পর্দা ও ইসলাম

চলমান পেজের সূচীপত্র




গ্রন্থকারের আরজ

স্ক্যান কপি ডাউনলোড

 

আজ চার বৎসর আগে পর্দা সম্পর্কে এক ধারাবাহিক প্রবন্ধ লিখিয়াছিলাম। ‘তর্জুমানূল কুরআন’ – এর কয়েকটি সংখ্যায় তাহা প্রকাশিত হইয়াছিল। তখন আলোচনার কয়েকটি দিক ইচ্ছা করিয়া বাদ দেওয়া হইয়াছিল; কোন কোন বিষয়কে অসম্পূর্ণ রাখিতে হইয়াছিল— কারন, গ্রন্থ রচনা তখন উদ্দেশ্য ছিল না; উদ্দেশ্য ছিল একটি প্রবন্ধ রচনা— সেই সকল বিষয়কে সন্নিবেশিত করিয়া প্রয়োজনীয় সংযোজন এবং বিশ্লেষণসহ বর্তমান গ্রন্থের রূপ দেওয়া হইয়াছে। আলোচ্য বিষয়, ইহা চূড়ান্ত এবং শেষ কথা এমন দাবী এখনও করা যায় না। কিন্তু সত্য সত্যই যাঁহারা বিষয়টি অনুধাবন করিতে আগ্রহী তাঁহারা ইহাতে অনেকাংশে তৃষ্ণা নিবৃত্তকারী তত্ত্ব-তথ্য এবং যুক্তি-প্রমাণ পাইবেন—অন্তত এতটুকু আশা আমি অবশ্যই করিব।

–তাওফীক আল্লাহরই হাতে; তাঁহারই কাছে সাহায্য চাই। আমিন।

২২, মুহাররাম ১৩৫১ হিজরী             -আবুল আ’লা

Top

মানব সমাজের মৌলিক সমস্যা

সমস্যার ধরন-প্রকৃতি

মানব সভ্যতার প্রধানতম ও জটিলতম সমস্যা দুইটি। এই দুইটি সমস্যার সুষ্ঠু ও ভারসাম্যপূর্ণ সমাধানের উপর মানব জাতির কল্যাণ ও অগ্রগতি নির্ভরশীল। এইজন্যই ইহার সমাধানের জন্য আবহমানকাল হইতে দুনিয়ার বিদগ্ধ সমাজ বিব্রত ও চিন্তান্বিত রহিয়াছেন।

প্রথম সমস্যাটি এই যে, সামাজিক জীবনে নারী-পুরুষের সম্পর্ক কিরুপে স্থাপিত হইতে পারে। কারণ ইহাই প্রকৃতপক্ষে তমদ্দুনের ভিত্তি-প্রস্তর এবং ইহাতে তিলমাত্র বক্রতার অবকাশ থাকিলে তাহাকে অবলম্বন করিয়া যে ইমারত গরিয়া উঠিবে, তাহাও অবশ্যই বক্র হইবে।

দ্বিতীয় সমস্যা হইতেছে মানব জাতির ব্যষ্টি ও সমষ্টিগত সম্পর্ক। ইহারও সামঞ্জস্য বিধানে যদি সামান্যতমও অসংগতি থাকিয়া যায়, তাহা হইলে যুগযুগান্ত কাল ধরিয়া মানব জাতিকে ইহার তিক্ত ফল ভোগ করিতে হইবে।

একদিকে যেমন সমস্যা দুইটির গুরুত্ব এইরূপ, অপরদিকে ইহার জটিলতাও এত বর্ধনশীল যে, মানবপ্রকৃতির যাবতীয় তথ্যের পুংখানুপুংখ বিশ্লেষণ না করিয়া কেহ ইহার সমাধানে সমর্থ হইবে না। সত্য সত্যই এইরূপ মন্তব্য যথার্থ হইয়াছে যে, মানব একটি ক্ষুদ্রতম জগত; ইহার শারীরিক গঠন, প্রকৃতিবিন্যাস, ক্ষমতা-যোগ্যতা, বাসনা, অনুপ্রেরণা-অনুভূতি এবং আপন সত্তাবহির্ভূত অসংখ্য সৃষ্টিনিচয়ের সহিত ইহার বাস্তব সম্পর্ক প্রভৃতি বিষয়সমূহ একটি বিশ্বজগতের ন্যায় মানবের অভ্যন্তরে বিরাজমান। এহেন জগতের প্রতি প্রান্তে সুস্পষ্ট দৃষ্টি নিক্ষেপ না করিলে মানবের প্রকৃত পরিচয় লাভ সম্ভব নহে এবং পূর্ণ ও প্রকৃত পরিচয় ব্যতীত তাহার মৌলিক সমস্যাবলির সমাধানও অসম্ভব।

আবার বিষয়টি এতই জটিল যে, আদিকাল হইতে অদ্যাবধি ইহা জ্ঞান-বিজ্ঞান ও গবেষণার লীলাভূমি হইয়া রহিয়াছে। প্রথম কথা এই যে, আজ পর্যন্ত জগতের সমুদয় তথ্য মানুব সম্মুখে উদ্ঘাটিত হয় নাই। আজ পর্যন্ত কোন মানবীয় জ্ঞানই চরম পরিপূর্ণতা লাভ করিতে পারে নাই অর্থাৎ কোন মানুষই এমন দাবী করিতে পারে না যে, উক্ত জ্ঞানের সহিত সংশ্লিষ্ট তথ্যাবলীর সমুদয়ই তাহার আয়ত্তাধীন রহিয়াছে। উপরন্তু যে সমস্ত তথ্যের উপর এ-যাবত আলোকপাত করা হইয়াছে, তাহার বিস্তৃতি ও সূক্ষ্মতা আবার এত অধিক যে, ব্যক্তি বিশেষ তো দূরের কথা, দল বিশেষেরও সতর্ক দৃষ্টি উহার উপরে একই সময়ে নিপতিত হয় না। উহার একদিক যদি জ্ঞান-চক্ষে ধরা পড়ে তো অপরদিক তমসাবৃত থাকিয়া যায়। কোথাও দৃষ্টি সংকীর্ণ হইয়া পড়ে, আবার কোথাও ব্যক্তিগত ভাব-প্রবণতা দৃষ্টি-পথকে আচ্ছন্ন করিয়া রাখে। এবম্বিধ দ্বিগুণিত দুর্বলতা সহকারে মানব স্বীয় জীবনের এই সকল সমস্যা সমাধানের সকল প্রকার প্রচেষ্টা সত্ত্বেও অকৃতকার্য থাকিয়া যায় এবং পরিণামে তাহার ত্রুটি-বিচ্যুতিগুলিই প্রকট হইয়া পড়ে। সমস্যার সুষ্ঠু সমাধান একমাত্র তখনই সম্ভব, যখন তৎসংশ্লিষ্ট সমুদয় তথ্য সম্পর্কে সমদর্শিতা লাভ হয়। আবার যতক্ষণ পর্যন্ত সমস্ত তথ্য না হইলেও অন্তত আবিষ্কৃত তথ্যাবলীর সমগ্র দিক এক সংগে জ্ঞানালোকে উদ্ভাসিত না হইবে, ততক্ষণ সমদর্শিতা লাভ হইবে না। কিন্তু আবার যে দৃশ্যপটের বিস্তৃতি স্বভাবতই এত অধিক হয় যে, উহার সমগ্রখানি দৃষ্টিপথে পতিত হয় না এবং এতদ্সহ প্রকৃতির বাসনা, আগ্রহ ও ঘৃণার অভীপ্সা এত প্রবল হয় যে, যাহাও স্পষ্ট দৃষ্টিগোচর হয় তাহা হইতেও দৃষ্টি কুঞ্চিত করা হয়। এমন অবস্থা সমদৃষ্টিশক্তি লাভ কি কখনও সম্ভব হইতে পারে? এমতাবস্থায় যে সমাধান গ্রহণ করা হইবে, তাহাতে অবশ্যম্ভাবীরূপে হয়ত অতিরিক্ত বাড়াবাড়ি অথবা সংগত সীমা লংঘিত হইবে নতুবা অপ্রাচুর্য ও ন্যূন্যতা ঘটিবে।

উপরে বর্ণিত প্রধানতম সমস্যা দুইটির মধ্যে প্রথমটিই এখানে আমাদের আলোচ্য বিষয়। আমরা এতদ্বিষয়ে অতীত ইতহাস আলোচনা করিলে শুধু অতিরিক্ত বাড়াবাড়ি এবং চরম ন্যূনতার এক বিস্ময়কর টানা-হেঁচড়া দেখিতে পাই। আমরা একদিকে দেখিতে পাই যে, নারী মাতারূপে সন্তানাদির অন্ন দান করিয়াছে এবং অর্ধাঙ্গিনী সাজিয়া জীবনের উত্থান-পতনে পুরুষের সাহায্য করিয়াছে। অপরদিকে সেই নারীকেই আবার সেবিকা অথবা দাসীর কার্যে নিযুক্ত করা হইয়াছে। তাহাকে গরু-ছাগলের ন্যায় ক্রয়-বিক্রয় করা হইয়াছে। মালিকানা ও উত্তরাধিকার হইতে বঞ্চিত রাখা হইয়াছে। তাহাকে পাপ-পংকিলতা ও লাঞ্ছনার প্রতিমূর্তি করিয়া রাখা হইয়াছে। তাহার ব্যক্তিত্বের পরিস্ফুটন অথবা ক্রমবিকাশের কোন সুযোগই তাহাকে দেয়া হয় নাই। আবার কোন সময়ে নারীকে উন্নীত ও পরিষ্ফুট করা হইলেও সংগে সংগে চরিত্রহীনতা ও উচ্ছৃঙ্খলতায় তাহাকে নিমজ্জিত করা হইয়াছে। তাহাকে পাশবিক প্রবৃত্তির ক্রীড়নকে পরিণত করা হইয়াছে। আবার কখনও তাহাকে ‘শয়তানের এজেন্ট’ আখ্যায়িত করিয়া রাখা হইয়াছে এবং তাহার তথাকথিত পরিস্ফুটন ও উন্নতির সংগে সংগে মানবতারও অধপতন শুরু হইয়াছে।

এতদৃশ চরম সীমাদ্বয়কে আমরা শুধু দৃষ্টিভঙ্গির দিক দিয়া সংগত সীমালঙ্ঘন এবং চরম ন্যূনতার নামেই অভিহিত করিতেছি না, বরং অভিজ্ঞতার দ্বারা যখন ইহার বিষময় পরিণাম আমরা দেখতে পাই, তখনই নৈতিক পরিভাষায় ইহার একটিকে সংগত সীমালঙ্ঘন এবং অপরটিকে চরম অপ্রাচুর্য বা ন্যূনতা বলিয়া থাকি। উপরোল্লিখিত ইতিহাসের পটভূমি আমাদিগকে ইহাই শিক্ষা দান করে যে, যখন কোন জাতি বন্য জীবন যাপনের যুগ অতিক্রম করিয়া সভ্যতা ও বসতি স্থাপনের দিকে অগ্রসর হয় তখন তাহাদের নারী দাসী ও সেবিকার ন্যায় পুরুষদের সংগে বসবাস করিতে থাকে। প্রথম প্রথম কুখ্যাত শক্তিগুলি তাহাদিগকে ক্রমোন্নতির দিকে লইয়া যায়। কিন্তু তামাদ্দুনিক উন্নতি যখন বিশিষ্ট পর্যায়ে উপনীত হয়, তখন তাহারা অনুধাবন করে যে, তাহাদের অর্ধাঙ্গিনীদিগকে অনুন্নত রাখিয়া তাহারা উন্নতির পথে পদক্ষেপ করিতা পারে না। তখন নিজেদের উন্নতির পথ রুদ্ধ মনে করে এবং প্রয়োজনানুসারে জাতীয় অর্ধাংশকে (নারী) প্রথমাংশের (পুরুষ) সহিত অগ্রসর হইবার যোগ্য করিয়া তোলে। এইভাবে তাহারা ক্ষতিপূরণ করিতে থাকে এবং তখন শুধু ক্ষতিপূরণেই তুষ্ট না হইয়া ক্রমাগত সম্মুখে অগ্রসর হইতে থাকে। অবশেষে বংশীয় শৃঙ্খলা-যাহাকে তামাদ্দুনিক ভিত্তিপ্রস্তর বলা হয়-নারী স্বাধীনতার দ্বারা ধ্বংস ও লুপ্ত হইয়া যায়। নৈতিক অবনুতির সংগে সংগে মানসিক, শারীরিক ও বৈষয়িক শক্তি নিচয়ের অবনতিও অবশ্যম্ভাবীরূপে পরিষ্ফুট হয়। ইহার শেষ পরিণতি ধবংস ব্যতীত আর কি হইতে পারে?

ইতিহাস হইতে বিস্তৃতভাবে দৃষ্টান্ত উপস্থাপিত করিতে গেলে সন্দর্ভের কলেবর বর্ধিত হইবে বলিয়া আমরা এখানে মাত্র দুই-চারিটির উল্লেখ সমীচীন মনে করিতেছি।

 

 

গ্রীস

প্রাচীন জাতিসমূহের মধ্যে গ্রীস সভ্যতাই সরবাপেক্ষা গৌরবময়। এই জাতির প্রাথমিক যুগে নৈতিক দৃষ্টিভঙ্গী, আইন সম্পর্কিত অধিকার, সামাজিক আচার প্রভৃতির দিক হইতে নারীর মর্যাদা নিতান্ত অধপতিত ছিল। গ্রীস পুরাণে নারী ‘পান্ডোরাকে’ মানবের দুঃখ-দুর্দশার কারণ হিসাবে বর্ণনা করা হইয়াছে, যেইরূপ হযরত হাওয়া (আ)-কে ইহুদী পুরানে উক্ত বিষয়ের জন্যে দায়ী করা হইয়াছে। হযরত হাওয়া (আ) সম্পর্কিত কল্পিত মিথ্যা কাহিনী ইহুদী ও খ্রীস্টীয় সম্প্রদায়ের রীতি নীতি, আইন-কানুন, সামাজিক ক্ষেত্রে, নৈতিক চরিত্র প্রভৃতিকেও যে প্রবলভাবে প্রভাবান্বিত করিয়াছে, তাহা কাহারও অজ্ঞাত নহে। ‘পান্ডোরা’ সম্পর্কে গ্রীকগণ যে ধারণা পোষণ করিত, তাহাও তাহাদের মানসিকতাকে সমভাবে প্রভাবান্বিত করিয়াছিল। তাহাদের দৃষ্টিতে নারী এক নিকৃষ্ট জীব ছিল। সামাজিক ক্ষেত্রে নারীর কোনই মর্যাদা ছিল না এবং সম্মানিত মর্যাদা একমাত্র পুরুষের জন্যই সংরক্ষিত ছিল।

সভ্যতার ক্রমবিকাশের প্রাথমিক পর্যায়ে কিয়ৎ সংশোধনীসহ এই ব্যবস্থাই বলবৎ  রহিল। সভ্যতা ও জ্ঞানালোকের এতটুকু প্রভাব পরিলক্ষিত হইল যে, নারীর আইন সম্পর্কিত অধিকার পূর্ববতই রহিল, তবে সামাজিক ক্ষেত্রে তাহাকে উন্নত মর্যাদা দান করা হইল। সে গ্রীকদের গৃহরাণী হইল। তাহার কর্তব্যকর্ম গৃহাভ্যন্তরেই সীমাবদ্ধ রহিল। এই সীমারেখার মধ্যে তাহার পূর্ণ কর্তৃত্বও ছিল। তাহার সতীত্ব অতীব মূল্যবান ছিল এবং ইহার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা হইত। সম্ভ্রান্ত গ্রীক পরিবারে পর্দা প্রথার প্রচলন ছিল। তাহাদের গৃহাভ্যন্তরে নারী-পুরুষের প্রকোষ্ঠ পৃথক ছিল। তাহাদের রমণিগণ নারী-পুরুষের মিলিত বৈঠকে যোগদান করিত না। জনসাধারণের প্রেক্ষাগৃহে তাহারা দৃষ্টিগোচর হইত না। বিবাহের মাধমে পুরুষের সংগে সম্পর্ক স্থাপন করাকেই তাহারা সম্মানজনক মনে করিত। বীরাঙ্গনায় জীবন যাপন অত্যন্ত ঘৃণিত ও অভিশপ্ত ছিল। ইহা তৎকালীন অবস্থা ছিল, যখন গ্রীক জাতি অতীব শক্তিশালী ও দ্রুত উন্নতির উচ্চ সোপানে অধিষ্ঠিত ছিল। এই সময়ে নৈতিক পাপাচার বিদ্যমান থাকিলেও তাহা ছিল সীমাবদ্ধ। গ্রীক রমণীগণ পবিত্রতা, শ্লীলতা ও সতীত্বের দাবী করিতে পারিত এবং পুরুষগণ তাহার বিপরীত ছিল। তাহারা এতাদৃশ গুণাবলীর প্রত্যাশী ছিল না এবং তাহারা যে পবিত্র জীবন যাপন করিবে এমন আশাও করা যাইত না। বেশ্যা সম্প্রদায় গ্রীক সমাজের একটি অভিন্ন অংশ ছিল। এই সম্প্রদায়ের সহিত সম্পর্ক স্থাপন পুরুষের জন্য কোনক্রমেই দূষণীয় ছিল না।

গ্রীকদের মধ্যে ক্রমশ প্রবৃত্তি পূজা ও কামোদ্দীপনার প্রভাব বিস্তার লাভ করিতে লাগিল এবং এই যুগে বেশ্যা-সম্প্রদায় এতখানি উন্নত মর্যাদা লাভ করিল যে, ইতিহাসে তাহার দৃষ্টান্ত বিরল। বেশ্যালয় গ্রীক সমাজের আপামর-সাধারণের কেন্দ্র ও আড্ডাখানায় পরিণত হইল। দার্শনিক, কবি, ঐতিহাসিক, সাহিত্যিক ও বিশেষজ্ঞ প্রভৃতি নক্ষত্ররাজি উক্ত চন্দ্রকে পরিবেষ্টিত করিয়া রাখিত। বেশ্যাগণ কেবল জ্ঞান-বিজ্ঞান ও সাহিত্য সম্মেলনে সভানেত্রীর আসনই গ্রহণ করিত না; বরং গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক আলোচনাও তাহাদের সমক্ষে সম্পাদিত হইত। যেই সমস্ত সমস্যার সহিত জাতির জীবন-মরণ প্রশ্ন সংশ্লিষ্ট ছিল, সেই সকল ব্যাপারেও বেশ্যাদের মতামতকে চূড়ান্ত মনে করা হইত। অথচ তাহাদের বিচার-বিবেচনায় কোন ব্যক্তির উপর কস্মিনকালেও সুবিচার করা হইত না। সৌন্দর্যপূজা গ্রীকদের মধ্যে কামাগ্নি প্রবলাকারে প্রজ্বলিত করিয়া দিল। যেই প্রতিমূর্তি অথবা শিল্পের নগ্ন আদর্শের প্রতি তাহারা সৌন্দর্য লালসা প্রকাশ করিত; তাহাই তাহাদের কামাগ্নির ইন্ধন যোগাইতে লাগিল। অবশেষে তাহাদের মানসিকতা এত বিকৃত হইল যে, কামাগ্নি পুজাকে তাহারা নৈতিকতার দিক দিয়া কোনরূপ দূষণীয়ই মনে করিত না। তাহাদের নৈতিক মাপকাঠি এতখানি পরিবর্তিত হইয়াছিল যে, বড় বড় দার্শনিক ও নীতিবিদ ব্যভিচার ও অশ্লীলতাকে কদর্য ও দূষণীয় মনে করিত না। সাধারনভাবে গ্রীকগণ বিবাহকে একটা অনাবশ্যক প্রথা মনে করিত এবং বিবাহ ব্যতীত নারী-পুরুষের প্রকাশ্য সংমিলন যুক্তিযুক্ত মনে করিত। অবশেষে তাহাদের ধর্মও তাহাদের পাশবিক প্রবৃত্তির কাছে নতি স্বীকার করিল। কামদেবীর (Aphrodite) পূজা সমগ্র গ্রীসে বিস্তৃতি লাভ করিল। গ্রীক পুরাণে কামদেবী সম্পর্কে এইরূপ বর্ণিত আছে যে, সে জনৈক দেবতার পত্নী হইয়া অপরাপর তিনজন দেবতা ও একজন মানবের সংগে প্রেমপূর্ণ দৈহিক সম্পর্ক সংস্থাপন করিয়াছিল। ইহাদের যৌনমিলনের ফলে যে সন্তান লাভ হইল, উত্তরকালে সেই কামদেব (কিউপিড) নামে অভিহিত হয়। এই কামদেব গ্রীকদের উপাস্য বা মা’বুদ ছিল। ইহা অনুমান করা কঠিন নহে যে, যেই জাতি এইরূপ জঘন্য চরিত্রকে শুধু তাহাদের আদর্শ নহে, উপাস্য হিসাবে গ্রহণ করিয়াছিল, তাহাদের নৈতিক মানদণ্ড কত নিম্নস্তরের ছিল। এবম্বিধ নৈতিক অধপতনের পরে কোন জাতির পুনরুত্থান সম্ভব নহে। এই নৈতিক অধপতনের যুগেই ভারতে ‘বামমার্গীয়’ এবং ইরানে ‘মজদকীয়’ মতবাদ প্রচারিত হইয়াছিল। এইরূপ পরিস্থিতিতেই বেবিলনে বেশ্যাবৃত্তি ধর্মীয় শূচিতার মর্যাদা লাভ করিয়াছিল। ইহার পরিণামে পরবর্তীকালে বেবিলন শুধু অতীত কাহিনীর অন্তর্ভুক্ত হইয়া রহিল এবং জগতে তাহার অস্তিত্ব চিরতরে বিলীন হইয়া গেল।

গ্রীসে যখন কামদেবীর পূজা আরম্ভ হইল, তখন গণিকালয়গুলি উপাসনা মন্দিরে পরিণত হইল। নির্লজ্জ বেশ্যা নারী দেবযানী বা দেবীতে পরিণত হইল এবং ব্যভিচার কার্য ধর্মীয় ক্রিয়াকলাপের মর্যাদায় উন্নীত হইল।

এইরূপ কামপূজার দ্বিতীয় সুস্পষ্ট পরিণাম এই হইয়াছিল যে, গ্রীক জাতির মধ্যে ‘লুত’ সম্প্রদায়ের দুস্কার্যাবলী মহামারীর ন্যায় সংক্রমিত হইয়া পড়িল এবং তাহা ধর্মীয় ও নৈতিক সমর্থন লাভ করিল। ‘হোমার’ ও ‘হিসিউড’ – এর শাসনকালে এই সমস্ত কার্যকলাপের অস্তিত্ব ছিল না। কিন্তু সাংস্কৃতিক উন্নতি যখন সৌন্দর্যবিজ্ঞান ও রসবিজ্ঞানের নামে (Aesthetics) নগ্নতা ও যৌনসম্ভোগের পূজার প্রবর্তন করিয়া দিল, তখন কামাগ্নির লেলিহান শিখা এমন পর্যায়ে পৌঁছুল যে, গ্রীক জাতিকে স্বাভাবিক পথ হইতে বিচ্যুত করিয়া এক প্রকৃতিবিরুদ্ধ পথে পরিচালিত করিল। শিল্প বিশেষজ্ঞগণ ইহাকে দুই ব্যক্তির মধ্যে ‘বন্ধুত্বের দৃঢ় সম্পর্ক’ নামে অভিহিত করিল। গ্রীকদেশীয় ‘হারমেডিয়াস’ ও ‘এরস্টগীন’ – ই সর্বপ্রথম এতদূর মর্যাদা লাভ করিয়াছিল যে, তাহাদের স্মরণার্থে আপন মাতৃভূমিতে তাহাদের প্রতিমূর্তি নির্মিত হইয়াছিল। ইহাদের মধ্যে পারস্পরিক অবৈধ ও অস্বাভাবিক প্রেম-সম্পর্ক স্থাপিত হইয়াছিল। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, এই যুগের পর গ্রীকদের জাতীয় জীবনে আর কোন নবযুগের সূত্রপাত হয় নাই।

 

রোম

গ্রীক জাতির পরে জগতে রোমক উন্নতির সুযোগ আসিয়াছিল। এখানেও আমরা পূর্বের ন্যায় উত্থান-পতনের চিত্র দেখিতে পাই। রোমকগণ যখন বর্বরতা অন্ধকার হইতে বাহির হইয়া ইতিহাসের উজ্জ্বল দৃশ্যপটে উদিত হয়, তখন তাহাদের সামাজিক শৃঙ্খলার চিত্র এইরূপ দেখা যায় যে, পুরুষ তাহার পরিবারের প্রধান কর্মকর্তা হইয়াছে; স্ত্রী ও সন্তানাদির উপর তাহার পূর্ণ প্রভুত্ব রহিয়াছে। এমন কি কোন কোন ক্ষেত্রে সে তাহার স্ত্রীকে হত্যা করিতেও ক্ষমতাবান হইয়াছে।

বর্বরতা যখন কিয়ৎ  পরিমাণে হ্রাস পাইল এবং তাহযীব-তমদ্দুনের ক্ষেত্রে রোমকগণ অগ্রসর হইতে লাগিল, তখন প্রাচীন পারিবারিক রীতিনীতি বজায় থাকিলেও তাহার কঠোরতার লাঘব এবং অবস্থা কিঞ্চিৎ পরিমিত হইল। রোমান সাধারণতন্ত্রের উন্নতিকালে গ্রীকদের ন্যায় পর্দা-প্রথার প্রচলন হয় নাই। কিন্তু নারী ও যুবক- যুবতিগণকে পারিবারিক শৃঙ্খলায় সম্ভ্রমশীল করিয়া রাখা হইয়াছিল। সতীত্ব, সাধুতা, বিশেষ করিয়া নারীদের ক্ষেত্রে এক অমুল্য রত্ন ছিল এবং ইহাই ছিল সম্ভ্রমশীলতার কষ্টিপাথর। নৈতিক কষ্টিপাথরও ছিল উচ্চমানের। একবার রোমান সিনেটের জনৈক সদস্য আপন কন্যার সম্মুখে তাহার স্ত্রীকে চুম্বন করিয়াছিল। ইহার দ্বারা জাতীয় চরিত্রের প্রতি কঠোর অবমাননা করা হইয়াছে বলিয়া মনে করা হয় এবং সিনেট গৃহে তাহার বিরুদ্ধে ভরৎসনাসূচক ভোট প্রদত্ত হয়। তৎকালে একমাত্র বিবাহ প্রথাই ছিল স্ত্রী-পুরুষের মিলনের বৈধ ও সম্মানিত পন্থা। নারীর সম্মান নির্ভর করিত তাহার মাতৃত্বে। বেশ্যাশ্রেণী যদিও বিদ্যমান ছিল এবং একটি সীমারেখা পর্যন্ত তাহাদের সংগে মেলামেশার অধিকারও পুরুষদের ছিল, তথাপি রোমদেশীয় জনসাধারণ ইহাকে অত্যন্ত হেয় মনে করিত এবং তাহাদের সহিত সম্পর্ক স্থাপনকারী পুরুষদিগকে অবজ্ঞার চক্ষেই দেখা হইত।

তাহযীব-তমদ্দুনের উন্নতির সংগে সংগে নারীদের সম্পর্কে রোমকদের দৃষ্টিভঙ্গিরও পরিবর্তন হইতে লাগিল। ক্রমশ বিবাহ-তালাকে বিধি-ব্যবস্থার এবং পারিবারিক রীতিনীতিরও এমন পরিবর্তন সংঘটিত হয় যে,অবস্থা অতীত অবস্থার বিপরীত হইয়া গেলো। বিবাহ শুধু একটা আইনগত চুক্তিনামায় (Civil Contract) পরিণত হইল-যাহার স্থায়িত্ব ও  বিচ্ছেদ স্বামী-স্ত্রীর উপর নির্ভর করিত । দাম্পত্য সম্পর্কের দায়িত্ব গুরুত্বহীন হইয়া পড়িল। নারীকে উত্তরাধিকার ও ধন-সম্পত্তির মালিকানার পূর্ণ অধিকার দেওয়া হইল। রোমান আইন তাহাকে পিতা ও স্বামীর কর্তৃত্ব হইতে স্বাধীন করিয়া দিল। রোমান নারীগণ সামাজিক ক্ষেত্রেই শুধু স্বাধীনতা লাভ করিল না, জাতীয় ধন-সম্পদের একটা বিরাট অংশও ক্রমশ তাহাদের কর্তৃত্বাধীন হইয়া পড়িল। তাহারা স্বামী দিগকে উচ্চহারের সুদে টাকা কর্য দিতে লাগিল। ফলে স্বামী ধনাঢ্য স্ত্রীর দাসে পরিণত হইল। তালাক এত সহজ বস্তু হইয়া পড়িল যে, কথায় কথায় দাম্পত্য সম্পর্ক ছিন্ন হইতে লাগিল। বিখ্যাত রোমান দার্শনিক ও পণ্ডিত স্নীকা (খ্রিস্টপূর্ব ৫৬ – খ্রিস্টপূর্ব ৪) তালাকের আধিক্যের জন্যে অনুতাপ করিয়া বলেন, ‘আজকাল রোমে তালাক কোন লজ্জার ব্যাপার নহে। নারী তাহার স্বামী সংখ্যার দ্বারাই নিজের বয়স গণনা করে।’

এই যুগে নারী পরস্পর বহু স্বামী গ্রহণ করিতে থাকে। মার্শাল (খ্রী. ৪৩-১০৪) একটি নারীর উল্লেখ করিয়া বলিয়াছেন যে, সে দশজন স্বামী গ্রহণ করা হইয়াছিল। জুদনিয়েল (খ্রী. ৬০-১৪০) একটি নারী সম্পর্কে মন্তব্য করিয়াছেন, সে পাঁচ বৎসরে আটজন স্বামী গ্রহণ করিয়াছে। সেন্ট জুরুম (খ্রী. ৩৪০-৪২০) এমন এক নারীর বর্ণনা করিয়াছেন, যে তাহার জীবনে বত্রিশ জন স্বামী গ্রহণ করিয়াছে এবং সে তাহার স্বামীর একবিংশ পত্নী ছিল।

বিবাহ ব্যতীত নারী-পুরুষের যৌনমিলন যে দূষণীয়, এমন ধারনাও এ যুগে মানুষের মন হইতে দূরীভূত হইতে লাগিল। বড় বড় নীতিবিদগণও ব্যভিচারকে একটি সাধারণ কার্য মনে করিত। খ্রী. পূর্ব ১৮৪ সনে কাটো (Cato)রোমে নীতিপরিদর্শক ও নীতিতত্ত্বাবধায়ক নিযুক্ত হন। তিনিও যৌনসুলভ লাম্পট্যকে সংগত বলিয়াছেন। সিসেরো নব্য-যুবতীদের জন্য নৈতিক বন্ধনকে শিথিল করার পরামর্শ দিয়াছেন। জিতেন্দ্রিয়তা, নিস্পৃহতা, ঔদাসিন্য, তিতিক্ষা, নিঃসঙ্গতা প্রভৃতি দার্শনিক মূলনীতির (Stoics) পূর্ণ অনুসারী (Epictetus) তাঁহার শিষ্যমন্ডলীকে নিম্নরূপ উপদেশ দান করিতেনঃ

যতদুর সম্ভব বিবাহের পূর্বে নারীদের সংস্পর্শ হইতে বিরত থাকিবে। কিন্তু যদি কেহ এ বিষয়ে সংযমী হইতে না পারে, তাহাকে ভর্ৎসনা করিও না।

অবশেষে নৈতিক চরিত্র ও সামাজিকতার বন্ধন এত শিথিল হইয়া পড়িল যে, কামপ্রবণতা, নগ্নতা ও অশ্লীলতার প্লাবনে রোম সাম্রাজ্য নিমজ্জিত হইয়া গেল। রঙ্গালয়ে নির্লজ্জতা ও নগ্নতার অভিনয় শুরু হইল। নগ্ন, কামোদ্দীপক ও অশ্লীল চিত্র দ্বারা গৃহের শোভা বর্ধন আবশ্যক বোধ করা হইল। বেশ্যাবৃত্তি এত প্রসার লাভ করিল যে, রোম সম্রাট ‘টাইবেরিসের’ (খ্রী. ১৪-৩৭) শাসনকালে সম্ভ্রান্ত পরিবারের মেয়েদিগকে বেশ্যা-নর্তকীয় কার্য হইতে নিরস্ত করিবার জন্য আইন প্রণয়ন করা আবশ্যক হইয়া পড়িয়াছিল। ফ্লোরা (Flora) নামে একটি ক্রীড়া সেইকালে বেশ জনপ্রিয় হইয়াছিল। কারণ ইহাতে উলঙ্গ নারীদের দৌড় প্রতিযোগিতা হইত। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলের একত্রে স্নানাবগাহন প্রথা প্রচলিত ছিল। রোমীয় সাহিত্যে অশ্লীল নগ্ন চিত্রসম্বলিত প্রবন্ধাদি দ্বিধাহীন চিত্তে প্রকাশ করা হইত এবং এইরূপ সাহিত্যই আপামরসাধারণের সুখপাঠ্য ও সমাদৃত ছিল। সাহিত্যের মান এত নিম্নস্তরের ছিল যে, এই সমস্ত অশ্রাব্য কুশ্রাব্য প্রবন্ধ রচনায় রূপাত্মক অথবা শ্লেষাত্মক বাক্য যোজনারও আবশ্যক অনুভূত হইত না।

পাশবিক প্রবৃত্তির দ্বারা বশীভূত হইবার পর রোম সাম্রাজ্যের গৌরবোজ্জ্বল অট্টালিকা এমনভাবে ধূলিসাৎ হইয়া পড়িল যে, তাহার শেষ ইষ্টকটিরও অস্তিত্ব রহিল না।

 

খ্রীস্টীয় ইউরোপ

পাশ্চাত্য জগতের এবম্বিধ নৈতিক অধপতনের প্রতিবিধানের জন্য ঈসায়ী ধর্মের আবির্ভাব হয়। ইহাতে প্রথম প্রথম বেশ সুফল পরিলক্ষিত হইল। অশ্লীলতার দ্বার রুদ্ধ হইল, জীবনের প্রতিক্ষেত্র হইতে নগ্নতা দূরীভূত হইল, বেশ্যাবৃত্তি রহিতকরণের ব্যবস্থালম্বন করা হইল; বেশ্যা, গায়িকা ও নর্তকীদিগকে পাপাচার হইতে নিবৃত্ত করা হইল এবং মানুষের মধ্যে পূত-পুণ্য চরিত্রের ধারণা অন্তর্নিবিষ্ট করা হইল। কিন্তু নারী ও যৌনসম্পর্ক সম্বন্ধে খ্রিষ্টীয় ধর্ম-যাজকদের যে ধারণা ছিল তাহা চরম সীমা অতিক্রম করিল। ফলে ইহা দ্বারা মানব প্রকৃতির বিরুদ্ধে সংগ্রাম ঘোষিত হইল।

তাহাদের প্রাথমিক ও মৌলিক দৃষ্টিভঙ্গি এই ছিল যে, নারীই পাপের মূল উৎস। পুরুষের জন্য নারী পাপ আন্দোলনের উৎস এবং নরকের দ্বার স্বরূপ। মানবের যাবতীয় দুঃখ-দুর্দশা নারী হইতেই হইয়াছে। নারীরূপে জন্মলাভ করা এক লজ্জাস্কর ব্যাপার। তাহার রূপ-সৌন্দর্যের জন্য তাহার লজ্জাবোধ করা উচিত। কারণ উহাই শয়তানের মারণ-যন্ত্র। যেহেতু সে জগত ও জগতবাসীর জন্য অভিশাপ আনয়ন করিয়াছে, সেইজন্য তাহাকে চিরদিন প্রায়শ্চিত্ত করিতে হইবে।

Tertullian নামক খ্রিস্টীয় সম্প্রদায়ের প্রাথমিক যুগের ধর্মগুরু নারী সম্পর্কে নিম্নরূপ মন্তব্য করিয়াছেনঃ

সে শয়তানের আগমনের দ্বারস্বরূপ, সে নিষিদ্ধ বৃক্ষের দিকে আকর্ষণকারিণী, খোদার আইন ভংগকারিণী ও পুরুষের ধ্বংসকারিণী।

খ্রীস্টীয় তাপসশ্রেষ্ঠ (Chrysostum) নারী সম্বন্ধে এইরূপ বলিয়াছেনঃ

-একটি অনিবার্য পাপ, একটি জন্মগত দুষ্ট প্ররোচনা, একটি আনন্দদায়ক বিপদ, পারিবারিক আশংকা, ধ্বংসাত্মক প্রেমদায়িনী, একটি সজ্জিত বিঘ্ন।

তাঁহার দৃষ্টিভঙ্গি এই ছিল যে, নারী-পুরুষের যৌন সম্পর্ক বিবাহের মাধ্যমে হইলেও উহা মূলত একটি অপবিত্র কার্য এবং ইহা হইতে নিবৃত হওয়া বাঞ্ছনীয়। নৈতিক চরিত্রের এতাদৃশ বৈরাগ্যসুলভ ধারণা কামগন্ধহীন দর্শনের (Neo Platonism)প্রভাব সর্বপ্রথম পাশ্চাত্য বিস্তার লাভ করিতেছিল। খ্রীস্টীয় মতবাদ তাহাকে চরমে পৌঁছাইয়া দিল। এখন কৌমার্য ও কুমারীত্ব নৈতিক চরিত্রের কষ্টিপাথর হইয়া পড়িল। দাম্পত্য জীবনকে নৈতিক চরিত্রের দিক হইতে ঘৃণিত ও অধপতিত মনে করা হইল। লোকে বিবাহ হইতে বিরত থাকাকে পুণ্যের কাজ ও উন্নত চরিত্রের পরিচায়ক মনে করিতে লাগিল। পবিত্র জীবন যাপনের পন্থা এই হইল যে, কেহ একেবারে বিবাহই করিবে না অথবা বিবাহ করিলেও নারী-পুরুষ তাহাদের বৈবাহিক সম্পর্ক ছিন্ন করিবে। বিভিন্ন ধর্মীয় সভা-সমিতিতে এইরূপ আইন প্রণীত হইল যে, গীর্জার কর্মচারীগণ নির্জনে তাহাদের স্ত্রীর সঙ্গে সম্মিলিত হইতে পারিবে না, এমন কি দেখা-সাক্ষাত করিতে হইলেও উন্মুক্ত স্থানে অন্তত দুইজন পুরুষের উপস্থিতিতে করিতে হইবে। বৈবাহিক সম্পর্ক যে অপবিত্র, এই ধারণা নানা প্রকারের খ্রীস্টানদের মধ্যে বদ্ধমূল হইতা লাগিল। এখানে প্রচলিত একটি রীতির দৃষ্টান্ত দেওয়া যাইতে পারে। যেদিন গীর্জায় কোন ধর্মীয় অনুষ্ঠান হইত, পূর্বরাত্রে একত্র বসবাসকারী স্বামী-স্ত্রীকে তাহাতে যোগদান করিতে দেওয়া হইত না। কারণ যৌন সম্মিলনের দ্বারা তাহারা পাতকী হইয়াছে এবং এইরূপ অবস্থায় তাহাদিগকে কোন পবিত্র স্থানে গমন করিবার অনুমতি দেওয়া যাইতে পারে না। এইরূপ বৈরাগ্যসূলভ মনোভাব সমগ্র পারিবারিক সম্পর্ক, এমনকি মাতা-পুত্রের সম্পর্কও তিক্ততর করিয়া তুলিয়াছিল এবং বিবাহের ফলে যে সম্পর্ক দানা বাঁধিয়া উঠিত, তাহাকে অপবিত্র ও পাপজনক মনে করা হইত।

উপরিউক্ত উভয় প্রকারের দৃষ্টিভঙ্গী শুধুমাত্র নৈতিক ও সামাজিক দিক হইতে নারীর মর্যাদাকে অতিমাত্রায় হেয় করে নাই বরং কৃষ্টিগত আইন-কানুনকে এতখানি প্রভাবান্বিত করিয়াছে যে, একদিকে বৈবাহিক জীবন নারী-পুরুষের জন্য বিপজ্জনক হইয়া পড়িয়াছে এবং অপরদিকে সমাজে নারীর মর্যাদা সকল দিক দিয়ে হেয় ও অবজ্ঞেয় হইয়া পড়িয়াছে। খ্রীস্টধর্মীয় বিধি-বিধান অনুযায়ী যত প্রকার আইন পাশ্চাত্য জগতে প্রচলিত হইয়াছে, উহার বৈশিষ্ট্য ছিল নিম্নরূপঃ

১। জীবিকার্জন ক্ষেত্রে নারীকে সম্পূর্ণ অসহায় করিয়া পুরুষের অধীন করিয়া রাখা হইয়াছিল। উত্তরাধিকার সংক্রান্ত ব্যাপারে তাহার অধিকার অত্যন্ত সীমাবদ্ধ ছিল এবং বিষয়-সম্পত্তির উপর অধিকার অধিকতর সীমাবদ্ধ ছিল। এমন কি স্বোপার্জিত অর্থের উপরও তাহার কর্তৃত্ব ছিল না। সকল বিষয়ের উপর পূর্ণ কর্তৃত্ব ছিল স্বামীর।

২। ‘তালাক’ ও ‘খোলার’ অনুমতি দেওয়া হইত না। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে যতই মনোমালিন্য হউক না কেন, পারস্পরিক তিক্ত সম্পর্কের জন্য সংসার নরকতুল্য হউক না কেন, তথাপি ধর্ম ও আইন উভয়ই স্বামী-স্ত্রীকে অবিচ্ছেদ্য বন্ধনে আবদ্ধ থাকিতে বাধ্য করিত। অবস্থা অত্যন্ত বেগতিক হইলে উভয়কে এই শর্তে বিবাহ বিচ্ছেদের অনুমতি দেওয়া হইত যে, তাহারা কেহই দ্বিতীয়বার অন্যত্র বিবাহ করিতে পারিবে না। ইহা প্রথমোক্ত নীতি হইতে কঠোরতর ছিল। কারণ এমতাবস্থায় বিচ্ছিন্ন নারী-পুরুষের জন্য সারা জীবন বৈরাগ্য পালন অথবা যৌন পাপাচারে লিপ্ত হওয়া ব্যতীত অন্য কোন পন্থা থাকে না।

৩। স্বামীর মৃত্যুর পর স্ত্রীর ও স্ত্রীর মৃত্যুর পর স্বামীর পুনরায় বিবাহ করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ও পাপজনক ছিল। খ্রীস্টীয় পাদ্রীগণ বলিতেন যে, ইহা শুধু পাশবিক প্রবৃত্তির দাসত্ব এবং ভোগ লালসা ব্যতীত আর কিছু নহে। তাঁহারা ইহাকে ‘মার্জিত ব্যভিচার’ নামে অভিহিত করিতেন। গির্জার কর্মচারীগণের জন্য দ্বিতীয় বিবাহ অপরাধজনক ছিল। দেশের সাধারণ আইনানুযায়ী কোন কোন স্থানে ইহার অনুমতিই দেওয়া হইত না। কোথাও আবার আইনগত বাধা না থাকিলেও ধর্মীয় ভাবাপন্ন জনসাধারণ ইহাকে বৈধ মনে করিত না।

 

আধুনিক ইউরোপ

খ্রীস্টীয় অষ্টাদশ শতাব্দীতে ইউরোপের দার্শনিক ও সাহিত্যিকগণ যখন ব্যক্তিগত অধিকার ও ব্যক্তি স্বাধীনতার জন্য সমাজের বিরুদ্ধে আন্দোলন আরম্ভ করিলেন, তখন তাহাদের সম্মুখে সেই ভ্রান্তিপূর্ণ তামাদ্দুনিক রীতিনীতি বিদ্যমান ছিল-যাহা খ্রীস্টীয় নৈতিক শাসন, জীবন দর্শন ও সামন্ততন্ত্রের জঘন্য সমন্বয়েই গঠিত হইয়াছিল। ইহা মানবীয় আত্মাকে অপ্রাকৃতিক শৃঙ্খলে আবদ্ধ করিয়া উন্নতির সকল দ্বার রুদ্ধ করিয়া দিয়াছিল। এই প্রচলিত রীতি-নীতিকে চূর্ণ করিয়া তদস্থলে এই নূতন রীতি-শৃঙ্খলা  প্রবর্তনের জন্য নব্য-ইউরোপের প্রতিষ্ঠাতাগণ যে দৃষ্টিভঙ্গী উপস্থিত করিলেন তাহার ফলে ফরাসী বিপ্লব জন্মলাভ করিল। তাহার পর পাশ্চাত্য তাহযীব-তমদ্দুনের উন্নতির পদক্ষেপ এমন পথে পরিচালিত হইল, যাহার শেষ পরিণতি বর্তমান পর্যায়ে আসিয়া দাঁড়াইয়াছে।

নবযুগের প্রারম্ভে নারী জাতিকে তাঁহাদের অধপতন হইতে উন্নীত করিবার জন্য যাহা কিছু করা হইয়াছিল, তাহার সুফল সামাজিক জীবনেই প্রতিফলিত হইল। বিবাহ ও তালাকের পূর্বতন কড়াকড়ি হ্রাস করা হইল। নারীদের জীবিকার্জনের অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করা হইল। যে নৈতিক দৃষ্টিভঙ্গীর ভিত্তিতে নারীকে হেয় ও অবহেলিত করিয়া রাখা হইয়াছিল, তাহার সংশোধন করা হইল। যেই সমস্ত সামাজিক মূলনীতির কারণে নারী দাসীর ন্যায় জীবন যাপন করিত, তাহাও সংশোধন করা হইল। পুরুষের ন্যায় নারীর জন্য উচ্চশিক্ষার পথ উন্মুক্ত হইল। ত্রুটিপূর্ণ সামাজিক রীতিনীতি ও অন্ধকার যুগের নৈতিক ধারণাসমূহের চাপে নারীদের নিষ্পেষিত যোগ্যতা ও প্রতিভা এইরূপ নানাবিধ সুব্যবস্থার ফলে ক্রমশ উদ্বেলিত হইয়া উঠিত। তাহারা গৃহ সামলাইল, সমাজে পবিত্রতা আনয়ন করিল এবং জনগনের মঙ্গল সাধন করিল। স্বাস্থ্যের উন্নতি, সন্তানাদি প্রতিপালন, রোগীর পরিচর্যা, গার্হস্থ্য ও বিজ্ঞানের উন্নতি প্রভৃতি যে সব গুণ নূতন তাহযীবের সঙ্গে সঙ্গে নারীদের মধ্যে পরিস্ফুট হইয়াছিল, তাহা ঐ আন্দোলনেরই প্রাথমিক ফল ছিল। কিন্তু যে সমস্ত দৃষ্টিভঙ্গীর গর্ভ হইতে এই আন্দোলন জন্মলাভ করিল, প্রথম হইতেই উহার মধ্যে সংগত সীমালংঘনের অভীপ্সা  বিদ্যমান ছিল। উনবিংশ শতাব্দীর এই অভীপ্সা অনুযায়ী কার্যকলাপ বেশ অগ্রসর হইয়া ছিল এবং বিংশ শতাব্দীর প্রারম্ভ পর্যন্ত ইউরোপীয় সমাজ অসংযম ও অমিতাচারের দ্বিতীয় প্রান্ত সীমায় উপনীত হইল ।

যেই সকল দৃষ্টিভংগীর উপর নুতন পাশ্চাত্য সমাজব্যবস্থার ভিত্তি স্থাপন করা হইল , তাহা নিম্নরূপ তিনটি শিরোনামায় ব্যক্ত করা যায়ঃ

ক) নারী – পুরুষের মধ্যে সাম্য বিধান,

খ) নারীর অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ও

গ) নারী –পুরুষের অবাধ মেলামেশা ।

এই তিনটি  মৌলিক ভিত্তির উপর সমাজ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার যে সম্ভাব্য পরিণাম ফল হইতে পারে, তাহাই অবশেষে প্রকট হইয়া পড়িল।

প্রথমত, সাম্যের এইরূপ সংজ্ঞা বর্ণনা করা হইল যে, নারী ও পুরুষ নৈতিক মর্যাদা ও মানবীয় অধিকারের দিক দিয়াই শুধু সমান নহে বরং তামাদ্দুনিক জীবনে পুরুষ যে সব কার্য করে, তাহারাও তাহাই করিবে এবং নৈতিক বন্ধন পুরুষের জন্য যেমন শিথিল করা হইয়াছে, নারীদের জন্যও অনুরুপ শিথিল করা হইবে। সাম্যের এই ভ্রান্ত ধারণার জন্য নারী তাহার দৈনন্দিন কার্যাবলীর প্রতি উদাসীন ও বিদ্রোহী হইয়া পড়িল। বস্তুত এই সমস্ত প্রকৃতিগত দৈনন্দিন কার্য সমাধার উপর  তমদ্দুন ও মানব জাতির স্থায়িত্ব নির্ভরশীল । অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও দলীয় প্রবণতা তাহার ব্যক্তিত্বকে আত্মকেন্দ্রিক করিয়া তুলিল। নির্বাচনী অভিযানে প্রতিদ্বন্দ্বিতা, অফিস ও কলকারখানায় চাকুরি গ্রহণ, স্বাধীন ব্যবসায় ও শিল্প প্রতিষ্ঠানে পুরুষের সংগে প্রতিযোগিতা, খেলাধুলা, ক্রীড়া, ব্যায়ামাদি ও সমাজের চিত্তবিনোদনকারী কার্যকলাপে অংশ গ্রহণ, ক্লাব, রংগমঞ্চ, নৃত্যগীত প্রভৃতি ও অনুষ্ঠানে সময় ক্ষেপণ এবং এবম্বিধ বহু প্রকার অকরণীয় ও অবক্তব্য কার্যকলাপ তাহাদের মন ও মস্তিস্ককে এমনভাবে প্রভাবান্বিত করিল যে, দাম্পত্য জীবনের গুরু দায়িত্ব, সন্তান প্রতিপালন, পারিবারিক সেবা-শুশ্রুষা, গৃহের সুব্যবস্থা প্রভৃতি যাবতীয় করণীয় বিষয়গুলি তাহার কর্মসূচী-বহির্ভূত হইয়া পড়িল। উপরন্তু তাহাদের প্রকৃতিগত ক্রিয়াকলাপের প্রতি তাহাদের আন্তরিক ঘৃণা জন্মিল। এখানে পাশ্চত্য পারিবারিক শৃঙ্খলা-যাহাকে তামাদ্দুনিক ভিত্তি-প্রস্তর বলা হয়-কদর্যভাবে প্রসার লাভ করিতে লাগিল। যেই গার্হস্থ্য জীবনের সুখ-শান্তির উপর মানবের কার্যক্ষমতা পরিস্ফুটন নির্ভরশীল , তাহা প্রকৃতপক্ষে শেষ হইয়া আসিতে লাগিল। তামাদ্দুনিক পরিচর্যায় নারী-পুরুষের পারস্পরিক সুষ্ঠু পন্থাই বৈবাহিক সম্পর্ক-উহা এখন মাকড়সার জাল অপেক্ষা ক্ষীণতর হইয়া পড়িল। জন্ম নিয়ন্ত্রন, গর্ভপাত ও প্রসূত হত্যার দ্বারা বংশ বৃদ্ধির পথ রুদ্ধ হইতে লাগিল। নৈতিক সাম্যের ভ্রান্ত ধারণা নারী-পুরুষের মধ্যে চরিত্রহীনতার সাম্য আনয়ন করিল। যেই নির্লজ্জতা পুরুষের জন্যও লজ্জাজনক ছিল, তাহা আর নারীর জন্য লজ্জাকর রহিল না।

দ্বিতীয়ত, নারীর অর্থনৈতিক স্বাধীনতা তাহাকে পুরুষ হইতে বেপরোয়া করিয়া দিল। পূর্বতন রীতিনীতি অনুযায়ী পুরুষ উপার্জন করিত এবং নারী গৃহ রক্ষা করিত। এখন তাহার পরিবর্তন ঘটিল। এখন নারী পুরুষ উভয়েই উপার্জন করিবে এবং গৃহ-শৃঙ্খলার ভার বহিরাগত তৃতীয় ব্যক্তির উপর অর্পিত হইবে বলিয়া স্থির হইল। এখন একমাত্র যৌন সম্পর্ক ব্যতীত নারী-পুরুষের মধ্যে এমন কোন সম্পর্ক রহিল না, যাহার জন্য একে অপরের সহিত সংশ্লিষ্ট থাকিতে বাধ্য হয়। কামরিপু চরিতার্থ করিবার জন্য নারী-পুরুষকে অবশ্যম্ভাবীরূপে চিরন্তন পারস্পরিক সম্পর্ক বন্ধনে আবদ্ধ থাকিয়া কোন এক গৃহে যৌথ জীবন যাপন করিতা হইবে-ইহার কি প্রয়োজন আছে? যেই নারী স্বীয় জীবিকা অর্জন করিতে পারে, যাবতীয় আবশ্যক মিটাইতে সক্ষম এবং অপরের নিরাপত্তা ও সাহায্যের মুখাপেক্ষী নহে, সে শুধু যৌন সম্ভোগের জন্য কেন একটি পুরুষের অধীনতা স্বীকার করিবে? কেনই-বা সে নৈতিক ও আইনগত বাধা-নিষেধ আপন স্কন্ধে স্থাপন করিবে? এবং কেনই-বা একটি পরিবারের গুরুদায়িত্ব বহন করিবে? বিশেষ করিয়া যখন নৈতিক সাম্যের ধারণা তাহার যৌন সম্ভোগের পথ নিষ্কণ্টক করিয়া দিয়াছে, তখন সে অভিলাষ চরিতার্থের এমন সহজ-সুন্দর সুরুচিসম্মত পন্থা পরিত্যাগ করিয়া ত্যাগ ও দায়িত্বসম্পন্ন প্রাচীন পন্থা অবলম্বন করিবে কেন? ধর্মের সংগে পাপ-ভয়ও দূরীভূত হইয়াছে। সমাজ তাহাকে আর অশ্লীলতার জন্য তিরস্কার করিবে না বলিয়া তাহার অন্তর হইতা সমাজ ভীতিও দূর হইয়াছে। তাহার একমাত্র ভয় ছিল অবৈধ সন্তানের। কিন্তু তাহা হইতে পরিত্রাণ লাভ করিবার জন্য গর্ভনিরোধেরও ব্যবস্থা আছে। ইহা সত্ত্বেও যদি গর্ভ সঞ্চার হ্য়, তবে গর্ভ-নিপাতেও ক্ষতির কোন কারণ নাই। ইহাতেও বিফল মনোরথ হইলে, প্রসূতকে গোপনে হত্যা করা যাইতে পারে। কিন্তু একান্তই যদি হতভাগ্য মাতৃত্বের অভিলাষ (যাহা দুর্ভাগ্যবশত এখনও বিলুপ্ত হয় নাই) প্রসূতকে হত্যা করিতে বাধা দান করে, তাহাতেই-বা ক্ষতি কি? কারণ বর্তমানে ‘কুমারী মাতা’ এবং জারজ সন্তানের স্বপক্ষে এত আন্দোলন হইতেছে যে, যেই ব্যক্তি তাহাদিগকে ঘৃণার চক্ষে দেখিবার সৎ সাহস করিবে তাহাকে কুসংস্কারাচ্ছন্ন বলিয়া অভিযুক্ত করা হইবে।

ইহাই পাশ্চাত্য সমাজ ব্যবস্থার মূলোৎপাটন করিয়াছে। আজকাল প্রতিটি দেশে লক্ষ লক্ষ যুবতী নারী চিরকুমারীত্ব বরণ করিয়া কামাসক্ত জীবন যাপন করিতেছে। আবার বহু সংখ্যক নারী আকস্মিক প্রেম-ফাঁদে পড়িয়া বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়। কিন্তু একমাত্র যৌন সম্পর্ক ব্যতীত স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে অন্য কোনরূপ আবশ্যকীয় যোগসূত্র থাকে না-যাহা তাহাদিগকে চিরমিলনের সূত্রে আবদ্ধ রাখিতে পারে। এইজন্য বর্তমানে বৈবাহিক সম্পর্কে কোন স্থায়িত্ব ও দৃঢ়তার অবকাশ নাই। স্বামী-স্ত্রী কেহ কাহার পরোয়া করে না বলিয়া তাহাদের দাম্পত্য সম্পর্ক লইয়া কোন প্রকার বিচার-বিবেচনা অথবা সমঝোতার জন্যও তাহারা প্রস্তুত নহে। নিছক যৌন প্রেমানুরাগ অবিলম্বেই মন্দীভূত হইয়া পড়ে; ইহার ফলে তুচ্ছ মতদ্বৈধতা, এমন কি অধিকাংশ সময়ে শুধু ঔদাসিন্য তাহাদের বিচ্ছেদ ঘটাইয়া দেয়। একমাত্র এই কারণেই অধিকাংশ বিবাহই তালাক অথবা আইনসম্মত পৃথকীকরণে পর্যবসিত হইয়া থাকে। গর্ভনিরোধ, গর্ভনিপাত, ভ্রূণ ও প্রসূতহত্যা, জন্মহারের ন্যূনতা এবং জারজ সন্তানের সংখ্যা বৃদ্ধি বহুলাংশে উপরিউক্ত কারণসমূহেরই শেষ পরিনতি। কুকার্য, নির্লজ্জতা ও রতিজ দুষ্ট ব্যাধির প্রাদুর্ভাবও উপরিউক্ত কারণেই হইয়া থাকে।

তৃতীয়ত, নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা নারীদের মধ্যে সৌন্দর্য প্রদর্শন, নগ্নতা ও অশ্লীলতা স্পৃহাকে অতিমাত্রায় বর্ধিত করিয়াছে। প্রকৃতিগতভাবে যৌন আকর্ষণ নর-নারীর মধ্যে প্রবলভাবে বিদ্যমান থাকে এবং উভয়ের অবাধ মেলামেশার ফলে উক্ত যৌন আকর্ষণ অতিরিক্ত বর্ধিত হয়। আবার এতাদৃশ মিশ্র সমাজে স্বাভাবিকভাবে নর-নারী উভয়ের মধ্যে এই অদম্য স্পৃহা জন্মে যে, তাহাদিগকে বিপরীত লিঙ্গের লোকের জন্য চিত্তাকর্ষক সাজিতে হইবে। যেহেতু নৈতিক দৃষ্টিভঙ্গীর পরিবর্তনের ফলে এইরূপ কার্য নিন্দনীয় বিবেচিত হয় না, বরং প্রকাশই প্রেম নিবেদন প্রশংসার্হ মনে করা হয়, সেইজন্য রূপ-লাবণ্যের আড়ম্বর ক্রমশ সকল সীমা লঙ্ঘন করিয়া চলে। অবশেষে ইহা নগ্নতার চরম সীমায় উপনীত হয়। পাশ্চাত্য তাহযীবের বর্তমান পরিস্থিতি ইহাই। আজকাল বিপরীত লিঙ্গের জন্য চৌম্বক সাজিবার স্পৃহা নারীদের মধ্যে এত প্রবল যে, চাকচিক্যময় মনোহর সাজ-পোশাক ও লিপস্টিক, রুজ প্রভৃতি প্রসাধন দ্রব্যাদি সুশোভিত রূপসজ্জায় তাহাদের মনের সাধ মিটে না। অবশেষে হতভাগিনীর দল বিবস্ত্র হইয়া পড়ে। এদিকে পুরুষদের পক্ষ থেকে অধিকতর নগ্নতার দাবী উত্থিত হয়। কারণ কামলিপ্সার প্রজ্বলিত অগ্নিশিখা নগ্ন সৌন্দর্যের দ্বারা নির্বাপিত না হইয়া অধিকতর লেলিহান হইয়া উঠে এবং অধিকতর নগ্নতার দাবী করে। মরু সাইমুম তাড়িত পিপাসারত পথিকের এক চুমুক পানি যেমন তৃষ্ণা বৃদ্ধিই করে, তেমনি এই হতভাগাদের যৌন পিপাসা এক চরম তৃষ্ণায় পরিণত হইয়াছে। সীমাহীন যৌন-তৃষ্ণায় অতৃপ্ত হইয়া এই সকল কামলিপ্সুর দল সর্বদা সকল সম্ভাব্য উপায়ে পরস্পরের যৌন তৃপ্তি বিধানের উপাদান সরবরাহ করিয়া থাকে। নগ্নচিত্র, যৌনোদ্দীপক সাহিত্য, প্রেমপূর্ণ গল্প, নগ্ন বলনৃত্য এবং যৌনানুরাগ পরিপূর্ণ ছায়াচিত্র কিসের জন্য? সমস্তই উক্ত অগ্নি নির্বাপিত করিবার-প্রকৃতপ্রস্তাবে অধিকতর প্রজ্বলিত করিবার উদাহরণস্বরূপ যাহা এই ভ্রান্ত সমাজ ব্যবস্থা প্রত্যেকের কণ্ঠ সংলগ্ন করিয়া রাখিয়াছে এবং স্বীয় দুর্বলতাকে ঢাকিবার জন্য ইহার নাম দিয়াছে ‘আর্ট’।

এক্ষণে ঘূণেধরা পাশ্চাত্য জাতিসমূহের জীবনীশক্তি নিঃশেষিত হইয়া আসিতেছে। বস্তুত আজ পর্যন্ত ঘূণেধরা কোন জাতিই বাঁচিয়া থাকে নাই। যেই সমস্ত শারীরিক ও মানসিক শক্তি আল্লাহ তায়ালা মানুষকে জীবন ধারণ ও উন্নতি বিধানের জন্য দান করিয়াছেন, তাহা এইরূপ ঘূণেই বিনষ্ট হইয়া গিয়াছে। বস্তুত যাহারা চতুর্দিক হইতে কামোদ্দীপনার পীড়নে নিপীড়িত হইয়া জীবনযাপন করে, প্রতি মুহূর্তে যাহাদের আবেগ-অনুভূতিকে নব নব প্ররোচণা ও নব নব উত্তেজনার সম্মুখীন হইতে হয়, একটি উত্তেজনাব্যঞ্জক পরিবেশ যাহাদিগকে প্রভাবান্বিত করিয়া রাখিয়াছে, নগ্ন চিত্র, অশ্লীল সাহিত্য, চিত্তাকর্ষক সংগীত, কামোদ্দীপক নৃত্য, প্রেম-প্রণয়পূর্ণ চলচিত্র, চিত্তহরণকারী জীবন্ত দৃশ্য ও চলার পথে বিপরীত লিঙ্গের সহিত নিত্যনৈমিত্যিক সাক্ষাতকারের সুযোগ-সুবিধা যাহাদের রক্তকণাকে উত্তপ্ত ও উত্তেজিত করিয়া রাখিয়াছে, তাহারা কেমন করিয়া সেই নিরাপত্তা, শান্তি ও চিত্তের প্রসন্নতা আনয়ন করিবে যাহা গঠনমূলক ও সৃজনশীল কার্যে একান্ত অপরিহার্য? এইরূপ উত্তেজনার মধ্যে তাহাদের তরুণ বংশধরগণের জন্য সেই শান্ত সুশীতল ক্ষেত্র কোথায়, যেখানে তাহাদের মানসিক ও নৈতিক শক্তির বিকাশ সম্ভবপর হইতে পারে? সংগ লাভ করিবার সংগে সংগেই তো পাশবিক প্রবৃত্তির দৈত্য তাহাদিগকে গ্রাস করিয়া ফেলে। এহেন দৈত্যের নখর কবলিত হওয়ার পর তাহাদের উন্নতির সম্ভাবনা কোথায়?

 

মানবীয় চিন্তাধারায় বেদনাদায়ক নৈরাশ্য

তিন সহস্র বৎসরের ঐতিহাসিক উত্থান-পতনের কাহিনী পরস্পর এমন একটি বিশাল ভূখণ্ডের সহিত সংশ্লিষ্ট রহিয়াছে, যাহা অতীতেও দুইটি বিরাট সভ্যতার লালন-পালন ক্ষেত্র ছিল এবং যাহার সভ্যতার বিজয়-ডঙ্কা বর্তমানকালেও জগতের বুকে নিনাদিত হইতেছে। এইরূপ কাহিনী মিসর, বেবিলন, ইরান এবং অন্যান্য দেশেরও আছে। প্রাচীন ভারত উপমহাদেশেও শত শত বৎসর যাবত  সংগত সীমা লঙ্ঘন ও চরম নূন্যতার অভিশাপ নামিয়া আসিয়াছে। একদিকে নারীকে দাসীরূপে পরিগণিত করা হইয়াছে; পুরুষ তাহার স্বামী, পতিদেব ও উপাস্য মা’বুদ হইয়াছে- তাহাকে শৈশবে পিতার, যৌবনে স্বামীর ও বৈধব্যাবস্থায় পুত্রের অধীন হইয়া থাকিতে হইয়াছে। স্বামীর চিতায় সে সহমরণ বরণ করিয়াছে। তাহাকে কর্তৃত্ব ও উত্তরাধিকার হইতে বঞ্চিত রাখা হইয়াছে। বিবাহ ব্যাপারে তাহার উপর এমন নিষ্ঠুর আইন প্রয়োগ করা হইয়াছে যা, তাহার ইচ্ছার বিরুদ্ধে তাহাকে একজন পুরুষের হস্তে সম্প্রদান করা হইয়াছে ও জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তাহার কর্তৃত্ব ও অধীনতার নাগপাশ হইতে নিজেকে মুক্ত করিতে পারে নাই। ইহুদী এবং গ্রীকদের ন্যায় তাহাকে পাপ এবং নৈতিক ও আধ্যাত্মিক অধপতনের প্রতিমূর্তি মনে করা হইয়াছে। তাহার চিরন্তন ব্যক্তিত্বকে মানিয়া লইতে অস্বীকার করা হইয়াছে।

অপরদিকে যখন তাহার প্রতি করুণা প্রদর্শন করা হইয়াছে, তখন তাহাকে পাশবিক প্রবৃত্তির ক্রীড়নকে পরিণত করা হইয়াছে। সে এমন নিবিড়ভাবে পুরুষের দেহ-সঙ্গিনী হইয়াছে যে, পরিণামে সে তাহার জাতিসহ ধ্বংস হইয়া গিয়াছে। এই যে লিংগ ও যোনীপূজা, উপাসনালয়ে নগ্ন যুগল মূর্তি, ধর্মীয় বারাঙ্গনা, হোলির প্রেম-লীলা এবং নদ-নদীতে অর্ধনগ্নস্নান-এই সকল কিসের স্মৃতিবাহক? প্রাচীন ভারতের বামমার্গীয় আন্দোলনের পরে পাপাচার-ব্যভিচারই শেষ পরিণাম ফল হইয়া রহিল-যাহা ইরান, বেবিলন, গ্রীস ও রোমের ন্যায় ভারতেরও তাহযীব-তমদ্দুনের ক্রমোন্নতির পর সংক্রামক ব্যাধির ন্যায় ছড়াইয়া পড়িল এবং হিন্দু জাতিকে কয়েক শতাব্দীর জন্য গ্লানি ও অধপতনের অতলগর্ভে নিমজ্জিত করিয়া দিল।

এই ইতিবৃত্তের প্রতি গভীর অন্তর্দৃষ্টি নিক্ষেপ করিলে পরিজ্ঞাত হওয়া যায় যে, নারী সম্পর্কে সাম্য-সুবিচার জ্ঞান লাভ করা, উহা অনুধাবন করা এবং উহার প্রতি অবিচল থাকা মানবের পক্ষে কত দুষ্কর প্রমাণিত হইয়াছে। সাম্য সুবিচারের অর্থ এই হইতে পারে যে, একদিকে নারীকে তাহার ব্যক্তিত্ব ও যোগ্যতা প্রদর্শনের এতখানি সুযোগ দান করা, যাহাতে সে উন্নত কর্মদক্ষতার সহিত মানবীয় তাহযীব-তমদ্দুনের উৎকর্ষ সাধনে অংশ গ্রহণ করিতে পারে। কিন্তূ অপরদিকে আবার এমন সতর্ক দৃষ্টি রাখিতে হইবে, যেন সে নৈতিক অধপতন ও মানবতার ধ্বংসের কারণ হইয়া না পড়ে । উপরন্তু পুরুষের কার্যে তাহার সাহায্য–সহযোগিতা এমন পন্থা নির্ণয় করিয়া দিতে হইবে, যাহাতে উভয়ের মিলিত কার্যক্রম তমদ্দুনের জন্য মংগলকর হয়। শত সহস্র বৎসর হইতে জগত এই সাম্য –সুবিচারের প্রতীক্ষায় দিন গণনা করিতেছে  কিন্তু আজ পর্যন্ত তাহা সম্ভব হয় নাই। কখনও সে এক চরম প্রান্তসীমায় উপনীত হইতেছে  এবং মানবতার একাংশকে অকর্মণ্য করিয়া রাখিয়াছে। আবার কখনও অপর প্রান্তসীমায় উপনীত হইয়া মানবতার উভয় অংশকে একত্রে মিলিত করিয়া ধ্বংসের অতলগর্ভে নিমজ্জিত করিতেছে।

তথাপি সাম্য – সুবিচার অবর্তমান নহে, ইহার অস্তিত্ব বিদ্যমান । কিন্তু শতসহস্র বৎসরের সংগত সীমা লংঘন ও চরম শূন্যতার মধ্যে বিবর্তিত হইবার ফলে মানুষের এতখানি মতিভ্রম হইয়াছে যে, স্বচক্ষে দর্শন করিয়াও চিনিতে পারে না যে, ইহাই তাহার চির ঈপ্সিত বস্তু –যাহার সন্ধান সে যুগে যুগ ধরিয়া করিয়া আসিতেছে । এই চির –অভীস্পতকে দেখিয়া সে ভ্রমবশত নাসিকা কুঞ্চিত করে –বিদ্রূপ করে । যে ব্যক্তির মধ্যে ইহা দেখিতে পাওয়া যায়,তাহাকে হাস্যস্পদ করিবার চেষ্টা করা হয়। ইহার দৃষ্টান্ত এমন একটি শিশুর ন্যায়, যে একটি কয়লা খনির গর্ভে ভূমিষ্ট হইয়াছে এবং তথায় প্রতিপালিত ও বর্ধিত হইয়াছে। সেই কয়লা অধ্যুষিত জলবায়ু ও তমসাবৃত স্থানই যে তাহার নিকটে স্বাভাবিক মনে হইবে, তাহাতে সন্দেহের অবকাশ নাই। অতঃপর অন্ধকার কয়লাখনির অভ্যন্তর হইতে ভূপৃষ্ঠে তাহাকে আনয়ন করিলে প্রাকৃতিক জগতের সূর্য-করোজ্জ্বল নির্মল প্রান্তরের প্রতিটি বস্তু দর্শনে প্রথমত সে অবশ্য নাসিকা কুঞ্চিত করিবে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে সে তো মানুষ বটে। কয়লার ছাদ ও তারকা-শোভিত আকাশের পার্থক্য নির্ণয় করিতে তাহার কত সময় লাগিবে? দূষিত ও নির্মল বায়ুর পার্থক্য নির্ণয় করিয়া সে কতদিন কাটাইবে?

Top

নব্য যুগের মুসলমান

দুইটি বিপরীত চরম সীমাতিক্রমের গোলক ধাঁধায় বিভ্রান্ত জগতকে সঠিক পথের সন্ধান দিতে সক্ষম ছিল একমাত্র মুসলমানই । কারণ একমাত্র তাহারই নিকটে ছিল সামাজিক জীবনের যাবতীয় জটিল সমস্যার সঠিক সমাধান। কিন্তু পৃথিবীর ভাগ্যের ইহা এক বিস্ময়কর ও মর্মন্তুদ পরিহাস যে, এই অমানিশার অন্ধকারে যাহার হস্তে আলোকবর্তিকা ছিল, সেই হতভগ্যই রাত্রান্ধ হইয়া পড়িল। অপরকে পথ-প্রদর্শন করা তো দূরের কথা, বরং সে নিজেই অন্ধের ন্যায় পথভ্রষ্ট হইয়া পড়িল এবং এক একটি পথভ্রষ্টের পশ্চাদ্ধাবন করিয়া চলিল।

যে সমস্ত শরীয়তের নির্দেশের সমষ্টিগত রুপকে বুঝাইবার জন্য পর্দা শব্দটি শীর্ষনাম হিসাবে ব্যবহৃত হইয়া থাকে, তাহা প্রকৃতপক্ষে ইসলামী সমাজ বিধানের বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ অংশাবলীর অন্তর্ভুক্ত।এই সমাজ বিধানের মানদণ্ডে উক্ত নির্দেশাবলীকে যথাযথভাবে স্থাপন করিলে যে কোন স্বাভাবিক অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন ব্যক্তিই এইরূপ স্বীকারোক্তি না করিয়া পারিবে না যে, সমাজ ব্যবস্থায় ইহা ব্যতীত মিতাচার এবং মধ্যপন্থার অন্য কোন উপায়ই থাকিতে পারে না। যদি এই বিধি-বিধানকে সত্যিকারভাবে প্রত্যক্ষ জীবনে রূপায়িত করা যায়, তাহা হইলে দুঃখ বেদনাক্লিষ্ট পৃথিবী বিনা প্রতিবাদে শান্তির এই উৎসের দিকে দ্রুত ধাবিত হইবে এবং তাহা নিঃসন্দেহে সামাজিক ব্যাধির মহৌষধ লাভ করিবে। কিন্তু এই কার্য কাহার দ্বারা সম্পাদিত হইবে? ইহা সম্পাদন করিবার ক্ষমতা যাহার ছিল  সে-ই যে দীর্ঘকাল যাবত পীড়িত হইয়া আছ। সুতরাং সম্মুখে অগ্রসর হইবার পূর্বে তাহার ব্যাধিটিও কিঞ্চিৎ পরীক্ষা করিয়া দেখা আবশ্যক।

 

ঐতিহাসিক পটভূমি

অষ্টাদশ  শতাব্দীর শেষভাগে ও উনবিংশ শতাব্দীর প্রারম্ভকালে পাশ্চাত্য জাতিসমূহের দেশ জয়ের প্লাবন প্রচণ্ড ঝঞ্জাবেগে মুসলিম দেশগুলিকে নিমজ্জিত করিয়া ফেলেছিল। এই সময়ে মুসলমানগণ অর্ধনিদ্রিত ও অর্ধজাগ্রত অবস্থায় ছিল এবং দেখিতে দেখিতে এই ঝঞ্জা-প্লাবন প্রাচ্য হইতে আরম্ভ করিয়া প্রতীচ্যের সমগ্র মুসলিম বিশ্বকে গ্রাস করিয়া ফেলিল। উনবিংশ শতাব্দীর শেষার্ধে উপনীত হইতে না হইতেই অধিকাংশ মুসলিম রাষ্ট্র ইউরোপের গোলাম হইয়া পড়িল এবং অপরাপর দেশগুলি গোলাম না হইলেও পরাভূত ও প্রভাবিত হইয়া পড়িল। এই সর্বধ্বংসী বিপ্লব পূর্ণ দানা বাঁধিয়া উঠিবার পর মুসলমানদের চক্ষু উন্মিলিত হইতে লাগিল। দিগ্বিজয় ও রাজ্য বিস্তারের ক্ষেত্রে উন্নতিশীল মুসলমানদের যে জাতীয় গৌরব সৃষ্টি হইয়াছে, তাহা অপ্রত্যাশিতরূপে ধূলিস্মাৎ হইয়া গেল। অতঃপর ক্ষমতাবান শত্রুর উপর্যুপরি আঘাতে মাদকতামুক্ত মদ্যপায়ীর ন্যায় তাহারা স্বীয় পরাজয় এবং ইউরোপীয়দের জয় লাভের কারণ সম্পর্কে গবেষণা করিতে লাগিল। কিন্তু তখনও মস্তিষ্ক প্রকৃতিস্থ হয় নাই। মাদকতা যদিও কাটিয়া গিয়াছে, কিন্তু মানসিক ভারসাম্য তখনও বিকল রহিয়াছে। একদিকে অপমান-অসম্মানের তীব্র অনুভূতি তাহাদের এতাদৃশ হীনাবস্থার পরিবর্তন সাধনের জন্যও চাপ দিতেছিল এবং অপরদিকে বহু শতাব্দীর বিলাস প্রিয় শ্রমবিমুখ জীবন পদ্ধতি অবস্থা পরিবর্তনের সহজতম ও নিকটতম পন্থা অনুসন্ধান করিতেছিল। উপরন্তু তাহারা জ্ঞান-বুদ্ধি ও চিন্তা-বিবেচনার জীর্ণ শক্তিগুলিকে কার্যে নিয়োজিত করিতে অনভ্যস্থ হইয়া পড়িয়াছিল। এতদ্ব্যতীত পরাভূত গোলাম জাতির মধ্যে অপ্রত্যাশিতরূপে যে সন্ত্রস্ততা ও ভয়-বিহবলতার সৃষ্টি হয়, তাহাও তাহাদের মধ্যে সঞ্চারিত হইয়াছিল। এহেন বিভিন্ন কারণের সংমিশ্রণের ফলে সংস্কারপ্রিয় মুসলমানগণ নানাবিধ কল্পনাত্মক ও ব্যবহারিক পাপাচারে লিপ্ত হইয়া পড়িয়াছিল। তাহাদের অধিকাংশই নিজেদের হীনতা, দুর্নীতি ও ইউরোপের উন্নতি বিধানের প্রকৃত হেতুই অনুধাবন করিতে পারিল না। আবার যাহারা অনুধাবন করিল, তাহাদের মধ্যে এতটুকু সৎ সাহস, সহনশীলতা এবং সংগ্রামী মনোভাব ছিল না যে, উন্নতির দুর্গম পথ অতিক্রম করে। এই উভয় দলের মধ্যেই দুর্বলতা ও ভয়বিহ্বলতা সমানভাবে বিদ্যমান ছিল। এইরূপ বিভ্রান্ত মানসিকতায় তাহাদের উন্নতির সহজতর পন্থা এই ছিল যে, পাশ্চাত্য তাহযীব-তমদ্দুনের বাহ্যদৃশ্যাবলী তাহারা তাহাদের জীবনে প্রতিফলিত করে এবং স্বয়ং এমন দর্পণ হইয়া যায় যাহার অভ্যন্তরে সুরম্য উদ্যান ও বসন্ত কান্তিরাজির মনোহর দৃশ্যপট প্রতিবিম্বিত হয়, অথচ প্রকৃত উদ্যান ও তাহার সৌন্দর্য শোভার কোন অস্তিত্বই থাকে না।

 

মানসিক দাসত্ব

ব্যাধির এই চরম পর্যায়ে পাশ্চাত্য বেশভূষা, সমাজ ব্যবস্থা, সাহিত্য-কলা, আচার-আচরণ, চাল-চলন প্রভৃতি অনুকৃত হইতে লাগিল। এমন কি বাকভঙ্গিমাতেও পাশ্চাত্য অনুকরণ প্রকট হইয়া পড়িল। মুসলমান সমাজকে পাশ্চাত্য আদর্শে ঢালিয়া সাজাইবার প্রচেষ্টা চলিতে লাগিল। খোদাদ্রোহিতা, নাস্তিকতা ও জড়বাদিত্ব অন্ধের ন্যায় ‘ফ্যাশান’ হিসাবে গৃহীত হইল। পাশ্চাত্যের আমদানীকৃত  স্পষ্ট অথবা অস্পষ্ট চিন্তাধারা ও মতবাদের প্রতি অন্ধের ন্যায় বিশ্বাস স্থাপন করা এবং বৈঠকাদিতে উহাকে আলোচনার বিষয়বস্তু হিসাবে উপস্থাপিত করা পরিচ্ছন্ন চিন্তাধারার পরিচায়ক মনে করা হইল। মদ্যপান, জুয়া, লটারি, ঘোড়দৌড়, থিয়েটার, নৃত্যগীত ও পাশ্চাত্য সংস্কৃতপ্রসূত অন্যান্য বিষয়ও তৎসঙ্গে গৃহীত হইল। শ্লীলতা, নৈতিকতা, সামাজিক আদানপ্রদান, জীবিকার্জন, রাজনীতি, আইন-কানুন এমন কি ধর্মীয় বিশ্বাস ও অনুষ্ঠানাদি বিষয়ক যত প্রকার দৃষ্টিভঙ্গী ও কর্ম পদ্ধতি ছিল তাহা সবই বিনা প্রতিবাদ ও চিন্তা-গবেষণায় আকাশ হইতে অবতীর্ণ ওহীর ন্যায় –‘শ্রবণ করিলাম ও মানিয়া লইলাম’-বলিয়া গৃহীত হইল। ঐতিহাসিক ঘটনাবলী, ইসলামী শরীয়তের নির্দেশাবলী ও কুরআন-হাদীসের বর্ণনাগুলির প্রতি অতীতের ইসলামবৈরিগণ যেরূপ ঘৃণা পোষণ ও প্রতিবাদ করিয়াছে, এই যুগের মুসলমানগণও তদ্রুপ ইহার জন্য লজ্জাবোধ করিতা লাগিল এবং তাহারা এই কলংক মোচনে সচেষ্ট হইয়া উঠিল।

পাশ্চাত্যের শ্বেতাঙ্গ প্রভুগণ ইসলামী জিহাদের তীব্র সমালোচনা করিল। ইহারাও (মুসলমানগণ) প্রভুদের চরণে কৃতাঞ্জলি নিবেদন করিয়া বলিল, ‘হুযুর। কোথায় আমরা আর কোথায় জিহাদ!’ তাহারা দাস প্রথার সমালোচনা করিল। ইহারা বলিল, ‘ইহা তো ইসলামে একেবারেই নিষিদ্ধ।‘ তাহারা বহু বিবাহের সমালোচনা করিলে তৎক্ষণাৎ কুরআনের একটি আয়াত বা নির্দেশকে রহিত করিয়া দিল। তাহারা বলিল, ‘নারী ও পুরুষের মধ্যে পূর্ণ সাম্য প্রতিষ্ঠিত হওয়া বাঞ্ছনীয়।’ ইহারা বলিল, ‘ইহাই তো আমাদের ধর্মের মূল কথা।’ তাহারা বিবাহ-তালাকের সমালোচনা করিলে ইহারা তৎসমূহের সংশোধনীর জন্য তৎপর হইয়া পড়িল। তাহারা বলিল, ‘ইসলাম তো শিল্পকলার শত্রু।’ ইহারা তদুত্তরে বলিল, ‘হুযুর! ইসলাম তো চিরকালই নৃত্য-গীত, চিত্রাংকন  ভাস্কর্যের পৃষ্ঠপোষকতা করিয়া আসিয়াছে।’

 

পর্দা প্রসঙ্গে সূচনা

মুসলমানদের জাতীয় ইতিহাসে ইহাই সর্বাপেক্ষা নিন্দনীয় ও লজ্জাকর যুগ। যেহেতু এই যুগেই পর্দাপ্রথা লইয়া বিতর্কের সূত্রপাত হয়। তর্কের বিষয়বস্তু যদি এই হইত যে, ইসলাম নারী স্বাধীনতার কি সীমা নির্ধারণ করিয়াছে, তাহা হইলে ইহার জওয়াব মোটেই কঠিন হইত না। কারণ এই ব্যাপারে যতটুকু মতানৈক্য পরিদৃষ্ট হয় তাহা এই পর্যন্ত যে, নারী তাহার মুখমণ্ডল ও হস্তদ্বয় অনাবৃত রাখিতে পারে কিনা; ইহা কোন গুরুত্বপূর্ণ মতভেদ নহে। কিন্তু প্রকৃত ব্যাপার এইস্থলে অন্যরূপ। মুসলমানদের মধ্যে এই প্রশ্ন এইজন্য উত্থিত হইয়াছে যে, ইউরোপ ‘হেরেম’ পর্দা ও নারীর বহিরাবরণকে ঘৃণার চোখে দেখিয়াছে। ইউরোপীয়গণ তাহাদের সাহিত্যে ইহার ঘৃণাব্যঞ্জক ও বিদ্রুপাত্মক চিত্র অংকিত করিয়াছে, ইসলামের দোষত্রুটির তালিকায় নারীদের ‘অবরোধ’কে (পর্দা) বিশিষ্ট স্থান দিয়াছে। ইউরোপ যখন পর্দাকে ঘৃণার্হ বলিয়া পরিত্যাগ করিয়াছে তখন তাহাদেরই মানসিক দাসানুদাস মুসলমানদের পক্ষে কেমন করিয়া ইহা সম্ভব যে, ইহার জন্য তাহারা স্বভাবতই লজ্জা বোধ করিবে না? তাহারা জিহাদ, দাসপ্রথা, বহুবিবাহ ও এবম্বিধ অন্যান্য ব্যাপারে যে ব্যাবস্থাবলম্বন করিয়াছে, এই বিষয়েও তাহাই করিল। তাহারা কুরআন, হাদীস এবং ফিকাহতত্ববিদ ইমামগণের গভীর গবেষণাপ্রসূত গ্রন্থাবলীর পৃষ্ঠা উলটাইতে লাগিল। উদ্দেশ্য এই ছিল যে, সেই কুৎসিত কলংক কালিমা অপনোদনের জন্য কোন উপায়-উপাদান তাহার মধ্যে খুঁজিয়া পাওয়া যায় কি-না। জানিতে পারা গেল যে, কোন কোন ইমাম হস্ত ও মুখমণ্ডল অনাবৃত রাখিবার অনুমতি দিয়াছেন। ইহাও জানা গেল যে, নারী তাহার আবশ্যক কার্যের জন্য গৃহ হইতে নিষ্ক্রান্ত হইতে পারে। উপরন্তু আরও জানিতে পারা গেল, নারী যুদ্ধক্ষেত্রে সৈনিকদের পানি পান করাইতে এবং আহতদের সেবা করিতে পারে। নামাযের জন্য মসজিদে ও শিক্ষা গ্রহন ও শিক্ষা দানের জন্য অন্যত্র গমন করিতে পারে। ব্যস, এতটুকুই তাহাদের জন্য যথেষ্ট ছিল। অতঃপর তাহারা ঘোষণা করিল, ‘ইসলাম নারীকে পূর্ণ স্বাধীনতা দান করিয়াছে। পর্দা নিছক অন্ধ বর্বর যুগের একটি প্রাচীন প্রথা মাত্র। ইসলামের প্রাথমিক যুগের (খিলাফতে রাশেদার) বহু পরে সংকীর্ণমনা ও কুসংস্কারাচ্ছন্ন মুসলমানগণ ইহার প্রচলন করিয়াছে। কুরআন-হাদীসে পর্দার কোন নির্দেশ নাই। ইহার মধ্যে লজ্জা-সম্ভ্রম সম্পর্কে নৈতিক শিক্ষা দান করা হইয়াছে মাত্র। এমন কোন নীতি নির্ধারিত হয় নাই, যাহার দ্বারা নারীদের চলাফেরার স্বাধীনতা নিয়ন্ত্রিত হইতা পারে।’

 

গোড়ার কথা

মানুষের ইহা একটি স্বাভাবিক দুর্বলতা যে, বাস্তব কর্মজীবনে যখন সে কোন  পথ অবলম্বন করে, তখন সেই পথ নির্বাচনে সাধারণত ধীর ও স্থির মস্তিস্কে যুক্তি ও বিবেক-বুদ্ধির সাহায্য না লইয়া সে একটি ভাবপ্রবণতার দ্বারা পরিচালিত হয়। অতপর সেই ভাবপ্রবণতাপ্রসূত সিদ্ধান্তকে সে নির্ভুল প্রমাণিত করিবার জন্য যুক্তি-প্রমাণের সাহায্য গ্রহণ করে। পর্দার ব্যাপারেও সেই অবস্থারই সৃষ্টি হইয়াছে। এতদসম্পর্কে যে বিতর্কের সৃষ্টি হইয়াছিল, তাহার জন্য কোন যুক্তিসংগত অথবা শরীয়ত সম্পর্কিত আবশ্যকতা অনুভূত হয় নাই। বিজয়ী জাতির বাহ্যিক চাকচিক্যময় সংস্কৃতি দ্বারা প্রভাবান্বিত এবং ইসলামী তমদ্দুনের বিরুদ্ধে উক্ত জাতির তীব্র প্রচারণার দ্বারা বিহবল হওয়ার ফলে যে অনুরাগ, অনুভূতি ও ভাবপ্রবনতার সৃষ্টি হইয়াছিল, পর্দা সম্পর্কিত বিতর্কের সূচনা শুধু তাহারই কারণে হইয়াছিল।

আমাদের সংস্কারপ্রিয় শিক্ষিত সমাজ যখন বিস্ময় বিস্ফোরিত নেত্রে ইউরোপীয় ললনাদের সৌন্দর্য, বিলাস-ভূষণ, যত্রতত্র স্বাধীন বল্গাহীন যাতায়াত এবং আপন সমাজে তাহাদের কর্মতৎপরতা লক্ষ্য করিল, তখন অনিবার্যরূপে তাহাদের মনে এই বাসনার সঞ্চার হইল যে, তাহাদের রমণীগণও যেন সেইভাবে চলিতে পারে এবং তাহাদের তমদ্দুনও যেন ইউরোপীয় সংস্কৃতির সমকক্ষতা লাভ করিতে পারে। নারী স্বাধীনতা, স্ত্রীশিক্ষা এবং নারী-পুরুষের মধ্যে সাম্যের নূতন দৃষ্টিভঙ্গী শক্তিশালী প্রামানিক ভাষার চটকদার ছাপার অক্ষরে যখন তাহাদের মধ্যে অবিরল বারি বর্ষণের ন্যায় বর্ষিত হইতেছিল, তখন তাহারা উহার প্রতি আকৃষ্ট হইয়া পড়িল। এই সকল সাহিত্যের শক্তিশালী প্রভাবে তাহাদের ভালো-মন্দের বিচার শক্তি লোপ পাইয়াছিল। তাহাদের মনের মধ্যে এই ধারণাই বদ্ধমূল হইয়াছিল যে, সত্যিকার প্রগতিশীল হইতে হইলে প্রাচীনত্ব ও জীর্ণতার কলংক কালিমা হইতে মুক্ত হইতে হইলে ঐ সমস্ত ভাবধারা ও দৃষ্টিভঙ্গীর প্রতি অন্ধভাবে বিশ্বাস স্থাপন করত লিখনী ও বক্তৃতার সাহায্যে তাহার প্রচারণা চালাইতে হইবে এবং সাহসিকতার সহিত তাহাকে বাস্তব জীবনে রূপায়িত করিতে হইবে। অবগুণ্ঠনসহ শ্বেতবস্ত্রাবৃত রমণীদিগকে সচল তাঁবুর ন্যায় বা কাফনপরিহিত জানাযার পোশাকে আচ্ছাদিত দেখিলে এই সকল আত্মপ্রবঞ্চিত হতভাগ্যের দল ব্রীড়াহত হইয়া ভূলুণ্ঠিত হয়। কতকাল আর ইহা সহ্য করা যায়? অবশেষে বাধ্য হইয়া অথবা মন্ত্রমুগ্ধ হইয়া তাহারা এই লজ্জার কলঙ্ক অপনোদনে প্রস্তুত হইল।

ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে নারী স্বাধীনতার যে আন্দোলন মুসলমানদের মধ্যে মাথা চাড়া দিয়াছিল, তাহার মূলে ছিল উপরোক্ত আবেগ, অনুভূতি ও ভাবপ্রবণতা। এই সকল আবেগ, অনুভূতি আবার কাহারো কাহারো সূক্ষ্ম অন্তর্দৃষ্টির অন্তরালে লুক্কায়িত ছিল। তাহারা নিজেরাই এই বিষয়ে অবহিত ছিল না যে, এই আন্দোলন তাহাদিগকে কোথায় লইয়া যাইতেছে। তাহারা ছিল আত্মপ্রবঞ্চিত। পক্ষান্তরে কেহ কেহ আবার এই সকল আবেগ-অনুভূতি সম্পর্কে অবহিতও ছিল। কিন্তু প্রকৃত ভাবাবেগ অপরের সম্মুখে প্রকাশ করিতে তাহারা কুণ্ঠাবোধ করিত। ইহারা যদিও আত্মপ্রবঞ্চিত ছিল না, কিন্তু বিভ্রান্তির ধুম্রজাল সৃষ্টি করিয়া বহির্জগতকে প্রতারিত করিবার চেষ্টা করিল। যাহা হউক, উভয় দলই একই লক্ষ্যে শর নিক্ষেপ করিতেছিল এবং তাহা এই যে, স্বীয় আন্দোলনের মূল প্রেরণাকে গোপন করিয়া একটি ভাবাবেগ পরিচালিত আন্দোলনের পরিবর্তে একটি যুক্তিসংগত আন্দোলন পরিচালনার প্রয়াস পাইল। নারীদের স্বাস্থ্য, জ্ঞানার্জন ও ব্যবহারিক ক্ষেত্রে তাহাদের উৎকর্ষ সাধন, তাহাদের স্বাভাবিক ও জন্মগত অধিকার সংরক্ষণ, জীবিকার্জনের পূর্ণ স্বাধীনতা, পুরুষের অত্যাচার ও স্বেচ্ছাচারিতা হইতে পরিত্রাণ লাভ, জাতির অর্ধাংশ হিসাবে তাহাদের উন্নতির উপর তামাদ্দুনিক উন্নতির নির্ভরশীলতা এবং ইউরোপ হইতে সরাসরি আমদানীকৃত অন্যান্য কলাকৌশল এই আন্দোলন পরিচালনায় এমনভাবে প্রয়োগ করা হইল যেন মুসলমান জনসাধারণ প্রতারিত হয়। এই আন্দোলন পরিচালনায় এমন এক কৌশলও অবলম্বিত হইল যে, মুসলমান নারীগণকে ইউরোপীয় নারীদের আচরণ পদ্ধতি এবং ইউরোপীয় সমাজ ব্যবস্থা অবলম্বনে উদ্বুদ্ধ করাই যে এই আন্দোলনের মুখ্য উদ্দেশ্য, তাহার গূঢ় রহস্য যেন মুসলমান জনসাধারণের নিকট উদ্ঘাটিত না হয়।

 

বিরাট প্রবঞ্চনা

এই বিষয়ে সর্বাপেক্ষা মারাত্মক প্রবঞ্চনা এই ছিল যে, কুরআন- হাদীস হইতে যুক্তির অবতারণা করত এই আন্দোলনকে ইসলামের অনুকূলে সপ্রমাণ করিবার জন্য প্রয়াস চলিয়াছে। অথচ ইসলামী ও পাশ্চাত্য তাহযীবের উদ্দেশ্য ও সমাজ ব্যবস্থার মৌলিক নীতির মধ্যে আকাশ- পাতাল পার্থক্য বিদ্যমান। ইসলামী তাহযীবের অন্তর্নিহিত উদ্দশ্যে এই যে, মানবের যৌন শক্তিকে (Sex Energy) নৈতিক নিয়মতান্ত্রিকতার মাধ্যমে এমনভাবে নিয়ন্ত্রিত করিতে হইবে, যাহাতে তাহা লাম্পট্য ও কামোত্তেজনার বশে নিঃশেষিত না হইয়া একটা পূত-পবিত্র ও সৎ তমদ্দুন গঠনে নিয়োজিত হয়। পক্ষান্তরে জীবনের কার্যকলাপে এবং দায়িত্ব পালনে নারী পুরুষকে সমানভাবে নিযুক্ত করিয়া বৈষয়িক উন্নতির গতি প্রবাহকে দ্রুততর করাই পাশ্চাত্য সভ্যতা-সংস্কৃতির উদ্দেশ্য। এতদসহ ইহা যৌনোত্তেজনাকে এমন কার্যে ব্যবহৃত করে যাহাতে জীবন সংগ্রামের তিক্ততা মধুর সুখ সম্ভোগে পরিণত হয়। উদ্দেশ্যের এই বৈষম্য অবশ্যম্ভাবীরূপে ইহাই দাবী করে যে, জীবন যাপনের পদ্ধতিতেও ইসলাম ও পাশ্চাত্য সংস্কৃতির মধ্যে মৌলিক বৈষম্য থাকিবে না। ইসলাম এমন একটি সমাজ ব্যবস্থা দাবী করে, যেখানে নারী পুরুষের কর্মক্ষেত্র পৃথক হইবে। উভয়ের স্বাধীন একত্র মিলনকে নিষিদ্ধ করা হইয়াছে ও এই শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণের পরিপন্থী সকল উপায়-উপাদানের মূলোৎপাটন করা হইয়াছে। পক্ষান্তরে পাশ্চাত্য সংস্কৃতির লক্ষ্য এবং দাবি এই যে, নারী পুরুষ উভয় শ্রেণীকে জীবনের একই ক্ষেত্রে টানিয়া আনিবার, উভয়ের অসংযত  বল্গাহীন পারস্পরিক মিলন ও কার্য পরিচালনার পথে সকল বাধা-বিঘ্নকে অপসারিত করা হইয়াছে। উপরন্তু তাহাদিগকে পারস্পরিক সৌন্দর্য ও যৌন সম্ভোগের সীমাহীন সুযোগও দেওয়া হইয়াছে।

এখন যে কোন বিবেকসম্পন্ন ব্যক্তি অনুমান করিতে পারেন যে, যাহারা একাধারে পাশ্চাত্য সংস্কৃতির অনুসরণ করিতে ইচ্ছা করে এবং ইসলামী সমাজ ব্যবস্থার নিয়ম-নীতিকে তাহার স্বপক্ষে প্রমাণস্বরূপ উপস্থাপিত করে, তাহারা কতখানি আপনাদিগকে ও অপরকে প্রতারিত করিতেছে। ইসলামী সমাজ ব্যবস্থায় নারী স্বাধীনতার শেষ সীমারেখা এইরূপ নির্ধারিত হইয়াছে যে, সে তাহার হস্তদ্বয় ও মুখমণ্ডল অনাবৃত রাখিতে পারিবে এবং আবশ্যকবোধে গৃহ হইতে নিষ্ক্রান্তও হইতে পারিবে। কিন্তু ইহারা (পাশ্চাত্যের অনুসারীগণ) ইসলাম কর্তৃক নির্ধারিত শেষ সীমারেখাকেই তাহাদের যাত্রাপথের প্রথম পদক্ষেপ বলিয়া গ্রহণ করিয়াছে। ইসলামের যাত্রা যেখানে শেষ হইয়াছে, ইহারা তাহা হইতে আরম্ভ করে এবং এমন এক পর্যায়ে উপনীত হয় যে, লজ্জা, সম্ভ্রম ও শ্লীলতাকে পরিহার করে। শুধু হস্ত ও মুখমণ্ডল নহে, বরং সুষম সীমান্তসহ কেশরাজিশোভিত নগ্ন মস্তক, স্কন্ধদেশে আস্তীন, বেণী ও অর্ধনগ্ন উন্নত বক্ষ দর্শকের নয়নগোচর করা হয়। কমনীয় দেহকান্তির যাহা অবশিষ্ট থাকে, তাহাও এমন সুক্ষ বস্ত্রে আবৃত করা হয় যে, তন্মধ্য হইতে এমন অংগসমূহ দৃষ্টিগোচর হয় যাহার দ্বারা পুরুষের কামপিপাশা চরিতার্থ করা যায়। অতঃপর এহেন বেশভূষা ও সাজসজ্জাসহ স্ত্রী, কন্যা ও ভগ্নিকে ‘মুহরেম’(ইসলামী আইনানুযায়ী যাহাদের সহিত বিবাহ নিষিদ্ধ হইয়াছে।) পুরুষগণের সম্মুখে নহে, বরং বন্ধুদের সম্মুখে আনয়ন করা হয় এবং পর পুরুষের সহিত এমনভাবে হাসি-ঠাট্টা, কথাবার্তা ও ক্রীড়া-কৌতুক করিবার স্বাধীনতা দেয়া হয়, যাহা কোন মুসলমান রমণী তাহার বৈমাত্রেয় অথবা বৈপিত্রেয় ভ্রাতার সহিতও লাভ করিতে পারে না। কেবল আবশ্যক কার্যোপলক্ষে শরীয়তসম্মত পরিপূর্ণ দেহাবরণসহ গৃহ হইতে নিষ্ক্রান্ত হইবার স্বাধীনতাকে চিত্তাকর্ষক শাড়ী, অর্ধনগ্ন ব্লাউজ ও অসংযত নয়নবানসহ প্রকাশ্য রাজপথে ভ্রমনে, প্রমোদ কাননে বিচরণে, ক্লাব-হোটেলাদিতে চিত্তবিনোদনে এবং ছায়াচিত্র দর্শনে প্রযুক্ত করা হয়। গৃহাভ্যন্তরীণ কাজকর্ম ব্যতীত বিশেষ শর্তাধীনে অন্য কাজকর্মের যে স্বাধীনতা ইসলাম নারীকে দান করিয়াছে তাহাকে এইরূপ যুক্তিস্বরূপ উপস্থাপিত করা হইতেছে যে, মুসলমান নারীও ইউরোপীয় নারীর ন্যায় গার্হস্থ্য জীবন ও পরিবারিক দায়িত্ব পরিত্যাগ পূর্বক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষিপ্রকারিতায় যত্রতত্র ঘুরিয়া বেড়াইবে এবং কর্মক্ষেত্রে পুরুষের কণ্ঠসংলগ্ন হইয়া কঠোর পরিশ্রম করিবে।

ভারত উপমহাদেশের অবস্থা মোটামুটি এই পর্যায়ে দাঁড়াইয়াছে। মিসর, তুরস্ক ও ইরানের রাজনৈতিক স্বাধীনতাপ্রাপ্ত মানসিক দাসগণ ইহা অপেক্ষা দশ ধাপ অগ্রসর হইয়াছে। এই সকল দেশের মুসলিম নারীগণ ইউরোপীয় নারীদের অনুরূপ পোশাক পরিধান করে। এতদ্বারা তাহারা আসল ও নকলের পার্থক্য মিটাইতে চাহে। তুরস্ক এই ব্যাপারে এতখানি অগ্রসর হইয়াছে যে, তুর্কী নারীদের আলোকচিত্রে তাহাদিগকে সমুদ্রতীরে স্নানের পোশাকসহ দেখা যায়। এতদৃশ পরিচ্ছদ পরিহিত নারীদের দেহের তিন-চতুর্থাংশ অনাবৃত থাকে। দেহের অবশিষ্টাংশ এমনভাবে সূক্ষ্ম বস্ত্রাচ্ছাদিত থাকে যে, দেহের স্ফীত ও অনুন্নত অংগসমূহ তৎসংশ্লিষ্ট বস্ত্রের উপর পরিস্ফুট ও বিকশিত হইয়া পড়ে।

কুরআন ও হাদীসে কুত্রাপিও এমন জীবন পদ্ধতি সমর্থনের কোন সূত্র খুঁজিয়া পাওয়া যায় কি? কেহ যদি এই পথ অবলম্বন করিতে চাহে, তবে তাহার স্পষ্ট ঘোষণা করা উচিত যে, ইসলাম ও ইসলামের আইন-কানূনের সে প্রকাশ্য বিরোধী। যে সমাজ ব্যবস্থা ও জীবন পদ্ধতির মৌলিক নীতি, উদ্দেশ্য ও কর্মপন্থার প্রতিটি বিষয়কে কুরআন নিষিদ্ধ ঘোষণা করিয়াছে, তাহাকে শুধু প্রকাশ্যে ও সজ্ঞানে অবলম্বন করা নহে, উপরন্তু এই পথের প্রথম পদক্ষেপ কুরআনের নামেই করা হইতেছে। ইহার উদ্দেশ্য এই যে, জগতকে বিভ্রান্ত ও প্রতারিত করিয়া কুরআনের নামে এই পথেই পরবর্তী পদক্ষেপ করা হইবে। ইহা কত বড় ভণ্ডামি, নীচতা ও শঠতা!

 

আমাদের বর্তমান আলোচ্য বিষয়

নব্যযুগের মুসলমানদের অবস্থা উপরে বর্ণিত হইল। এখন আমাদের সম্মুখে আলোচনার দুইটি দিক রহিয়াছে। এই গ্রন্থে এই উভয় দিকের আলোচনায় মনোনিবেশ করিতে হইবে।

প্রথমত, মুসলমান-অমুসলমান নির্বিশেষে সমগ্র মানব জাতির সমক্ষে ইসলামী সমাজ ব্যবস্থার ব্যাখ্যা করিতে হইবে এবং ইহাও বলিয়া দিতে হইবে যে, এই ব্যবস্থায় পর্দার নির্দেশাবলী কেন প্রদত্ত হইয়াছে।

দ্বিতীয়ত, এই নব্যযুগের মুসলমানদের সম্মুখে একদিকে কুরআন-হাদীসের নির্দেশাবলী ও অন্যদিকে পাশ্চাত্য সংস্কৃতি ও সামাজিকতার দৃষ্টিভঙ্গী এবং তাহার পরিণাম ফল তুলনামূলকভাবে উপস্থাপিত করিতে হইবে, যাহাতে তাহাদের দ্বিমুখী কার্যপদ্ধতির অবসান ঘটে এবং দুইটি পথের যে কোন একটিকে অবলম্বন করিতে পারে। যদি তাহারা প্রকৃত মুসলমান হিসাবে বসবাস করিতে চাহে, তাহা হইলে ইসলামী অনুশাসনের পূর্ণ আনুগত্য করিয়া চলিতে হইবে নতুবা যে লজ্জাকর ও ভয়াবহ পরিণামের দিকে পাশ্চাত্য সমাজব্যবস্থা তাহাদিগকে আকৃষ্ট করিতেছে, ইসলামী সংশ্রব বর্জন করত তাহাকেই অবলম্বন করিতে হইবে।

Top

তাত্ত্বিক আলোচনা

যে সমস্ত কারণে পর্দাপ্রথার বিরোধিতা করা হয় তাহা নিছক নেতিবাচক নহে। প্রকৃতপক্ষে ইহা একটি প্রামানিক ইতিবাচক ভিত্তির উপরে প্রতিষ্ঠিত। বিরোধী দলের বিরোধিতার ভিত্তি শুধু ইহা নহে যে, যেহেতু লোকে নারীদের গৃহমধ্যে আবদ্ধ থাকা এবং দেহাবরণসহ গৃহ হইতে নিষ্ক্রান্ত হওয়াকে অন্যায় অবরোধ মনে করে; সুতরাং পর্দাপ্রথাকে রহিত করিতে হইবে, বরং প্রকৃত ব্যাপার এই যে, তাহাদের সম্মুখে নারী জীবন সম্পর্কে একটি স্বতন্ত্র চিত্র রহিয়াছে। নারী-পুরুষের মেলামেশা সম্পর্কে তাহারা একটি স্থায়ী নিজস্ব মতবাদ পোষণ করে। তাহারা চায় যে, নারী এইরূপ না করিয়া অন্য কিছু করুক। পর্দার বিরুদ্ধে তাহারা এইজন্য আপত্তি উত্থাপন করে যে, নারী গৃহমধ্যে আবদ্ধ থাকিয়া অবগুণ্ঠনসহ জীবনের সেই বাঞ্চিত চিত্রও পরিস্ফুট করিতে পারে না। অথবা ‘অন্য কিছু’ও করিতে পারে না।

এখন আমাদের পরীক্ষা করিয়া দেখা আবশ্যক যে, নারীদের করণীয় সেই ‘অন্য কিছু’ বস্তুটি কি। ইহার পশ্চাতে কোন মতবাদ ও মূলনীতি রহিয়াছে, ইহা কতখানি ন্যায়সংগত ও যুক্তিযুক্ত এবং বাস্তবক্ষেত্রে ইহার কি-ইবা পরিণাম ফল ঘটিয়াছে? ইহা সুস্পষ্ট যে, তাহাদের মতবাদ মূলনীতিকে যদি আমরা সরাসরি গ্রহণ করিয়া লই, তাহা হইলে পর্দাপ্রথা এবং সেই সামাজিক ব্যবস্থা – যাহার অবিচ্ছেদ্য অংগ এই পর্দা-প্রকৃতপক্ষে সম্পূর্ণ ভ্রান্ত প্রমাণিত হইবে। কিন্তু আমরা যাচাই ও যুক্তিসংগত পরীক্ষা ব্যতিরেকে তাহাদের মতবাদ কেনই বা মানিয়া লইব? তবে কি কোন বস্তুকে শুধু তাহার নূতনত্বের জন্য এবং সর্বসাধারণ্যে ব্যাপক প্রসার লাভ করার জন্য আমরা বিনা পরীক্ষায়ই শিরোধার্য করিয়া লইব?

 

অষ্টাদশ শতাব্দীতে স্বাধীনতার ধারণা

পূর্বেই করা হইয়াছে যে, অষ্টাদশ শতাব্দীতে যে সকল দার্শনিক, প্রকৃতিবিদ ও সাহিত্যিক সমাজ সংস্কারের প্রচেষ্টা চালাইয়াছিলেন, তাহাদিগকে প্রকৃতপক্ষে এমন এক তামাদ্দুনিক ব্যবস্থার সম্মুখীন হইতে হয় যাহার মধ্যে নানাবিধ জটিলতা বিদ্যমান ছিল এবং যাহাতে কমনীয়তার লেশমাত্র ছিল না। তাহা ছিল অযৌক্তিক গতানুগতিক আচারানুষ্ঠান এবং জ্ঞান ও স্বভাববিরোধী অসামঞ্জস্যে পরিপূর্ণ। কয়েক শতাব্দীর ক্রমাগত অধপতন তাহার উন্নতির পথ রুদ্ধ করিয়াছিল। একদিকে মধ্যবিত্ত বুর্জোয়া শ্রেণীর মধ্যে জ্ঞান-বুদ্ধির নবজাগরণ উদ্বেলিত হইয়া ব্যক্তিগত চেষ্টা-সাধনার সীমা অতিক্রম করিবার অনুপ্রেরণা দিতেছিল; অপরদিকে সমাজপতি ও ধর্মীয় নেতার দল প্রচলিত প্রবাদ-কিংবদন্তীর বন্ধন দৃঢ়তর করিতে ব্যাপৃত ছিল। গীর্জা হইতে সৈন্যবিভাগ ও বিচারালয় পর্যন্ত রাজপ্রাসাদ হইতে কৃষিকৃত্য ও অর্থনৈতিক আদানপ্রদান পর্যন্ত জীবনের প্রতিটি বিভাগ ও সংগঠনের প্রতিটি প্রতিষ্ঠান এমনভাবে কাজ করিয়া যাইত যে, বুর্জোয়া শ্রেণীর সহিত সংশ্লিষ্ট নবজাগ্রত দলের সকল শ্রম ও যোগ্যতার ফল কতিপয় বিনষ্ট শ্রেণীর তাহাদের পূর্ব প্রতিষ্ঠিত অধিকার বলে হরণ করিয়া লইত। এহেন পরিস্থিতিতে সংস্কার-সংশোধনের সকল প্রকার প্রচেষ্টা, ক্ষমতাসীন দলের স্বার্থপরতা ও অজ্ঞতার সম্মুখে ব্যর্থকাম হইতে লাগিল। এই সমস্ত কারণে সংশোধন ও পরিবর্তনকারীদের মধ্যে বিপ্লবের একটি অন্ধ অনুপ্রেরণা দৈনন্দিন জাগ্রত হইয়া উঠিতেছিল। অবশেষে তদানীন্তন গোটা সমাজ ব্যবস্থা এবং তাহার প্রতিটি বিভাগ ও অংশের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের দাবানল জ্বলিয়া উঠিল। অতপর ব্যক্তি স্বাধীনতার এমন এক চরম মতবাদ গণস্বীকৃতি লাভ করিল যাহার উদ্দেশ্য ছিল সমাজের বিরুদ্ধে ব্যক্তিকে পরিপূর্ণ স্বাধীনতা ও অনাবিল মুক্তি দান করা। এইরূপ মতবাদ প্রচারিত হইতে লাগিল যে, ব্যক্তিকে যেমন পূর্ণ স্বাধীনতার সহিত স্বীয় ইচ্ছানুযায়ী আপন অভিপ্সিত কার্য করিবার অধিকার দান করিতে হইবে, তদ্রুপ তাহার অনভিপ্রেত কার্য হইতে বিরত থাকিবার স্বাধীনতাও তাহার থাকিবে। কাহারো ব্যক্তি স্বাধীনতা হরণ করিবার কোন অধিকারই সমাজের থাকিবে না। ব্যক্তিবর্গের কর্মস্বাধীনতা অক্ষুন্ন রাখাই হইবে সরকারের একমাত্র কর্তব্য। গণ-প্রতিষ্ঠানগুলি শুধু ব্যক্তিকে তাহার উদ্দেশ্য সাধনের পথে সাহায্য করিবে।

নিষ্ঠুর সমাজ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে স্বাভাবিক বিক্ষোভ ও ক্রোধের মধ্যে যে স্বাধীনতার অতিরঞ্জিত চরম মতবাদ জন্মলাভ করিল তাহার মধ্যে একটি বৃহত্তর অমঙ্গল ও ধ্বংসের বীজাণু বিদ্যমান ছিল। এই মতবাদকে যাহারা সর্বপ্রথমে উপস্থিত করিয়াছিল, তাহারাও ইহার অবশ্যম্ভাবী পরিণাম ফল সম্পর্কে সম্পূর্ণরূপে অবহিত ছিল না। এবম্বিধ বল্গাহীন স্বাধীনতা ও স্বেচ্ছাচারিতার পরিণাম ফল যদি তাহাদের জীবদ্দশায় প্রকাশ হইয়া পড়িত, তাহা হইলে সম্ভবত তাহারাও আতংকিত হইয়া পড়িত। তাহাদের সময়ে সমাজে যে সকল অসংগত বাড়াবাড়ি এবং অযৌক্তিক বাধাবন্ধন ছিল, তাহার মূলোৎপাটনের অস্ত্রস্বরূপই তাহারা এইরূপ মতবাদ চালু করিতে চাহিয়াছিলেন। কিন্তু অবশেষে ইহাই পাশ্চাত্যের অধিবাসীদের মন-মস্তিস্কে বদ্ধমূল হইয়া ক্রমবিকাশ লাভ করিতে লাগিল।

           {ব্যক্তি স্বাধীনতার এই ধারণা হইতেই বর্তমান গণতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা, গণতান্ত্রিক সাংস্কৃতিক ব্যবস্থা এবং নৈতিক লাম্পট্য (Licentiousness) জন্মলাভ করিয়াছে। প্রায় দেড় শতাব্দিকাল ব্যাপী এই মতবাদ ইউরোপ ও আমেরিকার যে অনাচার-উৎপীড়নের বন্যা প্রবাহিত করিয়াছে, তাহার ফলে মানবতা ইহার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করিতে বাধ্য হইয়াছে। কারণ এইরূপ সমাজ ব্যবস্থা জনগণের স্বার্থের বিরুদ্ধে স্বেচ্ছাচারিতার অবাধ অধিকার দান করিয়া জনস্বার্থকে পদদলিত এবং সমাজকে ধ্বংস করিয়াছে। ক্রমশ এই বিদ্রোহের ভিতর দিয়া সোস্যালিজম ও ফ্যাসিজম আত্মপ্রকাশ করিয়াছে। কিন্তু নবজাত ইজমগুলির সৃষ্টির গোড়াতেই এক অনাচার, অমঙ্গলের বীজ অন্তর্নিহিত রহিয়া গেল। প্রকৃতপক্ষে একটি চরম মতবাদের সমাধানকল্পে অপর একটি চরম মতবাদ উত্থাপিত করা হইল। অষ্টাদশ শতাব্দীর ব্যক্তি স্বাধীনতা আন্দোলনের ত্রুটি এই যে, ইহা ব্যক্তির খাতিরে সমষ্টিকে বিসর্জন দিয়াছে।

পক্ষান্তরে বর্তমান বিংশ শতাব্দীর গণতান্ত্রিক মতবাদের ত্রুটি এই যে, ইহা ব্যক্তিকে সমষ্টির যূপকাষ্ঠে বলিদান দিয়াছে। মানবতার মঙ্গলের জন্য একটি সুসামঞ্জস্য মতবাদ অষ্টাদশ শতাব্দীর ন্যায় আজও বিদ্যমান রহিয়াছে।}

 

 

ঊনবিংশ শতাব্দীর পরিবর্তন

ফরাসী বিপ্লব এই স্বাধীনতার ক্রোড়েই প্রতিপালিত হইয়াছিল। এই বিপ্লবের দ্বারা পূর্বতন বহু নৈতিক মতবাদ, তামাদ্দুনিক ও ধর্মীয় রীতিনীতি রহিত করা হইয়াছিল। এই সকল রহিতকরণের ফলে যখন উন্নতি দেখা গেল, তখন বিপ্লবী মস্তিষ্কসম্পন্ন ব্যক্তিগণ ইহাই বলিতে লাগিল যে, আবহমান কাল হইতে প্রচলিত জীর্ণ কর্মনীতিই উন্নতির পথে কণ্টকস্বরূপ হইয়া পড়িয়াছে। ইহার পরিবর্তন ব্যতীত সম্মুখে পদক্ষেপ সম্ভব নহে। খ্রীস্টীয় নৈতিকতার ভ্রান্ত মৌলিক নীতি রহিত হইবার পর তাহাদের সমালোচনার অস্ত্র মানবীয় নৈতিকতার বুনিয়াদী মতবাদের উপরে ক্ষীপ্র গতিতে নিক্ষিপ্ত হইল। সম্ভ্রম সতিত্ব আবার কোন বিপদ? যৌবনের উপর আল্লাহর ভীতির সংকটই বা কেন চাপাইয়া দেওয়া হইয়াছে? বিবাহ ব্যতিরেকে যদি কেহ কাহারও প্রণয়াবদ্ধ হয়, তবে তাহাতে দোষই বা কোথায়? বিবাহোত্তরকালে মানুষ কি এতই নির্মম হইয়া পড়ে যে, তখন তাহাকে অন্যত্র প্রেম নিবেদনের অধিকার হইতে বঞ্চিত করা হইবে? এই ধরনের প্রশ্নাবলী নূতন বিপ্লবী সমাজের চতুর্দিকে মুখরিত করিল, বিশেষ করিয়া ঔপণ্যাসিক লিখনীর মাধ্যমে এই সকল প্রশ্নাবলী দৃপ্ত কণ্ঠে জিজ্ঞাসিত হইল। উনবিংশ শতাব্দীর প্রারম্ভে (George Sand)এই দলের নেত্রী ছিল। যে সমস্ত নৈতিক মূলনীতির উপর মানব সভ্যতা, বিশেষ করিয়া নারীর সতিত্ব সম্ভ্রম নির্ভরশীল, এই নারী স্বয়ং তা চূর্ণ করিল। যে একজনের বিবাহিতা পত্নী হইয়াও বিবাহ বন্ধন লঙ্ঘন করিয়া অপরের সহিত অবৈধ সম্পর্ক স্থাপন করিল। অবশেষে স্বামীর সম্পর্ক ছিন্ন হয়। তারপর তাহার প্রণয়ী পরিবর্তনের পালা আরম্ভ হয় এবং কাহারো দুই বৎসরাধিককাল একত্রে বসবাস করা তাহার সম্ভব হয় নাই। তাহার জীবনীতে এমন ছয় ব্যক্তির কথা জানিতে পারা যায়, যাহাদের সহিত তার প্রকাশ্যে প্রেম নিবেদন চলিয়াছে। তাহার জনৈক প্রণয়ী তাহার প্রশংসায় নিম্নরূপ মন্তব্য করিয়াছেঃ

-জর্জ স্যান্ড প্রথমে একটি প্রজাপতিকে ধরিয়া পুষ্প পিঞ্জরে আবদ্ধ করিয়া রাখে-ইহাই তাহার প্রনয় নিবেদনের কাল। অতপর সে তাহার শুণ্ডের সূচাগ্র দ্বারা তাহাকে বিদ্ধ করিলে সে ফড়ফড় করিতে থাকে এবং ইহাতে সে চরমানন্দ লাভ করে।– অতপর একদা তাহার প্রেমে ভাটা পড়িয়া যায়।– অতপর সে তাহার পালক উৎপাটিত করিয়া তাহাকে ঐ সকল পতঙ্গের শ্রেণীভুক্ত করিয়া লয়, যাহাদিগকে তাহার উপন্যাসের জন্য প্রধান চরিত্র হিসাবে মনোনীত করা হয়।

ফরাসী কবি ‘Alfred Musse’ – ও তাহার একজন প্রেমিক ছিল। সে অবশেষে তাহার বিশ্বাসঘাতকতায় এতখানি মর্মাহত হইয়াছিল যে, মৃত্যুর সময় সে এই বলিয়া ওসীয়ত করিয়া যায় যে, George Sand যেন তাহার জানাযায় যোগদান করিতা না পারে। ইহাই ছিল সেই নারীর ব্যক্তিগত নৈতিক চরিত্র। ত্রিশ বৎসর যাবত তাহার সাহিত্যের মাধ্যমে তাহার চরিত্র ফরাসীর যুবক সমাজকে প্রভাবান্বিত করিয়াছিল। সে তাহার স্বরচিত উপন্যাস লেলীয়ায় (Lelia)। লেলিয়ার পক্ষ হইতে স্টেনোকে লিখিতেছেঃ

-জগতকে যতখানি দেখিবার আমার সুযোগ হইয়াছে, তাহাতে আমি অনুভব করি যে, প্রেম সম্পর্কে আমাদের যুবক-যুবতীদের ধারণা কতখানি ভ্রান্ত। প্রেম শুধু একজনের জন্যই হইবে অথবা তাহার মনকে জয় করিতে হইবে এবং তাহাও চিরদিনের জন্য-এইরূপ ধারণা নিতান্তই ভুল। অন্যান্য যাবতীয় কল্পনাকেও নিসন্দেহে মনে স্থান দিতে হইবে। আমি একথা মানিয়া লইতে প্রস্তুত আছি যে, কিছু সংখ্যক লোকের দাম্পত্য জীবনে বিশ্বস্ততার পরিচয় দেয়ার অধিকার আছে। কিন্তু অধিকাংশ লোকই অন্যরূপ প্রয়োজন বোধ করে এবং তাহা অর্জনের যোগ্যতাও রাখে। ইহার জন্য আবশ্যক যে, নারী-পুরুষ একে অপরকে পূর্ণ স্বাধীনতা দিবে, পারস্পরিক উদারতা প্রদর্শন করিবে এবং যে সমস্ত কারণে প্রেমের ক্ষেত্রে হিংসা ও প্রতিযোগিতার সৃষ্টি হয় তাহা অন্তর হইতে নির্মূল করিবে, সকল প্রেমই সঠিক, তাহা উগ্র হউক অথবা শান্ত, সকাম অথবা নিষ্কাম, দৃঢ় অথবা পরিবর্তনশীল, আত্মঘাতী অথবা সুখদায়িনী-

সে তাহার জাক (Jacus) নামক অন্য এক উপন্যাসে এমন এক স্বামীর বর্ণনা দিয়াছে, যাহাকে সে একটি আদর্শ স্বামী হিসাবে সমাজের সম্মুখে উপস্থাপিত করিয়াছে। উপন্যাসের প্রধান চরিত্র জাকের স্ত্রী নির্জনে পরপুরুষকে বাহুবন্ধনে আবদ্ধ করিতেছে অথচ উদারচেতা স্বামী তাহাতে কোন প্রকার আপত্তি করিতেছে না। ইহার কারণস্বরূপ স্বামী বলিতেছেঃ

যে পুষ্প আমা ব্যতীত অন্যকে তাহার সুরভী দান করিতে চায়, তাহাকে পদদলিত করিবার আমার কি অধিকার আছে?

লেখিকা অন্যত্র ‘জাকে’র ভাষায় নিম্নরূপ মন্তব্য করিতেছেঃ

আমি আমার মতের পরিবর্তন করি নাই, সমাজের সঙ্গে কোন আপোষও আমি করি নাই। যত প্রকার সামাজিক পন্থা আছে, আমার মতে বিবাহ তন্মধ্যে এক চরম পাশবিক পন্থা। আমার বিশ্বাস, যদি মানুষ ও জ্ঞানবুদ্ধির উৎকর্ষ সাধন করিতে ইচ্ছা করে, তাহা হইলে নিশ্চয় এই পন্থাকে তাহারা রহিত করিয়া দিবে। অতঃপর তৎপরিবর্তে তাহারা একটি পবিত্র মানবীয় পন্থা বাছিয়া লইবে। তখন মানব সন্তানগণ এই সকল নারী পুরুষ হইতে অধিকতর অগ্রগামী হইবে এবং একে অপরের স্বাধীনতায় কোন প্রকার প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করিবে না। বর্তমানে পুরুষ এমন স্বার্থপর এবং নারী এত ভীরু যে, তাহারা বর্তমানের প্রচলিত রীতিনীতির পরিবর্তে কোন উন্নততর ও সম্ভ্রান্ত রীতিনীতির দাবি করে না। হ্যাঁ, যাহাদের মধ্যে বিবেক ও পূণ্যের অভাব আছে, তাহাদিগকে তো কঠিন শৃঙ্খলে আবদ্ধই থাকিতে হইবে।

এই সকল মতবাদ ও ধ্যান-ধারণা ১৮৩৩ খ্রীঃ এবং সমসাময়িক কালে প্রচারিত হইতেছিল। জর্জ স্যান্ড শুধু ঐ পর্যন্তই পৌঁছাতে পারিয়াছিল। সে তাহার মতবাদ ও ধ্যানধারণাকে অবশ্যম্ভাবী শেষ পরিণতি ফল পর্যন্ত পৌঁছাইয়া দিতে সাহসী হয় নাই। তথাপি স্বাধীনচিত্ততা, প্রগতিশীলতা ও প্রাচীন গতানুগতিক নৈতিকতার অন্ধকার কিছু না কিছু তাহার মনমস্তিস্কে বিদ্যমান ছিল। তাহার ত্রিশ পঁয়ত্রিশ বৎসর পরে ফ্রান্সে নাট্যকার, সাহিত্যিক ও নৈতিকতাবাদী দার্শনিক প্রভৃতির দ্বিতীয় বাহিনী আবির্ভূত হয়। আলেকজান্ডার দুমা (Alexander Dumas) ও আলফ্রেড নাকেট (Alfred Naquet) তাহাদের অন্যতম নেতা ছিল। তাহাদের সমগ্র শক্তি এই মতবাদ প্রচারে নিয়োজিত করে যে, স্বাধীনতা ও জীবনের সুখ-সম্ভোগে মানুষের জন্মগত অধিকার আছে। এই অধিকারের উপর নৈতিক নিয়মনীতি ও সামাজিক বন্ধন চাপাইয়া দেওয়া ব্যক্তির প্রতি সমাজের উৎপীড়ন বিশেষ। ইহার পূর্বে ব্যক্তির জন্য কর্মস্বাধীনতার দাবী শুধু প্রেমের নামেই করা হইত। উত্তরসূরিদের নিকট এইরূপ নিছক ভাব প্রবণতাপ্রসূত ভিত্তি দুর্বল মনে হইল। অতএব তাহারা ব্যক্তিগত ঔদ্ধত্য, লাম্পট্য ও বল্গাহীন স্বাধীনতাকে যুক্তি, দর্শন এবং বিজ্ঞানের দৃঢ় ভিত্তির উপরে প্রতিষ্ঠিত করিতে চেষ্টা করে। ইহার উদ্দেশ্য এই ছিল যে, যুবক-যুবতীরা যাহা কিছু করুক না কেন, তাহা যেন মন ও বিবেকের পরিপূর্ণ তুষ্টি সহকারে করিতে পারে এবং সমাজও যেন তাহাদের যৌবনের উচ্ছৃঙ্খলতায় রুষ্ট না হইয়া উহাকে নৈতিকতার দিক দিয়া সঙ্গত ও সমীচীন মনে করে।

ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে Paul Adam, Henry Betaille, Pierrelouis প্রমুখ সাহিত্যিকগণ তরুণ তরুণীদের মধ্যে স্বেচ্ছাচারিতায় সাহস সঞ্চার করিবার জন্য সাহিত্যের মাধ্যমে তাহাদের সর্বশক্তি নিয়োজিত করে। ফলে প্রাচীন নৈতিকতার ধারণা মানব প্রকৃতির মধ্যে যে একটি দ্বিধাসঙ্কচ ও প্রতিবন্ধকতার অনুভূতি জিয়াইয়া রাখিয়াছিল, এখন তাহাও নিঃশেষিত হইয়া গেল। বস্তুত Poul Adam ‘La-Morale-De-La Amour’ – এ তরুণ-তরুণীদের এই নির্বুদ্ধিতার জন্য তিরস্কার করিয়াছে যে, তাহারা প্রেম করিবার কালে অযথা এইরূপ আশ্বাস দেয় যে, প্রেমিকার জন্য জীবন দান করিবে, তাহার জন্য আন্তরিক প্রেম করিবে, চিরকাল তাহারই হইয়া থাকিবে ইত্যাদি। পল আদম বলেঃ

এই সকল কথা এইজন্য বলা হইতেছে যে, দেহ সম্ভগের বাসনা-যাহা প্রকৃতিগতভাবে প্রত্যেক মানুষের মধ্যেই আছে এবং যাহার মধ্যে কোন পাপ নাই – প্রাচীন মতবাদ অনুযায়ী দূষণীয় মনে করা হয়। এইজন্য মানুষ ইহাকে অযথা মিথ্যার আবরনে ঢাকিবার চেষ্টা করে।,,, জাতির মারাত্মক দুর্বলতা এই যে, তাহাদের প্রেমিক-প্রেমিকা এই কথা স্পষ্ট করিয়া বলিতে সংকোচ বোধ করে যে, তাহাদের সাক্ষাতের উদ্দেশ্য নিছক দৈহিক বাসনাকে চরিতার্থ করিয়া সুখসম্ভোগ ও চরমানন্দ লাভ করা।

ইহার পর সে তরুণ-তরুণীদিগকে এই বলিয়া উপদেশ দান করিতেছেঃ

অমায়িক ও যুক্তিবাদি মানুষ হও। আপন প্রবৃত্তি ও আনন্দ উপভোগের অনুচরকে তোমাদের মা’বুদ বানাইও না।(ইহার তাৎপর্য উপলব্ধি করিতে কেহ যেন ভুল না করেন। ইহা দ্বারা ঐ সকল নারী-পুরুষকে বুঝানো হইতেছে, যাহারা একে অপরকে আপন প্রবৃত্তি চরিতার্থ করিবার উদ্দেশ্যে ব্যবহার করিতে পারে।) যে ব্যক্তি প্রেমমন্দির নির্মাণ করত একই বিগ্রহের পূজারী হইয়া বসিয়া থাকে, সে প্রকৃতই নির্বোধ। প্রতি আনন্দ মুহূর্তে একজন অভ্যাগতের নির্বাচন  করা তাহার উচিত।

Pierre Louis অন্যদের অপেক্ষা কয়েক ধাপ অগ্রসর হইয়া মুক্ত কন্ঠে ঘোষণা করিতে লাগিল যে, নৈতিক বন্ধন প্রকৃতপক্ষে মানবীয় প্রতিভা ও মস্তিস্ক শক্তির উন্মেষ সাধনে বাধার সৃষ্টি করে। যতক্ষণ পর্যন্ত এই সকল বন্ধন ছিন্ন করিতে মানুষকে  পূর্ণ স্বাধীনতার সহিত দৈহিক সুখসম্ভোগের সুযোগ দেওয়া না হইবে, ততক্ষণ পর্যন্ত কোন প্রকার জ্ঞানবুদ্ধির বিকাশ অথবা বৈষয়িক ও আত্মিক উন্নতি সম্ভবপর নহে। সে তাহার গ্রন্থ Afrodite- এ দৃঢ়তার সহিত ইহা প্রমাণ করিবার চেষ্টা করিয়াছে যে, বেবিলন, আলেকজান্দ্রিয়া, এথেন্স, রোম, ভেনিস এবং সংস্কৃতি ও সভ্যতার অন্যান্য কেন্দ্রের চরম উন্নতি ঠিক তখনই হইয়াছিল, যখন সেখানে চরিত্রহীনতা, লাম্পট্য ও প্রবৃত্তির দাসত্ব পূর্ণ মাত্রায় চলিয়াছিল। কিন্তু যখনি সেখানে নৈতিক ও আইন-কানুনের বন্ধন মানবীয় কামনা বাসনার উপর চাপাইয়া দেওয়া হইল, তখনই প্রবৃত্তি বাসনার সঙ্গে সঙ্গে মানবীয় আত্মাও সেই সকল বন্ধনের মধ্যে আবদ্ধ হইয়া পরিল।

তৎকালীন ফ্রান্সে Pierre Louis একজন খ্যাতনামা সাহিত্যিক এবং নিজস্ব পদ্ধতিতে প্রবন্ধ রচনাকারী ছিল। এই ব্যক্তি একটি সুপ্রতিষ্ঠিত সাহিত্য প্রতিষ্ঠানের পরিচালকও ছিল। তাহার অধীনে গল্পলেখক, নাট্যকার, নৈতিকতাবাদী প্রভৃতি একটি দল তাহার মতবাদ ও দৃষ্টিভঙ্গী প্রচারে লিপ্ত থাকিত। সে তাহার গোটা লেখনী শক্তির সাহায্যে নগ্নতা ও নারীপুরুষের অবাধ মেলামেশার বহুল প্রচার করিয়াছে। তাহার গ্রন্থ Afrodite- এ সে গ্রীসের এমন এক সময়ের উচ্ছ্বাসিত প্রশংসা করিতেছেঃ

যখন উলঙ্গ মানবতা ধারণাতীত সৌন্দর্যের পূর্ণ প্রতিচ্ছবি, যাহার সম্পর্কে ধর্মাবলম্বীগণ এই আশ্বাস দান করিয়াছে যে, খোদা তাহাকে আপন মূর্তিতে সৃষ্টি করিয়াছে- এক পবিত্র বেশ্যার মূর্তিতে নানাবিধ ঠাকঠমক ও কমনীয় ভঙ্গিতে বিশ হাজার দর্শকের সম্মুখে আপন দেহ সম্ভার উপস্থাপিত করিত, তখন পরিপূর্ণ কামভাবসহ তাহার প্রতি প্রণয় নিবেদন সেই পূত পবিত্র স্বর্গীয় প্রণয়, যাহার দ্বারা আমরা সকলে সৃষ্ট হইয়াছি-

কোন পাপ, লজ্জাকর অথবা অপবিত্র কার্য বিবেচিত হইত না।

মোদ্দাকথা এই যে, সে কবিত্বের সকল আবরণ উন্মেচন করিয়া স্পষ্ট ভাষায় এতখানি উক্তি করিয়াছেঃ

বলিষ্ঠ নৈতিক শিক্ষার দ্বারা আমাদিগকে এই গর্হিত কার্যের মূলোৎপাটন করিতে হইবে যে, নারীর মাতা হওয়া কোন অবস্থাতেই লজ্জাকর, অন্যায় ও অসম্মানজনক নহে।

 

বিংশ শতাব্দীর উন্নতি

ঊনবিংশ শতাব্দীতে চিন্তাধারা ও মতবাদ এতদূর পর্যন্তই পৌছিয়াছিল। বিংশ শতাব্দীর প্রারম্ভে অন্তরীক্ষে এমন এক নূতন শ্যেনপক্ষীর আবির্ভাব হইল, যে তাহার পূর্ববর্তীগণ অপেক্ষা অধিক উচ্চে উড়িবার চেষ্টা করিল। ১৯০৮ খ্রীস্টাব্দে Peorr Wolff এবং Caston Leronx- এর একখানা নাটক Lelys প্রকাশিত হইল। এই নাটকে দুইটি বালিকা তাহাদের যুবক ভ্রাতার সম্মুখে পিতার সহিত এই বিষয়ে তর্ক করিতেছে যে, তাহাদের ইচ্ছানুযায়ী স্বাধীনভাবে প্রেম নিবেদন করিবার অধিকার আছে। তাহারা ইহাও বলিতেছে যে, প্রেম ব্যতিরেকে একজন যুবতীর জীবন কত মর্মন্তুদ হইতে পারে! একজন বৃদ্ধ পিতা তাহার কন্যাকে জনৈক যুবকের সহিত অবৈধ প্রেম করার জন্য তিরস্কার করিতেছে। তদুত্তরে কন্যা বলিতেছেঃ

আমি তোমাকে কিরূপে বুঝাইব? একটি বালিকা প্রেম না করিয়াই আইবুড়া হউক-ইহা কোন বালিকাকে বলিবার অধিকার কাহারও নাই, সে তাহার ভগ্নি হউক অথবা কন্যা হউক, ইহা তুমি কিছুতেই বুঝিতে পার নাই।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ এই  স্বাধীনতার আন্দোলন শুধু বাড়াইয়াই দেয় নাই বরং এক চরম সীমায় পৌঁছাইয়া দিয়াছে। গর্ভনিরোধ আন্দোলনের প্রভাব ফ্রান্সের উপর অধিকতর পড়িয়াছে। ক্রমাগত চল্লিশ বৎসর যাবত ফ্রান্সের জন্মহারের পতন ঘটিতেছিল। ইহার সাতাশিটি জেলার মধ্যে মাত্র বিশটি জেলার জন্মহার মৃত্যুহারের অধিক ছিল। দেশের কোন কোন অঞ্চলে এরূপ অবস্থা ছিল যে, একশ শিশুর জন্মের বিপক্ষে মৃত্যুহার ছিল ১৩০ হইতে ১৬০ এর মাঝামাঝি। যখন ফরাসি জাতির জীবন-মৃত্যু সিদ্ধান্তকারী মহাযুদ্ধ শুরু হইল, তখন দেশের চিন্তাশীল ব্যক্তিগণ জানিতে পারিলেন যে, জাতির ক্রোড়ে যুদ্ধোপযোগী যুবকের সংখ্যা নিতান্ত নগণ্য। এই অল্প সংখ্যক যুবককে উৎসর্গ করিয়া জাতীয় জীবনকে হয়ত নিরাপদ করা যাইতে পারে, কিন্তু শত্রুর পরবর্তী আক্রমনে রক্ষা পাওয়া দুস্কর হইবে। এই অনুভূতি সমগ্র ফরাসীদেশে জন্মহার বর্ধিত করিবার এক তিব্র অনুপ্রেরণা জাগাইয়া তুলিল। চতুর্দিক হইতে গ্রন্থকার, সাংবাদিক, বক্তা, বিদ্বানমণ্ডলী ও রাজনীতিবিদগণ সমবেত কণ্ঠে প্রচার শুরু করিল “সন্তান জন্মাও। বিবাহের প্রচলিত বন্ধনের ভয় করিও না। যে সমস্ত কুমারী নারী ও বিধবা জন্মভূমির কল্যাণের জন্য তাহাদের গর্ভে সন্তান ধারণের উদ্দেশ্যে প্রস্তুত হইবে, তাহারা সমাজের নিন্দনীয় না হইয়া বরং সম্মানের অধিকারিণী হইবে।”

এই সময়ে স্বাধীনতাকামী ভদ্রলোকদের স্বাভাবিকভাবেই এক সুবর্ণ সুযোগ উপস্থিত হইল। তাহারা এই সুযোগের সদ্ব্যবহার করিয়া শয়তানের ঝুলিতে অবশিষ্ট যাবতীয় মতবাদ ও চিন্তাধারার প্রচার শুরু করিল।

তৎকালীন জনৈক বিশিষ্ট গ্রন্থকার Lo-Lyon Republican- এর সম্পাদক ‘বলপূর্বক ব্যভিচার অপরাধজনক কেন?’ শীর্ষক প্রবন্ধে নিম্নরূপ মন্তব্য করেনঃ

নিরন্ন দরিদ্র যখন ক্ষুধার তাড়নায় অতিষ্ঠ হইয়া চুরি ও লুটতরাজে লিপ্ত হয়, তখন বলা হয় যে, তাহার অন্ন বস্ত্রের সংস্থান করিয়া দাও, চুরি ও লুটতরাজ আপনিই বন্ধ হইয়া যাইবে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় এই যে, দেহের একটি প্রাকৃতিক চাহিদা মিটাইবার জন্য যে সাহায্য সহানুভূতি করা হয়, অনুরূপ দ্বিতীয় প্রাকৃতিক এবং গুরুত্বপূর্ণ চাহিদা মিটানো অর্থাৎ যৌনক্ষুধা নিবৃত্তির বেলায় তাহা করা হয় না। ক্ষুধার তীব্র তাড়নার পরিণামে যেমন মানুষ চৌর্যবৃত্তিতে লিপ্ত হয়, তেমনই বলপূর্বক ব্যভিচার এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রাণহত্যাও যৌনক্ষুধার অনুরূপ তীব্র তাড়নার পরিণাম হিসাবেই হইয়া থাকে – যাহা ক্ষুধাতৃষ্ণা অপেক্ষা কম প্রাকৃতিক নহে। একটি স্বাস্থ্যবান বলিষ্ঠ যুবক স্বীয় কামরিপু জোরপূর্বক সংযত রাখিতে পারে না – যেমন সে তাহার ক্ষুধা এই প্রতিশ্রুতিতে নিবৃত্ত রাখিতে পারে না যে, আগামী সপ্তাহে তাহার অন্ন জুটিবে। আমাদের শহরগুলিতে সব কিছুরই প্রাচুর্য রহিয়াছে। কিন্তু একজন নিঃস্বের উদরান্নের অভাব যেমন মর্মন্তুদ, তেমনই তাহার যৌন সম্ভোগের অভাবও অতি মর্মন্তুদ। ক্ষুধার্তকে যেমন বিনা মুল্যে খাদ্য বিতরণ করা হয়, তেমনই দ্বিতীয় প্রকারের ক্ষুদায় যাহারা অতিষ্ঠ, তাহাদের জন্যও কিছু ব্যবস্থা করা আমাদের কর্তব্য।

মনে রাখা আবশ্যক যে, ইহা কোন পরিহাসব্যঞ্জক প্রবন্ধ নহে। ইহা যেমন অতি দায়িত্ব ও গুরুত্ব সহকারে লিখিত হইয়াছিল, তেমনই ফরাসী দেশে অতি গুরুত্ব সহকারেই ইহা প্রচারও হইয়াছিল।

এই সময়ে প্যারিসের Faculty of Medicine জনৈক অভিজ্ঞ ডাক্তারকে তাহার একটি প্রবন্ধের জন্য ‘ডক্টরেট’ উপাধি প্রদান করে। প্রবন্ধটি সরকারি মুখপত্রেও প্রকাশ করা হয়। উক্ত প্রবন্ধের এক স্থানে নিম্নরূপ মন্তব্য করা হইয়াছেঃ

আজ আমরা বিনা দ্বিধায় বলিয়া থাকি যে, রক্তনিষ্ঠীবন (থুথু) ত্যাগের জন্য আমাকে পর্বত শিখরে প্রেরণ করা হইয়াছিল। আমাদের বিশ্বাস, এমন একদিনও আসবে, যেদিন আমরা কৃত্রিম গর্ব ও লজ্জা ব্যতিরেকে বলিতে পারিব, বিশ বৎসর বয়সে আমার সিফলিস হইয়াছিল। এই ব্যাধিগুলি তো জীবনের সুখসম্ভোগের মূল্যবিশেষ। যে ব্যক্তি তাহার জীবন এমনভাবে অতিবাহিত করে যে, তাহার দ্বারা কোন ব্যাধির উপক্রম হয় না, – তাহার জীবন অসম্পূর্ণ। সে কাপুরুষতা, নম্র স্বভাব অথবা ধর্মীয় বিভ্রান্তির কারণে তাহার প্রকৃতিগত দৈহিক চাহিদা পূরণে নিবৃত্ত থাকে অথচ ইহা তাহার স্বাভাবিক চাহিদাগুলির মধ্যে একটা নগণ্য চাহিদামাত্র।

নওমালথুসীয় সাহিত্য

সম্মুখে অগ্রসর হইবার পূর্বে গর্ভনিয়ন্ত্রন বা গর্ভনিরোধ আন্দোলন সম্পর্কে আলোচিত মতবাদ ও চিন্তাধারার প্রতি একবার দৃষ্টি নিক্ষেপ করা প্রয়োজন মনে করি। অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষভাগে শ্রেষ্ঠ ইংরেজ অর্থনীতিবিদ মালথুস যখন বর্ধিষ্ণু জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করিবার জন্য বার্থ কন্ট্রোল বা জন্মনিয়ন্ত্রনের প্রস্তাব করেন, তখন তিনি স্বপ্নেও ইহা ভাবিয়া দেখেন নাই যে, তাঁহার সেই পরামর্শ এক শতাব্দীর পরে ব্যভিচার ও অশ্লীলতা প্রচারের সহায়ক হইবে। মালথুস জনসংখ্যা বৃদ্ধি বন্ধ করিবার জন্য আত্মসংযম, অধিক বয়সে বিবাহ প্রভৃতির পরামর্শ দিয়েছিলেন। কিন্তু উনবিংশ শতাব্দীর শেষ ভাগে যখন নও মালথুস আন্দোলন (New Multhusian Movement) শুরু হইল, তখন তাহার মূলনীতি ছিল স্বাধীনভাবে কামরিপু চরিতার্থ করা এবং উহার স্বাভাবিক পরিণাম হিসাবে সন্তানের জন্মলাভ বৈজ্ঞানিক প্রণালীতে বন্ধ করা। ইহার ফলে অবৈধ যৌন সম্পর্ক স্থাপনের যে শেষ প্রতিবন্ধকতাটুকু অবশিষ্ট ছিল, তাহাও দূরীভূত হইয়া পাপাচারের পথ নিষ্কণ্টক হইল। কারণ এখন একজন নারী স্বাধীনভাবে তাঁহার দেহসম্ভারকে পর পুরুষের জন্য বিলাইয়া দিতে পারে। অতপর সন্তান লাভ বা তাঁহার প্রতিপালনের দায়িত্ব সম্পর্কে আর কোন শঙ্কাই থাকিল না। এই সবের ভয়াবহ পরিণাম ফল বর্ণনা করিবার অবকাশ এখানে নাই, তবে জন্ম নিয়ন্ত্রণ সম্পর্কীয় সাহিত্যাবলিতে যে সকল মতবাদের প্রচার করা হইয়াছে, এখানে তাহার কিঞ্চিত উদাহরণ দিব।

যে সব যুক্তিপ্রমাণাদির দ্বারা এই সকল সাহিত্যে নও মালথুসীয় ভূমিকা লেখা হইয়াছে, তাহার সংক্ষিপ্ত বিবরণ নিম্নরূপঃ

প্রত্যেক মানুষকে প্রকৃতিগতভাবে তিনটি বিরাত ও প্রচণ্ড অভাবের সম্মুখীন হইতে হয়। প্রথম খাদ্য, দ্বিতীয় বিশ্রাম ও তৃতীয় কামরিপু চরিতার্থকরণ। প্রকৃতি এই তিনটি বস্তু মানুষের মধ্যে পূর্ণ শক্তিতে গচ্ছিত রাখিয়াছে। এই সবের অভাব পূরণের মধ্যে বিশেষ আনন্দও ঢালিয়া দিয়াছে। সেইজন্য মানুষ এই সকল অভাব পূরণের জন্য স্বভাবতই অভিলাষী হয়। যুক্তি ও তর্ক মানুষকে ইহার জন্য তীরবেগে ধাবিত হইতে বাধ্য করে। প্রথম দুইটি বিষয়ে তাহার কার্যপ্রণালী একইরূপ হয়। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় এই যে, তৃতীয়টির ব্যাপারে তাঁহার কার্যপ্রণালী ভিন্নরূপ। সামাজিক নৈতিক বিধান তাহার উপর এই বাধ্যবাধকতা আরোপিত করিয়াছে যে, যৌন অভিলাষ বিবাহ ব্যতিরেকে  পূর্ণ করা চলিবে না। বৈবাহিক সীমারেখার মধ্যে স্ত্রী-পুরুষের জন্য বিশ্বস্ততা এবং সতিত্ব-সম্ভ্রমকে অনিবার্য করা হইয়াছে। উপরন্তু ইহাও শর্ত করিয়া দেয়া হইয়াছে যে, সন্তানের জন্মনিরোধ করা চলিবে না। এই ধরনের বিধিবিধান সম্পূর্ণ ভ্রান্ত ও নির্বুদ্ধিতার পরিচায়ক। ইহা জ্ঞান ও প্রকৃতিবিরুদ্ধ। ইহা নীতিগতভাবেও ভ্রান্ত ও মানবতার জন্য ভয়াবহ পরিণামদর্শী।

এবম্বিধ ভূমিকার উপর যে সকল মতবাদের প্রাসাদ নির্মিত হয়, তাহাও একবার লক্ষ্য করিয়া দেখুন। জার্মান সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টির নেতা Babel স্পষ্ট ভাষায় লিখিতেছেনঃ

  • নারী ও পুরুষ তো পশুই। পশু-দম্পতির মধ্যে কি কখনো বিবাহের-স্থায়ী বিবাহের – প্রশ্ন উত্থাপিত হয়?

Dr. Drysdale বলেনঃ

আমাদের যাবতীয় অভিলাষের মধ্যে প্রেমও একটি পরিবর্তনশীল বস্তু। ইহাকে একক পন্থায় নির্দিষ্ট করিয়া দেয়ার অর্থ প্রাকৃতিক নিয়মকানুনের সংশোধন করা। তরুণ-তরুণী একটা বৈশিষ্ট্য সহকারে এই পরিবর্তনের বাসনা রাখে। প্রাকৃতিক বিরাট সুবিচারপূর্ণ ব্যবস্থানুযায়ী আমাদের বাসনা এই যে, এই ব্যাপারে তাহাদের অভিজ্ঞতা যেন রকমারী হয়। স্বাধীন সম্পর্ক উৎকৃষ্ট চরিত্রের অভিব্যক্তি এইজন্য যে, ইহা প্রাকৃতিক নিয়মনীতির সহিত অধিকতর সাদৃশ্য রাখে। উপরন্তু ইহা ভাবপ্রবণতা, অনুভূতি ও নিস্বার্থ প্রেম হইতে সরাসরি প্রকাশ পায়। যে অনুপ্রেরণা ও বাসনার দ্বারা এই সম্পর্কের সৃষ্টি হয়, তাহার বিরাট নৈতিক মূল্য রহিয়াছে। এমন সৌভাগ্য সেই ব্যবসাসুলভ আদানপ্রদানের দ্বারা কিরূপে সম্ভব হইবে, যাহা বিবাহকে প্রকৃতপক্ষে একটি পেশায় পরিণত করে?

পাঠক লক্ষ্য করুন, দৃষ্টিভঙ্গীর কিরূপে কখন পরিবর্তন হইতেছে এবং ক্রমশ কিভাবে বিপরীত মতাদর্শ গ্রহণ করা হইতেছে। প্রথমত এই চেষ্টা চলিয়াছে যে, ব্যাভিচারকে নৈতিকতার দিক দিয়া নির্দোষ মনে করা হইবে এবং বিবাহ ও ব্যাভিচার সমপর্যায়ভুক্ত হইবে। কিন্তু এখন সম্মুখে অগ্রসর হইয়া বিবাহকেই দূষণীয় মনে করা হইতেছে এবং ব্যাভিচারকে উৎকৃষ্টতর মর্যাদা দান করা হইতেছে।

উক্ত ডাক্তার অন্য এক স্থানে বলিতেছেনঃ

এমন ব্যবস্থা অবলম্বন করা প্রয়োজন, যাহার দ্বারা বিবাহ ব্যতিরেকে প্রেম করাকে সম্মানজনক মনে করা যায়। ইহা আনন্দের বিষয় যে, তালাকের পন্থা শিথিল হওয়ায় বিবাহের পথও বন্ধ হইয়া আসিতেছে। কারণ এখন বিবাহটা মিলিতভাবে জীবন যাপন করিবার জন্য দুই ব্যক্তির মধ্যে একটি চুক্তি এবং উভয় পক্ষ যখন ইচ্ছা তখনই এই চুক্তির পরিসমাপ্তি ঘটাইতে পারে। যৌন মিলনের ইহাই একমাত্র সুষ্ঠু পন্থা।

ফরাসীদেশের খ্যাতনামা নও-মালথুসীয় নেতা Paul Robin লিখিতেছেনঃ

বিগত পঁচিশ বৎসরে আমরা এতখানি সাফল্য অর্জন করিয়াছি যে, অবৈধ সন্তানকে আমরা প্রায় বৈধ সন্তানের পর্যায়ে আনিয়া ফেলিয়াছি। এখন এতটুকু করিবার আছে, যাহাতে এখন শুধু হারামী বা অবৈধ সন্তানই জন্মলাভ করিতে পারে। কারণ তাহা হইলে আর প্রতিযোগিতার প্রশ্নই উঠিবে না।

ইংল্যান্ডের বিখ্যাত দার্শনিক ‘মিল’ সাহেব তাঁহার গ্রন্থ On Liberty তে দৃঢ়তার সহিত ইহা বলিতেছেন, যে ব্যক্তি জীবন যাপন করিবার জন্য যথেষ্ট উপায়-উপাদানের প্রমাণ দিতে পারিবে না, তাহাকে আইনের সাহায্যে বিবাহ হইতে বিরত রাখা হইবে। কিন্তু ইংল্যান্ডে যখন বেশ্যাবৃত্তি বন্ধ করার প্রশ্ন উঠিল, তখন এই বিজ্ঞ দার্শনিকই উহার প্রচণ্ড বিরোধিতা করেন। তাঁহার যুক্তি এই ছিল যে, ইহা দ্বারা ব্যক্তি স্বাধীনতার উপরে হস্তক্ষেপ করা হয় এবং শ্রমিকদের অবমাননা করা হয়। কারণ ইহার দ্বারা তাহাদের সহিত ছেলেমী করা হইয়াছিল।

চিন্তা করিয়া দেখুন, ব্যাক্তি স্বাধীনতার মর্যাদা এইজন্য দিতে হইবে যে, উহার সুযোগে ব্যভিচার করা হইবে। কিন্তু কোন মূর্খ যদি ব্যক্তি স্বাধীনতার বলে বিবাহ করিতে চায়, তবে তাহার সে স্বাধিনতার রক্ষার অধিকার থাকিবে না। তাহার স্বাধীনতায় আইনের হস্তক্ষেপ শুধু গ্রহণযোগ্যই নহে, বরং স্বাধীনতাপ্রিয় দার্শনিকের বিবেক উহাকে প্রয়োজনীয় মনে করে। এখানে নৈতিক দৃষ্টিভঙ্গীর বিপ্লব চরম সীমায় উপনীত হইতেছে। যাহা দূষণীয় ছিল, তাহা এখন নির্দোষ হইয়াছে এবং যাহা নির্দোষ ছিল তাহা এখন দূষণীয়।

Top

পরিণাম ফল

সাহিত্য অগ্রভাগে চলে, জনমত চলে তাহার পশ্চাতে। অবশেষে সামাজিক চরিত্র, নিয়মনীতি, রাষ্ট্রের আইন-কানুন তাহার নিকট আত্মসমর্পণ করে। যেখানে ক্রমাগত দেড় শত বৎসর যাবত দর্শন, ইতিহাস, নৈতিকতা, বিজ্ঞান, উপন্যাস, নাটক, শিল্পকলা প্রভৃতি মানসিক বিপ্লব সৃষ্টিকারী উপায়-উপাদানগুলি সম্মিলিত শক্তিতে একই প্রকারের দৃষ্টিভঙ্গী ও চিন্তাধারা মানুষের মনে অনুপ্রবিষ্ট করিতে থাকে, সে ওখানে সমাজের এইরূপ চিন্তাধারায় প্রভাবান্বিত না হওয়া এক অতি অসম্ভব ব্যাপার। অতপর যেখানে সরকার ও যাবতীয় সামাজিক ব্যবস্থা গণতান্ত্রিক নীতির উপর প্রতিষ্ঠিত হয়, সেখানে ইহাও সম্ভব নহে যে, জনমতের পরিবর্তনের সহিত আইনেরও পরিবর্তন হইবে না।

 

শিল্প বিপ্লব ও তাহার প্রতিক্রিয়া

অবলীলাক্রমে অন্যান্য তামাদ্দুনিক উপকরণ ঠিক সময়োপযোগী হইয়া পড়িয়াছিল। এই সময়েই শিল্প বিপ্লব (Industrial Revolution) সংঘটিত হইয়াছিল। ইহার দ্বারা অর্থনৈতিক জীবনে যে সমস্ত পরিবর্তন ঘটিয়াছিল এবং সাংস্কৃতিক জীবনে তাহার যে সকল প্রভাব পরিস্ফুট হইয়াছিল, তাহা ঘটনা প্রবাহকে সেই দিকেই পরিচালিত করিতেছিল, যেদিকে বিপ্লবী সাহিত্যগুলি পরিচালিত করিতে চাহিয়াছিল। ব্যক্তি স্বাধীনতার যে ধারণার উপরে ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হইয়াছিল, যান্ত্রিক আবিস্কার ও ব্যাপক উৎপাদনের (Mass Production) সম্ভাবনা তাহাকে অসাধারণ শক্তি দান করিয়াছিল। ধনিক শ্রেণী বড় বড় শিল্প ও ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান কায়েম করিল। শিল্প ব্যবসায়ের নূতন নূতন কেন্দ্রগুলি বিরাট বিরাট নগরে পরিণত হইল। পল্লী অঞ্চল হইতে লক্ষ লক্ষ নর-নারীকে শহরে টানিয়া আনা হইল। জীবিকা আশাতিরিক্ত মহার্ঘ হইয়া পড়িল। বাসস্থান, খাদ্য, বস্ত্র ও জীবনযাত্রা নির্বাহের জন্য দৈনন্দিন আবশ্যকীয় দ্রব্যাদি অগ্নিমূল্য হইয়া পড়িল। কিছুটা সাংস্কৃতিক উন্নতির কারণে এবং কিছুটা পুঁজিপতিদের চেষ্টায় জীবনের আবশ্যকীয় দ্রব্যাদির মধ্যে অসংখ্য বিলাস-সামগ্রী স্থানলাভ করিল। কিন্তু পুজিপুতিগণ দৈনন্দিন জীবনে যে সমস্ত আরাম, আনন্দ উপভোগ ও বিলাসভূষণের সৃষ্টি করিয়াছিল, তাহা লাভ করিবার উপায়-উপকরণ যাহাতে সকলে সমভাবে ভোগ করিতে পারে, ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সেই পর্যায়ে ধনবণ্টন করা করা হইল না। পুঁজিপতিদের পল্লী অঞ্চল হইতে জনসাধারণকে শহরে টানিয়া আনিবার পর তাহাদের জীবন যাপনের অত্যাবশ্যক সামগ্রী, বাসস্থান, খাদ্য, বস্ত্র প্রভৃতির সংস্থান সহজেই হইতে পারিত। ইহার ফল এই হইল যে, স্ত্রী স্বামীর এবং সন্তান-সন্ততি  পিতার গলগ্রহ হইয়া পড়িল। জ্ঞাতি কুটুম্ব ও স্বজনবর্গের বোঝা বহন করা তো দূরের কথা, নিজকে নিজেরই সামাল দেওয়া সুকঠিন হইয়া পড়িল। আর্থিক অবস্থা প্রত্যেক ব্যক্তিকে উপার্জন করিতে বাধ্য করিল। কুমারী, বিবাহিতা নারী, বিধবা প্রভৃতি সকল শ্রেণীর নারীকে জীবিকার্জনের জন্য গৃহ হইতে বাহির হইতে হইল। অতঃপর যখন নারী পুরুষের একত্রে মেলামেশার সুযোগ বাড়িয়া গেল এবং উহার অবশ্যম্ভাবী পরিণাম ফল দেখা দিল, তখন স্বাধীনতার ধারণা ও নূতন চরিত্র দর্শন পিতা-কন্যা, ভ্রাতা-ভগ্নি, স্বামি-স্ত্রী সকলকে সান্তনা দান করিয়া বলিল, ‘অধীর হইও না, যাহা হইতেছে বেশ হইতেছে! ইহা অধপতন নহে, প্রকৃতপক্ষে ইহাই উন্নতি ও মুক্তি (Emancipation)। এই যে অতল গহবরে পুঁজিপতিগণ তোমাদিগকে নিক্ষেপ করিতেছে, ইহা নরককুণ্ড নহে, স্বর্গ-পরম স্বর্গ।’

ধনতান্ত্রিক ব্যক্তিস্বার্থ

অন্যান্য বিষয় এই পর্যন্তই সীমাবদ্ধ রহিল না। ব্যক্তি স্বাধীনতার এক প্রকার ধারণার উপরে যে ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হইল, তাহা ব্যক্তিকে সকল প্রকার সম্ভাব্য উপায়ে ধনার্জনের সীমা শর্তহীন নিরঙ্কুশ অধিকার দান করিল। যে কোন উপায়েই ধন অর্জিত হউক, এমন কি কাহারও ধনার্জনের ফলে যতজনেরই ধ্বংস সাধন হউক না কেন-নূতন চরিত্রদর্শন তাহাকে বৈধ ও পবিত্র বলিয়া মনে করিল। এইরূপে যাবতীয় সাংস্কৃতিক ব্যবস্থা এমনভাবে প্রতিষ্ঠিত হইল যে, সমষ্টির বিপক্ষে সকল দিক দিয়া ব্যক্তিকে সমর্থন করা হইল। পক্ষান্তরে ব্যষ্টির ব্যক্তিগত স্বার্থের বিপক্ষে সমষ্টির অধিকার রক্ষার কোন উপায় রহিল না। স্বার্থান্বেষী ব্যক্তিবর্গের জন্য সমাজকে ধ্বংস করিবার যাবতীয় পথ উন্মুক্ত হইল। তাহারা যাবতীয় মানবীয় দুর্বলতার সুযোগে স্বীয় স্বার্থসিদ্ধ করিবার নব নব পন্থা অবলম্বন করিতে আরম্ভ করিল। এক ব্যক্তির আবির্ভাব হইতেছে এবং সে স্বীয় পকেট পূর্ণ করিবার জন্য অপরকে মদ্যপানের কুকার্যে লিপ্ত করিতেছে। এই প্লেগ-মুষিক হইতে সমাজকে রক্ষা করিবার জন্য কেহই অগ্রসর হইতেছে না। অপর এক ব্যক্তির আবির্ভাব হইতেছে এবং সে সুদের জাল বিস্তার করিয়া দিতেছে। এমন কেহ নাই যে, মানুষকে এই রক্ত শোষক জোঁকের কবল হইতে রক্ষা করে। উপরন্তু যাবতীয় আইনকানুন এই রক্ত শোষকের স্বার্থ সংরক্ষিত করিতেছে, যেন কেহই তাহার কবল হইতে এক বিন্দু রক্তও নিরাপদে রাখিতে না পারে। তৃতীয় এক ব্যক্তির আবির্ভাব হইতেছে, সে জুয়ার এক অদ্ভূত পন্থা আবিস্কার করিতেছে। ইহার প্রসার এত ব্যাপক হইতেছে যে, শিল্প ব্যবসায়ের কোন বিভাগই জুয়ার প্রভাব মুক্ত হইতেছে না। মানুষের অর্থনৈতিক আয়ুকে এই দাহনকারী অগ্নি হইতে রক্ষা করিবার কেহই নাই। যে যুগে মানুষের অতি মারাত্মক দুর্বলতা যৌন উন্মাদনায় ইন্ধন সংযোগ করত প্রভুত স্বার্থসিদ্ধ করা সম্ভব হইত সেই যুগে সেই ব্যক্তিগত ঔদ্ধত্য, বিদ্রোহ ও শত্রুতার অপবিত্র যুগে এবম্বিধ মানবীয় দুর্বলতার প্রতি স্বার্থান্ধ ব্যক্তিবর্গের দৃষ্টি আকৃষ্ট না হওয়া এক অসম্ভব ব্যাপার ছিল। বস্তুত এই যৌন-উচ্ছৃঙ্খলতার দ্বারা যথাসম্ভব কার্যোদ্ধার করা হইয়াছে। রঙ্গমঞ্চ, নৃত্যশালা ও চলচ্চিত্রের নির্মাণকেন্দ্রগুলিতে যাবতীয় কার্যকলাপ সুন্দরী নারীকে কেন্দ্র করিয়াই চলিত। এই সকল কার্যে নারীর অংশগ্রহন অনিবার্য ছিল। নারীকে অধিকতর নগ্ন আকারে এবং কামোদ্দীপক মূর্তিতে জনসাধারণের সম্মুখে উপস্থিত করা হইত। ইহা দ্বারা লোকের যৌন তৃষ্ণাকে বর্ধিত করিয়া তাহাদের অর্থ লুট করা হইত। কিছু সংখ্যক লোক নারীকে ভাড়া খাটাইতে শুরু করিল এবং বেশ্যাবৃত্তির উন্নতি সাধন করিয়া তাহাকে একটি সুসংগঠিত আন্তর্জাতিক ব্যবসায়ে পরিণত করিল। আবার কতিপয় লোক সৌন্দর্য ও বিলাসিতার নব নব উপকরণ আবিস্কার করত তাহার দ্বারা নারীদের সৌন্দর্য প্রদর্শনের জন্মগত অনুভূতিকে বাড়াইয়া নিয়া তাহাদিগকে উন্নত করিয়া তোলা হইল এবং স্বার্থান্বেষী ব্যবসায়ীর দল ইহার দ্বারা প্রভুত অর্থ উপার্জন করিতে লাগিল। কেহ কেহ আবার যৌন উত্তেজক নব নব বেশভূষা ও নগ্নতার ফ্যাশান আবিস্কার করত সুন্দরী নারীকে উহা পরিধান করাইয়া সমাজে বিচরণ করিতে উদ্বুদ্ধ করিল এবং নব্য যুবকের দল সতৃষ্ণ নয়ন ও মন লইয়া ইহাদের দিকে ভীড় জমাইতে লাগিল। তরুণীর দল নবাবিষ্কৃত উলঙ্গ বাহার বেশভূষার প্রতি আকৃষ্ট হইয়া পড়িল এবং নুতন পোশাকের বাজারও সরগরম হইয়া উঠিল। কতিপয় লোক সুযোগ বুঝিয়া নগ্ন ছবি ও অশ্লীল সাহিত্যের প্রচার শুরু করিল এবং এইভাবে জনসাধারণকে কুষ্ঠব্যাধিতে সংক্রমিত করিয়া বেশ দু’পয়সা রোজগার করিতে লাগিল। ক্রমশ অবস্থা এতদুর গড়াইল যে, ব্যবসা-বাণিজ্যের কোন বিভাগও যৌন উন্মাদনার উপায়-উপকরণ হইতে মুক্ত রহিল না। যে কোন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপনাদির প্রতি লক্ষ্য করুন, দেখিতে পাইবেন যে, নারীর নগ্ন অথবা অর্ধনগ্ন প্রতিকৃতি ব্যতিরেকে কোন বিজ্ঞপ্তি একেবারেই মূল্যহীন। হোটেল, রেস্তোরাঁ, দোকানের শো-রুম বা প্রদর্শনী কক্ষ প্রভৃতিতে নারীমূর্তি এমনভাবে রক্ষিত হইয়াছে, যেন পুরুষ তদ্দিকেই আকৃষ্ট হয়। এহেন পরিস্থিতিতে অসহায় হতভাগ্য জনসাধারণের স্বার্থ রক্ষার একটিমাত্র উপায় এই ছিল যে, নিজেদের নৈতিক মনোবল দ্বারা এই সমস্ত আক্রমণ প্রতিহত করিবে এবং যৌন উন্মাদনার কবল হইতে আত্মরক্ষা করিবে। কিন্তু ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থা এমন দুর্বল বুনিয়াদের উপর প্রতিষ্ঠিত ছিল যে, তাহার আক্রমণকে প্রতিহত করা যাইতে পারে। তাহাদের নিকট একটি পরিপূর্ণ জীবন দর্শন ও শক্তিশালী শয়তানী বাহিনী তথা সাহিত্য ছিল, যাহা সঙ্গে সঙ্গে নৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিকে পরাস্ত ও পরাভুত করিয়া দিত। হত্যাকারীর কৃতিত্ব এই যে, সে বলির পশুকে স্বেচ্ছায় সন্তুষ্ট চিত্তে বলির জন্য প্রস্তুত করিয়া লয়।

 

গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ব্যবস্থা

এইখানেই বিপদের সমাপ্তি হয় নাই। উপরন্তু এই স্বাধীনতার ধারণা পাশ্চাত্য গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার জন্মদান করিল এবং তাহা এই ধরনের নৈতিক বিপ্লবকে ষোলকলায় পূর্ণ করিবার এক শক্তিশালী অস্ত্রে পরিণত হইল।

নতুন গনতন্ত্রের মূলনীতি এই ছিল যে, মানুষ স্বয়ং তাহার শাসক হইবে এবং নিজেদের জন্য শাসন-সংবিধান ও আইন-কানুন রচনা করিবে। যেমন ইচ্ছা তেমন আইন তাহারা রচনা করিবে এবং ইচ্ছামত কোন আইন রহিত বা পরিবর্তন করিবে। তাহাদের উপরে প্রাধান্য বিস্তারকারী মানবীয় দুর্বলতামুক্ত কোন ঊর্ধ্বতন শক্তি বা কর্তৃপক্ষ নাই, যাহার পথনির্দেশ নত মস্তকে মানিয়া লইয়া মানুষ ভ্রান্ত পথ হইতে নিজেকে বাঁচাইতে পারে। তাহাদের নিকটে চিরশাশ্বত মানবীয় ক্ষমতার বহির্ভূত অপরিবর্তনীয় কোন বুনিয়াদী আইন-কানুন ছিল না। মানবীয় কুপ্রবৃত্তির তাড়নায় পরিবর্তিত হয় না, এমন অচল-অটল কোন কষ্টিপাথর তাহাদের নিকট ছিল না, যাহা দ্বারা তাহারা সত্য-অসত্য নির্ণয় করিতে পারে। এইরূপে গনতন্ত্রের নূতন দৃষ্টিভঙ্গি মানুষকে পূর্ণ স্বয়ংশাসক (Autonomous) এবং দায়িত্বহীন করিয়া দিল। তাহারা নিজেরাই নিজেদের শাসক হইল এবং জনমতকেই প্রতিটি আইনের উৎস হিসাবে গ্রহণ করিল।

প্রকাশ থাকে যে, যেখানে সামাজিক জীবনে যাবতীয় আইন-কানুন জনমতের অধীন হয় এবং যেখানে শাসন কর্তৃপক্ষ এই নতুন গণতন্ত্রখোদার দাস হইয়া পড়ে, সেখানে আইন-কানুন ও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা সমাজকে নৈতিক বিশৃঙ্খলা হইতে রক্ষা করিতে পারেই না, বরং শেষ পর্যন্ত উহার ধ্বংস সাধনের সহায়ক হইয়া পড়ে। জনমতের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে আইনেরও পরিবর্তন হইতে থাকে। জনসাধারণের দৃষ্টিভঙ্গির যেরূপ পরিবর্তন হইতে থাকিবে, আইন-কানুনের মূলনীতি ও বন্ধন অনুরূপভাবে গড়িতে থাকিবে। ভোটের আধিক্য যেদিকে হইবে, তাহাই সত্য এবং কল্যাণ নির্ণয়ের কষ্টিপাথর হইবে। কোন একটি প্রস্তাব, তাহা যতই অশুভ ও অসঙ্গতই হউক না কেন, যদি শতকরা একান্নজনের সমর্থন লাভ করিতে পারে, তাহা হইলে সে প্রস্তাবকে আইনে পরিণত করিতে কোন বাধাই থাকিবে না। ইহার এক নিতান্ত বীভৎস ও ঘৃণার্হ দৃষ্টান্ত জার্মানির নাৎসীপূর্ব যুগে পাওয়া যায়। ডাঃ ম্যাগনাস হারশফিল্ড (Dr. Magnus Herschfield) নামক জনৈক জার্মান দার্শনিক বিশ্বজনীন যৌন সংস্কার সভার (World League of Sexual Reform) সভাপতি ছিলেন। তিনি ছয় বৎসর যাবত লুত জাতির কুকার্যের সমর্থনে শক্তিশালী প্রচারকার্য চালান। অবশেষে গনতন্ত্রখোদা এই গতি অবৈধ কার্যকে ‘হালাল’ বা বৈধ বলিয়া ঘোষণা করিতে সম্মত হইল এবং জার্মান পার্লামেন্ট বিপুল ভোটাধিক্যে এই সিদ্ধান্ত করিল যে, উভয় পক্ষের সম্মতিক্রমে উক্ত কার্য সম্পাদিত হইলে তাহা আর অবৈধ থাকিবে না। ইহা স্থিরীকৃত হইল যে, যাহার প্রতি উক্ত ক্রিয়া সম্পন্ন করা হইত সে যদি অপ্রাপ্ত বয়স্ক হয়, তাহা হইলে তাহার অভিভাবক তাহার পক্ষে রায় দান করিবে।

 

এই গণতন্ত্র খোদার দাসত্ব পালনে আইনকে কিঞ্চিৎ ধীরগতি দেখা যায়, ইহার আদেশাবলী প্রতিপালিত হয় বটে, কিন্তু তাহা অলসতা ও ঔদাসীন্যের সহিত। পরিপূর্ণ দাসত্ব পালনে এই যে ত্রুটি-বিচ্যুতি রহিয়া যায়, রাষ্ট্র ব্যবস্থাপনার সকল অংশ মিলিয়া তাহা পরিপূর্ণ করিয়া দেয়। যাহারা এই সকল গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা পরিচালনা করে, তাহারা আইন রচনার পূর্বেই তাহাদের চতুষ্পার্শ্বস্থ সাহিত্য, নৈতিক দর্শন এবং জনসাধারণের ভাবপ্রবণতার প্রভাব স্বীকার করিয়া লয়। যে সকল নৈতিক উচ্ছৃঙ্খলতা জনসাধারণ্যে প্রচলিত হইয়া পড়ে, শাসন কার্য পরিচালকদের অনুগ্রহে তাহার প্রতিটি সরকারী পর্যায়ে স্বীকৃত ও গৃহীত হয়। যে সকল বিষয় তদবধি নিষিদ্ধ থাকে, পুলিশ ও বিচারালয় সেই সকল বিষয়ে আইনকে কার্যকরী করিতে বিরত থাকে। এইরূপ নিষিদ্ধ কার্যগুলিও বৈধ বলিয়া পরিগণীত হয়। দৃষ্টান্তস্বরূপ গর্ভনিপাতের বিষয়ই ধরা যাক। ইহা পাশ্চাত্য আইনে এখনও পর্যন্ত নিষিদ্ধ আছে। কিন্তু এমন দেশ নাই, যেখানে ইহা প্রকাশ্যে এবং অধিক পরিমাণে করা হইতেছে না। ইংল্যান্ডে প্রতি বৎসর আনুমানিক নব্বই সহস্র গর্ভনিপাত করা হয়। বিবাহিতা নারীদের মধ্যে শতকরা পঁচিশজন এমনও আছে, যাহারা হয় নিজেরাই গর্ভনিপাত করে কিংবা এই ব্যাপারে কোন বিশেষজ্ঞের সাহায্য গ্রহণ করে। কোন কোন স্থানে গর্ভনিপাতের যথারীতি ক্লাব স্থাপিত আছে। অভিজাত মহিলাগণ তথায় সাপ্তাহিক ফিস দিয়া থাকেন এবং প্রয়োজনানুসারে গর্ভনিপাত বিশেষজ্ঞের পরিচর্যা লাভ করিয়া থাকেন। লন্ডনে এইরূপ বহু নার্সিংহোম আছে যেখানে গর্ভনিপাতের রোগিণীদের চিকিৎসা হয়।( অধ্যাপক জুড, তাঁহার Guide to Modern weekedness গ্রন্থে এতদ্বিষয়ে বিস্তৃত বিবরণ লিপিবদ্ধ করিয়াছেন। গ্রন্থখানি বেশ কয়েক বছর পূর্বে প্রকাশিত হইয়াছে)। এতদসত্ত্বেও ইংল্যান্ডের আইন গ্রন্থে এখনও গর্ভনিপাত অপরাধজনক বলিয়া লিপিবদ্ধ আছে।

 

মূলতত্ত্ব ও প্রমাণাদি

এখন আমি বিস্তারিত বর্ণনা করিতে চাই যে, আধুনিক নৈতিক দৃষ্টিভঙ্গী, ধনতান্ত্রিক সাংস্কৃতিক ব্যবস্থা ও গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক শাসন-এই তিনটি উপাদানের একত্র সমাবেশে সামাজিক চরিত্র এবং নারী পুরুষের যৌন সম্পর্ক কতখানি প্রভাবান্বিত করিতেছে এবং কি পরিমাণ পরিস্ফুট হইতেছে। যেহেতু আমি এ যাবত অধিক পরিমাণে ফরাসী দেশেরই উল্লেখ করিয়াছি- যেখান হইতে এ আন্দোলন শুরু হইয়াছিল-সেইজন্য আমি সর্বপ্রথমে ফরাসী দেশকেই প্রমাণ হিসাবে উপস্থাপিত করিব। (ফরাসীর সমাজতত্ত্ববিদ Paul Bureau – এর গ্রন্থ Towards Moral bankruptcy দ্রষ্টব্য। ইহা ১৯২৫ সনে প্রকাশিত হয়।)

 

 

নৈতিক অনুভুতির বিলোপ সাধন

পূর্বতন অধ্যায়ে যে সকল দৃষ্টিভঙ্গীর বর্ণনা করা হইয়াছে, তাহার প্রচারণার প্রাথমিক ফল এই হইল যে, যৌন আচরন সম্পর্কে মানুষের নৈতিক অনুভূতি বিকল হইয়া পড়িল। লজ্জা, শ্লীলতা, ঘৃণা, অবজ্ঞা প্রভৃতি দিন দিন লোপ পাইতে লাগিল। বিবাহ ও ব্যভিচারের পার্থক্য-জ্ঞান হৃদয় হইতে মুছিয়া গেল। অবশেষে ব্যভিচার এমন এক নির্দোষ বস্তুতে পরিণত হইল যে, তাহা ঘৃণাভরে গোপন করার প্রয়োজন বোধই রহিল না।

উনবিংশ  শতাব্দীর শেষভাগ পর্যন্ত ফরাসী জনসাধারণের নৈতিক দৃষ্টিভঙ্গীর শুধু এতটুকু পরিবর্তন হইয়াছিল যে, পুরুষের পক্ষে ব্যভিচার এক অসাধারণ প্রাকৃতিক বিষয় বলিয়া মনে করা হইত। তরুণ বয়স্ক পুত্রগণ যৌনব্যাধিতে আক্রান্ত না হইলে কিংবা তাহাদের বিচারালয়ে প্রেরিত হইবার আশংকা না থাকিলে, পিতা-মাতা সন্তুষ্ট চিত্তে তাহাদের যৌন স্বেচ্ছাচারিতার প্রশ্রয় দান করিত। উপরন্তু বৈষয়িক দিক দিয়া লাভবান হইলে তাহারা পরম পরিতুষ্ট হইত। তাহাদের এইরূপ ধারণা ছিল যে, বিবাহ ব্যতিরেকে নারী-পুরুষের যৌন-সম্পর্ক দুষনীয় নহে। এমন দৃষ্টান্তও পাওয়া যায় যে, পিতা-মাতা তরুণ বয়স্ক পুত্রদিগকে প্রভাবশালী অথবা ধনাঢ্য নারীর সহিত সম্পর্ক স্থাপন করত ভবিষ্যত উজ্জ্বল করিতে উদ্বুদ্ধ করিত। কিন্তু তখন পুরুষদের সম্পর্কে তাহাদের দৃষ্টিভঙ্গী পরবর্তীকালীন দৃষ্টিভঙ্গী হইতে বিভিন্ন ছিল। নারীর সতীত্বকে মূল্যবান মনে করা হইত। যে পিতা-মাতা স্বীয় পুত্রদের যৌন-স্বেচ্ছাচারিতাকে যৌবনোচ্ছাস মনে করিয়া তাহাকে উপেক্ষা করিত, তাহারাই আবার আপন কন্যার চরিত্রে কোন কলুষ-কালিমা সহ্য করিতে পারিত না। অসৎ পুরুষকে নির্দোষ মনে করা হইলেও অসৎ নারীকে নির্দোষ মনে করা হইত না। ব্যবসায়ী বারাঙ্গণার নামোচ্চারণে ঘৃণাভরে ভ্রূকুঞ্চিত হইলেও তাহার শয্যাসঙ্গী পুরুষের প্রতি ঘৃণা প্রদর্শন করা হইত না। অনুরূপভাবে দাম্পত্য জীবনেও নারী পুরুষের নৈতিক দায়িত্ব একই রূপ ছিল না। স্বামীর চরিত্রহীনতা সহ্য করা হইলেও স্ত্রীর চরিত্রহীনতা মারাত্মক দূষণীয় ছিল।

বিংশ শতাব্দীর প্রারম্ভকালে এই অবস্থার পরিবর্তন হইল। নারী স্বাধীনতার আন্দোলন নারী-পুরুষের নৈতিক সাম্যের যে বাঁশী বাজাইল, তাহার ফল এই হইল যে, পুরুষের কুকার্যের ন্যায় নারীর কুকার্যকেও নির্দোষ মনে করা হইল। বিবাহ ব্যতিরেকে কোন পুরুষের সহিত যৌন-সম্পর্ক স্থাপন করিলে নারীর আভজাত্য বা মান-সম্ভ্রমে আঘাত লাগিতে পারে, এই ধারনাও পরিবর্তিত হইল। Paul Bureau বলেনঃ

শুধু বড় বড় শহরেই নহে, ফ্রান্সের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র শহর ও পল্লীতেও নব্য যুবকদের দল এই নীতিকে মানিয়া লইয়াছে যে, তাহারা যখন নিজেরাই জিতেন্দ্রিয় নহে, তখন ঘটকের নিকটে সতী বা কুমারী নারীর দাবী করিবার তাহাদের অধিকার নাই। বারগুন্ডী, বুন ও অন্যান্য অঞ্চলে ইহা এক সাধারন ব্যপার যে, বিবাহের পূর্বে বালিকা বহু বান্ধবের সাহচর্য লাভ করে এবং বিবাহের সময় তাহার বিগত জীবনের ঘটনাবলী ঘটকের নিকট অপ্রকাশ রাখার প্রয়োজন বোধ করে না। খেলাধুলা অথবা জীবিকার্জন সম্পর্কে আলোচনার ন্যায় পরস্পর পরস্পরের অকাতরে পর পুরুষের সহিত অবৈধ সাহচর্যের বিষয় আলোচনা করে। বিবাহকালে পাত্র যে শুধু পাত্রীর বিগত জীবন সম্পর্কে অবহিত হয় তাহা নহে, বরং যে সমস্ত বন্ধুবর্গ তখন পর্যন্ত তাহার দেহ সম্ভারকে উপভোগ করিয়াছে, তাহাও তাহার গোচরীভূত হয়। এমতাবস্থায় পাত্র প্রবর বিশেষ সচেষ্ট থাকেন, যাহাতে কেহ সন্দেহ করিতে না পারে যে, পাত্রীর এতাদৃশ কার্যকলাপের প্রতি তাহার কোনরূপ আপত্তি আছে।     -উক্ত গ্রন্থের, পৃ.৯৪

তিনি আরও বলেনঃ

ফ্রান্সের মধ্যবিত্ত শিক্ষিত সমাজের শিক্ষিতা মেয়েদিগকে অফিস অথবা ব্যবসায় প্রতিস্থানে চাকুরী করিতে বহুল পরিমাণে দেখা যায়। তাহারা ভদ্র সমাজে অবাধ মেলামেশাও করে এবং সকল কার্য মোটেই নীতিবিরুদ্ধ বিবেচিত হয় না। অতঃপর এই সকল মেয়েদের কেহ কোন যুবকের প্রতি আকৃষ্ট হইয়া তাহার সহিত বসবাস করিতে থাকিলে তাহাদের মধ্যে বিবাহ একেবারেই অনাবশ্যক মনে করা হ্য়। তাহারা বিবাহ ব্যতিরেকেই একত্রে বসবাস করাকে শ্রেয় মনে করে। অবশ্য উভয়ের মনের সাধ পরিপূর্ণ হইবার পর একের অপর হইতে বিচ্ছিন্ন হইয়া অন্যত্র কোথাও প্রেম নিবেদন করিবার পূর্ণ অধিকার তাহাদের থাকে। তাহাদের এহেন সম্পর্ক সম্বন্ধ সমাজের নিকট অজ্ঞাত থাকে না। তাহারা উভয়ে মিলিয়া ভদ্র মহলে যাতায়াত করে। তাহাদের এইরূপ পারস্পরিক সম্পর্ককেও তাহারা গোপন করে না এবং অন্য কেহই তাহাদের এই জীবন যাপন প্রণালীতে মন্দ কোন কিছু দেখিতে পায় না। যাহারা কারখানায় কাজ করে, তাহাদের মধ্যেই প্রথমত এই আচরণ দেখা যায়। পরে ইহা অত্যন্ত দুষনীয় মনে করা হইত। কিন্তু ইহা সম্ভ্রান্ত পরিবারের মধ্যে এক সাধারণ নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হইয়া পড়িয়াছে। সামাজিক জীবনে বিবাহের যে মর্যাদা ছিল, এই ধরনের জীবন যাপন এখন সেই মর্যাদা লাভ করিয়াছে।                      -উক্ত গ্রন্থের, পৃ.৯৪-৯৬

এইভাবে রক্ষিতাকেও এখন যথারীতি স্বীকার করিয়া লওয়া হইয়াছে। মশিয়ে বারথেলেম (M.Berthelemy) প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনশাস্ত্রের অধ্যাপক ছিলেন। তিনি বলেন যে, ‘ক্রমশ রক্ষিতা নারী বিবাহিতা স্ত্রীর ন্যায় আইনগত মর্যাদা লাভ করিতেছে। পার্লামেন্টে তাহাদের বিষয়ে আলোচনা শুরু হইয়াছে। এখন সরকার তাহাদের স্বার্থ সংরক্ষণ করিতে আরম্ভ করিয়াছে। একজন সৈনিকের বিবাহিতা স্ত্রীর জন্য যে ভাতা বরাদ্ধ করা হয় উক্ত সৈনিকের মৃত্যুর পরও তাহার স্ত্রীর ন্যায় অনুরূপ বৃত্তি তাহার রক্ষিতাও ভোগ করে।’

ফরাসী নীতিবিজ্ঞান অনুযায়ী ব্যভিচারকে নির্দোষ মনে করিবার কারণ নিম্নের ঘটনা হইতে নির্ণয় করা যায়ঃ

খৃ.১৯১৮ সালে একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষয়িত্রী অবিবাহিতা হইয়াও গর্ভধারণ করে। শিক্ষা বিভাগে কিছু সংখ্যক পুরাতনপন্থী লোক ছিল, তাহারা এতদ্বিষয়ে কিছু হৈ চৈ শুরু করিল। ইহাতে সম্ভ্রান্ত লোকদের  একটি প্রতিনিধিদল শিক্ষামন্ত্রী সমীপে গমন করত নিম্নের যুক্তি প্রমাণাদি এমনভাবে উপস্থাপিত করিল যে, উক্ত শিক্ষয়িত্রীর বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়া হইল।

১.কাহারও ব্যক্তিগত জীবনে হস্তক্ষেপ করিবার অন্যের কি অধিকার আছে?

২.তাহার অপরাধই বা এমন কি হইয়াছে?

৩.বিবাহ ব্যতিরেকে সন্তানের মাতা হওয়া কি অধিকতর গণতান্ত্রিক নহে?

 

ফরাসী সৈন্য বিভাগে সৈনিকদিগকে যে শিক্ষা দেওয়া হয়, তাহার মধ্যে যৌনব্যাধি হইতে নিরাপদ থাকিবার এবং গর্ভনিরোধ বিষয়েও শিক্ষা দেওয়া হয়, কারণ ইহা এক অবধারিত সত্য যে, সৈনিকগণ নিশ্চিতরূপেই ব্যভিচার করিবে ১৯১৯ খৃষ্টাব্দের ৩রা মে তারিখে ফরাসীর ১২৭ ডিভিশনের উইং কমান্ডার সৈনিকদের নামে নিম্নোক্ত বিবৃতি প্রচার করেঃ

জানিতে পারা গেল যে, সামরিক বেশ্যালয়ে সশস্ত্র সৈনিকদের ভীড় হওয়ার অভিযোগ করা হইয়াছে। তাহাদের অভিযোগ এই যে, সশস্ত্র সৈনিকেরা ঐ স্থানে একেবারে তাহাদের ইজারা কায়েম করিয়া লইয়াছে এবং অন্য কাহাকেও কোন সুযোগ দেওয়া হয় না। সৈনিকদের সংখ্যা বৃদ্ধির ফলে গণিকা বৃদ্ধির জন্য হাই কম্যান্ড চেষ্টা করিতেছে। কিন্তু যতদিন ইহার ব্যবস্থা না হইতেছে, ততদিন এতদ্বারা সশস্ত্র সৈনিকদিগকে জানান যাইতেছে যে, তাহারা যেন বেশীক্ষণ ভিতরে না থাকে। তাহারা আপন কামরিপু চরিতার্থ করিতে যেন একটু তাড়াতাড়ি করে।

চিন্তা করিয়া দেখুন, এই বিজ্ঞপ্তি পৃথিবীর একটি সুসভ্য সরকারের সামরিক বিভাগ হইতে যথারীতি সরকারীভাবে প্রচার করা হইতেছে। ইহার অর্থ এই যে, ব্যভিচার যে নৈতিক দৃষ্টিভঙ্গীতে দুষণীয় হইতে পারে এমন কল্পনাও তাহাদের মন ও মস্তিস্ক হইতে মুছিয়া গিয়াছিল। সমাজ, দেশের আইন এবং সকলের মন হইতেই এই ধারণা বিদূরিত হইয়াছিল। (যে সকল সৈনিকদের নৈতিক অবস্থা এইরূপ, তাহারা যখন বিজয়ীর বেশে কোন দেশে প্রবেশ করে, তখন সেই দেশের নারী সমাজের সম্ভ্রম-সতীত্বের কি ভয়াবহ পরিণাম হইতে পারে, তাহা সহজেই অনুমান করা যায়। সামরিক বাহিনীর ইহা এক প্রকারের নৈতিক মান। অপর এক প্রকার নৈতিক মান কুরআন উপস্থাপিত করিতেছেঃ ‘মুসলমানগণ জগতে ক্ষমতার অধিকারী হইলে তথায় তাহারা নামাজ কায়েম করে , যাকাত আদায় করে, পুণ্য কাজের জন্য আদেশ করে এবং গর্হিত কার্যে বাধা দান করে।’ এক ধরনের সৈনিক ষন্ডের ন্যায় ঘুরিয়া বেড়ায়। অন্য ধরনের সৈনিক এই জন্য ক্ষমতা হস্তগত করে যে, মানবীয় নৈতিক মর্যাদার রক্ষণাবেক্ষণ করিবে এবং মানুষকে পবিত্রতা শিক্ষা দিবে। মানুষ কি এতই অন্ধ হইয়া পড়িয়াছে যে, এতদুভয়ের পার্থক্য নির্ণয় করিবে না?)

প্রথম মহাসমরের কিয়তকাল পূর্বে ফ্রান্সে একটি এজেন্সী প্রতিষ্ঠিত হইয়াছিল। কোন নারীর অবস্থা ও নৈতিক চালচলন যেইরূপ হউক না কেন, সকল অবস্থাতেই তাহাকে এক নুতন পরীক্ষার জন্য উদ্বুদ্ধ করাই উক্ত এজেন্সীর কাজ ছিল। কোন পুরুষ কোন নারীর সহিত যৌন সম্পর্ক স্থাপন করিতে ইচ্ছা করিলে তাহাকে শুধু সেই নারীর ঠিকানা বলিয়া দিতে হইত। তদুপরি প্রাথমিক ফিস হিসাবে পঁচিশ ফ্রাংক উক্ত এজেন্সীতে দাখিল করিতে হইত। অতপর সেই নারীকে উক্ত কাজের জন্য সম্মত করা এজেন্সীর কর্তব্য হইয়া পড়িত।

এই এজেন্সীর রেজিস্টার দৃষ্টে জানা গিয়াছে যে, ফরাসী সমাজের এমন কোন শ্রেণী ছিল না যাহারা বহু সংখ্যক লোক এই এজেন্সীর মাধ্যমে ব্যবসা করে নাই। এই সকল কার্য ফরাসী সরকারের নিকট গোপন ছিল না।   -পল ব্যুরো, পৃ.১৬

তাহাদের নৈতিক অধপতন কতখানি চরমে পৌছিয়াছিল, সে সম্পর্কে পল ব্যুরো বলেনঃ

ফ্রান্সের কতিপয় জেলায় এবং বড় বড় শহরের জনবহুল অঞ্চলগুলিতে নিকটতম আত্মীয়ের মধ্যে, এমন কি পিতা-কন্যা ও ভ্রাতা-ভগ্নির মধ্যে যৌন সম্পর্ক স্থাপনের ঘটনা বিরল ছিল না।

 

 

অশ্লীলতার আধিক্য

প্রথম মহাসমরের পূর্বে ফ্রান্সের এটর্নি জেনারেল মশিয়ে বুলো (M.Bulot) তাঁহার এক রিপোর্টে জানান যে, যে সকল নারী তাহাদের দেহ ভাড়া খাটাইয়া জীবিকার্জন করিত, তাহাদের সংখ্যা পাঁচ লক্ষ ছিল। কিন্তু তথাকার দেহ ব্যবসায়ী নারীদের সহিত ভারতীয় উপমহাদেশের বারাঙ্গনাদের তুলনা করিলে চলিবে না। ফ্রান্স একটি সুসভ্য ও উন্নত দেশ। তথাকার যাবতীয় কার্য ভদ্রতা ও সুব্যবস্থার সহিত ব্যপক আকারে করা হইয়া থাকে। সংবাদপত্র, চিত্র, পোস্টকার্ড, টেলিফোন, ব্যক্তিগত আমন্ত্রণপত্র প্রভৃতি যাবতীয় শিষ্টাচারসুলভ পন্থায় গ্রাহকের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়। মানুষের বিবেক কখনও এ সকল কার্যের জন্য তিরস্কার করে না, বরং যে সকল নারী এই ব্যবসায়ে অধিকতর ভাগ্য অর্জন করিবার সুযোগ পায়, তাহারা অধিকাংশ সময়ে দেশের রাজনীতি, অর্থনীতি ও সম্ভ্রান্ত শ্রেণীর মধ্যে যথেষ্ট কর্তৃত্ব করিতে পারে। গ্রীস সভ্যতার কালে এই শ্রেণীর নারীদের যেরূপ হইয়াছিল, ইহাদেরও তদ্রূপ হইয়াছে।

ফরাসী সিনেটের জনৈক সদস্য মশিয়ে ফারদিনান্দ দ্রিফু (M.Ferdinand Dreyfus) বলেন যে, বেশ্যাবৃত্তি এখন আর ব্যক্তিগত ব্যপার নহে। ইহার এজেন্সীর দ্বারা যে আর্থিক লাভ হয়, তাহাতে ইহা একটি ব্যবসায় এবং সুসংগঠিত শিল্পে পরিণত হইয়াছে। ইহার কাঁচামাল সরবরাহ করিবার এজেন্ট স্বতন্ত্র ও অল্প বয়স্কা বালিকাদিগকে এই ব্যবসায়ের পণ্যদ্রব্য হিসাবে আমদানী রপ্তানী করা হয়। এখানে দশ বৎসরের কম বয়সের বালিকার চাহিদা অত্যন্ত অধিক।

পল ব্যুরো বলেনঃ

ইহা একটি শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান। ইহা সুসংগঠিত উপায়ে বেতনভোগী উচ্চ কর্মচারী ও কর্মী দ্বারা পরিচালিত হইতেছে। প্রচার, লেখক, বক্তা, চিকিৎসক, ধাত্রী ও ব্যবসায়ী, পর্যটক এখানে চাকুরী করে। ইহাতে বিজ্ঞাপনের সাহায্য লওয়া হয় এবং প্রদর্শনীর নুতন নুতন পন্থা অবলম্বন করা হয়।

অশ্লীলতার এই আড্ডাগুলি ব্যতীতও হোটেল, চা-খানা, নৃত্যশালা প্রভৃতিতে প্রকাশ্যভাবে বেশ্যাবৃত্তি চলে। কোন কোন সময়ে আবার পাশবিক অত্যাচার এবং চরম নিষ্ঠুরতা চলে। ১৯১৪ খৃস্টাব্দে একবার ফ্রান্সে একটি নগরের নরপতিকে (Mayor) হস্তক্ষেপ করত একটি বালিকার প্রাণ রক্ষা করিতে হইয়াছিল। উক্ত বালিকাটিকে সারা দিনে সাতাইশ জন গ্রাহকের মনতুষ্টি করিতে হইয়াছিল এবং তাহার পরও বহু গ্রাহক অপেক্ষমাণ ছিল।

প্রথম মহাসমরে ব্যবসায়ী বেশ্যালয় ব্যতীতও এক প্রকার দাতব্য বেশ্যালয় স্থাপনের গৌরব অর্জন করিয়াছিল।  যুদ্ধকালে যে সমস্ত দেশপ্রেমিক নারী ফরাসী দেশের নিরাপত্তা রক্ষাকারী বীরগণের মহান সেবা করিয়া অবৈধ পিতৃহীন সন্তান লাভ করিয়াছিল তাহারা এর সম্মানসূচক উপাধিতে ভূষিতা হইয়াছিল। এই প্রকার ইতর ধারণাকে ভাষায় রূপান্তরিত করা সম্ভব নহে। এই সকল নারী সুসংগঠিত উপায়ে বেশ্যাবৃত্তি করিতে থাকে এবং ইহাদের সাহায্য করা দুর্বৃত্ত শ্রেণীর লোকদের নৈতিক কর্তব্য হইয়া পড়ে। বহুল প্রচারিত ফ্রানটাসিও (Frantasio) ও লাভি প্যারিসিয়া (Lavie Parisiemme) কর্মকুশল ব্যাক্তিদের দৃষ্টি এই সকল নারীদের প্রতি আকৃষ্ট করিবার ব্যাপারে চরম পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করিয়াছিল। ১৯১৭ খৃস্টাব্দের প্রারম্ভে শেষোক্ত পত্রিকাটির একটি সংখ্যায় উক্ত নারীদের ১৯৯টি বিজ্ঞাপন প্রকাশিত হইয়াছিল।

Top







লেটেস্ট প্রবন্ধ