খেলাফত ও রাজতন্ত্র

চলমান পেজের সূচীপত্র




খেলাফত ও রাজতন্ত্র

  স্ক্যান কপি ডাউনলোড

 

খেলাফত সম্পর্কে খোলাফায়ে রাশেদীন এবং রাসূলুল্লাহ (সাঃ)- এর সাহাবীদের সবর্সম্মত মত এই ছিল যে, খেলাফত একটা নির্বাচন ভিত্তিক পদ্ধতি। মুসলমানদের পারস্পারিক পরামর্শ এবং তাদের স্বাধীন মতামত প্রকাশের মাধ্যমেই তা কায়েম করতে হবে। বংশানুক্রমিক বা বল প্রয়োগের দ্বারা ক্ষমতায় অধিষ্টিত কর্তৃত্ব ও নেতৃত্ব তাঁদের মতে খেলাফত নয় বরং তা বাদশাহী-রাজতন্ত্র। খেলাফত এবং রাজতন্ত্রের যে স্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন ধারণা সাহাবায়ে কেরামগণ পোষণ করতেন, হযরত আবু মূসা আশআরী (রাঃ) তা ব্যক্ত করেন নিন্মোক্ত ভাষায়ঃ

‍‌”এমারত (অর্থাৎ খেলাফত) হচ্ছে তাই, যা প্রতিষ্ঠা করতে পরামর্শ নেয়া হয়েছে, আর তরবারীর জোরে যা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তা হচ্ছে বাদশাহী বা রাজতন্ত্র।”

Top

প্রথম অধ্যায়

কুরআনের রাজনৈতিক শিক্ষা

একঃ বিশ্ব-প্রকৃতি সম্পর্কে ধারণা

বিশ্ব-প্রকৃতি সম্পর্কে কুরআনের মৌলিক চিন্তাধারার উপরই রাজনৈতিক মতবাদ প্রতিষ্ঠিত। কুরআনের রাজনৈতিক মতবাদ সঠিকভাবে উপলব্ধি করতে হলে তা অবশ্যই সামনে রাখতে হবে। রাজনৈতিক দর্শনের প্রেক্ষাপটে বিশ্ব-প্রকৃতি সম্পর্কে কুরআনের চিন্তাধারা পর্যালোচনা করলে নিন্মোক্ত ধারাগুলো আমাদের চোখের সামনের ভেসে ওঠেঃ

(ক) সমগ্র বিশ্ব-জাহান, মানুষ এবং বিশ্ব-জাহানে যে বস্তুরাজি দ্বারা উপকৃত হয়, আল্লাহ তায়ালা সে সব কিছুরই সৃষ্টিকর্তা।

*************************

- এবং তিনিই আসমান যমীনকে যথাযথভাবে সৃষ্টি করেছেন।

*************************

- বল, আল্লাহ সকল বস্তুর সষ্টা, আর তিনিই একক, মহা-প্রতাপশালী।

*************************

- লোক সকল! তোমাদের সে রবকে ভয় করো, যিনি তোমাদেরকে এক আত্মা থেকে সৃষ্টি করেছেন, আর তা থেকে সৃষ্টি করেছেন তার জোড়া, আর এতদোভয় থেকে তিনি অসংখ্য নারী-পুরুষ ছড়িয়ে দিয়েছেন। – আন-নিসাঃ ১

*************************

- তিনিই সেই সত্বা, যিনি তোমাদের জন্য যমীনের সমূদয় বস্তু সৃষ্টি করেছেন।

*************************

- আল্লাহ ছাড়া এমন কোন স্রষ্টা আছে কি, যে আসমান-যমীন থেকে তোমাদেরকে রিয্ক (জীবিকা) দান করে?- আল-ফাতিরঃ ৩

*************************

- তোমরা কি ভেবে দেখেছো? তোমরা যে শুত্রপাত করো তা থেকে শিশু তোমরা জন্ম দাও, না আমি তার জন্মদাতা? ………. তোমরা কি চিন্তা করেছো? এই যে তোমরা বীজ বপন করো, তা তোমরা উৎপাদন করো, না আমি তার উৎপাদক? ……… তোমরা কি চিন্তা করেছো? তোমরা যে পানি পান করো, মেঘমালা থেকে তোমরা তা বর্ষণ করো, না আমি তার বর্ষণকারী? ………. তোমরা কি চিন্তা করে দেখেছো? তোমরা যে আগুন জ্বালো, তার বৃক্ষ তোমরা সৃষ্টি করেছো? না আমিই তার স্রষ্টা? – আল-ওয়াকিয়াঃ ৫৮-৭২

*************************

-আসমান-যমীন, এতদোভয়ের মধ্যস্থল এবং মাটির গভীর তলদেশে যা কিছু আছে, সমস্তই তাঁর।-ত্বা-হাঃ৬

(খ) তাঁর সৃষ্টি এ বিশ্বের মালিক, পালক, নিয়ন্ত্রক, এবং পরিচালকও আল্লাহ তায়ালা-ইঃ

*************************

-আসমান-যমীনে যা কিছু আছে, সব কিছুই তাঁর। সব কিছুই তাঁর ফরমানের অনুগত।

*************************

-চন্দ্র-সূর্য, গ্রহ-তারকা তিনি সৃষ্টি করেছেন, সবই তাঁর নির্দেশে নিয়ন্ত্রিত। সাবধান! সৃজন এবং কর্তৃত্ব তাঁরই। আল্লাহ সারা জাহানের মালিক-পরওয়ারদেগার, একান্ত বরকতের অধিকারী।

*************************

-আসমান থেকে যমীন পর্যন্ত দুনিয়ার ব্যবস্থাপনা পরিচালনা তিনিই করেন।

(গ) এ বিশ্ব-জগতে সার্বভৌমত্ব (Sovereignty) একমাত্র আল্লাহ তায়ালার, আর কারো তা নেই, হতেও পারে না। সার্বভৌমত্বে তাঁর অংশীদার হওয়ার অধিকারও নেই কারোঃ

*************************

-তুমি কি জাননা যে, আসমান-যমীনের রাজত্ব আল্লার?

*************************

-এবং রাজত্বে তাঁর কোন শরীক নেই। -আল-ফোরকানঃ২

*************************

-দুনিয়া-আখেরাতের সকল প্রশংসা তাঁরই জন্য; হুকুম দেয়ার ইখতিয়ার কেবল তাঁরই আছে। তোমরা তাঁর নিকটেই ফিরে যাবে।

*************************

-আল্লাহ ছাড়া আর কারো ফায়সালার ইখতিয়ার নেই।-আনআমঃ৫৯

*************************

-তিনি ছাড়া বান্দাদের আর কোন ওলী-পৃষ্ঠপোষক নেই। আপন নির্দেশে তিনি কাউকে শরীক করেন না। – আল-কাহাফঃ ২৬

*************************

-তারা বলে, আমাদের ইখতিয়ারের মধ্যে কিছু আছে কি? বল, ইখতিয়ার সর্বতোভাবে আল্লারই। -আলে-ইমরানঃ ১৫৪

*************************

-ইখতিয়ার আল্লারই হাতে-শুরুতেও এবং শেষেও। -আর-রুমঃ৪

*************************

-আসমান যমীনের বাদশাহী তাঁরই। সমূদয় ব্যাপার তাঁরই দিকে প্রত্যাবর্তিত হয়।-আল-হাদীদঃ৫

*************************

-যে পয়দা করে, সে কি তার মতো হতে পারে, যে পয়দা করে না? তোমরা কি চিন্তা করো না?-আন-নাহালঃ১৭

*************************

-তারা কি আল্লাহর জন্য এমন কিছু শরীক বানিয়েছে, যারা আল্লাহর মতো কিছু সৃষ্টি করেছে? যাতে সৃষ্টির ব্যাপারটি তাদের কাছে সন্দিগ্ধ হয়ে পড়েছে।-আর-রাআ’দঃ১৬

*************************

-বল, আল্লাহ ছাড়া যাদেরকে তোমরা (রব হিসেবে) ডাকো, তোমাদের সে সব কল্পিত শরীকদেরকে তোমরা কি কখনো দেখেছো? আমাকে দেখাো, যমীনে তারা কী সৃষ্টি করেছে? অথবা আসমানে তাদের কোন অংশ আছে? …….. মূলত আল্লাহ-ই আসমান যমীনকে বিচ্যুতি থেকে আটকে রেখেছেন। আর যদি তা বিচ্যুত হতে থকে তাহলে তিনি ব্যতীত এমন কেউ নেই, যে তাকে সামলে রাখতে পারে।-ফাতেরঃ ৪০-৪১

(ঘ) সার্বভৌমত্বের সকল গুণ-বৈশিষ্ট্য, সকল ক্ষমতা-ইখতিয়ার কেবলমাত্র আল্লার সত্তাতেই কেন্দ্রীভূত। এ বিশ্ব-চরাচরে অন্য কেউ এমন গুণ-বৈশিষ্ট্য এবং ক্ষমতা-ইখতিয়ারের অধিকারী আদৌ নেই। তিনি সকলের ওপর পরাক্রমশালী, তিনি সব কিছুই জানেন, ত্রুটি-বিচ্যুতি মুক্ত তিনি। সকলের নেগাহবান, রক্ষক। সকলের নিরাপত্তা বিধায়ক। চিরঞ্জীব, সদাজাগ্রত, সকল বস্তু-নিচয়ের ওপর ক্ষমতাবান। সকল ক্ষমতা ইখতিয়ার তাঁর হাতে নিবদ্ধ। সমুদয় বস্তু ইচ্ছায়-অনিচ্ছায় তাঁরই ফরমানের অনুগত। কল্যাণ-অকল্যাণ সবকিছুই তাঁর ইখতিয়ারভুক্ত। তিনি ব্যতীত এবং তাঁর অনুমতি ব্যতীত কেউ কারো ক্ষতি করতে পারে না; পারে না কোন উপকার করতে। তাঁর অনুমতি ছাড়া কেউ তাঁর সামনে সুপারিশ পর্যন্ত করতে পারে না। তিনি যাকে চান, পাকড়াও করেন, যাকে খুশী ক্ষমা করেন। তাঁর নির্দেশের ওপর পুনরুক্তি করতে পারেন এমন কেউ নেই। তাঁকে কারো সামনে জবাবদিহি করতে হয় না, কৈফিয়ত দিতে হয় না। সকলেই তাঁর সামনে জবাবদিহি করতে বাধ্য। তাঁর নির্দেশ কার্যকর হয়েই থাকে। তাঁর নির্দেশ রদ করতে পারে এমন ক্ষমতা কারুর নেই। সার্বভৌমত্বের এ সকল গুণ-বৈশিষ্ট্য কেবল আল্লার জন্য নির্দিষ্ট। এতে কেউই তাঁর শরীক-অংশীদার নেইঃ

*************************

-তিনিই তো তাঁর বান্দাদের ওপর নিয়ন্ত্রণ-ক্ষমতার অধিকারী-কর্তৃত্বের মালিক। তিনি মহাজ্ঞানী, সকল বিষয় সম্পর্কে জ্ঞাত। -আল-আনআমঃ ১৮

*************************

-প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য সকল বিষযের জ্ঞাতা মহান, বিপুল মর্যাদার অধিকারী। -রাআ’দঃ৯

*************************

-রাজ্যাধিপতি, ত্রুটি-বিচ্যুতি মুক্ত। ভুল ভ্রান্তি মুক্ত, শান্তি-নিরাপত্তা দাতা, হেফাজতকারী, প্রতাপশালী, শক্তিবলে নির্দেশ জারিকারী, বিপুল মহিমার অধিকারী, মহত্বের মালিক।

*************************

-তিনি চিরঞ্জীব, আপন ক্ষমতাবলে উদ্ভুত। নিদ্রা-তন্দ্রা কিছুই তাঁকে স্পর্শ করে না। আসমান-যমীনে যা কিছু আছে, সবই তাঁর। তাঁর অনুমতি ব্যতীত তাঁর সামনে সুপারিশ করতে পারে, এমন কে আছে? যা কিছু মানুষের সামনে আছে, তাও তিনি জানেন; আর যেসব বিষয় তাদের নিকট প্রচ্ছন্ন তাও তিনি পরিজ্ঞাত। -আল-বাকারাঃ ২৫৫

*************************

-সকল বরকত-মহিমা সে মহান সত্তার, বাদশাহী যাঁর হাতে। তিনি সকল বস্তুর উপর ক্ষমতাবান। -আল-মূলকঃ ১

*************************

-সমুদয় বস্তুর ইখতিয়ার তাঁর হাতে। তোমাদেরকে তাঁর নিকটেই ফিরে যেতে হবে।

*************************

-আসমান-যমীনে বসবাসকারী সকলেই ইচ্ছায়-অনিচ্ছায় তাঁরই নির্দেশের অনুগত।-আলে ইমরানঃ ৮৩

*************************

-সকল ক্ষমতা তাঁরই হাতে ন্যাস্ত। তিনি সব কিছু শোনেন, জানেন। – ইউনুসঃ ৬৫

*************************

-বল, আল্লাহ যদি তোমাদের ক্ষতি করতে চান, তাহলে তা থেকে তোমাদেরকে সামান্য পরিমাণ বাঁচাবার ক্ষমতা কার আছে? অথবা তিনি যদি তোমাদের উপকার করতে চান (তা হলে কে তাকেঁ বাধা দিতে পারে?)।-আল-ফাতহঃ১১

*************************

-আল্লাহ যদি তোমাদের ক্ষতি করেন, তবে তিনি ছাড়া আর কেউ তা দূর করার নেই। আর তিনি যদি তোমাদের মঙ্গল করতে চান, তাহলে তাঁর অনুগ্রহ ফিরিয়ে দেয়ার কেউ নেই। নিজের বান্দাদের মধ্যে থেকে তিনি যাকে চান, অনুগ্রহ করেন। তিনি ক্ষমাশীল ও দয়ালু।

*************************

-তোমরা মনের কথা প্রকাশ কর বা গোপন রাখ, আল্লাহ তার হিসাব নেবেন; অতঃপর যাকে ইচ্ছা মাফ করেন, যাকে খুশী শাস্তি দেন। আল্লাহ সকল বিষয়ে ক্ষমতা বান। -বাকারাঃ ২৮৪

*************************

তিনি পূর্ণমানের শ্রোতা ও দ্রষ্টা। তিনি ছাড়া বান্দাদের কোন ওলী-পৃষ্ঠপোষক নেই। তিনি স্বীয় নির্দেশে কাউকে শরীক করেন না।-আল-কাহাফঃ ২৬

******************************

-বল, কেউ আমাকে আল্লাহর হাত থেকে রক্ষা করতে পারে না। তিনি ব্যতীত আমি কোন আশ্রয়স্থলও পেতে পারি না। -আল-জ্বিনঃ ২২

*********************

-তিনি আশ্রয় দান করেন, তাঁর মুকাবিলায় কোনো আশ্রয় দেয়া যায় না। -মুমিনঃ ৮৮

*********************

-তিনিই সুচনা করেন, তিনিই পুনরুত্থান করেন। তিনি ক্ষমা, মার্জনাকারী। তিনি ভালবাসেন। রাজ্য-সিংহাসনের মালিক, মহান তিনি। তিনি যা ইচ্ছা তা করেন। -আল-বুরুজঃ ১৩-১৬

*********************

-নিঃসন্দেহে আল্লাহ ফায়সলা করেন। তাঁর ফায়সলা পূনর্বিবেচনা করার কেউ নেই। -আর-রাআদঃ৪১

*********************

-তিনি যা কিছু করেন, তার জন্য তাঁকে কারো সামনে জবাবদিহি করতে হয় না। অন্য সকলকেই তাঁর সামনে জবাবদিহি করতে হয়। -আল-আম্বিয়াঃ ২৩

*********************

-তাঁর ফরমান পরিবর্তন করার কেউ নেই। তাঁর মুকাবিলায় তুমি কোন আশ্রয়স্থল পাবে না। -আল-কাহাফঃ২৭

*********************

-আল্লাহ কি সব শাসনকর্তার বড় শাসনকর্তা নন? -আত-তীনঃ ৮

*********************

-বল, হে খোদা! রাজ্যাধিপতি! যাকে ইচ্ছা রাজ্য দান করো; আর যার কাছ থেকে খুশী, রাজ্য ছিনিয়ে নাও। যাকে খুশী সম্মান দাও, যাকে খুশী অপমান কর। সকল কল্যাণ তোমার ইখতিয়ারাধীন। তুমি সব কিছুর ওপর ক্ষমতাবান। -আলে-ইমরানঃ ২৬

*********************

-বস্তুত যমীন আল্লার। আপন বান্দাদের মধ্য হতে যাকে চান, তাঁর উত্তরাধিকারী করেন। -আল-আরাফঃ১২৮

 

দুইঃ আল্লাহর সার্বভৌমত্ব

বিশ্ব-জাহান সম্পর্কে এহেন ধারণার ভিত্তিতে কুরআন বলে, বিশ্ব জাহানের যিনি শাসক পরিচালক, মানুষের শাসক পরিচালকও তিনিই। মানুষের কাজ কারবারেও তিনিই সর্বময় কর্তৃত্বের অধিকারী এবং তিনি ছাড়া অন্য কোন মানবীয় ও অ-মানবীয় শক্তির পক্ষ থেকে নির্দেশ-ফয়সালা দান করার কোন অধিকার নেই। তবে এ ক্ষেত্রে পার্থক্য কেবল এতটুকু যে, বিশ্ব ব্যবস্থায় আল্লাহর নিজস্ব শক্তিতেই তাঁর কর্তৃত্ব ও সার্বভৌমত্ব সুপ্রতিষ্ঠিত, এজন্য কারোর স্বীকৃতির প্রয়োজন হয় না। এমনকি ক্ষুদ্র অণু-পরমাণু থেকে শুরু করে নক্ষত্র ও নীহারিকাপুঞ্জ পর্যন্ত সমুদয় বস্তু যেমন তাঁর অনুগত, ঠিক তেমনি মানুষও তার জীবনের ইখতিয়ার বহির্ভূত বিভাগে স্বভাবত তাঁর সার্বভৌমত্ব এবং কর্তৃত্বের অধীন। তাঁর এ সার্বভৌমত্ব জোর করে চাপিয়ে দেন না। বরং প্রত্যাদিষ্ট গ্রন্থাদির মাধ্যমে, যার মধ্যে সর্বশেষ গ্রন্থ হচ্ছে আল-কুরআন- তিনি মানুষকে আহবান জানান ইচ্ছা ও চেতনা সহকারে তাঁর এ সার্বভৌমত্ব মেনে নেয়ার এবং তাঁর আনুগত্য গ্রহণ করার জন্য। এ পর্যায়ের বিভিন্ন দিক কুরআনে স্পষ্টভাবে বিবৃত হয়েছে।

(ক) বস্তুত বিশ্ব-জাহানের রবই মানুষের রব। তাঁর রবুবিয়্যাত স্বীকার করে নেয়াই বাঞ্ছনীয়ঃ

*********************

-বল, আমার সালাত, আমার জীবন-মৃত্যু সব কিছুই আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের নিমিত্ত ….. বলঃ আল্লাহ ছাড়া আমি কি অন্য কোন রব তালাশ করবো? অথচ তিনিই তো সকল বস্তুর রব। -আল-আনআমঃ ১৬২-১৬৪

*********************

-বস্তুত আল্লাহ তোমাদের রব, যিনি আসমান-যমীন সৃষ্টি করেছেন। -আল-আরাফঃ ৫৪

*********************

-বল, মানুষের রব, মানুষের বাদশাহ, মানুষের মা’বুদের কাছে আমি আশ্রয় চাই।

*********************

-বল, কে তোমাদেরকে আসমান-যমীন থেকে রিযক দান করেন? শ্রবণ এবং দর্শন শক্তি কার ইখতিয়ারভুক্ত? কে নিষ্প্রাণ থেকে প্রাণী এবং প্রাণী থেকে নিষ্প্রাণ বের করেন? কে বিশ্ব ব্যবস্থা পরিচালনা করেন? তারা অবশ্যই বলবে আল্লাহ। বল, তবুও কি তোমরা ভয় করো না? আল্লাহ তো তোমাদের প্রকৃত রব। সত্যের পরে গুমরাহী ব্যতীত আর কি-ই বা অবশিষ্ট থাকে? তাহলে তোমরা কোথায় ঠোকর খেয়ে বেড়াচ্ছো? -ইউনুসঃ ৩১-৩২

(খ) নির্দেশ দান এবং ফায়সালার অধিকার আল্লাহ ছাড়া আর কারোর নেই। মানুষের উচিত তাঁর বন্দেগী করা। এটাই সঠিক পন্থাঃ

*********************

-তোমাদের মধ্যে মতভেদই হোক না কেন, তার ফায়সালা করা আল্লার কাজ।

*********************

-আল্লহ ছাড়া আর কারো নির্দেশ নেই। তাঁরই ফরমান যে, তোমরা তাঁর ছাড়া আর কারোর বন্দেগী করো না। এটিই তো দ্বীনে কাইয়্যেম-সত্য-সঠিক জীবন বিধান। কিন্তু অধিকাংশ লোকই জানে না। -ইউসুফঃ ৪০

*********************

-তারা বলে, আমাদেরও কি কোন ইখতিয়ার আছে? বল, সমস্ত ইখতিয়ার আল্লাহর।

(গ) একমাত্র আল্লাই হুকুম দেয়ার অধিকার ও ইখতিয়ার রাখেন। কারণ তিনিই স্রষ্টাঃ

*********************

সাবধান। সৃষ্টি তাঁর, নির্দেশও তাঁরই। -আল আরাফঃ ৫৪

(ঘ) একমাত্র আল্লাই নির্দেশ দেয়ার অধিকার রাখেন। কারণ তিনিই সমগ্র জগতের বাদশাহঃ

*********************

-চোর-নারী-পুরুষ-উভয়ের হাত কেটে দাও। তুমি কি জানোনা যে আসমান-যমীনের বাদশাহী আল্লারই জন্য? -আল-মায়েদাঃ ৩৮-৪০

(ঙ) আল্লার নির্দেশ সত্য-সঠিক এজন্য যে, তিনিই বাস্তব বিষয়ের জ্ঞান রাখেন এবং তিনিই সঠিক পথ নির্দেশ দিতে পারেনঃ

*********************

হতে পারে একটি জিনিস তোমাদের মনপুত নয়; অথচ তা তোমাদের জন্য উত্তম এবং হতে পারে, একটি জিনিস তোমাদের মনপুত, অথচ তা তোমাদের জন্য অকল্যাণকর। আল্লাই জানেন, তোমরা জান না। -আল-বাকারাঃ ২১৬

*********************

-কে বিপর্যয়কারী, আর কে সংশোধনকারী তা আল্লাহ জানেন। -আল-বাকারাঃ ২২০

*********************

-যা কিছু তাদের সামনে আছে, তাও তিনি জানেন আর যা তাদের নিকট প্রচ্ছন্ন, তার খবরও তিনি রাখেন। তিনি যেসব বিষয় জ্ঞান দান করতে চান তা ব্যতীত তারা তাঁর জ্ঞানের কোন বিষয়ই জানতে পারে না। -আল-বাকারাঃ ২৫৫

*********************

-তোমরা যখন স্ত্রীদের তালাক দাও আর তারা তাদের ইদ্দতের মেয়াদে পৌঁছে, তখন তাদেরকে (নিজেদের পছন্দসই) স্বামীর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে বারণ করো না। …. ইহা তোমাদের জন্য অধিক মর্জিত এবং পবিত্র পন্থা। আল্লাহ জানেন, তোমরা জান না।

*********************

-তোমাদের সন্তানদের ব্যাপারে আল্লাহ তোমাদেরকে হেদায়েত দিচ্ছেন। …. তোমাদের পিতা-মাতা এবং সন্তানদের মধ্যে কে উপকারের দিক থেকে তোমাদের নিকটতর, তা তোমরা জান না। উত্তরাধিকারের হিস্যা আল্লাহ নির্ধারণ করে দিয়েছেন। নিশ্চয় আল্লাহ সর্বজ্ঞ, মহাজ্ঞানী।

*********************

-তারা তোমার কাছে জানতে চায়! বল, আল্লাহ ‌‌’কালালা’ সম্পর্কে তোমাদেরকে জানাচ্ছেন। … আল্লাহ তোমাদের সম্পর্কে বিধান বিশ্লেষণ করেছেন, যাতে তোমরা বিপথগামী না হয়ে যাও। এবং তিনি সকল বিষয়ের জ্ঞান রাখেন। -আন-নিসাঃ ১৭৬

*********************

-আল্লাহ কিতাবে আত্নীয়-স্বজনরা (অন্যদের তুলনায়) বেশী হকদার। আল্লাহ সর্ব বিষয়ে জ্ঞান রাখেন। -আল-আনফালঃ ৭৫

*********************

-সদকা তো নিঃস্বদের জন্য। …. ইহা আল্লার পক্ষ থেকে নির্ধারিত বিধান। আল্লাহ সর্বজ্ঞ, মহাজ্ঞানী। -আত-তওবাঃ ৬০

*********************

হে ইমানদারগণ! তোমাদের দাস-দাসীরা অনুমতি নিয়ে যেন তোমাদের কাছে হাযির হয়। … এমনি করে আল্লাহ তোমাদেরকে তাঁর বিধান সমূহ খুলে বলেন। তিনি সব কিছু জানেন; মহাজ্ঞানী তিনি। -নূরঃ৫৮-৫৯

*********************

-হে ঈমানদারগণ! যেসব মুমিন মহিলা হিজরত করে তোমাদের কাছে আসে, তাদেরকে পরীক্ষা করো …. এটা আল্লাহর বিধান। তিনি তোমাদের ব্যাপারে ফায়সালা করেন। তিনি সর্বজ্ঞ, মহাজ্ঞানী।

 

তিনঃ আল্লাহর আইনানুগ সার্বভৌমত্ব

এ সব কারণে কুরআন ফায়সালা করে যে, আনুগত্য হবে নিরঙ্কুশ ভাবে আল্লার আর অনুসরণ অনুবর্তন হবে তাঁর আইন-বিধানের; এটিই বাঞ্ছনীয়। তাঁকে বাদ দিয়ে অন্যদের অথবা নিজের নফসের খাহেশের অনুসরণ নিষিদ্ধঃ

*********************

-(হে নবী) আমরা এ কিতাব যথাযথভাবে তোমার প্রতি নাজিল করেছি। সুতরাং দ্বীনকে আল্লার জন্য খালেছ করে তাঁর বন্দেগী করো। সাবধান! খালেছ দ্বীন আল্লারই জন্য।

*********************

-বল দ্বীনকে আল্লার জন্য খালেছ করে তাঁর বন্দেগী করার জন্য আমাকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। আর আমাকে এ নির্দেশও দেয়া হয়েছে যে, আমিই যেন সর্বপ্রথম আনুগত্যের শির অবনতকারী হই। -আয-যুমারঃ ১১-১২

*********************

-এবং আমি প্রত্যেক উম্মাতের মধ্যে একজন রাসূল প্রেরণ করেছি (এ নির্দেশ দিয়ে) যে, আল্লার বন্দেগী করো এবং তাগুত থেকে বিরত থাকো। -আন-নহলঃ ৩৬ [যে সত্তা আল্লার মুকাবিলায় ঔদ্ধত্য প্রকাশ করে এবং আল্লাহ ব্যতীত যার বন্দেগী করা হয়- বন্দেগীকারী ব্যক্তি তার প্রভাব-প্রতাপে বাধ্য হয়ে বন্দেগী করুক বা সেচ্ছায় সন্তুষ্টচিত্তে করুক- তাকেই বলা হয় তাগুত। সে মানুষ, শয়তান, প্রতীমা বা অন্য যাই কিছু হোক না কেন। (ইবনে জারীর, আত-ত্বাবারী-জামেউল বয়ান ফী তাফসীরুল কুরআন, ৩য় খন্ডঃ পৃষ্ঠা-১৩)]।

*********************

-দ্বীনকে আল্লাহর জন্য খালেছ করে নিবিষ্টভাবে বন্দেগী করা ব্যতীত তাদেরকে আর কোন নির্দেশই দেয়া হয়নি। -আল-বাইয়্যেনাঃ৫

*********************

-তোমাদের প্রতিপালকের নিকট থেকে তোমাদের প্রতি যা অবতীর্ণ হয়েছে তার অনুসরণ কর তা বাদ দিয়ে তোমাদের নেতাদের অনুসরণ করো না। -আল-আরাফঃ ৩

*********************

-তোমার কাছে যে জ্ঞান এসেছে, তারপরও তুমি যদি তাদের খাহেশাতের অনুসরণ করো, তাহলে আল্লাহর মুকাবিলায় তোমার কোন সাহায্যকারী হবে না, হবে না কোন রক্ষাকারী।

*********************

-অতঃপর আমি তোমাকে দ্বীনের এক বিশেষ পদ্ধতির ওপর স্থাপন করেছি। সুতরাং তুমি তারই অনুসরণ করো। যাদের কোন জ্ঞান নেই, তাদের খাহেশের অনুসরণ করো না।

কুরআন বলে, মানুষের কার্যাবলীকে সংগঠিত সুবিন্যস্ত করার জন্য আল্লাহ যে সীমারেখা নির্ধারণ করে দিয়েছেন, তা লংঘন করার অধিকার কারোর নেইঃ

*********************

…. এসব হচ্ছে আল্লাহর নির্ধারিত সীমারেখা। এগুলো লংঘন করো না। যারা আল্লার সীমারেখা লংঘন করে, তারাই যালেম-অত্যাচারী। -আল-বাকারাঃ ২২৯

*********************

…. এসব হচ্ছে আল্লার সীমারেখা। যে আল্লার সীমারেখা লংঘন করে, সে নিজেই নিজের নফসের ওপর যুলুম করে। -আত-তালাকঃ ১

*********************

… এসব হচ্ছে আল্লার সীমারেখা। বাধ্য-বাধকতা মেনে চলতে যারা অস্বীকার করে, তাদের জন্য রয়েছে কঠোর শাস্তি। -আল-মুজাদালাঃ৪

কুরআন এও বলে যে, আল্লার হুকুমের বিরুদ্ধে যে হুকুমই হোক না কেন, তা শুধু অন্যায় অবৈধই নয়, বরং তা হচ্ছে কুফরী, গুমরাহী, যুলুম-শিরক-অন্যায় এবং স্পষ্ট পাপাচার। এ ধরনের যে কোন ফায়সালা জাহেলিয়াতের ফায়সালা-ঈমান বিরুদ্ধ ফায়সালা। এ ধরনের ফায়সালা অস্বীকার করা ঈমানের অপরিহার্য দাবী-অবিচ্ছেদ্ধ অংশঃ

*********************

-আল্লার নাযিল করা বিধান অনুযায়ী যারা ফায়সালা করে না, তারাই কাফের। -মায়েদাঃ৪৪

*********************

-আল্লার নাযিল করা হুকুম অনুযায়ী যারা ফায়সালা করে না, তারাই যালেম। -মায়েদাঃ৪৫

*********************

-আল্লার নাযিলকৃত নির্দেশ অনুযায়ী যারা ফায়সালা করে না, তারাই ফাসেক, পাপাচারী। -আল-মায়েদাঃ ৪৭

*********************

তারা কি জাহিলিয়াতের ফায়সালা চায়? অথচ বিশ্বাসীদের জন্য আল্লার চেয়ে উত্তম ফায়সালাকারী আর কে হতে পারে? -আল -মায়েদাঃ ৫০

*********************

-তুমি কি সেসব লোককে দেখোনি, যারা দাবী করে যে, তোমার ওপর নাযিল করা কিতাবের প্রতি তারা ঈমান এনেছে, ঈমান এনেছে তোমার পূর্বে নাযিলকৃত কিতাবসমূহের ওপরও, অতঃপর ফায়সালার জন্য নিজেদের ব্যাপারে ‘তাগুতের’ কাছে নিয়ে যেতে চায়, অথচ তাদেরকে নির্দেশ দেয়া হয়েছিল তাকে অস্বীকার করার? শয়তান তাদেরকে পথভ্রষ্ট করে দূরে নিয়ে যেতে চায়। -আন-নিসাঃ৬০

 

চারঃ রাসূলের মর্যাদা

ওপরের আয়াতসমূহে আল্লার যে বিধান মেনে চলার নির্দেশ দেয়া হয়েছে তা মানুষের নিকট পৌছার একমাত্র Media তাঁর রাসূল (সাঃ)। তিনিই আল্লার পক্ষ থেকে তাঁর বিধান এবং হেদায়েত মানুষের কাছে পৌঁছান এবং নিজের কথা এবং কাজের দ্বারা সে সব বিধি-বিধান ও হেদায়াতের ব্যাখ্যা দান করেন। সুতরাং রাসূল (সাঃ) মানব জীবনে আল্লাহর আইনগত সার্বভৌমত্বের (Legal Sovereignty) প্রতিনিধি। এর ভিত্তিতে আনুগত্য অবিকল আল্লাহরই আনুগত্য। রাসূলের আদেশ নিষেধ এবং ফায়সালাকে নির্দ্বিধায় মেনে নেয়ার জন্য আল্লাহই নির্দেশ দিয়েছেন। রাসূলের আদেশ-নিষেধ ফায়সালা এমনভাবে স্বীকার করে নিতে হবে, যেন অন্তরে সামান্যতম দ্বিধা-দ্বন্দ্ব এবং সংকোচও না থাকে, অন্যাথায় ঈমান কোন কাজেই আসবে নাঃ

*********************

-আমি যে রাসূলই প্রেরণ করেছি, তা করেছি এ জন্য যে, আল্লার নির্দেশক্রমে তাঁর আনুগত্য করা হবে। -আন-নিসাঃ ৬৪

*********************

-যে রাসূলের আনুগত্য করে, সে মূলত আল্লাহরই আনুগত্য করে। -আর নিসাঃ৮০

*********************

-হেদায়েত স্পষ্ট হয়ে যাওয়ার পরও যে ব্যক্তি রাসূলের সাথে মতবিরোধ করে, তাঁর বিরোধিতা করে এবং ঈমানদারদের পথ ত্যাগ করে অন্য পথ অবলম্বন করে সে নিজে যে দিক ফিরে যেতে চায়, আমি তাকে সে দিকে ফিরিয়ে দেবো। আর তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবো। জাহান্নাম অতি নিকৃষ্ট ঠিকানা। -আন-নিসাঃ১১৫

*********************

-রাসূল তোমাদেরকে যা কিছু দেন, তোমরা তা গ্রহণ করো, আর যেসব সম্পর্কে নিষেধ করেন, সে সব থেকে বিরত থাকো। আল্লাকে ভয় করো। আল্লাহ কঠোর শাস্তিদাতা।

*********************

-না, তোমার রবের শপথ, তারা কখনো মুমিন হবে না, যতক্ষণ তারা তোমাকে (হে নবী) নিজেদের সকল মতবিরোধে ফায়সালাকারী বলে মেনে না নেয়। অতঃপর তুমি যে ফায়সালা করবে, তাতে নিজেদের অন্তরে তারা কোন রকম সংকীর্ণতা বোধ করবে না; বরং পুরোপুরি তা মেনে নেবে। -আন নিসাঃ৬৫

পাঁচঃ উর্ধ্বতন আইন

কুরআনের দৃষ্টিতে আল্লাহ এবং রাসূলের নির্দেশ হচ্ছে এমন এক উর্ধ্বতন আইন (Supreme Law), যার মুকাবিলায় ঈমানদার ব্যক্তি শুধু আনুগত্যের পন্থাই অবলম্বন করতে পারে। যেসব ব্যাপারে আল্লাহ এবং রাসূল ফায়সালা দিয়েছেন, সে সব ব্যাপারে কোন মুসলমান নিজের পক্ষ থেকে কোন স্বাধীন ফায়সালা দেয়ার অধিকারী নয়। আল্লাহ ও রাসূলের ফায়সালা থেকে দূরে সরে দাঁড়ানো এবং তার বিরোধিতা-অবাধ্যতা ঈমানের পরিপন্থীঃ

*********************

আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল কোন বিষয়ে ফায়সালা দেয়ার পর সে ব্যাপারে কোন মুমিন নারী-পুরুষের কোন প্রকার ইখতিয়ারই থাকে না। যে কেউ আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের নাফরমারী (অবাধ্যতা) করে, সে স্পষ্ট গুমরাহীতে নিমজ্জিত। -আল-আহযাবঃ ৩৬

*********************

তারা বলে, আমরা আল্লাহ ও রাসূলের উপর ঈমান এনেছি এবং আনুগত্য কবুল করেছি, অতঃপর তাদের একদল মুখ ফিরিয়ে নেয়; তারা কখনো মু’মিন নয়। তাদেরকে যখন আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের দিকে আহবান করা হয়, যাতে রাসূল তাদের মধ্যে ফায়সালা করেন, তখন তাদের একটি দল মুখ ফিরিয়ে নেয়। -আন-নূরঃ ৪৭-৪৮

*********************

-ঈমানদারদের কাজ হচ্ছে এই যে, যখন রাসূল তাদের মধ্যে ফায়সালা করবেন এজন্য তাদেরকে আল্লাহ এবং রাসূলের দিকে আহবান জানানো হয়, তখন তারা বলে, আমরা শুনেছি এবং আনুগত্য করেছি। এমন ব্যক্তিরাই সফলতা লাভ করবে। -আন-নূরঃ ৫১

ছয়ঃ খেলাফত

কুরআনের বিধান মতে শাসনের সত্যিকার রূপ হচ্ছে, রাষ্ট্র আল্লাহ এবং রাসূলের আইনগত কর্তৃত্ব (Legal Supremacy) স্বীকার করে তাঁর স্বপক্ষে সার্বভৌমত্ব (sovereignty) ত্যাগ করবে এবং আসল শাসকের খেলাফত (প্রতিনিধিত্ব) এর ভূমিকা গ্রহণ করবে। এ ক্ষেত্রে তার ক্ষমতা ও ইখতিয়ার আইনগত, প্রশাসনিক বা বিচার সম্বন্ধীয় যাই হোক না কেন-উপরে আল্লার আইনের সার্বভৌমত্ব, রাসূলের মর্যাদা ও উর্ধ্বতন আইন শিরোনামে বর্ণিত চৌহদ্দীর মধ্যে অবশ্য সীমিত থাকবেঃ

**********************

-(হে নবী!) আমি তোমার প্রতি এ কিতাব সত্য-সঠিকভাবে নাযিল করেছি। তা পূর্ববর্তী কিতাবসমূহের সত্যতা প্রতিপন্ন করে এবং তার হেফাজত করে। সুতরাং আল্লাহ যা কিছু নাযিল করেছেন, তদানুযায়ী লোকদের মধ্যে তুমি ফায়সালা করো। আর মানুষের খাহেশের অনুবর্তন করতে গিয়ে তোমার নিকট আগত সত্য থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে না।

**********************

-হে দাউদ! আমি আমি তোমাকে যমীন খলীফা (প্রতিনিধি) করেছি। সুতরাং তুমি সত্যানুযায়ী মানুষের মধ্যে ফায়সালা করো এবং নফসের খাহেশ (মনের অভিলাষ এবং কামনা বাসনা)-এর অনুসরণ করো না। এমন করলে তা তোমাকে আল্লার পথ থেকে দূরে সরিয়ে নিয়ে যাবে।

সাতঃ খেলাফতের তাৎপর্য

কুরআনে এ খেলাফতের যে চিত্র অঙ্কিত হয়েছে, তা হচ্ছেঃ যমীনের বুকে মানুষ যে শক্তি-সামর্থ লাভ করেছে, তা সবই সম্ভব হয়েছে আল্লার দান ও অনুগ্রহে। আল্লাহ মানুষকে এমন মর্যাদা দান করেছেন, যার ফলে মানুষ আল্লাহ প্রদত্ত শক্তি-সামর্থ তাঁরই দেয়া স্বাধীন ক্ষমতা বলে তাঁর যমীন ব্যবহার করে। এ জন্য দুনিয়ার বুকে মানুষের স্বাধীন মালিকানা নেই। বরং সে প্রকৃত মালিকের খলীফা বা প্রতিননিধি মাত্রঃ

**********************

-এবং স্মরণ কর, তোমার রব যখন ফিরিশতাদের বলেছিলেন, আমি যমীনে একজন খলীফা বানাবো। -আল-বাকারাঃ ৩১

**********************

-(মানব মন্ডলী!) আমি তোমাদেরকে যমীনের বুকে স্বাধীন কর্মক্ষমতা দিয়ে সংস্থাপন করেছি এবং তোমাদের জন্য তার অভ্যন্তরে জীবিকার উপায়-উপকরণ সরবরাহ করেছি। -আল-আরাফঃ ১০

**********************

-তোমরা কি দেখতে পাওনা যে, যমীনে যা কিছু আছে, সবই আল্লাহ তোমাদের জন্য বিজিত করে দিয়েছেন? -আল-হজ্জঃ ৬৫

যমীনের কোনও অংশে যে জাতি ক্ষমতা লাভ করে, মূলত সে জাতি সেখানে আল্লার খলিফাঃ

**********************

-(হে আদ কওম)! যমীনে আল্লাহ যখন তোমাদেরকে নূহের কওমের পরে খলীফা করেছিলেন, তখনকার কথা স্মরণ করো। -আ’রাফঃ ৬৯

**********************

-(হে সামুদ কওম)! স্মরণ কর তখনকার কথা, যখন তিনি আদ কওমের পরে তোমাদেরকে খলীফা করেছিলেন। -আল-আরাফঃ ৭৪

**********************

-(হে বনী-ইসরাঈল)! সে সময় নিকটবর্তী যখন তোমাদের রব তোমাদের দুশমন (ফেরাউন)- কে ধ্বংস করে তোমাদেরকে যমীনে খলীফা করবেন। এবং তিনি দেখবেন, তোমরা কেমন কার্য কর। -আল-আরাফঃ ১২৯

**********************

-অতঃপর তাদের পরে আমি তোমাদেরকে যমীনে খলীফা করেছি, তোমরা কেমন কাজ কর, তা দেখার জন্য। -ইউনুসঃ ১৪

কিন্তু এ খেলাফত কেবলমাত্র তখন সঠিক এবং বৈধ হতে পারে; যখন তা হবে সত্যিকার মালিকের (আল্লাহ তায়ালার) নির্দেশের অনুসারী। তা থেকে বিমুখ হয়ে যে স্বেচ্ছাচার মূলক শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত করা হবে, তা খেলাফত হবে না। বরং খেলাফতের পরিবর্তে তা হবে ‘বাগওয়াত’ তথা প্রকাশ্য বিদ্রোহঃ

**********************

-তিনি তোমাদেরকে যমীনে খলীফা করেছেন। অতঃপর যে কুফরী করবে-তার কুফরী তার ওপর শাস্তি স্বরূপ আপতিত হবে। কাফেরদের কুফরী তাদের রব-এর কাছে তাঁর গযব ছাড়া অন্য কোন বিষয় বৃদ্ধি করতে পারে না। কাফেরদের জন্য তাদের কুফরী কেবল ক্ষতিই বৃদ্ধি করতে পারে। -আল-ফাতেরঃ ৩৯

**********************

তুমি কি দেখনি, তোমার রব আদ এর সাথে কেমন ব্যবহার করেছেন? …. …. এবং সামুদের সাথে; যারা উপত্যাকায় পাথর কেটেছিল (গৃহ নির্মানের জন্য) এবং খুটি-তাঁবুর অধিকারী ফেরাউনের সাথেও -যারা দেশে অবাধ্যতা সৃষ্টি করেছিল? -আল ফজর

**********************

-(হে মুসা!) ফেরাউনের কাছে যাও। করণ, সে বিদ্রোহী হয়ে গেছে। …. ফেরাউন লোকদের বলেছিল, আমিই তোমাদের সবচেয়ে বড় রব-পালনকর্তা-পরওয়ারদেগার। -আন-নাযেআতঃ ১৭-২৪

**********************

-তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান এনেছে এবং সৎকর্ম করেছে, তাদের সাথে আল্লাহ ওয়াদা করেছেন যে, তিনি তাদেরকে যমীনে খলীফা করবেন, যেমন তিনি খলীফা করেছিলেন তাদের পূর্ববর্তীদেরকে …. …. তারা আমার বন্দেগী করবে, আমার সাথে অন্য কিছুকেই শরীক করবে না।

 

আটঃ সামষ্টিক খেলাফত

কোন ব্যক্তি গোষ্ঠি বা দল বৈধ এবং সত্য-সঠিক ধরনের খেলাফত (প্রতিনিধি) -এর একক ধারক-বাহক নয়। বরং যে দল (Community) উপরোক্ত মূলনীতিগুলো স্বীকার করে সমষ্টিগতভাবে রাষ্ট্র-সরকার প্রতিষ্ঠা করে, সে দলই হয় এ খেলাফতের ধারক-বাহক। সূরায় নূর-এর ৫৫ নং আয়াতের **********************

বাক্যাংশ এ ব্যাপারে অত্যন্ত দ্বার্থহীন। এ বাক্যাংশের আলোকে ঈমানদারদের জামায়াতের প্রতিটি ব্যক্তিই খেলাফতের সমান অংশীদার। সাধারণ মুমিনদের খেলাফতের অধিকার হরণ করে তা নিজের কুক্ষিগত করার অধিকার কোন ব্যক্তি-গোষ্ঠির নেই। কোন ব্যক্তি বা দল নিজের স্বপক্ষে আল্লার বিশেষ খেলাফতের দাবীও করতে পারে না। এ বিষয়টিই ইসলামী খেলাফতকে মুলুকিয়্যাত (একনায়কতন্ত্র, সৈরতন্ত্র, রাজতন্ত্র) গোষ্ঠীতন্ত্র এবং ধর্মীয় যাজক-সম্প্রদায়ের শাসন থেকে পৃথক করে তাকে গণতন্ত্রাভিমুখী করে। কিন্তু ইসলামী গণতন্ত্র এবং পাশ্চত্য গণতন্ত্রের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য এই যে, পাশ্চত্য গণতন্ত্র জনগণের সার্বভৌমত্ব (Popular Soverignty) -এর মূলনীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত। পক্ষান্তরে ইসলামী গণতন্ত্রে (ইসলামের জমহুরী খেলাফত) জনগণ স্বয়ং আল্লার সার্বভৌমত্ব স্বীকার করে স্বেচ্ছায় সন্তুষ্টচিত্তে নিজেদের ক্ষমতা-ইখতিয়ারকে আল্লার বিধানের সীমার মধ্যেই সীমিত করে দেয়।

নয়ঃ রাষ্ট্রের আনুগত্যের সীমা

এ খেলাফত ব্যবস্থা পরিচালনা করার জন্য যে রাষ্ট্র-সরকার প্রতিষ্ঠিত হবে, জনগণ শুধু ভাল কাজে (মারুফ) তার আনুগত্য করতে বাধ্য থাকবে মাসিয়াত (আইনের বিরুদ্ধাচরণ, পাপ অন্যায়)-এ কোন আনুগত্য নেই; নেই কোন সহযোগিতাঃ

**********************

হে নবী! ঈমানদার মহিলারা যখন তোমার নিকট এসব বিষয়ে বায়আত (আনুগত্যের শপথ) গ্রহণ করার জন্য আসে যে, তারা আল্লার সাথে শরীক করবে না, এবং কোন বৈধ বিধানের ব্যাপারে তোমার নাফরমানী (অবাধ্যতা) করবে না, তখন তুমি তাদের বায়আত কবুল করো। -আল-মুমতাহানাঃ১২

**********************

-নেকী এবং পরহেযগারী-ভাল কাজ এবং তাকওয়ার ব্যাপারে সহযোগীতা করো; পাপ এবং ঔদ্ধত্যে সহযোগিতা করো না। আল্লাকে ভয় করো। আল্লাহ কঠোর শাস্তিদাতা।

**********************

দশঃ শুরা

সে রাষ্ট্রের সমস্ত কার্যাবলী-প্রতিষ্ঠা-সংগঠন থেকে শুরু করে রাষ্ট্রপ্রধান এবং উলিল আমর-এর নির্বাচন, শাসনতান্ত্রিক এবং প্রশাসনিক কার্যাবলী পর্যন্ত সমস্ত কিছুই ঈমানদারদের পারস্পারিক পরামর্শক্রমে সম্পন্ন হওয়া উচিত; এ পরামর্শ কোন মাধ্যম ছাড়া সরাসরি হউক বা নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমেঃ

**********************

-এবং মুসলমানদের কার্যাবলী পারস্পারিক পরামর্শক্রমে সম্পন্ন হয়। [এ আয়াতের বিস্তারিত ব্যাখ্যার জন্য তাফহীমুল কুরআন, উর্দু সংস্করণ, ৪র্থ খন্ড, পৃষ্ঠা ৫০৮-৫১০ দ্রষ্টব্য]।

এগারঃ উলিল আমর-এর গুণাবলী

এ রাষ্ট্র ব্যবস্থা পরিচালনার জন্য উলিল আমর এর নির্বাচনে যেসব বিষয়ের প্রতি লক্ষ্য রাখা দরকার, তা এইঃ

(ক) যেসব মূলনীতির ভিত্তিতে খেলাফত ব্যবস্থা পরিচালনার দায়িত্ব তার ওপর ন্যাস্ত হচ্ছে, তাকে সে সব মূলনীতি মেনে চলতে হবে। কারণ যে ব্যক্তি নীতিগতভাবে একটি ব্যবস্থার বিরোধী, তার ওপর সে ব্যবস্থা পরিচালনার দায়িত্ব ন্যস্ত করা যায় নাঃ

**********************

-হে ঈমানদারগণ। আনুগত্য কর আল্লার এবং আনুগত্য কর রাসূলের আর তাদের, যারা তোমাদের মধ্যে উলিল আমর। -আন-নিসাঃ৫৯

**********************

-হে ঈমানদারগণ। নিজেদের ছাড়া অন্যদেরকে গোপনীয় বিষয়ের অংশীদার করো না। -আলে-ইমরানঃ১১ [মূলে **********************(বিতানাতুন) শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে যামাখশারী (মৃত্যু ৫৩৮ হিঃ ১১৪৪ খৃঃ) এর ব্যাখ্যা করেছেন এরূপেঃ কোন ব্যক্তির ‘বিতনা’ এবং ওয়ালিজা সে ব্যক্তি যে তার বিশিষ্ট বন্ধু নির্বাচিত সাথী, যার ওপর নির্ভর করে সে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারে তার দিকে প্রত্যাবর্তন করে। (আল-কাশ শাফ, ১ম খন্ড, পৃষ্ঠা ১৬২)।]।

**********************

-তোমরা কি মনে করে বসেছ যে, তোমাদেরকে এমনি ছেড়ে দেয়া হবে? অথচ তোমাদের মধ্যে কারা জেহাদ করেছে, আল্লাহ, রাসূল এবং মুমিনদের ছাড়া অন্য কাউকে নিজেদের ব্যাপারে দখলদার বানায়নি আল্লাহ এখনও তা পরখ করেননি। -আত-তাওবাঃ১৬ [মূলে ********************** (ওয়ালীজ) শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। যামাখশারীর উদ্ধৃতি দিয়ে ওপরে তার একটি ব্যাখ্যাও উল্লেখিত হয়েছে। অপর এক ব্যাখ্যা দিয়েছেন রাগেব ইসফাহানী। তিনি লিখেছেনঃ ওয়ালীজা বলা হয় তাকে মানুষ যাকে তার নির্ভরযোগ্য ব্যক্তি হিসেবে গ্রহণ করে। অথচ সে নিজস্ব লোকদের পর্যায়ভুক্ত নয়। ********************** আরবের এ বাগধারা থেকে এটি গৃহীত। এর অর্থ- ‘অমুক ব্যক্তি সে জাতির মধ্যে ঢুকে পড়েছে, অথচ সে ব্যক্তি সে জাতির লোক নয়।’ (মুফরাদাত ফি গারীবিল কুরআন, আল-মাতবাআতুল খাইরিয়া, মিশর ১৩২২ হিজরী।)]

(খ) সে যালেম ফাসেক-ফাজের, আল্লাবিমুখ এবং সীমালংঘনকারী হবে না। বরং ঈমানদার, আল্লাহভীরু এবং নেককার হতে হবে তাকে। কোন যালেম বা ফাসেক ব্যক্তি যদি এমারত বা ইমামের পদ অধিকার করে বসে, তবে ইসলামের দৃষ্টিতে তার এমারত (নেতৃত্ব-কর্তৃত্ব) বাতেলঃ

**********************

-এবং স্মরণ কর, ইব্যাহীমকে তার রব যখন কয়েকটি কথার ব্যাপারে পরীক্ষা করছিলেন এবং তা সে পূর্ণ করেছিল। তখন তার রব বলেছিলেন-আমি তোমাকে লোকদের ইমাম (নেতা) বানাবো। ইব্যাহীম বললো-আমার বংশধরদের মধ্যেও? তিনি বললেন, যালেমরা আমার আহাদ-অঙ্গীকার লাভ করে না। -আল-বাকারাঃ১২৪ [প্রসিদ্ধ হানাফী (ফিকাহ শাস্ত্রবেত্তা) আবুবকর আল জাসসাস (মৃত্যু ৩৭০ হিজরী, ৯৮০ ঈসায়ী) এ আয়াতের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে বলেন যে, অভিধানে ইমামের অর্থ সে ব্যক্তি, যার অনুসরণ করা হয় -সে অনুসরণ হক-বাতিল, ন্যায়-অন্যায় যে কোন ব্যাপারেই হোক না কেন। কিন্তু আলোচ্য আয়াতে ইমাম বলতে কেবল সে ব্যক্তিকেই বুঝায়, যে আনুগত্যের যোগ্য, যার অনুকরণ অবশ্য করণীয়। সুতরাং এদিক থেকে ইমামতের উন্নত পর্যায়ে রয়েছেন নবী-রাসূলগণ, সত্যাশ্রয়ী খলীফাগণ এবং পরে সত্যানুসারী ওলামা এবং কাযী। এরপর তিনি লিখেছেনঃ সুতরাং কোন যালেম নবী হতে পারে না। নবীর প্রতিনিধি কাযী বা এমন পদ মর্যাদার অধিকারী হওয়াও তার জন্য বৈধ নয়, দ্বীনের ব্যাপারে যার কথা মেনে চলা অপরিহার্য কর্তব্য। এ আয়াত দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, ফাসেক পাপাচারী-দূরাচারী ব্যক্তির ইমামত বাতেল। সে খলীফা হতে পারে না। সে যদি নিজেই এমন পদ-মর্যাদায় জেকে বসে, তবে তার অনুগমন-অনুসরণ এবং আনুগত্য জনগণের জন্য ব্যধ্যতামূলক নয়। (আহকামুল কুরআন, ১ম খন্ডম পৃষ্ঠা ৭৯-৮০, আল-মাতবায়াতুল বাহিয়্যা, মিশর, ১৩৪৬ হিজরী।]]

-যারা ঈমান এনেছে এবং সৎকর্ম করেছে, তাদেরকে আমরা কি সে সব লোকেদের মত করবো, যারা যমীনে বিপর্যয় সৃষ্টি করে? আমরা কি মুত্তাকী-পরহেযগারদেরকে ফাসেকদের মত করবো? -ছাদঃ ২৮

**********************

-এমন কোন লোকের আনুগত্য করো না যার অন্তরকে আমাদের স্মরণ থেকে গাফেল করে দিয়েছি, যে তার নফসের কামনা-বাসনা (খাহেসে-নফস)-এর বশ্যতা স্বীকার করে নিয়েছে এবং যার কার্যধারা সীমাতিক্রম করেছে। -আল-কাহাফঃ ২৮

**********************

-সে সব সীমালংঘনকারীর আনুগত্য করো না, যারা যমীনে বিপর্যয় সৃষ্টি করে- সংস্কার-সংশোধন করে না। -আশ-শুয়ারাঃ ১৫১-১৫২

**********************

-তোমাদের মধ্যে সে ব্যক্তি আল্লাহর নিকট সবচেয়ে বেশী সম্মানিত, যে সবচেয়ে বেশী মুত্তাকী-পরহেযগার-সবচেয়ে বেশী আল্লাভীরু।

(গ) সে অজ্ঞ-মূর্খ হবে না; বরং তাকে হতে হবে বিজ্ঞ-জ্ঞানী। প্রয়োজনীয় বিষয়ে অভিজ্ঞ হতে হবে তাকে। খেলাফতের কার্যাবলী পরিচালনার জন্য তাকে পর্যাপ্ত শারীরিক-মানসিক যোগ্যতাসম্পন্ন হতে হবেঃ

**********************

-যে ধন-সম্পদকে আল্লাহ তোমাদের জীবন-জীবিকার অবলম্বন করেছেন, তা নির্বোধ ব্যক্তিদের হাতে তুলে দিও না। -আন-নিসাঃ ৫

**********************

-(বনী-ইসরাইল) বললো সে (ত্বালুত) আমাদের ওপর শাসন-কর্তৃত্ব চালাবার অধিকার পেল কোথায়? অথচ তার তুলনায় আমরা শাসনকার্যের বেশী হকদার। আর তাকে তো ধন-সম্পদে প্রাচুর্যও দেয়া হয়নি। নবী বললেন, আল্লাহ তোমাদের মুকাবিলায় তাকে নিযুক্ত করেছেন এবং তার জ্ঞান-শক্তিতে প্রশস্ততা দান করেছেন। -আল-বাকারাঃ ২৪৭

**********************

-এবং দাউদের রাজত্বকে আমরা সুদৃঢ় করেছি, তাকে দিয়েছি জ্ঞান-কৌশল এবং চূড়ান্ত ফায়সলাকারী কথা বলার যোগ্যতা। -সাদঃ ২০

**********************

ইউসুফ বললো, আমাকে যমীনের ভান্ডারসমূহের কার্যে নিযুক্ত করো। কারণ, আমি হেফাযতকারী এবং ওয়াকেফহাল। -ইউসুফঃ ৫৫

**********************

-আর এরা যদি (গুজব না ছড়িয়ে) খবরটি রাসূল এবং তাদের উলিল আমর-এর নিকট পৌঁছাতো, তাহলে তা এমন ব্যক্তিদের জ্ঞানে আসতো, তাদের মধ্যে যারা বিষয়ের গভীরে পৌঁছাতে সক্ষম। -আন-নিসাঃ ৮৩

**********************

-বল, যাদের জ্ঞান আছে এবং যাদের জ্ঞান নেই, উভয়ে কি সমান হতে পারে? -যুমারঃ৯

(ঘ) তাকে এমন আমানতদার হতে হবে, যাতে আস্থার সাথে তার ওপর দায়িত্ব ন্যাস্ত করা যেতে পারেঃ

**********************

-আল্লাহ তোমাদেরকে নির্দেশ দিচ্ছেন, আমানতসমূহ তার যোগ্য ব্যক্তির কাছে ফেরত দেয়ার জন্য। -আন নিসাঃ৫৮ [দায়িত্বপূর্ণ পদ তাদেরকেই দান করা উচিত, যারা তার যোগ্য অধিকারী-এ অর্থও এতে শামিল রয়েছে। (আলুসী, রুহুল মাআনী, ৫ম খন্ড, ৫৮ পৃষ্ঠা, ইদারাভুজ তাবায়াতিল মুনিরিয়া, মিশর, ১৩৪৫ হিজরী।)]

 

বারঃ শাসতন্ত্রের মৌলনীতি

এ রাষ্ট্রের শাসনতন্ত্র যেসব মৌলনীতির উপর প্রতিষ্ঠিত হবে, তা এইঃ

**********************

(ক) তোমরা যারা ঈমান এনেছো। আনুগত্য করো আল্লার এবং আনুগত্য করো রাসূলের, আর তোমাদের উলিল আমর-এর। অতঃপর তোমাদের মধ্যে যদি কোন বিষয়ে বিরোধ দেখা দেয়, তবে তা আল্লাহ এবং রাসূলের দিকে প্রত্যাবর্তন করো-যদি তোমরা আল্লাহ এবং শেষ দিনের প্রতি ঈমান রাখো। -আন-নিসাঃ৫৯

আলোচ্য আয়াতটি শাসনতন্ত্রের ছটি ধারা স্পষ্ট তুলে ধরেঃ

একঃ আল্লাহ এবং রাসূলের আনুগত্য সকল আনুগত্যের চেয়ে অগ্রগণ্য।

দুইঃ উলিল আমর-এর আনুগত্য আল্লাহ-রাসূলের আনুগত্যের অধীন।

তিনঃ উলিল আমর ঈমানদারদের মধ্য হতে হবে।

চারঃ শাসকবর্গ এবং সরকারের সাথে মতবিরোধের অধিকার জনগণের রয়েছে।

পাঁচঃ বিরোধ দেখা দিলে আল্লাহ এবং রাসূলের বিধানই হবে চূড়ান্ত ফায়সালাকারী দলীল।

ছয়ঃ খেলাফত ব্যবস্থায় এমন একটি প্রতিষ্ঠান থাকতে হবে, যা উলীল আমর এবং জনগণের চাপ-প্রভাব মুক্ত হয়ে উর্ধ্বতন আইন অনুযায়ী সকল বিরোধ মীমাংসা করতে পারে।

(খ) প্রশাসন যন্ত্রের (Executive Body) ক্ষমতা ইখতিয়ার অবশ্যই আল্লার সীমারেখা দ্বারা সীমিত হবে, হবে আল্লাহ-রাসূলের আইনে বাঁধা। তা লংঘন করে, প্রশাসন যন্ত্র এমন কোন নীতি (Policy) গ্রহণ করতে পারে না, এমন কোন নির্দেশ দিতে পারে না, যা মাসিয়াত (পাপাচার; কুরআন-সুন্নার যে কোন স্পষ্ট দ্বার্থহীন নির্দেশের পরিপন্থী)-এর সংজ্ঞায় পড়ে। কারণ, এ আইনানুগ সীমারেখার বাইরে গিয়ে আনুগত্য দাবী করার অধিকারই তার নেই। (এ সম্পর্কে ওপরের ৩, ৫ ও ৯ নং প্যারাগ্রাফে আমরা কুরআনের স্পষ্ট নির্দেশ উল্লেখ করেছি।) এছাড়াও প্রশাসনিক কাঠামো অবশ্যই শূরা অর্থাৎ নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত হবে। এবং শূরা অর্থাৎ পারস্পারিক পরামর্শক্রমে তাকে কার্য পরিচালনা করতে হবে। ওপরে ১০ নং প্যারাগ্রাফে এ বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে। কিন্তু নির্বাচন এবং পরামর্শ সম্পর্কে কুরআন কোন সুস্পষ্ট এবং সুনির্দিষ্ট রূপ-কাঠামো নির্ধারণ করে দেয়নি। বরং এক সামগ্রিক মূলনীতি নিরূপণ করে বিভিন্ন যুগে সমাজের পরিবেশ পরিস্থিতি এবং প্রয়োজনের পরিপ্রেক্ষিতে তা কার্যকর করার পথ উন্মুক্ত রেখেছে।

(গ) আইন পরিষদ (Legislature) অবশ্যই পরামর্শভিত্তিক হবে (১০ নং প্যারাগ্রাফ দ্রষ্টব্য)। কিন্তু তার আইন প্রণয়নের অধিকার সর্বাবস্থায় ৩ এবং ৫ নং প্যারাগ্রাফে বর্ণিত সীমারেখায় সীমিত হতে বাধ্য। যেসব ব্যাপারে আল্লাহ এবং রাসূল কোন স্পষ্ট নির্দেশ দেননি বা মূলনীতি এবং সীমারেখা নির্ধারণ করে দিয়েছেন, আইন পরিষদ সে সব ব্যাপারে ব্যাখ্যা দিতে পারে। তা কার্যকর করার জন্য প্রসঙ্গিক নিয়ম-নীতির পরামর্শ দিতে পারে, প্রস্তাব পেশ করতে পারে। কিন্তু তাতে রদবদল করতে পারে না। অবশ্য যেসব ব্যাপারে উর্ধ্বতন আইন প্রণেতা কোন সুস্পষ্ট বিধান দেয়নি, সীমারেখা এবং মূলনীতি নির্ধারণ করেননি; সে সব ব্যাপারে ইসলামের স্পিরিট (Spirit) এবং সাধারণ মূলনীতি অনুযায়ী আইন পরিষদ যে কোন প্রয়োজনে আইন প্রণয়ন করতে পারে। কারণ সে ব্যাপারে কোন নির্দেশ না থাকাই এ কথার প্রমাণ যে, শরীয়ত প্রণেতা তা ঈমানদারের শুভবুদ্ধির ওপর ছেড়ে দিয়েছেন।

(ঘ) বিচার বিভাগকে (Judiciary) সকল প্রকার হস্তক্ষেপ এবং চাপ ও প্রভাবমুক্ত হতে হবে; যেন সরকার এবং জনগণ সকলের ব্যাপারে আইন অনুযায়ী পক্ষপাতহীন রায় দিতে পারে। ওপরে ৩ এবং ৫ নম্বর প্যারাগ্রাফে যেসব সীমারেখার উল্লেখ করা হয়েছে, তা কঠোরভাবে মেনে চলতে হবে। নিজের এবং অন্যের অভিলাষ দ্বারা প্রভাবিত না হয়ে সত্য এবং ন্যায়ের ভিত্তিতে মামলার রায় দেয়া হবে তার কর্তব্যঃ

**********************

-আল্লার নাযেলকৃত বিধান অনুযায়ী তাদের মধ্যে ফায়সালা করো এবং তাদের কামনা-বাসনা (খাহেশ)-এর অনুসরণ করো না। -আল-মায়েদাঃ৪৮

**********************

-নিজেদের নফসের কামনা-বাসনার অনুসরণ করো না। (এরূপ করলে) তা তোমাকে আল্লাহর পথ থেকে দূরে নিয়ে যাবে। -সাদঃ২৬

**********************

-মানুষের মধ্যে যখন ফায়সালা করবে, ইনসাফের সাথে করবে। -আন-নিসাঃ৫৮

তেরঃ রাষ্ট্রের লক্ষ্য

এ রাষ্ট্রকে দুটি মহৎ উদ্দেশ্যের জন্য কাজ করতে হবে।

একঃ মানব জীবনে ইনসাফ-সুবিচার প্রতিষ্ঠিত হোক; যুলুম-নির্যাতনের অবসান হোকঃ

**********************

-আমরা স্পষ্ট হেদায়াত দিয়ে আমাদের রাসূল প্রেরণ করেছি, আর তাদের সাথে কিতাব এবং আল-মিযান [মুজাহিদ কাতাদা ইত্যাকার তাফসীরকারকদের মতে মীযান অর্থ আদল ন্যায় বিচার। (ইবনে কাসীরঃ তাফসীরুল কুরআনিল আযীম, ৪র্থ খন্ড, পৃষ্ঠা-৩১৪; মাতবাআতু মুস্তফা মুহাম্মাদ, মিশর, ১৯৩৭)] নাযিল করেছি, যেন মানুষ ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করতে পারে। আমরা লোহা [লোহার অর্থ রাজনৈতিক শক্তি। এদ্বারা এদিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে যে, মানুষ ঔদ্ধত্য অবলম্বন করলে তাদের বিরুদ্ধে তরবারীর শক্তি প্রয়োগ করতে হবে। (আর-বাযীঃ মাফাতিহুল গায়েব, ৮ম খন্ড, পৃষ্ঠা-১০১, আল-মাতবাআতুশ শারফিয়া, মিশর, ১৩২৪ হিজরী)] নাযিল করেছি, যাতে রয়েছে কঠিন শক্তি এবং মানুষের জন্য কল্যাণ। -আল-হাদীদঃ২৫

দুইঃ সরকারী ক্ষমতা এবং উপায়-উপকরণ দ্বারা ‘সালাত প্রতিষ্ঠা’ এবং যাকাত আদায়ের ব্যবস্থা কায়েম করতে হবে – যা ইসলামী জীবনের স্তম্ভ। কল্যাণ এবং পূণ্যের উন্নতি সাধন করতে হবে। বিশ্বে ইসলামের আগমনের ইহাই আসল উদ্দেশ্য। অন্যায়-অকল্যাণের প্রতিরোধ করতে হবে। অন্যায় -অকল্যাণ আল্লার নিকট সবচেয়ে বেশী ঘৃণ্যঃ

**********************

-তারা এমন ব্যক্তি, আমরা তাদেরকে দুনিয়ায় ক্ষমতা দান করলে তারা সালাত প্রতিষ্ঠা করে, যাকাত দান করে, ন্যায়ের আদেশ করে অন্যায়ের প্রতিরোধ করে। -আল-হজ্জঃ৪১

 

চৌদ্দঃ মৌলিক অধিকার

এ ব্যবস্থায় বসবাসকারী মুসলিম অমুসলিম নাগরিকদের মৌলিক অধিকারগুলো এই। এসব অধিকার সংরক্ষণ করা রাষ্ট্রের কর্তব্য। [মৌলিক অধিকার সম্পর্কে আরও বিস্তারিত জানার জন্য মানুষের মৌলিক অধিকার তাফহীমাত, ৩য় খন্ড, ২৪৮-২৬৮ পৃষ্ঠা দ্রষ্টব্য]

(ক) জীবন সংরক্ষণঃ

**********************

-যে জীবনকে আল্লাহ হারাম-সম্মানার্হ করেছেন, হক ব্যতীত তাকে হত্যা করো না।

(খ) মালিকানার অধিকার সংরক্ষণঃ

**********************

-নিজেদের সম্পদ পরস্পরে অবৈধ পন্থায় ভক্ষণ করো না।

(গ) সম্মান-সম্ভ্রম সংরক্ষণঃ

**********************

-একদল যেন অপর দলকে ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ না করে। …. একে অপরকে দোষারোপ করো না, একে অন্যকে বিরূপ পদবী দিও না। …. একে অন্যের গীবত করো না-তার অনুপস্থিতিতে তাকে মন্দ বলো না। -আল-হুজুরাতঃ ১১-১২

(ঘ) ব্যক্তিগত জীবনের গোপনীয়তা সংরক্ষণঃ

**********************

-অনুমতি গ্রহণ না করে নিজেদের গৃহ ব্যতীত অপরের গৃহে প্রবেশ করো না। -নুরঃ২৭

**********************

-মানুষের গোপন কথা খুজে বেড়াইও না। – আল-হুজুরাতঃ১২

(ঙ) যুলুমের বিরুদ্ধে আওয়ায তুলবার অধিকারঃ

**********************

-প্রকাশ্য নিন্দাবাদ আল্লাহ পছন্দ করেন না, অবশ্য যদি কারো ওপর যুলুম হয়ে থাকে।

(চ) ন্যায়ের আদেশ এবং অন্যায় থেকে নিবৃত্ত করার অধিকার, সমালোচনার স্বাধীনতার অধিকারও এর পর্যায়ভুক্তঃ

**********************

-বনী-ইসরাইলের মধ্যে যারা কুফরী করেছে, দাউদ এবং ঈসা ইবনে মারইয়াম-এর ভাষায় তাদের ওপর লানত (অভিসম্পত) করা হয়েছে। এটা এজন্য যে, তারা নাফরমানী করেছিল; করেছিল বাড়াবাড়ি, সীমালংঘন। তারা একে অপরকে মন্দ কাজ করা থেকে বারণ করতো না। তারা যা করতো, কতই না মন্দ ছিল। -আল-মায়েদাঃ৭৮-৭৯

**********************

-যারা মন্দ কার্য থেকে বারণ করতো, আমরা তাদেরকে আযাব থেকে নিষ্কৃতি দিয়েছি; আর যালেমদের কঠোর আযাবে পাকড়াও করেছি-তারা যে ফিসক-পাপাচার করতো, তার প্রতিদানে। -আল-আরাফঃ১৬৫

**********************

-তোমরা সে সর্বোত্তম উম্মাত, মানুষের কল্যাণের জন্য যাদের সৃষ্টি। তোমরা ভাল কাজের আদেশ করবে, মন্দ কাজ থেকে বারণ করবে এবং আল্লার ওপর ঈমান রাখবে।

(ছ) সংগঠনের স্বাধীনতা (Freedom of Association) -এর অধিকার। অবশ্য এজন্য শর্ত এই যে, তা মঙ্গল-কল্যাণ কার্যে ব্যবহার হবে। সমাজে দলাদলি এবং মৌল-বিরোধ ছড়াবার কাজের মাধ্যম হিসেবে তাকে ব্যবহার করা হবে নাঃ

**********************

-তোমাদের মধ্যে এমন একটি দল থাকা বাঞ্ছনীয়, যারা কল্যাণের দিকে আহবান জানাবে, ভাল কাজের নির্দেশ দেবে, মন্দ কাজ থেকে বারণ করবে। এমন লোকেরাই হবে সফলকাম। যারা নানা দল-উপদলে বিভক্ত হয়েছে, স্পষ্ট হেদায়োত আসার পরও যারা মতভেদ করেছে, তোমরা তাদের মত হয়ো না। এমন লোকদের জন্য রয়েছে কঠোর শাস্তি।

(জ) বিবেক-বিশ্বাসের স্বাধীনতার অধিকারঃ

**********************

-দ্বীনে কোন যবরদস্তি নেই। -আল-বাকারাঃ ১৫৬

**********************

-মুমিন হয়ে যাওয়ার জন্য তুমি কি লোকদেরকে বাধ্য করবে?

**********************

-ফেতনা হত্যার চেয়েও মারাত্নক। -আল-বাকারাঃ ১৯১ [ফেতনার মানে কোন ব্যক্তির ওপর শক্তি প্রয়োগ করে তাকে নিজের দ্বীন পরিবর্তন করতে বাধ্য করা। (ইবনে জরীর, দ্বিতীয় খন্ড, পুষ্ঠা ৯১১)]

(ঝ) ধর্মীয় ব্যাপারে মনোকষ্ট থেকে মুক্ত থাকার অধিকারঃ

**********************

-আল্লাকে বাদ দিয়ে তারা যে সব উপাস্যকে ডাকে; তোমরা তাদের গালি দিও না।

এ ব্যাপারে কুরআনস্পষ্ট বলে দিয়েছেন যে, ধর্মীয় ব্যাপার নিয়ে তাত্বিক আলোচনা করা যেতে পারে; কিন্তু তা করতে হবে সুন্দরভাবে, উত্তম পন্থায়ঃ

**********************

-সুন্দর (Fair) পন্থা ব্যতীত আহলে কিতাবের সাথে বহছ করো না।

(ঞ) প্রত্যেক ব্যক্তি কেবল তার নিজের কাজের জন্যই দায়ী, একের কর্মের জন্য অপরকে পাকড়াও করা যাবে না-এ অধিকারঃ

**********************

-প্রত্যেক ব্যক্তি যে মন্দ কাজ করে, তার ফল তাকেই ভোগ করতে হয়, কোন ভার বহনকারী অপরের বোঝা বহন করে না। -আল-আনআমঃ১৬৫ [অর্থাৎ কোন অপরাধী যে অপরাধই করুক না কেন সে জন্য সে-ই দায়ী। সে ছাড়া অন্য ব্যক্তি ধৃত হবে না। তার নিজের অপরাধ ব্যতীত অন্যের অপরাধের দায়িত্ব তার ওপর অর্পিত হতে পারে না। (ইবনে জারীর, ৮ম খন্ড, পৃষ্ঠা-৮৩)]

**********************

-কোন ফাসেক পাপাচারী যদি তোমাদের কাছে কোন সংবাদ নিয়ে আসে, তবে অনুসন্ধান করো। এমন যেন না হয় যে, তোমরা না বুঝে-শুনে কোন দলের ক্ষতি করে বসো, আর নিজের কাজের জন্য পরিতাপ করো। -আল-জুজুরাতঃ৬

(ট) বিনা প্রমাণে এবং সুবিচারের সুবিহিত দাবী পূরণ না করে কোন ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা অবলম্বন করা যাবে না।-এ অধিকারঃ

**********************

-এমন কোন ব্যাপারের পেছনে পড়ো না, যার জ্ঞান তোমাদের নেই। বনী-ইসরাইলঃ৩৬

**********************

-মানুষের ব্যাপারে যখন ফায়সালা করবে, আদল (ন্যায়) এর সাথে ফায়সালা করবে। -আন-নিসাঃ৫৮

(ঠ) অভাবী এবং বঞ্চিত ব্যক্তিদেরকে তাদের জীবন ধারণের অপরিহার্য দ্রব্যসামগ্রী সরবরাহ করতে হবে-এ অধিকারঃ

**********************

-এবং তাদের সম্পদে সাহায্য প্রার্থী বঞ্চিতের অধিকার রয়েছে। আয-যাবিয়াতঃ১৯

(ড) রাষ্ট্র তার নাগরিকদের মধ্যে বিভেদ-বৈষম্য করবে না বরং সকলের সাথে সমান আচরণ করবে-এ অধিকারঃ

*********************

-ফেরাউন যমীনে ঔদ্ধত্য করেছে, যমীনে বাসিন্দাদেরকে নানা দলে বিভক্ত করেছে, তাদের একদলকে দূর্বল করে রাখতো সে …. নিশ্চিত সে বিপর্যয় সৃষ্টিকারীদের পর্যায়ভুক্ত ছিল।

 

পনেরঃ নাগরিকদের ওপর সরকারের অধিকার

এ ব্যবস্থায় নাগরিকদের ওপর সরকারের অধিকার গুলো এইঃ

(ক) তারা সরকারের আনুগত্য করবে, সরকারকে মেনে চলবেঃ

**********************

-আনুগত্য করো আল্লার এবং আনুগত্য করো রাসূলের, আর তাদের তোমাদের মধ্যে যারা উলিল আমর। -আন-নিসাঃ ৫৯

(খ) তারা আইন মেনে চলবে, শাসন-শৃংখলায় ফাটল ধরাবে নাঃ

**********************

-সংস্কার-সংশোধনের পর যমীনে বিপর্যয় সৃষ্টি করো না।

**********************

-যারা আল্লাহ এবং রাসূলের সাথে যুদ্ধ করে এবং যমীনে বিপর্যায় সৃষ্টি করে তাদের শাস্তি এইঃ তাদেরকে হত্যা করা হবে অথবা শুলিবিদ্ধ করা হবে ….। -আল-মায়েদাঃ ৩৩

(গ) তারা সরকারের সকল ভাল কাজে সহযোগিতা করবেঃ

**********************

-ভাল কাজ এবং তাকওয়ার ব্যাপারে তোমরা সহযোগিতা করো।

(ঘ) প্রতিরক্ষা কাজে তারা জান-মাল দ্বারা সর্বতোভাবে রাষ্ট্রের সাহায্য করবেঃ

**********************

-তোমাদের কি হয়েছে? আল্লার রাস্তায় বেরিয়ে পড়ার জন্য বলা হলে তোমরা যমীনকে আঁকড়ে ধরে থাকো। …. তোমরা যদি বেরিয়ে না পড়ো, আল্লাহ তোমাদেরকে কঠোর শাস্তি দেবেন এবং তোমাদের পরিবর্তে অন্য কওমকে এনে দাঁড় করাবেন, তোমরা তাঁর কোন ক্ষতিই করতে পারবে না। …. তোমরা বেরিয়ে পড়ো-হালকা হও বা ভারি হও। এবং জান-মাল দিয়ে আল্লার পথে জিহাদ করো। এটা তোমাদের জন্য উত্তম যদি তোমরা বুঝতে পারো। -আত-তাওবাঃ ৩৮-৪১

ষোলঃ বৈদেশিক রাজনীতির মূলনীতি

ইসলামী রাষ্ট্রের বৈদেশিক নীতি (Foreign Policy) সম্পর্কে কুরআন মাজীদে যেসব হেদায়েত দেয়া হয়েছে, তা এইঃ

(ক) চুক্তি -অঙ্গীকারের প্রতি সম্মান প্রদর্শন। চুক্তি ভঙ্গ করা একান্ত অপরিহার্য হয়ে পড়লে সে ব্যাপারে দ্বিতীয় পক্ষকে পূর্বাহ্নে অবহিত করতে হবেঃ

**********************

-চুক্তি-অঙ্গীকার পুরো করো, চুক্তি সম্পর্কে অবশ্যই জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।

**********************

-আল্লার সাথে কৃত অংঙ্গীকার পূর্ণ করো, যখন তোমরা অংঙ্গীকার করো। পাকা-পোক্ত শপথ করার পর তা ভঙ্গ করো না। …. সে মহিলার মতো হয়ো না যে আপন শ্রম-মেহনত দ্বারা সূতা কেটে পরে তা টুকরো টুকরো করে ফেলে। এক জাতি অন্য জাতির চেযে বেশী ফায়দা হাসিল করার জন্য তোমরা নিজেদের কসমকে নিজেদের মধ্যে প্রতারণার মাধ্যম করো না। আল্লাহ এদ্বারা তোমাদেরকে পরীক্ষায় ফেলেন। কেয়ামতের দিন তিনি অবশ্যই তোমাদের মত বিরোধের রহস্য উন্মেচন করবেন।

**********************

-দ্বিতীয় পক্ষের লোক যতক্ষন তোমাদের সাথে অঙ্গীকারে অটল থাকে, তোমরাও অটল থাকো। নিশ্চয় আল্লাহ মুত্তাকী-পরহেযগারদের পছন্দ করেন। -আত-তাওবাঃ ৭

**********************

-মুশরিকদের মধ্যে তোমরা যাদের সাথে অঙ্গীকার করেছো, অতঃপর তোমাদের সাথে ওফাদারীতে তারাও ত্রুটি করেনি, তোমাদের বিরুদ্ধে কারো সাহায্যও করেনি, তবে তাদের অঙ্গীকার মেয়াদ পর্যন্ত পূর্ণ করো। -আত-তাওবাঃ৪

**********************

-(আর যদি শত্রুর এলাকায় বসবাসকারী মুসলমানরা) তোমাদের কাছে সাহায্য চায়, তবে তাদের সাহায্য করা তোমাদের কর্তব্য। অবশ্য এমন কোন জাতির বিরুদ্ধে এ সাহায্য করা যাবে না, যাদের সাথে তোমাদের চুক্তি রয়েছে। -আল-আনফালঃ৪২

**********************

-কোন জাতির পক্ষ থেকে তোমাদের যদি খেয়ানত (চুক্তিভঙ্গ) এর আশংকা হয়, তা হলে (তাদের চুক্তি) তাদের প্রতি ছুড়ে মারো। অবশ্য সমতার প্রতি লক্ষ্য রেখে (তা করবে)। [অর্থাৎ তোমাদের এবং তাঁদের মধ্যে যে চুক্তি বা সন্ধি হয়েছিল, তা বাতিল হয়ে যাওয়ার খবর তাদেরকে দিয়ে দাও, যাতে তা বাতিল হওয়ার ব্যাপারে উভয় পক্ষ সমান হয়। আর তোমরা যদি তাদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা গ্রহণ কর, তখন অপর পক্ষ যেন এ ধারণায় না থাকে যে, তোমরা তাদের সাথে চুক্তি ভঙ্গ করেছ। (আল-জাসসাস, ৩য় খন্ড, পৃষ্ঠাঃ ৮৩] আল্লাহ নিশ্চয় খেয়ানতকারীকে পছন্দ করেন না। -আল আনফালঃ৫৮

(খ) কাজ-কর্মে বিশ্বস্ততা এবং সততাঃ

**********************

-তোমাদের শপথকে নিজেদের মধ্যে প্রতারণা-প্রবঞ্চনার মাধ্যম করো না। [অর্থাৎ প্রতারণা করার নিয়তে চুক্তি করবে না, যাতে অপর পক্ষ তো তোমাদের কসমের ভিত্তিতে তোমাদের পক্ষ হতে নিশ্চিত হয়ে যায় আর তোমাদের ইচ্ছা এই হয় যে, সুযোগ পেলে তোমরা লংঘন করবে। -ইবনে জারীর, ১৪শ খন্ড, পৃষ্ঠাঃ ১১২]

(গ) আন্তর্জাতিক ন্যায় বিচারঃ

**********************

-এবং কোন দলের শত্রুতা তোমাদেরকে যেন এতটুকু ক্ষিপ্ত না করে, যাতে তোমরা না ইনসাফ করে বসো। ন্যায় বিচার করো, তা তাকওয়ার নিকটবর্তী। -আল-মায়েদাঃ ৮

(ঘ) যুদ্ধে নিরপেক্ষ রাষ্ট্রসমূহের সীমারেখার মর্যাদাঃ

**********************

-যদি তারা (অর্থাৎ দুশমনের সাথে মিলিত মুনাফেকেরা) না মানে, তাহলে তাদেরকে পাকড়াও করো; যেখানে পাও, তাদেরকে হত্যা করো। …. তাদেরকে বাদে, যারা এমন কোন জাতির সাথে মিলিত হয়েছে, যাদের সাথে তোমাদের চুক্তি রয়েছে। -আন-নিসাঃ ৯০

(ঙ) সন্ধিকামিতাঃ

**********************

-তারা যদি সন্ধির প্রতি ঝুঁকে পড়ে, তবে তোমরাও ঝুঁকে পড়।

(চ) দুনিয়ার বিপর্যয় সৃষ্টি এবং শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা থেকে নিবৃত্তিঃ

**********************

-যমীনে যারা নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব-বাহাদুরী (প্রতিষ্ঠা করতে) চায় না বিপর্যয় সৃষ্টি করতে ; পরকালের নিবাস তো আমরা শুধু তাদের জন্যই নির্দিষ্ট করবো শুভ পরিণাম পরহেযগারদের জন্য।-আল-ক্বাসাসঃ৮৩

(ছ) শত্রুভাবাপন্ন নয়, এমন শক্তির সাথে বন্ধু সুলভ আচারণঃ

**********************

-যারা দ্বীনের ব্যাপারে তোমাদের সাথে যুদ্ধ করেনি, তোমাদের নিবাস থেকেও তোমাদেরকে বের করেনি, তাদের সাথে সদাচরণ এবং ইনসাফ করতে আল্লাহ তোমাদেরকে বারণ করেন না। ইনসাফকারীদেরকে আল্লাহ নিশ্চিত পছন্দ করেন। -আল-মুমতাহানাঃ৮

(জ) সদাচারীদের সাথে সদাচারঃ

**********************

-এহসানের বিনিময় এহসান ছাড়া অন্য কিছু কি হতে পারে ?

(ঝ) যারা বাড়াবাড়ি করে, তাদের সাথে ততটুকু বাড়াবাড়ি করো- যতটুকু তারা করেছে।

**********************

-সুতরাং যারা বাড়াবাড়ি করে, তোমরাও তাদের সাথে ততটুকু বাড়াবাড়ি করো, যতটুকু তারা করেছে। এবং আল্লাকে ভয় করো নিশ্চয় আল্লাহ মুত্তাকীদের সাথে আছেন। -বাকারাঃ ১৯৪

**********************

-আর যদি প্রতিশোধ নিতেই হয় তবে ততটুকু, যতটুকু তোমাদেরকে উত্যক্ত করা হয়েছে। আর যদি ধৈর্য ধারণ করো, তবে ধৈর্যধারণকারীদের জন্য তাই উত্তম। -আন-নাহালঃ ১২৬

**********************

-আর অন্যায়ের বিনিময়ের ততটুকু অন্যায়, যতটুকু অন্যায় করা হয়েছে। অতঃপর যে ক্ষমা করে দেয় এবং শুদ্ধি করে নেয়, তার বিনিময় আল্লার যিম্মায়। আল্লাহ যালেমদের পছন্দ করেন না। নির্যাতিত হওয়ার পর যারা প্রতিশোধ গ্রহণ করেছে, তাদের বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ নেই। অভিযোগ কেবল তাদের বিরুদ্ধে, যারা মানুষের ওপর যুলুম করে। যমীনে না-হক ঔদ্ধত্য করে। এসব লোকেদের জন্য রয়েছে কঠোর শাস্তি। -আশ-শুরাঃ ৪০-৪২

 

ইসলামী রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্য

কুরআনে এ ষোলটি দফায় রাষ্ট্রের যে চিত্র আমাদের সামনে ফুটে উঠেছে, তার উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্যগুলো এইঃ

একঃ একটি স্বাধীন জাতি সম্পূর্ণ স্বেচ্ছাপ্রণেদিত হয়ে মহান আল্লাহ রাবুল আলামিনের সামনে আত্মসমর্পন করবে, তাঁর অধীনে কর্তৃত্ব-সার্বভৌমত্বের পরিবর্তে খেলাফতের ভূমিকা গ্রহণ করে সে সব বিধি-বিধান এবং নির্দেশাবলী কার্যকরী করবে, আল-কুরআন এবং রাসূলের মাধ্যমে তিনি যা দান করেছেন। একটি স্বাধীন জাতির পক্ষ থেকে বুঝে শুনে এহেন ঘোষণার মাধ্যমে ইসলামী রাষ্ট্র অস্তিত্ব লাভ করে।

দুইঃ সার্বভৌমত্বকে আল্লার জন্য বিশেষিত করার সীমা পর্যন্ত সে রাষ্ট্র থিয়াক্রেসী (Theacracy)-এর বুনিয়াদী দর্শনের সাথে একমত। কিন্তু সে দর্শন কার্যকরী করার ব্যাপারে থিয়াক্রেসী থেকে তার পথ ভিন্ন হয়ে যায়। ধর্মীয় যাজকদের কোন বিশেষ শ্রেণীকে আল্লার বিশেষ ক্ষমতার ধারক বাহক করা এবং ‘হিল ও আকদ’ এর সমস্ত ক্ষমতা এ শ্রেণীর হাতে ন্যাস্ত করার পরিবর্তে ইসলামী রাষ্ট্র দেশের সীমানার মধ্যে বসবাসকারী সমস্ত ঈমানদারকে (যারা স্বেচ্ছায় সজ্ঞানে আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের সামনে আত্মসমর্পণের জন্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ) আল্লার খেলাফতের ধারক-বাহক প্রতিপন্ন করে। ‘হিল ও আকদ’-এর চূড়ান্ত ক্ষমতা সামগ্রিক ভাবে তাদের হাতে ন্যস্ত করে।

তিনঃ রাষ্ট্র-প্রতিষ্ঠা, পরিবর্তন, পরিচালন, সম্পূর্ণভাবে জনগণের রায় অনুযায়ী হতে হবে- জমহুরিয়াতের এ নীতিতে ইসলামী রাষ্ট্র গণতন্ত্র (Democracy)-র সাথে একমত। কিন্তু ইসলামী রাষ্ট্রের জনগণ লাগামহীন নয়। রাষ্ট্রের আইন-কানুন, জনগণের জীবন-যাপনের মূলনীতি, আভ্যন্তরীন এবং বৈদেশিক নীতি, রাষ্ট্রের উপায়-উপকরণ সব কিছুই জনগণের ইচ্ছানুযায়ী হবে, এমন নয়। এমনও হতে পারে না যে, যেদিকে জনগণ ঝুকে পড়বে, ইসলামী রাষ্ট্রও সেদিকেই নুয়ে পড়বে। বরং আল্লাহ-রাসূলের উর্ধ্বতন আইন তার নিজস্ব নিয়ম-নীতি, সীমারেখা, নৈতিক বিধি-বিধান এবং নির্দেশাবলী দ্বারা জনগণের ইচ্ছা-বাসনার উপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে থাকে। রাষ্ট্র এমন এক সুনির্দিষ্ট পথে চালিত হয়, তার পরিবর্তন সাধনের ক্ষমতা-ইখতিয়ার, শাসন বিভাগ, আইন বিভাগ, বিচার বিভাগ- কারোই নেই। সামগ্রিকভাবে গোটা জাতিরও নেই সে ক্ষমতা-ইখতিয়ার। হ্যাঁ, জাতি যদি তার প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে ঈমানের বৃত্ত থেকে দূরে সরে যেতে চায়, তা স্বতন্ত্র কথা।

চারঃ ইসলামী রাষ্ট্র একটি আদর্শভিত্তক রাষ্ট্র। সে রাষ্ট্র পরিচালনা স্বভাবতই তাদের কাজ হতে পারে, যারা তার মৌলিক দর্শন এবং বিধি-বিধান স্বীকার করে। কিন্তু তা স্বীকার করে না- এমন যতো ব্যক্তিই সে রাষ্ট্র সীমায় আইনের অনুগত হয়ে বাস করতে রাজী হয়, তাদেরকে সে সব নাগরিক অধিকার পুরোপুরিই দেয়, যা দেয় রাষ্ট্রের আদর্শ এবং মূলনীতি মেনে চলতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ নাগরিকদেরকে।

পাঁচঃ তা এমন এক রাষ্ট্র, যা বংশ, বর্ণ, ভাষা এবং ভৌগলিক জাতীয়তার পরিবর্তে শুধু নীতি আদর্শের উপর প্রতিষ্ঠিত। পৃথিবীর যে কোন অঞ্চলের মানবজাতির যে কোন সদস্য ইচ্ছা করলে সে সব মূলনীতি স্বীকার করে নিতে পারে; কোন প্রকার ভেদ-বৈষম্য ছাড়াই সম্পূর্ণ সমান অধিকার নিয়ে সে ব্যবস্থার অন্তর্ভূক্ত হতে পারে। এ আদর্শের ভিত্তিতে বিশ্বের যেখানেই কোন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হবে, নিশ্চিত তা হবে ইসলামী রাষ্ট্র, তা আফ্রিকায় হোক বা এশিয়ায়; সে রাষ্ট্রের পরিচালকমন্ডলী কালো হোক বা সাদা বা হরিদ্র। এধরনের একটি নিরঙ্কুশ আইনভিত্তিক রাষ্ট্রের বিশ্ব-রাষ্ট্রে (World state) রুপান্তরিত হওয়ায় কোন প্রতিবন্ধকতা নেই। পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলেও যদি এ ধরনের অনেক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়, তাও হবে ইসলামী রাষ্ট্র। কোন জাতীয়তাবাদী দ্বন্দ-সংঘাতের পরিবর্তে সে সব রাষ্ট্রের মধ্যে পরিপূর্ণ ভ্রাতৃসুলভ সহযোগিতা সম্ভব। কোনও এক সময় তারা একমত হয়ে বিশ্ব-ফেডারেশন (World-federation) -প্রতিষ্ঠা করতে পারে।

ছয়ঃ রাজনীতিকে স্বার্থের পরিবর্তে নীতি নৈতিকতার অনুগত করা এবং আল্লাভীতি-পরহেযগারীর সাথে তা পরিচালনা করা সে রাষ্ট্রের মৌল প্রানশক্তি (Real Spirit)। নৈতিক-চারিত্রিক শ্রেষ্ঠত্বই সেখানে শ্রেষ্ঠত্বের একমাত্র ভিত্তি-একক মানদন্ড। সে রাষ্ট্রের পরিচালকমন্ডলী এবং ‘আহলুল হিল ওয়ার আকদ’-এর নির্বাচনের ব্যাপারেও শারীরিক মানসিক যোগ্যতার সাথে নৈতিক পবিত্রতাও সর্বাধিক লক্ষ্যণীয় ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তার সকল আভ্যান্তরীণ প্রশাসন বিভাগকেও পরিচালিত হতে হবে দিয়ানাত আমানত-সততা-বিশ্বস্ততা পক্ষপাতমুক্ত নির্ভিক ইনসাফ-সুবিচারের ভিত্তিতে। আর তার বৈদেশিক নীতিকেও প্রতিষ্ঠিত হতে হবে সম্পূর্ণ এবং সদাচরণের ভিত্তির ওপর।

সাতঃ নিছক পুলিশের দায়িত্ব পালন করার জন্য এ রাষ্ট্র নয়। শুধু আইন-শৃংখলা প্রতিষ্ঠা করা এবং দেশের সীমান্ত রক্ষা করা তার কাজ নয়; বরং তা হচ্ছে একটি আদর্শভিত্তিক রাষ্ট্র। সামাজিক সুবিচার, ন্যায়ের বিকাশ আর অন্যায়ের বিনাশ সাধনের নিমিত্ত তাকে নেতিবাচকভাবে কাজ করতে হবে।

আটঃ অধিকার, মর্যাদা এবং সুযোগ-সুবিধার সাম্য, আইনের শাসন, ভাল কাজে সহযোগিতা, খারাপ কাজে অসহযোগিতা, আল্লার সম্মুখে দায়িত্বের অনুভূতি, অধিকারের চেয়েও বড় করে কর্তব্যের অনুভূতি, ব্যক্তি সমাজ এবং রাষ্ট্র-সকলের এক লক্ষ্যে ঐক্যমত, সমাজের কোন কোন ব্যক্তিকে জীবন যাপনের অপরিহার্য উপাদান-উপকরণ থেকে বঞ্চিত থাকতে না দেয়া এসব হচ্ছে সে রাষ্ট্রের মৌলিক মূল্যমান (Basic Values)।

নয়ঃ এ ব্যবস্থায় ব্যক্তি এবং রাষ্ট্রের মধ্যে এমন এক ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে যে, রাষ্ট্র লাগামহীন এবং সামগ্রীক ক্ষমতার অধিকারী হয়ে ব্যক্তিকে নিরীহ দাসে পরিণত করতে পারে না, আর ব্যক্তিও সীমাহীন স্বাধীনতা পেয়ে ঔদ্ধত্যপরায়ন এবং সামাজিক স্বার্থের দুশমন হতে পারে না। এতে ব্যক্তিকে একদিকে মৌলিক অধিকার দিয়ে এবং রাষ্ট্রকে উর্ধ্বতন আইন এবং শুরার অনুগত করে ব্যক্তি সত্ত্বার উদ্ভব-বিকাশের সকল সুযোগ-সুবিধা দান করা হয়েছে; ক্ষমতার অবাঞ্ছিত হস্তক্ষেপ থেকে ব্যক্তিকে করা হয়েছে নিরাপদ; কিন্তু অপরদিকে ব্যক্তিকে নৈতিক নীতিমালার ডোরে শক্তভাবে বেঁধে দেয়া হয়েছে। তার ওপর এ কর্তব্যও আরোপ করা হয়েছে যে, রাষ্ট্র আল্লার বিধান অনুযায়ী কাজ করলে মনে-প্রাণে রাষ্ট্রের আনুগত্য করবে, ভাল কাজে তার সর্বতোভাবে সহযোগিতা করবে, রাষ্ট্র শৃংখলায় ফাটল ধরানো থেকে বিরত থাকবে, তার সংরক্ষণ কাজে জানমাল দিয়ে যে কোন ধরনের ত্যাগ স্বীকারে যেন বিন্দুমাত্র কুন্ঠাবোধও না করে।

Top

দ্বিতীয় অধ্যায়

ইসলামের শাসন-নীতি

ইতিপূর্বে কোরআন মাজীদের যে রাজনৈতিক শিক্ষা বর্ণিত হয়েছে তা বাস্তবে রূপায়িত করাই ছিল রাসুলুল্লাহ (সঃ)-এর কাজ। তাঁর নেতৃত্বে ইসলামের অভ্যূদয়ের পর যে মুসলিম সমাজ অস্তিত্ব লাভ করে এবং হিজরতের পর রাজনৈতিক শক্তি অর্জন করে তা যে রাষ্ট্রের রূপ গ্রহণ করে, তার ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত ছিল কুরআন মজীদের রাজনৈতিক শিক্ষার ওপর ইসলামী শাসন ব্যবস্থার নিম্নোক্ত বৈশিষ্ট্য তাকে অন্যান্য শাসন ব্যবস্থা থেকে পৃথক করে।

একঃ আল্লার আইনের কর্তৃত্ব

এ রাষ্ট্রের প্রথম মূলনীতি ছিল এই যে, একমাত্র আল্লাহ তায়ালাই সার্বভৌমত্বের অধিকারী এবং ঈমানদারদের শাসন হচ্ছে মূলতঃ খেলাফত বা আল্লার প্রতিনিধিত্বশীল শাসন। কাজেই বলগাহীন ভাবে কাজ করার তার কোন অধিকার নেই। বরং আল্লাহর কিতাব ও তাঁর রাসূলের সুন্নাতের উৎস থেকে উৎসারিত আল্লাহর আইনের অধীনে কাজ করা তার অপরিহার্য কর্তব্য। কুরআন মজীদের যেসব আয়াতে এ মূলনীতি বর্ণিত হয়েছে আগের অধ্যায়ে আমরা তা উল্লেখ করেছি। তন্মদ্ধে বিশেষ করে নিম্নোক্ত আয়াতগুলো এ ব্যাপারে একান্ত স্পষ্টঃ

আন-নিসাঃ ৫৯, ৬৪, ৬৫, ৮০, ১০৫; আল-মায়েদাঃ ৪৪, ৪৫, ৪৭; আল-আরাফঃ ৩; ইউসুফঃ ৪০; আন-নূরঃ ৫৪, ৫৫; আল-আহযাবঃ ৩৬ এবং আল-হাশরঃ ৭।

নবী (সঃ)-ও তার অসংখ্য বাণীতে এ মূলনীতি অত্যান্ত স্পষ্টভাবে ব্যক্ত করেছেনঃ

*********************

-আল্লার কিতাব মেনে চলা তোমাদের জন্য অপরিহার্য। আল্লার কিতাব যা হালাল করে দিয়েছে তোমরা তাকে হালাল মনে করো, আর যা হারাম করেছে, তোমরা তাকে হারাম মনে করো। [কানযুল ওম্মাল, ত্বাবরানী এবং মুসনাদে আহমাদের উদ্ধৃতিতে, ১ম খন্ড, হাদীস নং-৯০৭-৯৬৬; দায়েরাতুল মায়ারেফ, হায়দরাবাদ সংস্করণ ১৯৫৫।]

*********************

-আল্লাহ তাআলা কিছু ফরায়েয নির্ধারণ করে দিয়েছেন, তোমরা তা নষ্ট করো না, কিছু হারাম বিষয় নির্দিষ্ট করেছেন, তোমরা তা লংঘন করো না, কিছু সীমা নির্ধারণ করেছেন, তোমরা তা অতিক্রম করো না, ভুল না করেও কিছু ব্যাপারে মৌনতা অবলম্বন করেছেন, তোমরা তার সন্ধানে পড়ো না। [মিশকাত, দারেকুতনীর উদ্ধৃতিতে-বাবুল ইতিসাম বিল কিতাবে ওয়াস সুন্নাহ, কানযুল ওম্মাল, ১ম খন্ড, হাদীস নং-৯৮১, ৯৮২।]

*********************

-যে ব্যক্তি আল্লার কিতাব মেনে চলে, সে দুনিয়ায় পথভ্রষ্ট হবে না, পরকালেও হবে না সে হতভাগা। [মিশকাত, রাযীন-এর উদ্ধৃতিতে উল্লেখিত অধ্যায়।]

*********************

-আমি তোমাদের মধ্যে দুটি জিনিস রেখে যাচ্ছি, যতক্ষণ তোমরা তা দৃঢ়ভাবে ধারণ করে থাকবে, কখনো পথভ্রষ্ট হবে না, -আল্লার কিতাব এবং তাঁর রাসূলের সুন্নাহ। [মিশকাত মুয়াত্তার উদ্ধৃতিতে, আলোচ্য অধ্যায়, কানযুল ওম্মাল, ১ম খন্ড, হাদীস নং-৮৭৭, ৯৪৯, ৯৫৫, ১০০১।]

আমি তোমাদেরকে যে বিষয়ের নির্দেশ দিয়েছি, তা গ্রহণ করো, আর যে বিষয় থেকে বারণ করছি, তা থেকে তোমরা বিরত থাক। [কানযুল ওম্মাল, ১ম খন্ড, হাদীস নং-৮৬৬।]

দুইঃ আদল-সকল মানুষের প্রতি সুবিচার

দ্বিতীয় যে মুলনীতির ওপর সে রাষ্ট্রের ভিত্তি স্থাপিত হয়েছিল, তা ছিল এ কুরআন-সুন্নার দেয়া আইন সকলের জন্য সমান, রাষ্ট্রের সামান্যতম ব্যক্তি থেকে শুরু করে রাষ্ট্র প্রধান পর্যন্ত সকলের উপর তা সমভাবে প্রয়োগ করা উচিত। তাতে কারো জন্য কোন ব্যতিক্রমধর্মী আচরণের বিন্দু মাত্র অবকাশ নেই। কুরআন মাজীদে আল্লাহ তায়ালা তাঁর নবীকে এ কথা ঘোষণা করার নির্দেশ দিচ্ছেনঃ

*********************

-এবং তোমাদের মধ্যে আদল-সুবিচার কায়েম করার জন্য আমাকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

অর্থাৎ পক্ষপাতমুক্ত সুবিচার-নীতি অবলম্বন করার জন্য আমি আদিষ্ট ও নিয়োজিত। পক্ষপাতিত্বের নীতি অবলম্বন করে কারো পক্ষে বা বিপক্ষে যাওয়া আমার কাজ নয়। সকল মানুষের সাথে আমার সমান সম্পর্ক-আর তা হচ্ছে আদল ও সুবিচারের সম্পর্ক। সত্য যার পক্ষে, আমি তার সাথী; সত্য যার বিরুদ্ধে, আমি তার বিরোধী। আমার দ্বীনে কারও জন্য কোন পার্থক্য মূলক ব্যবহারের অবকাশ নেই। আপন-পর, ছোট-বড়, শরীফ-কমীনের জন্য পৃথক পৃথক অধিকার সংরক্ষিত নেই। যা সত্য তা সকলের জন্যই সত্য; যা গুনাহ, তা সকলের জন্যই গুনাহ; যা হারাম, তা সবার জন্যই হারাম; যা হালাল, তা সবার জন্যই হালাল; যা ফরয, তা সকলের জন্যই ফরয। আল্লার আইনের এ সর্বব্যপী প্রভাব থেকে আমার নিজের সত্ত্বাও মুক্ত নয়, নয় ব্যতিক্রম। নবী (সঃ) নিজে এ মূলনীতি বর্ণনা করেছেন এভাবেঃ

*********************

-তোমাদের পূর্বে যেসব উম্মাত অতিক্রান্ত হয়েছে, তারা এ জন্য ধ্বংস হয়েছে যে, নিম্ন পর্যায়ের অপরাধীদেরকে আইন অনুযায়ী শাস্তি দান করতো, আর উচ্চ পর্যায়ের অপরাধীদেরকে ছেড়ে দিতো। সে সত্তার শপথ, যাঁর হাতে মুহাম্মাদের প্রাণ নিহিত, (মুহাম্মাদের আপন কন্যা) ফাতেমাও যদি চুরি করতো, তবে আমি অবশ্যই তার হাত কেটে ফেলতাম। [বুখারী, কিতাবুল হুদূদ, অধ্যায়ঃ ১১-১২]

হযরত উমর (রাঃ) বলেনঃ

*********************

-আমি নিজে রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে আপন সত্তা থেকে প্রতিশোধ গ্রহণ করতে দেখেছি। [কিতাবুল খারাজ, ইমাম আবু ইউসুফ, পৃষ্ঠা-১১৬, আল-মাতবাআতুস সলফিয়া, মিশর, ২য় সংস্করণ, ১৩৫২ হিঃ; মুসনাদে আবু দাউদ আত-তায়ালেসী, হাদীস নং-৫৫, দায়েরাতুল মাআরেফ হায়দারাবাদ সংস্করণ, ১৩২১ হিজরী।]

তিনঃ মুসলমানদের মধ্যে সাম্য

এ রাষ্ট্রের তৃতীয় মূলনীতি ছিল, বংশ-বর্ণ-ভাষা এবং দেশ-কাল নির্বিশেষে সকল মুসলমানের অধিকার সমান। এ রাষ্ট্রের পরিসীমায় কোন ব্যক্তি, গোষ্ঠি, দল, বংশ বা জাতি কোন বিশেষ অধিকার লাভ করতে পারে না।

কুরআন মাজীদে আল্লাহ তায়ালা বলেনঃ

*********************

-মুমিনরা একে অন্যের ভাই। -আল-হুজুরাতঃ ১০

*********************

-হে মানব মন্ডলী। এক পুরুষ এবং নারী থেকে আমি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছি। আর তোমাদেরকে নানা গোত্র, নানা জাতিতে বিভক্ত করেছি, যেন তোমরা একে অপরকে চিনতে পারো। মূলত আল্লার নিকট তোমাদের মধ্যে সে ব্যক্তি সবচেয়ে বেশী সম্মানার্হ, যে সবচেয়ে বেশী আল্লাকে ভয় করে। -আল-হুজরাতঃ১৩

নবী (সঃ)-এর নিম্নোক্ত উক্তি এ মূলনীতিকে আরও স্পষ্ট করে ব্যক্ত করেছেঃ

*********************

-আল্লাহ তোমাদের চেহারা এবং ধন-সম্পদের দিকে তাকান না বরং তিনি অন্তর ও কার্যাবলীর দিকে তাকান। [তাফসীরে ইবনে কাসীর, মুসলিম এবং ইবনে মাজার উদ্ধৃতিতে, চতুর্থ খন্ড, পৃষ্ঠা-২১৭, মুস্তফা মুহাম্মদ প্রেস, মিশর-১৯৩৭।]

*********************

-মুসলমানরা ভাই ভাই। কারো ওপর কারো কোন ফযীলত নেই কিন্তু তাকওয়ার ভিত্তিতে। [তাফসীরে ইবনে কাসীর, তিবরাণীর উদ্ধৃতিতে, ৪র্থ খন্ড, পৃষ্ঠা-২১৭।]

*********************

-হে মানব জাতি। শোন, তোমাদের রব এক। অনারবের ওপর আরবের আর আরবের ওপর অনারবের কোন মর্যাদা নেই। সাদার ওপর কালোর বা কালোর ওপর সাদারও নেই কোন শ্রেষ্ঠত্ব। হাঁ, অবশ্য তাকওয়ার বিচারে। [তসীরে রুহুল মাআনী, বায়হাকী এবং ইবনে মারদুইয়ার উদ্ধৃতিতে ২৬শ খন্ড, পৃষ্ঠা-১৪৮, ইদরাতুত তাবয়াতিল মুনিরিয়া, মিশর।]

*********************

-যে ব্যক্তি সাক্ষ্য দেয় যে, আল্লাহ ব্যতীত কোন ইলাহ নেই, আমাদের কেবলার দিকে মুখ করে, আমাদের মত সালাত আদায় করে, আমাদের জবাই করা জন্তু খায়, সে মুসলমান। মুসলমানের যে অধিকার, তারও সে অধিকার, মুসলমানের যে কর্তব্য, তারও সে কর্তব্য। [বুখারী, কিতাবুস সালাত, অধ্যায়-২৮]

*********************

-সকল মুমিনের রক্তের মর্যাদা সমান, অন্যের মুকাবিলায় তারা সবাই এক। তাদের একজন সামান্যতম ব্যক্তিও তাদের পক্ষ থেকে দায়িত্ব নিতে পারে। [আবু দাউদ, কিতাবুদ দিয়াত, অধ্যায়-১১, নাসায়ী, কিতাবুল কাসামাত, অধ্যায়-১০, ১৪]

*********************

মুসলমানদের ওপর জিজিয়া আরোপ করা যেতে পারে না। [আবু দাউদ, কিতাবুল ইমরত, অধ্যায়-৩৪]

 

চারঃ সরকারের দায়িত্ব ও জবাবদিহি

এ রাষ্ট্রের চতুর্থ গুরুত্বপূর্ণ মূলনীতি ছিল, শাসন কর্তৃত্ব এবং তার ক্ষমতা-ইখতিয়ার ও অর্থ-সম্পদ আল্লাহ এবং মুসলমানের আমানত। আল্লাভীরু, ঈমানদার ও ন্যায়পরায়ণ লোকদের হাতে তা ন্যাস্ত করা উচিত। কোন ব্যক্তি নিজের ইচ্ছামত বা স্বার্থবুদ্ধি প্রোণোদিত হয়ে এ আমানতে খেয়ানত করার অধিকার রাখে না। এ আমানত যাদের সোপর্দ করা হবে তারা এজন্য জবাবদিহি করতে বাধ্য। আল্লাহ তয়ালা কুরআন মাজীদে বলেনঃ

*********************

আমানত বহনের যোগ্য ব্যক্তিদের হাতে আমানত সোপর্দ করার জন্য আল্লাহ তোমাদেরকে নির্দেশ দিচ্ছেন। আর যখন মানুষের মধ্যে ফায়সালা করবে। ন্যায়নীতির সাথে ফায়সালা করবে আল্লাহ তোমাদেরকে ভালো উপদেশ দিচ্ছেন। নিশ্চয় আল্লাহ সব কিছু শোনেন ও দেখেন।

রাসুলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ

*********************

-সাবধান। তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেককেই তার দায়িত্ব সম্পর্কে জবাবদিহি করতে হবে। মুসলমানদের সবচেয়ে বড় নেতা-যিনি সকলের ওপর শাসক হন-তিনিও দায়িত্বশীল তাঁকেও তাঁর দায়িত্ব সম্পর্কে জবাবদিহি করতে হবে। [বুখারী, কিতাবুর আহকাম, অধ্যায়-১। মুসলিম, কিতাবুল এমারত, অধ্যায়-৫।]

*********************

যিনি মুসলিম প্রজাদের কাজ-কারবারের প্রধান দায়িত্বশীল, কোনো শাসক যদি তাদের সাথে প্রতারণা এবং খেয়ানতকারী অবস্থায় মারা যান তাহলে আল্লাহ তার জন্য জান্নাত হারাম করে দেবেন। [বুখারী, কিতাবুর আহকাম, অধ্যায়-৮। মুসলিম, কিতাবুল ঈমান, অধ্যায়-৬১; কিতাবুল এমারাত, অধ্যায়-৫।]

*********************

-মুসলিম রাষ্ট্রের কোন পদাধিকারী শাসক যিনি নিজের পদের দায়িত্ব পালন করার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করেন না, নিষ্ঠার সাথে কাজ করেন না; তিনি কখনো মুসলমানদের সাথে জান্নাতে প্রবেশ করবেন না। [মুসলিম, কিতাবুল এমারত, অধ্যায়-৫।]

*********************

-(নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম হযরত আবু যারকে বলেন) আবু যার! তুমি দুর্বল মানুষ, আর সরকারের পদ-মর্যাদা একটা আমানত। কেয়ামতের দিন লজ্জা এবং অপমানের কারণ হবে; অবশ্য তার জন্য নয়, যে পুরোপুরি তার হক আদায় করে এবং তার ওপর অর্পিত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করে। [কানযুল ওম্মার, ৬ষ্ঠ খন্ড, হাদীস নং-৬৮, ১২২।]

*********************

-শাসকের জন্য আপন প্রজাদের মধ্যে ব্যবসা করা সবচেয়ে নিকৃষ্ট খেয়ানত। [কানযুল ওম্মার, ৬ষ্ঠ খন্ড, হাদীস নং-৭৮।]

*********************

-যে ব্যক্তি আমাদের রাষ্ট্রের কোন পদ গ্রহণ করে, তার স্ত্রী না থাকলে বিবাহ করবে, খাদেম না থাকলে একজন খাদেম গ্রহণ করবে, ঘর না থাকলে একখানা ঘর করে নেবে, (যাতায়াতের) বাহন না থাকলে একটা বাহন গ্রহণ করবে। যে ব্যক্তি এর চেয়ে বেশী অগ্রসর হয়, সে খেয়ানতকারী অথবা চোর। [কানযুল ওম্মার, ৬ষ্ঠ খন্ড, হাদীস নং-৩৪৬।]

*********************

-যে ব্যক্তি শাসক হবে, তাকে সবচেয়ে কঠিন হিসাব দিতে হবে, আর সবচেয়ে কঠিন আযাবের আশংকায় পতিত হবে। আর যে ব্যক্তি শাসক হবে না, তাকে হালকা হিসেব দিতে হবে, তার জন্য হালকা আযাবের আশংকা আছে। কারণ শাসকের মাধ্যমে মুসলমানদের ওপর যুলুমের সম্ভাবনা অনেক বেশী। আর যে ব্যক্তি মুসলমানদের ওপর যুলুম করে, সে আল্লার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে। [কানযুল ওম্মার, ৫ম খন্ড, হাদীস নং-২৫০৫।]

হযরত উমর (রাঃ) বলেনঃ

*********************

-ফোরাত নদীর তীরে যদি একটি বকরীর বাচ্চাও হারিয়ে যায় (বা ধ্বংস হয়) তবে আমার ভয় হচ্ছে, আল্লাহ আমাকে সে জন্য জিজ্ঞাসাবাদ করবেন। [কানযুল ওম্মার, ৫ম খন্ড, হাদীস নং-২৫১২।]

পাঁচঃ শুরা বা পরামর্শ

এ রাষ্ট্রের পঞ্চম গুরুত্বপূর্ণ মূলনীতি ছিল মুসলমানদের পরামর্শ এবং তাদের পারস্পারিক সম্মতি ক্রমে রাষ্ট্রপ্রধান নিযুক্ত হতে হবে। তাঁকে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা পরিচালনাও করতে হবে পরামর্শের ভিত্তিতে। কুরআন মজীদে বলা হয়েছেঃ

*********************

-আর মুসলমানদের কাজকর্ম (সম্পন্ন হয়) পারস্পরিক পরামর্শ ক্রমে।

*********************

-হে নবী। কাজ-কর্মে তাদের সাথে পরামর্শ করো।

হযরত আলী (রাঃ) বলেনঃ আমি রাসুল্লাহ (সঃ) এর খেদমতে আরয করি যে, আপনার পর আমাদের সামনে যদি এমন কোন বিষয় উপস্থিত হয়, যে সম্পর্কে কুরআনে কোন নির্দেশ না থাকে এবং আপনার কাছ থেকেও সে ব্যাপারে আমরা কিছু না শুনে থাকি, তখন আমরা কি করবো?

তিনি বলেনঃ

*********************

-এ ব্যাপারে দ্বীনের জ্ঞান সম্পন্ন এবং ইবাদত গুযার ব্যক্তিদের সাথে পরামর্শ কর এবং কোন ব্যক্তি বিশেষের রায় অনুযায়ী ফায়সালা করবে না। [হাদীসে ইবাদতগুযার অর্থে এমন সব ব্যক্তিদেরকে বুঝানো হয়েছে, যারা আল্লার বন্দেগী করে, স্বাধীনভাবে নিজের মন মতো কাজ করে না। এ থেকে এই অর্থ গ্রহণ করা ঠিক নয় যে, যাদের কাছ থেকে পরামর্শ গ্রহণ করা হবে, কেবল তাদের ইবাদতগুযারীর গুণটিই দেখে নেয়া হবে; মতামত এবং পরামর্শ দানের যোগ্যতা দানের সম্পন্ন হওয়ার জন্য অন্যান্য যেসব গুণাবলী প্রয়োজন, তার প্রতি ভ্রুক্ষেপ করা হবে না।]

হযরত উমর (রাঃ) বলেনঃ

*********************

-মুসলমানদের পরামর্শ ছাড়া যে ব্যক্তি তার নিজের বা অন্য কারো নেতৃত্বের (এমারত) প্রতি আহবান জানায়, তাকে হত্যা না করা তোমাদের জন্য হালাল নয়। [কানযুল ওম্মাল, ৫ম খন্ড, হাদীস নং-২৫৭৭। হযরত ওমর (রাঃ)-এর এ উক্তির তাৎপর্য এই যে, ইসলামী রাষ্ট্রে কোন ব্যক্তির জোর-পূর্বক চেপে বসার চেষ্টা করা এক মারাত্মক অপরাধ, তা বরদাস্ত করা উম্মাতের উচিত নয়।]

অপর এক বর্ণনায় হযরত ওমর (রাঃ)-এর এ উক্তি বর্ণিত আছেঃ

*********************

পরামর্শ ব্যতীত কোন খেলাফত নেই। [কানযুর ওম্মাল, ৫ম খন্ডম হাদীস নং-২৩৫৪]

 

ছয়ঃ ভাল কাজে আনুগত্য

৬ষ্ঠ মূলনীতি-যার ওপর এ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল-এই ছিল যে, কেবল মাত্র মা’রূফ-ভাল কাজেই-সরকারের আনুগত্য অপরিহার্য। পাপাচারে (মাসিয়াত) আনুগত্য পাওয়ার অধিকার কারুর নেই। অন্য কথায়, এ মূলনীতির তাৎপর্য এই যে, সরকার এবং সরকারী কর্মকর্তাদের কেবল সেসব নির্দেশই তাদের অধীন ব্যক্তিবর্গ এবং প্রজাবৃন্দের জন্য মেনে চলা ওয়াজেব, যা আইনানুগ। আইনের বিরুদ্ধে নির্দেশ দেয়ার তাদের কোন অধিকার নেই; তা মেনে চলাও কারো উচিত নয়। কুরআন মজিদে স্বয়ং রাসুলুল্লাহ (সাঃ)-এর বায়’আত-আনুগত্যের শপথ গ্রহণকেও মারূফে আনুগত্যের শর্তে শর্তযুক্ত করা হয়েছে। অথচ তাঁর পক্ষ থেকে কোন মা’সিয়াত (পাপাচার) এর নির্দেশ আসার কোন প্রশ্নই ওঠে নাঃ

*********************

-এবং কোন মারূফ কাজে তারা আপনার নাফরমানী-অবাধ্যতা করবে না।

রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেনঃ

*********************

-একজন মুসলমানের ওপর তার আমীরের আনুগত্য করা-শোনা এবং মেনে চলা-ফরয; তা তার পছন্দ হোক বা না হোক, যতক্ষণ তাকে কোন মাসিয়াত-পাপাচারের নির্দেশ না দেয়া হয়। মাসিয়াত-এর নির্দেশ দেয়া হলে কোন আনুগত্য নেই। [বুখারী, কিতাবুল আহকাম, অধ্যায়-৪। মুসলিম, কিতাবুল এমারত, অধ্যায়-৮। আবু দাউদ, কিতাবুল জিহাদ, অধ্যায়-৯৫। নাসায়ী, কিতাবুল বায়আত, অধ্যায়-৩৩। ইবনে মাজা, আবওয়াবুল জিহাদ, অধ্যায়-৪০।]

-আল্লার নাফরমানীতে কোন আনুগত্য নেই, আনুগত্য কেবল মারূফ কাজে। [মুসলিম, কিতাবুল এমারত, অধ্যায়-৮। আবু দাউদ, কিতাবুল জিহাদ, অধ্যায়-৯৫। নাসায়ী, কিতাবুল বায়আত, অধ্যায়-৩৩।]

নবী (সাঃ) এর বিভিন্ন উক্তিতে বিভিন্নভাবে এ বিষয়টি উল্লেখিত হয়েছে। কোথাও তিনি বলেছেন ****** (যে আল্লার নাফরমানী করে, তার জন্য কোন আনুগত্য নেই), কখনো বলেছেনঃ **************** (স্রষ্টার নাফরমানীতে সৃষ্টির কোন আনুগত্য নেই), কখনো বলেছেনঃ ***************** (যে আল্লার আনুগত্য করে না তার জন্য কোন আনুগত্য নেই), কখনো বলেছেনঃ ********************** (যে শাসক তোমাকে কোন মা’সিয়াত-এর নির্দেশ দেয় তার আনুগত্য করো না)। [কানযুল ওম্মাল, ৬ষ্ঠ খন্ড, হাদীস নং-২৯৩, ২৯৪, ২৯৫, ২৯৬, ২৯৯, ৩০১।]

হযরত আবুবকর রাঃ) তাঁর এক ভাষণে বলেনঃ

*********************

-যে ব্যক্তিকে মুহাম্মদ (সাঃ)-এর উম্মাতের কোন কাজের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে, কিন্তু সে লোকদের মধ্যে আল্লার কিতাব অনুযায়ী কাজ করেনি, তার ওপর আল্লার লানত-অভিসম্পাত। [কানযুল ওম্মাল, ৫ম খন্ডম হাদীস নং-২৫০৫]

এ কারণেই খলীফা হওয়ার পর তিনি তাঁর প্রথম ভাষণেই ঘোষণা করেছিলেনঃ

*********************

-যতক্ষণ আমি আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের আনুগত্য করি, তোমরা আমার আনুগত্য করো। যখন আমি আল্লাহ এবং রাসূলের নাফরমানী করবো, তখন তোমাদের ওপর আমার কোন আনুগত্য নেই। [কানযুর ওম্মাল, ৫ম খন্ড, হাদিস নং-২২৮২। অপর এক বর্ণনায় হযরত আবুবকর (রাঃ)-এর শব্দগুলো এইঃ **************** -আর আমি যদি আল্লার রাফরমানী করি, তাহরে তোমরা আমার নাফরমানী করো। -কানযুল ওম্মাল, ৫ম খন্ড, হাদীস-২৩৩০।]

হযরত আলী (রাঃ) বলেনঃ

*********************

-আল্লার নাযিল করা বিধান অনুযায়ী ফায়সালা করা এবং আমানত আদায় করে দেয়া মুসলমানদের শাসকের ওপর ফরয। শাসক যখন এভাবে কাজ করে তখন তা শুনা ও মেনে চলা এবং তাদেরকে আহবান জানালে তাতে সাড়া দেয়া লোকেদের কর্তব্য। [কানযুল ওম্মাল, ৫ম খন্ড, হাদীস নং-২৫৩১।]

একদা তিনি তাঁর ভাষণে বলেছিলেনঃ

*********************

-আল্লার আনুগত্য করে আমি তোমাদেরকে যে নির্দেশ দেই, তা মেনে চলা তোমাদের ওপর ফরয-সে নির্দেশ তোমাদের পছন্দ হোক বা না হোক। আর আল্লার নাফরমানী করে আমি তোমাদেরকে যে নির্দেশ দেই, তাতে আল্লার সাথে মা’সিয়াত বা পাপাচারের ক্ষেত্রে কারো জন্য আন্যগত্য নেই; আনুগত্য কেবল মা’রূফে, আনুগত্যে কেবল মা’রূফে। [কারযুল ওম্মাল, ৫ম খন্ড, হাদীস নং-২৫৮৭।]

সাতঃ পদ-মর্যাদার দাবী এবং লোভ নিষিদ্ধ

এটাও সে রাষ্ট্রের অন্যতম মূলনীতি ছিল যে, সাধারণত রাষ্ট্রের দায়িত্বপূর্ণ পদ বিশেষত খেলাফতের জন্য সে ব্যক্তি সবচেয়ে বেশি অযোগ্য-অনুপযুক্ত, যে নিজে পদ লাভের অভিলাষী এবং সে জন্য সচেষ্ট।

আল্লাহ তা’আলা কুরআনে মাজীদে বলেনঃ

*********************

-আখেরাতের ঘর আমি তাদেরকে দেবো, যারা যমীনে নিজের মহত্ব খুজে বেড়ায় না, বিপর্যয় সৃষ্টি করতে চায় না। -আল-কাসাসঃ ৮৩

নবী (সাঃ) বলেনঃ

*********************

-আল্লার শপথ, এমন কোন ব্যক্তিকে আমরা এ সরকারের পদ মর্যাদা দেই না, যে তা চায় এবং তার জন্য লোভ করে। [বুখারী, কিতাবুল আহকাম, অধ্যায়-৭। মুসলিম, কিতাবুল এমারাত, অধ্যায়-৩]

*********************

-যে ব্যক্তি নিজে তা সন্ধান করে, আমাদের নিকট সে-ই সবচেয়ে বেশী খেয়ানতকারী। [আবু দাউদ, কিতাবুল এমারাত, অধ্যায়-২।]

*********************

-আমরা এমন কোন ব্যক্তিকে আমাদের সরকারী কর্মচারী হিসাবে গ্রহণ করি না, যে নিজে উক্ত পদের অভিলাষী। [কানযুল ওম্মাল, ৬ষ্ঠ খন্ডম হাদীস নং-২০৬]

*********************

-আব্দুর রহমান ইবনে সামুরকে (রাঃ) রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেন, আব্দুর রহমান, সরকারী পদ দাবী করো না। কেননা চেষ্টা তদবীর করার পর যদি তা তোমাকে দেয়া হয়, তবে তোমাকে তার হাতে সপে দেয়া হবে, আর যদি চেষ্টা তদবীর ছাড়াই তা লাভ করো, তবে তার হক আদায় করার ব্যাপারে আল্লার পক্ষ থেকে তোমাকে সাহায্য করা হবে। [কানযুল ওম্মাল, ৬ষ্ঠ খন্ড, হাদীস নং-৬৯। এখানে কারো যেন সন্দেহ না হয় যে, এটা যদি মূলনীতি হয়ে থাকে, তা হলে হযরত ইউসুফ (আঃ) মিশরের বাদশার নিকট সরকারের পদ দাবী করলেন কেন? মূলত হযরত ইউসুফ (আঃ) কোন ইসলামী রাষ্ট্রে এ পদ দাবী করেন নি, দাবী করেছিলেন এক কাফের রাষ্ট্রে কাফের সরকারের কাছে। সেখানে এক বিশেষ মনস্তাত্ত্বিক সন্ধিক্ষণে তিনি উপলব্ধি করেন যে, আমি যদি বাদশাহের নিকট রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদ দাবী করি, তবে তা পেতে পারি। আর তার মাধ্যমে এদেশে আল্লার দ্বীন বিস্তার করার পথ সুগম হতে পারে। কিন্তু আমি যদি ক্ষমতার দাবী থেকে বিরত থাকি, তা হলে কাফের জাতির হেদায়াতের যে দূর্লভ সুযোগ আমি পাচ্ছি, তা হাতছাড়া হয়ে যাবে। এটা ছিল এক বিশেষ পরিস্থিতি, তার ওপর ইসলামের সাধারণ নিয়ম আরোপ করা যায় না।

আটঃ রাষ্ট্রের মূল লক্ষ্য

এ রাষ্ট্রের শাসক এবং তার সরকারের সর্ব প্রথম কর্তব্য এই সাব্যস্ত হয়েছিল যে, কোন রকম পরিবর্তন-পরিবর্ধন ছাড়াই যথাযথভাবে সে ইসলামী জীবন বিধান প্রতিষ্ঠা করবে, ইসলামের চারিত্রিক মানদন্ডানুযায়ী ভালো ও সদ-গুণাবলীর বিকাশ এবং মন্দ ও অসৎ গুণাবলীর বিনাশ সাধন করবে। কুরআন মজীদে এ রাষ্ট্রের মূল লক্ষ্য সম্পর্কে বলা হয়েছেঃ

********************

- (মুসলমান তারা) যাদেরকে আমি পৃথিবীতে ক্ষমতা দান করলে তারা সালাত কায়েম করে, যাকাত আদায় করে, ভাল কাজের নির্দেশ দেয় ও মন্দ কাজ থেকে বারণ করে।

- আল-হজ্জঃ ৪১

কুরআনের দৃষ্টিতে মুসলিম মিল্লাতের অস্তিত্বের মূল লক্ষ্যও এটিইঃ

***********************

- এমনি করে আমি তোমাদেরকে একটি মধ্যপন্থী উম্মাত (বা ভারসাম্যপূর্ণ পথে অবিচল উম্মাত) করেছি, যেন তোমরা লোকদের ওপর সাক্ষী হও আর রাসূল সাক্ষী হন তোমাদের ওপর। – আল-বাকারাঃ ১৪৩।

**************************

- তোমরা সে সর্বোত্তম উম্মাত, মানুষের (সংশোধন এবং পথ প্রদর্শনের) জন্য যাদেরকে সৃষ্টি করা হয়েছে। তোমরা ভাল কাজের আদেশ দেবে, মন্দ কাজ থেকে বারণ করবে এবঙ আল্লার প্রতি ঈমান রাখবে।

এতদ্ব্যতীত যে কাজের জন্য মুহাম্মদ (সঃ) এবং তাঁর পূর্বেকার সকল নবী-রাসূল আদিষ্ট ছিলেন, কুরআনের দৃষ্টিতে তা ছিল এইঃ

******************************

- দ্বীন কায়েম করো এবং তাতে বিভিন্ন-বিচ্ছিন্ন হয়ো না। – শূরাঃ ১৩

অমুসলিম বিশ্বের মুকাবিলায় তাঁর সকল চেষ্টা সাধনাই ছিল এ উদ্দেশ্যেঃ

****************************

- দ্বীন যেন সর্বতোভাবে আল্লার জন্যই নির্ধারিত হয়ে যায়।

অন্যান্য সকল নবী-রাসূলের উম্মাতের মতো তাঁর উম্মাতের জন্যও আল্লার নির্দেশ ছিলঃ

***************************

- তারা নিজের দ্বীনকে একমাত্র আল্লার জন্য নির্ধারিত করে একনিষ্ঠভাবে আল্লার বন্দেগী করবে। – আল-বাইয়োনাঃ ৫।

এ জন্য তাঁর প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রের সর্বপ্রথম কাজ ছিল, দ্বীনের পরিপূর্ণ ব্যবস্থাকে কায়েম করা, তার মধ্যে এমন কোন সংমিশ্রণ হতে না দেয়া, যা মুসলিম সমাজে দ্বিমুখী নীতি সৃষ্টি করে। এ শেষ বিষয়টি সম্পর্কে নবী (সঃ) তাঁর সাহাবী এবং স্থলাভিষিক্তদের কঠোরভাবে সতর্ক করে দিয়েছিলেনঃ

***************************

- আমাদের এ দ্বীনে যে ব্যক্তি এমন কোন বিঝয় উদ্ভাবন করবে, যা তার পর্যায়ভুক্ত নয়, তা প্রত্যাখ্যাত। [মিশকাত, বাবুল ইতিসাম বিল কিতাবে ওয়াস সুন্নাহ।]

*************************

- সাবধান! নব উদ্ভাবিত বিষয় থেকে বিরত থাকবে। কারণ, সকল নব উদ্ভাবিত বিষয়ই বেদআত, আর সকল বেদআতই গুমরাহী, পথভ্রষ্টতার অন্তর্ভূক্ত। [মিশকাত, বাবুল ইতিসাম বিল কিতাবে ওয়াস সুন্নাহ।]

***********************

- যে ব্যক্তি কোন বেদআত উদ্ভাবকের সম্মান করে, সে ইসলামের মুলোৎপাটনে সাহায্য করে। [মিশকাত, বাবুল ইতিসাম বিল কিতাবে ওয়াস সুন্নাহ।

- এ প্রসঙ্গে আমরা তাঁর এ উক্তিও দেখতে পাই যে, তিন ব্যক্তি আল্লার সবচেয়ে বেশী না-পসন্দ, তাদের একজন হচ্ছে সে ব্যক্তিঃ

**********************

- যে ইসলাম কোনো জাহেলী রীতিনীতির প্রচলন করতে চায়। [মিশকাত, বাবুল ইতিসাম বিল কিতাবে ওয়াস সুন্নাহ।]

 

নয়ঃ আমর বিল মা‘রূফ ও নাহ্ই আনিল মুনকার এর অধিকার এবং কর্তব্য

এ রাষ্ট্রের সর্বশেষ মূলনীতি- যা তাকে সঠিক পথে টিকিয়ে রাখার নিশ্চয়তা দেয়- তা ছিল, মুসলিম সমাজে প্রতিটি ব্যক্তি সত্যবাক্য উচ্চারণ করবে, নেকী ও কল্যাণের সহায়তা করবে এবং সমাজ ও রাষ্ট্রের যেখানেই কোন ভুল এবং অন্যায় কার্য হতে দেখবে, সেখানেই তাকে প্রতিহত করতে নিজের সর্বশক্তি নিয়োগ করে চেষ্টা করবে। মুসলিম সমাজের প্রতিটি সদস্যের এটা শুধু অধিকারই নয়, বরং অপরিহার্য কর্তব্যও। এ প্রসঙ্গে কুরআন মজীদের নির্দেশ হচ্ছেঃ

********************

-নেকী এবং তাকওয়ার কাজে পরস্পর সাহায্য করো এবং গুনাহ ও অবাধ্যতার কাজে সাহায্য করো না। – আল-মায়েদাঃ ২।

*********************

- ঈমানদাররা! আল্লাকে ভয় করো এবং সত্য সঠিক কথা বলো। – আল-আহযাবঃ ৭০

************************

- ঈমানদাররা! তোমরা সকলে ন্যায় বিচারে অটল-অবিচল থাকো এবং আল্লার জন্য সাক্ষ্যদাতা হও- তোমাদের সাক্ষ্য স্বয়ং তোমাদের নিজেদের বা তোমাদের পিতা-মাতা বা নিকটাত্মীয়দের বিরুদ্ধে যাক না কেন।

*************************

- মুনাফিক নারী-পুরুষ একই থলের বিড়াল, তারা মন্দ কাজের নির্দেশ দেয়, ভাল কাজ থেকে বারণ করে। …… আর মু’মিন নারী-পুরুষ একে অন্যের সাথী, তারা ভাল কাজের নির্দেশ দান করে আর মন্দ কাজ থেকে বারণ করে। – আত-তাওবাঃ ৬৭-৭১।

আল-কুরআনে ঈমানদারদের এ স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য উক্ত হয়েছেঃ

***************************

- নেকীর নির্দেশ দানকারী, মন্দ কাজ থেকে বারণকারী এবং আল্লার সীমারেখা সংরক্ষণকারী। – আত-তাওবাঃ  ১১২

এব্যাপারে নবী (সঃ)-এর এরশাদ এইঃ

***************************

-তোমাদের কেউ যদি কোন মুনকার (অসৎ কাজ) দেখে, তবে তার উচিত হাত দিয়ে তা প্রতিহত করা। তা যদি না পারে, তবে মুখ দ্বারা বারণ করবে, তাও যদি না পারে, তবে অন্তর দ্বারা (খারাপ জানবে এবং বরণ করার আগ্রহ রাখবে), আর এটা হচ্ছে ঈমানের দুর্বলতম পর্যায়। [মুসলিম, কিতাবুল ঈমান, অধ্যায়- ২০। তিরমিযি, আবওযাবুল ফিতান, অধ্যায়-১২। আবু দাউদ, কিতবুল মালাহেম, অধ্যায়-১৭, ইবনে মাজা, আবওয়াবুল ফিতান, অধ্যায়-২০।]

****************************

-অতঃপর অযোগ্য লোকেরা তাদের স্থানে বসবে। তারা এমন সব কথা বলবে, যা নিজেরা করবে না, এমনসব কাজ করবে, যার নির্দেশ দেয়া হয়নি তাদেরকে। যে হাতের সাহায্যে তাদের বিরুদ্ধে জেহাদ করবে, সে মুমিন; যে জিহ্বার সাহায্যে তাদের বিরুদ্ধে জেহাদ করবে, সে মুমিন; অন্তর দিয়ে যে তাদের বিরুদ্ধে জেহাদ করবে, সে মুমিন। ঈমানের এর চেয়ে ক্ষুদ্র সামান্যতম পর্যায়ও নেই। [মুসলিম, কিতাবুল ঈমান, অধ্যায়-২০।]

********************

- যালেম শাসকের সামনে ন্যায় বা সত্য কথা বলা সর্বোত্তম জেহাদ। [আবু দাউদ, কিতাবুল মালাহেম, অধ্যায়-১৭। তিরমিযি, কিতাবুল ফিতান, অধ্যায়-১২। নাসায়ী, কিতাবুল বায়আত, অধ্যায়-৩৬। ইবনে মাজা, আবওয়াবুল ফিতান, অধ্যায়-২০।]

************************

- যালেমকে দেখেও যারা তার হাত ধরে না (বাধা দেয় না) তাদের ওপর আল্লার আযাব প্রেরণ করা দূরে নয়। [আবু দাউদ, কিতাবুল মালাহেম, অধ্যায়-১৭। তিরমিযি, কিতাবুল ফিতান, অধ্যায়-১২।]

**************************

- আমার পরে কিছু লোক শাসক হবে। যে ব্যক্তি মিথ্যার ব্যাপারে তাদেরকে সাহায্য করবে, সে আমার নয় এবং আতি তার নই। [নাসায়ী, কিতাবুল বায়আত, অধ্যায়- ৩৪-৩৫]

***********************

- অনতিবিলম্বে এমন সব লোক তোমাদের ওপর শাসক হবে, যাদের হাতে থাকবে তোমাদের জীবিকা, তারা তোমাদের সাথে কথা বললে মিথ্যা বলবে, কাজ করলে খারাপ কাজ করবে। তোমরা যতক্ষণ তাদের মন্দ কাজের প্রশংসা না করবে, তাদের মিথ্যায় বিশ্বাস না করবে, ততক্ষণ তারা তোমাদের ওপর সন্তুষ্ট হবে না। সত্যকে বরদাশত করা পর্যন্ত তোমরা তাদের সামনে সত্য পেশ করে যাও। তারপর যদি তারা তার সীমালংঘন করে যায়, তাহলে যে ব্যক্তি এ জন্য নিহত হবে, সে শহীদ। [কানযুল ওম্মাল, ৬ষ্ঠ খন্ড, হাদীস নঙ- ২৯৭।]

***********************

- যে ব্যক্তি কোন শাসককে রাযী করার জন্য এমন কথা বলে, যা তার প্রতিপালককে নারায করে, সে ব্যক্তি আল্লার দ্বীন থেকে খারিজ হয়ে গিয়েছে। [কানযুল ওম্মাল, ৬ষ্ট খন্ড, হাদীস নঙ- ৩০৯।]

Top

তৃতীয় অধ্যায়

খেলাফতে রাশেদা ও তার বৈশিষ্ট্য

আগের অধ্যায়ে ইসলামের যে শাসননীতি বিবৃত হয়েছে, নবী (সঃ)- এর পরে সেসব মূলনীতির ওপর খোলাফায়ে রাশেদীনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। হযরত (সঃ)-এর প্রত্যক্ষ শিক্ষা-দীক্ষা ও কার্যকর নেতৃত্বের ভিত্তিতে যে সমাজ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, তার প্রত্যেক সদস্যই জানতো, ইসলামের বিধি বিধান ও প্রাণসত্তা অনুযায়ী কোন ধরনের শাসন ব্যবস্থা প্রবর্তিত হওয়া উচিত। নিজের স্থলাভিষিক্তের ব্যাপারে হযরত (সঃ) কোন ফায়সালা না দিয়ে গেলেও ইসলাম একটি শূরাভিত্তিক খেলাফত দাবী করে- মুসলিম সমাজের সদস্যরা এ কথা অবগত ছিল। তাই সেখানে কোন বংশানুক্রমিক বাদশাহী প্রতিষ্ঠিত হয়নি, বল প্রয়োগে কোন ব্যক্তি ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়নি, খেলাফত লাভ করার জন্য কেউ নিজের তরফ থেকে চেষ্টা-তদবীর করেনি বা নামমাত্র প্রচেষ্টাও চালায়নি। বরং জনগণ তাদের স্বাধীন মর্যীমতো পর পর চারজন সাহাবীকে তাদের খলীফা নির্বাচিত করে। মুসলিম মিল্লাত এ খেলাফতকে খেলাফত রাশেদ (সত্যাশ্রয়ী) বলে গ্রহণ করেছে। এ থেকে আপনা আপনিই প্রকাশ পায় যে, মুসলমানদের দৃষ্টিতে এটিই ছিল খেলাফতের সত্যিকার পদ্ধতি।

একঃ নির্বাচনী খেলাফত

নবী করীম (সঃ)-এর স্থলাভিষিক্তের জন্য হযরত ওমর (রাঃ) হযরত আবুবকর (রাঃ)- এর নাম প্রস্তাব করেন। মদীনার সকলেই (বস্তুত তখন তারা কার্যত সারা দেশের প্রতিনিধির মর্যাদায় অভিষিক্ত ছিল) কোন প্রকার চাপ-প্রভাব এবং প্রলোভন ব্যতীত নিজেরা সন্তুষ্ট চিত্তে তাঁকে পসন্দ করে তাঁর হাতে বায়আত (আনুগত্যের শপথ) করে।

হযরত আবুবকর (রাঃ) তাঁর ওফাতকালে হযরত ওমর (রাঃ)- এর সম্পর্কে ওসিয়াত লিখান, অতঃপর জনগণকে মসজিদে নববীতে সমবেত করে বলেনঃ

“আমি যাকে স্থলাভিষিক্ত করছি তোমরা তার ওপর সন্তুষ্ট? আল্লার শপথ! সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য বুদ্ধি-বিবেক প্রয়োগে আমি বিন্দুমাত্রাও ত্রুটি করিনি। আমার কোন আত্মীয়-স্বজনকে নয়, বরং ওমর ইবনুল খাত্তাবকে আমার স্থলাভিষিক্ত করেছি। সুতরাং তোমরা তাঁর নির্দেশ শুনবে এবং আনুগত্য করবে।”

সবাই সমস্বরে বলে ওঠেঃ আমরা তাঁর নির্দেশ শুনবো এবং মানবো। [আততাবারী- তারিখুল উমাম মুলুক, ২য় খন্ড, পৃষ্ঠা- ৬১৮। আল-মাতবাআতুল ইস্তেকামা, কায়রো ১৯৩৯।]

হযরত ওমর (রাঃ)- এর জীবনের শেষ বছর হজ্জের সময় এক ব্যক্তি বললোঃ ওমর (রাঃ) মারা গেলে আমি অমুক ব্যক্তির হাতে বায়আত করবো। কারণ, আবুবকর (রাঃ)-এর বায়আতও তো হঠাৎই হয়েছিলো।। শেষ পর্যন্ত তিনি সফল হয়েছেন। [তিনি এদিকে ইঙ্গিত করেছেন যে সাকীফায়ে বনী-সায়েদার মজলিসে হযরত ওমর (রাঃ) হঠাৎ দাড়িয়ে হযরত আবুবকর (রাঃ)-এর নাম প্রস্তাব করেছেন এবঙ হাত বড়িয়ে তখনই তাঁর হাতে বায়আত করেছেন। তাঁকে খলীফা করার ব্যাপারে পূর্বাহ্নে কোন পরামর্শ করেননি। ] হযরত ওমর (রাঃ) এ সম্পর্কে জানতে পেরে বললেনঃ এ ব্যাপারে আমি এক ভাষণ দেবো। জনগণের ওপর যারা জোরপূর্বক নিজেদেরকে চাপিয়ে দেয়ার ইচ্ছা পোষণ করছে, তাদের সম্পর্কে আমি জনগণকে সতর্ক করে দেবো। মদীনায় পৌঁছে তাঁর প্রথম ভাষণেই তিনি এ ঘটনার কথা উল্লেখ করেন। সাকীফায়ে বনী-সায়েদার ইতিবৃত্ত বর্ণনা করে বলেন যে, তখন এক বিশেষ পরিস্থিতিতে হঠাৎ হযরত আবুবকর (রাঃ)-এর নাম প্রস্তাব করে আমি তাঁর হাতে বায়আত করেছিলাম। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেনঃ তখন যদি এ রকম না করতাম এবং খেলাফতের মীমাংসা না করেই আমরা মজলিস ছেড়ে উঠে আসতাম, তবে রাতারাতি লোকদের কোন ভুল সিদ্ধান্ত করে বসার আশংকা ছিল। আর সে ফায়সালা মেনে নেয়া এবং তা পরিবর্তন করা-উভয়ই আমাদের জন্য কঠিন হতো। এ পদক্ষেপটি সাফল্য মন্ডিত হলেও ভবিষ্যতের জন্য একে নযীর হিসাবে গ্রহণ করা যেতে পারে না। আবুবকরের মতো উন্নত মানের এবং জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব তোমাদের মধ্যে আর কে আছে? এখন কোন ব্যক্তি যদি মুসলমানদের পরামর্শ ব্যতিরেকে কারো হাতে বায়আত করে তাহলে সে এবং যার বায়আত করা হবে- উভয়েই নিজেকে মৃত্যুর হাতে সোপর্দ করবে। [বুখারী, কিতাবুল মোহরেবীন, অধ্যায়-১৬। মুসনাদে আহমাদ, ১ম খণ্ড, হাদীস নম্বর- ৩৯১। তৃতীয় সংস্করণ, দারুল মাআরেফ, মিসর ১৯৪৯। মুসনাদে আহমাদের বর্ণনায় হযরত ওমর (রাঃ)- এর শব্দগুলো ছিল এইঃ মুসলমানদের পরামর্শ ব্যতীত যে ব্যক্তি কোন আমীরের হাতে বায়আত করে, তার কোন বায়আত নেই; এবং যার হাতে বায়আত করে, তারও কোন বায়আত নেই। অপর এক বর্ণনায় হযরত ওমর (রাঃ)-এর এ বাক্যও দেখা যায়- পরামর্শ ব্যতীত কোন ব্যক্তিকে এমারাত দেয়া হলে তা কবুল করা তার জন্য হালাল নয়। – (ইবনে হাযার, ফতহুলবারী, ২য় খন্ড, পৃষ্ঠা- ১২৫, আল-মাতবায়াতুল খাইরিয়া, কায়রো, ১৩২৫ হিজরী।]

তাঁর নিজের ব্যাখ্যা করা এ পদ্ধতি অনুযায়ী হযরত ওমর (রাঃ) খেলাফতের ফায়সালা করার জন্য তাঁর ওফাতকালে একটি নির্বাচন কমিটি গঠন করে বলেনঃ মুসলমানদের পরামর্শ ব্যতীত যে ব্যক্তি জোর করে আমীর হওয়ার চেষ্টা করবে, তাকে হত্যা করো। খেলাফত যাতে বংশানুক্রমিক পদাধিকারে পরিণত না হয়, সে জন্য তিনি খেলাফত লাভের যোগ্য ব্যক্তিদের তালিকা থেকে নিজের ছেলের নাম সুস্পষ্টভাবে বাদ দিয়ে দেন। [আততাবারী, তৃতীয় খন্ড, পৃষ্ঠা- ২৯২। ইবনুল আসীর, তৃতীয় খন্ড, পৃষ্ঠা- ৩৪-৩৫। ইদারাতুল তিবআতিল মুনীরিয়া, মিসর, ১৩৫৬ হিজরী। তাবাকাতে ইবনে সাআদ, তৃতীয় খন্ড, পৃষ্ঠা- ৩৪৪, বৈরুতে সংস্করণ ১৯৫৭। ফতহুল বারী, ৭ম খন্ড, পৃষ্ঠা- ৪৯।] ছ’ব্যক্তিকে নিয়ে এ নির্বাচনী কমিটি গঠিত হয়। হযরত ওমর (রাঃ)-এর মতে এরা ছিলেন কওমের মধ্যে সবচেয়ে প্রভাবশালী এবং জনপ্রিয়।

কমিটির সদস্য আবদুর রহমান (রাঃ) ইবনে আওফকে কমিটি শেষ পর্যন্ত খলিফার নাম প্রস্তাব করার ইখতিয়ার দান করে। সাধারণ লোকদের মধ্যে ঘোরা-ফেরা করে তিনি জানতে চেষ্টা করেন, কে সবচেয়ে বেশী জনপ্রিয়। হজ্জ শেষ করে যেসব কাফেলা বিভিন্ন এলাকায় ফিরে যাচ্ছিল, তিনি তাদের সাথেও আলোচনা করেন। এ জনমত যাচাইয়ের ফলে তিনি এ সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে,

আধিকাংশ লোকই হযরত ওসমান (রাঃ)-এর পক্ষে। [আততাবারী, তৃতীয় খন্ড, পৃষ্ঠা- ২৯৬। ইবনুল আসীর, তৃতীয় খন্ড, পৃষ্ঠা- ৩৬। আল-বেদায়া ওয়ান নেহায়া, ৭ম খন্ড, পৃষ্ঠা- ১৪৬।] তাই তাঁকেই খেলাফতের জন্য নির্বাচিত করা হয়। সাধারণ জনসমাবেশে তার বায়আত হয়।

হযরত ওসমান (রাঃ)-এর শাতাদাতের পর কিছু লোক হযরত আলী (রাঃ)-কে খলীফা করতে চাইলে তিনি বললেনঃ ‍”এমন করার ইখতিয়ার তোমাদের নেই। এটা তো শুরার সদস্য এবং বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণকারীদের কাজ। তারা যাঁকে খলীফা করতে চান, তিনিই খলীফা হবেন। আমরা মিলিত হবো এবং এ ব্যাপারে চিন্তা-ভাবনা করবো।” [ইবনে কোতায়বা, আল-ইমামা ওয়াস সিয়াসা, ১ম খন্ড, পৃষ্ঠা- ৪১।] তাবারী হযরত আলী (রাঃ)- এর যে বক্তব্য উদ্ধৃত করেছ, তা হচ্ছেঃ “গোপনে আমার বায়আত অনুষ্ঠিত হতে পারে না, তা হতে হবে মুসলমানদের মর্জী অনুযায়ী।” [আততাবারী, তৃতীয় খন্ড, পৃষ্ঠা- ৪৫০।]

হযরত আলী (রাঃ)- এর ওফাতকালে লোকেরা জিজ্ঞেস করলো, আমরা আপনার পুত্র হযরত হাসান (রাঃ)-এর হাতে বায়আত করবো? জবাবে তিনি বলেনঃ “আমি তোমাদেরকে নির্দেশও দিচ্ছি না, নিষেধও করছি না। তোমরা নিজেরাই এ ব্যাপারে ভালোভাবে বিবেচনা করতে পারো।” [আততাবারী, ৪র্থ খন্ড, পৃষ্ঠা- ১১২। আল-মাসউদী, মুরুজুয্ যাহাব, দ্বিতীয় খন্ড, পৃষ্ঠা- ৪৬। আল-মাতাবাআতুল বাহিয়্যা, মিসর, ১২৪৬ হিজরী।] তিনি যখন আপন পুত্রদেরকে শেষ ওসিয়াত করছিলেন, ঠিক সে সময় জনৈক ব্যক্তি আরয করলো, আমীরুল মু’মিনীন। আপনি আপনার উত্তরসুরী মনোনয়ন করছেন না কেন? জবাবে তিনি বলেনঃ “আমি মুসলমানদেরকে সে অবস্থায় ছেড়ে যেতে চাই, সে অবস্থায় ছেড়ে দিয়েছিলেন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম।” [ইবনে কাসীর, আল-বেদায়া ওয়ান নেহায়া, অষ্টম খন্ড, পৃষ্ঠা- ১৩-১৪। মাতবাআতুস সাআদাত, মিসর। আল-মাউদি, দ্বিতীয় খন্ড, পৃষ্ঠা- ৪৬।]

এসব ঘটনা থেকে স্পষ্টত প্রতীয়মান হয় যে, খেলাফত সম্পর্কে খোলাফায়ে রাশেদীন এবং রাসুল্লাহ (সঃ)- এর সাহাবীদের সর্বসম্মত মত এই ছিল যে, খেলাফত একটা নির্বাচন ভিত্তিক পদমর্যাদা। মুসলমানদের পারস্পরিক পরামর্শ এবং তাদের স্বাধীন মতামত প্রকাশের মাধ্যমেই তা কায়েম করতে হবে। বংশানুক্রমিক বা বল প্রয়োগের দ্বারা ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত কর্তৃত্ব ও নেতৃত্ব তাঁদের মতে খেলাফত নয়, বরং তা বাদশাহী-রাজতন্ত্র। খেলাফত এবং রাজতন্ত্রের যে স্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন ধারণা সাহাবায়ে কেরামগণ পোষণ করতেন, হযরত আবু মূসা আশআরী (রাঃ) তা ব্যক্ত করেন নিন্মোক্ত ভাষায়ঃ

********************************************************************************************

- এমারাত (অর্থাৎ খেলাফত) হচ্ছে তাই, যা প্রতিষ্ঠা করতে পরামর্শ নেয়া হয়েছে, আর তরবারীর জোরে যা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তা হচ্ছে বাদশাহী বা রাজতন্ত্র। [তাবকাতে ইবনে সাআদ, ৪র্থ খন্ড, পৃষ্ঠা- ১১৩।]

 

দুইঃ শূরাভিত্তিক সরকার

এ খলীফা চুতষ্টয় সরকারের কার্যনির্বাহ এবং আইন প্রণয়ণের ব্যাপারে জাতির বলিষ্ঠ সিদ্ধান্তের অধিকারী ব্যক্তিদের সাথে পরামর্শ না করে কোন কাজ করতেন না। সুনানে দারামীতে হযরত মায়মুন মাহরানের একটি বর্ণনা আছে যে, হযরত আবুবকর (রাঃ)- এর নীতি ছিল, তাঁর সামনে কোন বিষয় উত্থাপিত হলে তিনি প্রথমে দেখতেন এ ব্যাপারে আল্লাহর কিতাব কি বলে। সেখানে কোন নির্দেশ না পেলে এ ধরনের ব্যাপারে রাসুলুল্লাহ (সঃ) কি ফায়সালা দিয়েছেন, তা জানতে চেষ্টা করতেন। রাসুলের সুন্নায়ও কোন নির্দেশ না পেলে জাতীয় শীর্ষস্থানীয় এবং সৎ ব্যক্তিদের সমবেত করে পরামর্শ করতেন। সকলের পরামর্শক্রমে যে মতই স্থির হতো, তদানুযায়ী ফায়সালা করতেন। [সুনানে দারামী, ফুতইয়া ওয়ামা ফিহে মিনাশ শিদ্দাতে।] হযরত ওমর (রাঃ)- এর কর্মনীতিও ছিল অনুরূপ। [কানযুল ওম্মাল, ৫ম খন্ড, হাদীস- ২২৮১।]

পরামর্শের ব্যাপারে খোলাফায়ে রাশেদীনের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল, শূরার সদস্যদের সম্পূর্ণ স্বাধীন মতামত ব্যক্ত করার অধিকার রয়েছে। এ ব্যাপারে হযরত ওমর (রাঃ) এক পরামর্শ সভার উদ্বোধনী ভাষণে খেলাফতের পলিসি ব্যক্ত করেছেন এরূপেঃ

“আমি আপনাদেরকে যে জন্য কষ্ট দিয়েছি, তা এছাড়া আর কিছুই নয় যে, আপনাদের কার্যাদির আমানতের যে ভার আমার ওমর ন্যস্ত হয়েছে তা বহন করার কাজে আপনারও আমার সঙ্গে শরীক হবেন। আমি আপনাদের অন্তর্ভূক্ত এক ব্যক্তি। আজ আপনারাই সত্যের স্বীকৃতি দানকারী। আপনাদের মধ্য থেকে যাদের ইচ্ছা, আমার সাথে দ্বিমত পোষণ করতে পারেন; আবার যাদের ইচ্ছা আমার সাথে এক মতও হতে পারেন। আপনাদের যে আমার মতামতকে সমর্থন করতে হবে- এমন কোন কথা নেই এবং আমি তা চাই-ও-না।” [ইমাম আবু ইউসুফ, কিতাবুল খারাজ, পৃষ্ঠা- ২৫।]

 

তিনঃ বায়তুলমাল একটি আমানত

তাঁরা বায়তুলমালকে আল্লাহ এবং জনগণের আমানত মনে করতেন। বেআইনীভাবে বায়তুলমালের মধ্যে কিছু প্রবেশ করা ও বেআইনীভাবে তা থেকে কিছু বের হয়ে যাওয়াকে তারা জায়েয মনে করতেন না। শাসক শ্রেণীর-ব্যক্তিগত স্বার্থে বায়তুলমাল ব্যবহার তাঁদের মতে হারাম ছিল। তাদের মতে খেলাফত এবং রাজতন্ত্রের মৌলিক পার্থক্যই ছিল এই যে, রাজা-বাদশাহরা জাতীয়ভান্ডারকে নিজেদের ব্যক্তিগত সম্পদে পরিণত করে নিজেদের খাহেশ মতো স্বাধীনভাবে তাতে তসরুফ করতো, আর খলীফা তাকে আল্লাহ এবং জনগণের আমানাত মনে করে সত্য-ন্যায়- নীতি মোতাবেক এক একটি পাই পয়সা উসুল করতেন, আর তা ব্যয়ও করতেন সত্য-ন্যায়-নীতি অনুসারে। হযরত ওমর (রাঃ) একদা হযরত সালমান ফারসীকে জিজ্ঞেস করেনঃ “আমি বাদশাহ, না খলীফা?” তিনি তৎক্ষণাৎ জবাব দেনঃ “মুসলমানদের ভূমি থেকে আপনি যদি এক দেরহামও অন্যায়ভাবে উসুল এবং অন্যায়ভাবে ব্যয় করেন তাহলে আপনি খলীফা নন, বাদশাহ।” অপর এক প্রসঙ্গে একদা হযরত ওমর (রাঃ) স্বীয় মজলিসে বলেনঃ “আল্লার কসম, আমি এখনও বুঝে উঠতে পারছি না যে, আমি বাদশা, না খলীফা। আমি যদি বাদশাহ হয়ে গিয়ে থাকি। তবে তা তো এক সাংঘাতিক কথা।” এতে জনৈক ব্যক্তি বললোঃ “আমীরুল মুমিনীন। এতদোভয়ের মধ্যে বিরাট পার্থক্য রয়েছে।” হযরত ওমর (রাঃ) জিজ্ঞেস করলেন, কি পার্থক্য? তিনি বললেনঃ “খলীফা অন্যায়ভাবে কিছুই গ্রহণ কনের না, অন্যায়ভাবে কিছুই ব্যয়ও করেন না। আল্লার মেহেরবানীতে আপনিও অনুরূপ। আর বাদশাহ তো মানুষের ওপর যুলুম করেন, অন্যায়ভাবে একজনের কাছ থেকে উসুল করে; আর অন্যায়ভাবেই অপরজনকে দান করে।” [তাবাকাতে ইবনে সা’আদ, ৩য় খন্ড, পৃষ্ঠা- ৩০৪-৩০৭।]

এ ব্যাপারে খোলাফায়ে রাশেদনীনের কর্মধারা প্রণিধান যোগ্য। হযরত আবুবকর (রাঃ) খলীফা হওয়ার পরদিন কাপড়ের থান কাঁধে নিয়ে বিক্রি করার জন্য বেরিয়েছেন। কারণ, খেলাফতের পূর্বে এটিই ছিল তাঁর জীবিকার অবলম্বন। পথে হযরত ওমর (রাঃ)- এর সাথে দেখা। তিনি বললেন, আপনি একি করছেন? জবাব দিলেন, ছেলে-মেয়েদের খাওয়াবো কোত্থেকে? হযরত ওমর (রাঃ) বললেন, মুসলমানদের নেতৃত্বের ভার আপনার ওপর অর্পিত হয়েছে। ব্যবসায়ের সাথে খেলাফতের কাজ চলতে পারে না। চলুন আবু ওবায়দা (বায়তুল মালের খাজাঞ্চী)-এর সাথে আলাপ করি। তাই হলো। হযরত ওমর (রাঃ) আবু ওবায়দার সাথে আলাপ করলেন। তিনি বললেন, একজন সাধারণ মুহাজিরের আমদানীর মান সামনে রেখে আমি আপনার জন্য ভাতা নির্ধারণ করে দিচ্ছি। এ ভাতা মুহাজিরদের সর্বশ্রেষ্ঠ ধনী ব্যক্তির সমানও নয়; আবার সবচেয়ে দরিদ্র ব্যক্তির পর্যায়েরও নয়। এমনিভাবে তাঁর জন্য একটি ভাতা নির্ধারণ করে দেয়া হয়। এর পরিমাণ ছিল বার্ষিক চার হাযার দিরহামের কাছাকাছি। কিন্তু তাঁর ওফাতের সময় ঘনিয়ে এলে তিনি ওসিয়াত করে যান যে, আমার পরিত্যক্ত সম্পত্তি থেকে আট হাযার দিরহাম বায়তুলমালকে ফেরত দেবে। হযরত ওমর (রাঃ)-এর নিকট তা আনা হলে তিনি বলেনঃ “আল্লাহ আবুবকর (রাঃ)- এর প্রতি রহমত করুন। উত্তরসূরিদেরকে তিনি মুশকিলে ফেলেছেন।” [কানযুল ওম্মাল, ৫ম খন্ড,হাদীস নঙ- ২২৮০-২২৮৫।]

“গ্রীষ্মকালে এক জোড়া কাপড়, শীতকালে এক জোড়া কাপড়, কুরাইশের একজন মধ্যবিত্ত ব্যক্তির সমপরিমাণ অর্থ আপন পরিবার-পরিজনের জন্য-এ ছাড়া আল্লার সম্পদের মধ্যে আর কিছুই আমার জন্য হালাল নয়। আমি তো মুসলমানদের একজন সাধারণ ব্যক্তি বৈ কিছুই নই।” [ইবনে কাসীর, আল-বেদায়া ওয়ান নেহায়া, পৃষ্ঠা- ১৩৪।]

অপর এক ভাষণে তিনি বলেনঃ

“এ সম্পদের ব্যাপারে তিনটি বিষয় ব্যতিত অন্য কিছুকেই আমি ন্যায় মনে করি না। ন্যায় ভাবে গ্রহণ করা হবে, ন্যায় মুতাবিক প্রদান করা হবে এবং বাতেল থেকে তাকে মুক্ত রাখতে হবে। এতীপের সম্পদের সাথে তার অভিভাবকের যে সম্পর্ক, তোমাদের এ সম্পদের সাথে আমার সম্পর্কও ঠিক অনুরূপ। আমি অভাবী না হলে তা থেকে কিছুই গ্রহণ করবো না, অভাবী হলে মারুফ পন্থায় গ্রহণ করবো। [ইমাম আবু ইউসুফ, কিতাবুল খারাজ, পৃষ্ঠা- ১১৭।]

হযরত আবুবকর (রাঃ) এবং হযরত ওমর (রাঃ)- এর বেতনের মান যা ছিল, হযরত আলী (রাঃ)- এর তাঁর বেতনের মান তাই রাখলেন। তিনি পায়ের হাঁটু ও গোড়ালীর মাঝবরাবর পর্যন্ত উচু তহবন্দ পরতেন। তাও আবার ছিল তালিযুক্ত। [ইবনে সাআদ, ৩য় খন্ড, পৃষ্ঠা- ২৮।] সারাজীবন কখনো একটু আরামে কাটাবার সুযোগ হয়নি। একবার শীতের মওসুমে জনৈক ব্যক্তি তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করতে যান। দেখেন, তিনি একখানা ছেঁড়া-ময়লা কাপড় পরে বসে আছেন আর শীতে কাঁপছেন। [ইবনে কাসীর, ৮ম খন্ড, পৃষ্ঠা- ৩।] শাহাদাতের পর তাঁর পরিত্যক্ত সম্পত্তির হিসাব নিয়ে দেখা গেল মাত্র ৭শত দিরহাম। তাও তিনি এক পয়সা এক পয়সা করে সঞ্চয় করেছেন। একটা গোলাম খরিদ করার জন্য। [ইবনে সাআদ, ৩য় খন্ড, পৃষ্ঠা- ৩৮।] আমীরুল মুমিনীন বলে চিনতে পেরে তাঁর কাছ থেকে যাতে কম মূল্য কেউ গ্রহণ না করে-এ ভয়ে কোন পরিচিত ব্যক্তির কাছ থেকে বাজারে কখনো কোন জিনিস কিনতেন না। [ইবনে সাআদ, ৩য় খন্ড, পৃষ্ঠা- ২৮। ইবনে কাসীর, ৮ম খন্ড, পৃষ্ঠা- ৩।] সে সময় হযরত মুয়াবিয়া (রাঃ)- এর সাথে তাঁর সংঘর্ষ চলছিল, কেউ কেউ তাঁকে পরামর্শ দেনঃ হযরত মুয়াবিয়া (রাঃ) যে রকম লোকদেরকে অঢেল দান-দক্ষিণা করে তাঁর সাথি করে নিচ্ছেন আপনিও তেমনি বায়তুলমালের ভান্ডার উজাড় করে টাকার বন্যা বইয়ে দিয়ে সমর্থক সংগ্রহ করুন। কিন্তু তিনি এই বলে তা প্রত্যাখ্যান করলেন “তোমরা কি চাও, আমি অন্যায়ভাবে সফল হই?” [ইবনে আবিল হাদীদ, নাহজুল বালাগার ভাষ্য, ১ম খন্ড, পৃষ্ঠা- ১৮২। দারুল কুতুবিল আরাবিয়্যা, মিসর, ১৩২৯ হিজরী।] তাঁর আপন ভাই হযরত আ’কীল (রাঃ) তাঁর কাছে টাকা দাবী করেন বায়তুলমাল থেকে। কিন্তু তিনি তা দিতে অস্বীকার করে বলেনঃ “তুমি কি চাও তোমার ভাইও মুসলমানদের টাকা তোমাকে দিয়ে জাহান্নামে যাক?” [ইবনে কোতাইবা-আল-ইমামা ওয়াস সিয়াসা, ১ম খন্ড, পৃষ্ঠা- ৭১। হাফেয ইবনে হাজার তাঁর আল-ইসাবা গ্রন্থে লিখেছেন যে, হযরত আ’কীলের কিছু ঋণ ছিল। হযরত আলী (রাঃ) তা পরিশোধ করতে অস্বীকার করেন। তাই তিনি অসন্তুষ্ট হয়ে হযরত মুয়াবিয়া (রাঃ)- এর দলে ভিড়ে ছিলেন। আল-ইসাবা, ৩য় খন্ড, পৃষ্ঠা- ৪৮৭। মাতবাআতু মুস্তফা মুহাম্মাদ, মিসর ১৯৩৯।]

চারঃ রাষ্ট্রের ধারণা

রাষ্ট্র সম্পর্কে তাঁদের ধারণা কি ছিল, রাষ্ট্রপ্রধান হিসাবে নিজের মর্যাদা এবং কর্তব্য সম্পর্কে তাঁরা কি ধারণা পোষণ করতেন, স্বীয় রাষ্ট্রে তাঁরা কোন নীতি মেনে চলতেন? — খেলাফতের মঞ্চ থেকে ভাষন দান প্রসঙ্গে তাঁরা নিজেরাই প্রকাশ্যে এসব বিষয় ব্যক্ত করেছেন। মসজিদে নববীতে গণ বায়আত ও সপথের পর হযরত আবুবকর (রাঃ) যে ভাষণ দান করেন, তাতে তিনি বলেছিলেনঃ

“আমাকে আপনাদের শাসক নিযুক্ত করা হয়েছে, অথচ আমি আপনাদের মধ্যে সর্বোত্তম ব্যক্তি নই। সে সত্তার শপথ, যাঁর হাতে আমার জীবন ন্যস্ত, আমি নিজে ইচ্ছা করে এ পদ গ্রহণ করিনি। অন্যের পরিবর্তে আমি নিজে এ পদ লাভের চেষ্টাও করিনি, এ জন্য আমি কখনো আল্লার নিকট দোয়াও করিনি। এ জন্য আমার অন্তরে কখনো লোভ সৃষ্টি হয়নি। মুসলমানদের মধ্যে মতবিরোধ এবং আরবদের মধ্যে ধর্ম ত্যাগের ফেতনার সূচনা হবে- এ আশংকায় আমি অনিচ্ছা সত্ত্বে এ দায়িত্ব গ্রহণ করেছি। এ পদে আমার কোন শান্তি নেই। বরং এটা এক বিরাট বোঝা, যা আমার ওপর ন্যস্ত করা হয়েছে। এ বোঝা বহন করার ক্ষমতা আমার নেই। অবশ্য আল্লাহ যদি আমার সাহায্য করেন। আমার ইচ্ছা ছিল, অন্য কেউ এ গুরুদায়িত্ব- ভার বহন করুক। এখনও আপনারা ইচ্ছা করলে রাসুলুল্লা (সঃ)- এর সাহাবীদের মধ্য হতে কাউকে এ কাজের জন্য বাছাই করে নিতে পারেন। আমার বায়আত এ ব্যাপারে আপনাদের প্রতিবন্ধক হবে না। আপনারা যদি আমাকে রাসূলুল্লাহ (সঃ)- এর মানদন্ডে যাচাই করেন, তাঁর কাছে আপনারা যে আশা পোষণ করতেন, আমার কাছেও যদি সে আশা করেন, তবে তার ক্ষমতা আমার নেই। কারণ, তিনি শয়তান থেকে নিরাপদ ছিলেন, তাঁর ওপর ওহী নাযিল হতো। আমি সঠিক কাজ করলে আমার সহযোগিতা করবেন, অন্যায় করলে আমাকে সোজা করে দেবেন। সততা হচ্ছে একটি আমানত-গচ্ছিত ধন। আর মিথ্যা একটি খেয়ানত-গচ্ছিত সম্পদ অপহরণ্ তোমাদের দুর্বল ব্যক্তি আমার নিকট সবল। আল্লার ইচ্ছায় যতক্ষণ আমি তার অধিকার তাকে দান না করি। আর তোমাদের মধ্যকার সবল ব্যক্তি আমার নিকট দুর্বল-যতক্ষণ আল্লার ইচ্ছায় আমি তার কাছ থেকে অধিকার আদায় করতে না পারি। কোনজাতি আল্রার রাস্তায় চেষ্টা সাধনা ত্যাগ করার পরও আল্লাহ তার ওপর অপমান চাপিয়ে দেননি-এমনটি কখনো হয়নি। কোন জাতির মধ্যে অশ্লীলতা বিস্তার লাভ করার পরও আল্লাহ তাদেরকে সাধারণ বিপদে নিপতিত করেন নাএমনও হয় না। আমি যতক্ষণ আল্লাহ ও রাসূল (সঃ)- এর অনুগত থাকি, তোমরা আমার আনুগত্য করো। আমি আল্লাহ ও রাসূল (সঃ)- এর নাফরমানী করলে তোমাদের ওপর আমার কোন আনুগত্য নেই। আমি অনুসরণকারী, কোন নতুন পথের উদ্ভাবক নই।” [আততাবারী, ২য় খন্ড, পৃষ্ঠা- ৪৫০। ইবনে হিশাম, আস সীরাতুন নববিয়্যা, ৪র্থ খন্ড, পৃষ্ঠা- ৩১১, মাতবাআতু মুস্তফা আল-বারী, মিসর- ১৯৩৬, কানযুল ওম্মাল, ৫ম খন্ড, হাদীস নং- ২২৬১, ২২৬৪, ২২৬৮, ২২৭৮, ২২৯১, ২২৯৯।]

হযরত ওমর (রাঃ) তাঁর এক ভাষণে বলেনঃ

“লোক সকল। আল্লার অবাধ্যতায় কারোর আনুগত্য করতে হবে- নিজের সম্পর্কে এমন অধিকারের দাবী কেউ করতে পারে না। ….. লোক সকর। আমার ওপর তোমাদের যে অধিকার রয়েছে, আমি তোমাদের নিকটতা ব্যক্ত করছি। এসব অধিকারের জন্য তোমরা আমাকে পাকড়াও করতে পারো। আমার ওপর তোমাদের অধিকার এই যে, খেরাজ বা আল্লার দেয়া ‘ফাই’ (বিনা যুদ্ধে বা রক্তপাত ছাড়াই যে গনীমাতের মাল লব্ধ হয়) থেকে বেআইনীভাবে কোনো কিছু গ্রহণ করবো না। আর আমার ওপর তোমাদের অধিকার এই যে, এভাবে যে অর্থ আমার হাতে আসে, অন্যায়ভাবে তার কোন অংশও আমি ব্যয় করবো না।” [ইমাম আবু ইউসুফ, কিতাবুল খারাজ, পৃষ্ঠা- ১১৭।]

সিরিয়া ও ফিলিস্তিন যুদ্ধে হযরত আমর ইবনুল আ’স (রাঃ)-কে প্রেরণ কালে হযরত আবুবকর (রাঃ)- যে হেদায়াত দান করেন, তাতে তিনি বলেনঃ

“আমার! আপন প্রকাশ্য অপ্রকাশ্য সকল কাজে আল্লাকে ভয় করে চলো। তাঁকে লজ্জা করে চলো। কারণ, তিনি তোমাকে এবং তোমার সকল কর্মকেই দেখতে পান। ………….পরকালের জন্য কাজ করো। তোমার সকল কর্মে আল্লার সন্তুষ্টির প্রতি লক্ষ্য রেখো। সঙ্গী-সাথীদের সাথে এমনভাবে আচরণ করবে, যেন তারা তোমার সন্তান। মানুষের গোপন বিষয় খুঁজে বেড়িয়ো না। বাহ্য কাজের ভিত্তিতেই তাদের সঙ্গে আচরণ করো। ……. নিজেকে সংযত রাখবে, তোমার প্রজা সাধারণও ঠিক থাকবে।” [কানযুল ওম্মাল, ৫ম খন্ড, হাদীস নঙ- ২৩১৩।]

হযরত ওমর (রাঃ) শাসনকর্তাদের কোন এলাকায় প্রেরণকালে সম্বোধন করে বলতেনঃ

” মানুষের দন্ড-মুন্ডের মালিক বনে বসার জন্য আমি তোমাদেরকে মুহাম্মদ (সঃ)-এর উম্মাতের ওপর শাসনকর্তা নিযুক্ত করছি না। বরং এ জন্য নিযুক্ত করছি যে, তোমরা সালাত কায়েম করবে, মানুষের মধ্যে ইনসাফের ফায়সালা করবে, ন্যায়ের সাথে তাদের অধিকার বন্টন করবে।” [আততাবারী, ৩য় খন্ড, পৃষ্ঠা- ২৭৩।]

বায়আতের পর হযরত ওসমান (রাঃ) প্রথম যে ভাষণ দান করেন, তাতে তিনি বলেনঃ

“শোন, আমি অনুসরণকারী, নতুন পথের উদ্ভাবক নই। জেনে রেখো, আল্লার কিতাব এবং রাসূল (সঃ)-এর সুন্নাহ মেনে চলার পর আমি তোমাদের নিকট তিনটি বিষয় মেনে চলার অঙ্গীকার করছি। একঃ আমার খেলাফতের পূর্বে তোমরা পারস্পরিক সম্মতিক্রমে যে নীতি নির্ধারণ করেছো, আমি তা মেনে চলবো। দুইঃ যেসব ব্যাপারে পূর্বে কোন নীতি-পন্থা নির্ধারিত হয়নি, সেসব ব্যাপারে সকলের সাথে পরামর্শক্রমে কল্যাণভিসারীদের পন্থা নির্ধারণ করবো। তিনঃ আইনের দৃষ্টিতে তোমাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ অপরিহার্য হয়ে না পড়া পর্যন্ত তোমাদের ওপর হস্তক্ষেপ থেকে বিরত থাকবো।” [আততাবারী, ৩য় খন্ড, পৃষ্ঠা- ৪৪৬।]

হযরত আলী (রাঃ) হযরত কায়েস ইবনে সা’দকে মিসরের শাসনকর্তা নিযুক্ত করে পাঠাবার কালে মিসরবাসীদের নামে যে ফরমান দান করেন, তাতে তিনি বলেনঃ

“সাবধান! আমি আল্লার কিতাব এবং তাঁর রাসূল (সঃ)-এর সুন্নাহ মুতাবিক আমল করবো- আমার ওপর তোমাদের এ অধিকার রয়েছে। আল্লার নির্ধারিত অধিকার অনুযায়ী আমি তোমাদের কাজ-কারবার পরিচালনা করবো এবং রাসুলুল্লার সুন্নাহ কার্যকরী করবো। তোমাদের আগোচরেও তোমাদের কল্যাণ কামনা করবো।”

প্রকাশ্য জনসমাবেশে এ ফরমান পাঠ করে শোনাবার পর হযরত কায়েস ইবনে সাআ’দ ঘোষণা করেনঃ “আমি তোমাদের সাথে এভাবে আচরণ না করলে তোমাদের ওপর আমার কোন বায়আত নেই।” [আততাবারী, ৩য় খন্ড, পৃষ্ঠা- ৫৫০-৫৫১।]

হযরত আলী (রাঃ) জনৈক গবর্ণরকে লিখেনঃ

“তোমরা এবং জনসাধারণের মধ্যে দীর্ঘ প্রতিবন্ধক সৃষ্টি করো না। শাসক ও শাসিতের মধ্যে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা দৃষ্টির সংকীর্ণতা এবং জ্ঞানের স্বল্পতার পরিচায়ক। এর ফলে তারা সত্যিকার অবস্থা জানতে পারে না। ক্ষুদ্র বিষয় তাদের জন্য বৃহৎ হয়ে দাঁড়ায়, আর বিরাট বিষয় ক্ষুদ্র। তাদের জন্য ভাল মন্দ হয়ে দেখা দেয়, আর মন্দ গ্রহণ করে ভালর আকার; সত্য-মিথ্যা সংমিশ্রিত হয়ে যায়।” [ইবনে কাসীর, ৮ম খন্ড, পৃষ্ঠা- ৮।]

“হযরত আলী (রাঃ) কেবল এই কথা বলেই ক্ষান্ত হননি, তিনি অনুরূপ কাজও করেছেন। তিনি নিজে দোররা নিয়ে কুফার বাজারে বেরুতেন, জনগণকে অন্যায় থেকে বারণ করতেন, ন্যায়ের নির্দেশ দিতেন। প্রত্যেকটি বাজারে চক্কর দিয়ে দেখতেন, ব্যবসায়ীরা কাজ-কারবারে প্রতারণা করছে কিনা! এ দৈনন্দিন ঘোরাঘুরির ফলে কোন অপরিচিত ব্যক্তি তাঁকে দেখে ধারণাই করতে পারতো না যে, মুসলিম জাহানের খলীফা তার সামনে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। কারণ, তাঁর পোশাক থেকে বাদশাহীর কোন পরিচয় পাওয়া যেতোনা, তাঁর আগে আগে পথ করে দেয়ার জন্য কোন রক্ষীবহিনীও দৌড়ে যেতো না।” [ইবনে কাসীর, ৮ম খন্ড, পৃষ্ঠা- ৪-৫।]

একবার হযরত ওমর (রাঃ) প্রকাশ্য ঘোষণা করেনঃ

” তোমাদেরকে পিটাবার জন্য আর তোমাদের সম্পদ ছিনিয়ে নেয়ার জন্য আমি গবর্ণরদেরকে নিযুক্ত করিনি। তাদেরকে নিযুক্ত করেছি এ জন্য যে, তারা তোমাদেরকে দ্বীন এবং নবীর তরীকাপদ্ধতি শিক্ষা দেবে। কারো সাথে এই নির্দেশ বিরোধী ব্যবহার করা হলে সে আমার কাছে অভিযোগ উত্থাপন করুক। আল্লার কসম করে বলছি, আমি তার (গবর্ণর) কাছ থেকে প্রতিশোধ গ্রহণ করবো। এতে হযরত আমর ইবনুল আস (মিসরের গবর্ণর) দাঁড়িয়ে বলেনঃ “কেউ যদি মুসলমানদের শাসক হয়ে শিষ্টাচার শিক্ষা দেয়ার জন্য তাদেরকে মারে, আপনি কিতার কাছ থেকেও প্রতিশোধ নেবেন?”

হযরত ওমর (রাঃ) জবাব দেনঃ “হা, আল্লার শপথ করে বলছি, আমি তার কাছ থেকেও প্রতিশোধ নেবো। আমি আল্লার রাসূল (সঃ)-কে তাঁর নিজের সত্তা থেকেও প্রতি বিধান দিতে দেখেছি।” [আবু ইউসুফ, কিতাবুল খারাজ, পৃষ্ঠা- ১১৫। মুসনাদে আবু দাউদ আততায়ালেসী, হাদীস নঙ-৫৫। ইবনুল আসীর, ৩য় খন্ড, পৃষ্ঠা- ৩০। আততাবারী, ৩য় খন্ড, পৃষ্ঠা- ২৭৩।]

আর একবার হজ্জ উপলক্ষে হযরত ওমর (রাঃ) সমস্ত গবর্ণরকে ডেকে প্রকাশ্য সমাবেশে দাঁড়িয়ে বলেনঃ এদের বিরুদ্ধে কারোর ওপর কোন অত্যাচারের অভিযোগ থাকলে তা পেশ করতে পারো নির্দ্ধিধায়। গোটা সমাবেশ থেকে মাত্র একজন লোক উঠে হযরত আমর ইবনুল আস-এর বিরুদ্ধে অভিযোগ উত্থাপন করে বলেনঃ তিনি অন্যায় ভাবে আমাকে একশ দোররা মেরেছেন। হযরত ওমর (রাঃ) বলেনঃ ওঠ এবং তার কাছ থেকে প্রতিশোধ নাও। হযরত আমর ইবনুল আস প্রতিবাদ জানিয়ে বলেন, আপনি গবর্ণরদের বিরুদ্ধে এ পথ উন্মুক্ত করবেন না। কিন্তু তিনি বললেনঃ “আমি আল্লার রাসূলকে নিজের থেকে প্রতিশোধ দিতে দেখেছি। হে অভিযোগকারী, এসে তার থেকে প্রতিশোধ গ্রহণ করো।” শেষ পর্যন্ত আমর ইবনুল আস (রাঃ)-কে প্রতিটি বেত্রাঘাতের জন্য দুআশরাফী দিয়ে আপন পিঠ রক্ষা করতে হয়। [আবু ইউসুফ, কিতাবুল খারাজ, পৃষ্ঠা- ১১৬।]

 

পাঁচঃ আইনের প্রাধান্য

এ খলীফারা নিজেকেও আইনের উর্ধে মনে করতেন না। বরং আইনের দৃষ্টিতে নিজেকে এবং দেশের একজন সাধারণ নাগরিককে (স মুসলমান হোক বা অমুসলিম যিম্মি) সমান মনে করতেন।রাষ্ট্র প্রধান হিসেবে তাঁরা নিজেরা বিচারপতি (কাযী) করলেও খলীফাদের বিরুদ্ধে রায়দানে তারা ছিলে সম্পূর্ণ স্বাধীন- যেমন স্বাধীন একজন সাধারণ নাগরিকের ব্যাপারে। একবার হযরত ওরম (রাঃ) এবং হযরত উবাই ইবনে কাব (রাঃ)-এর মধ্যে এক ব্যাপারে মতবিরোধ দেখা দেয়। উভয়ে হযরত যায়েদ (রাঃ) দাঁড়িয়ে হযরত ওমর (রাঃ)-কে তাঁর আসনে বসাতে চাইলেন; কিন্তু তিনি উবাই (রাঃ)- এর সাথে বসলেন। অতঃপর হযরত উবাই (রাঃ)- তাঁর আর্যী পেশ করলেন, হযরত ওমর (রাঃ) অভিযোগ অস্বীকার করলেন। নিয়ম অনুযায়ী যায়েদ (রাঃ)-এর উচিত ছিল হযরত ওমরের কাছ থেকে কসম আদায় করা। কিন্তু তিনি তা করতে ইতস্তত করলেন, হযরত ওমর নিজে কসম খেয়ে মজলিস সমাপ্তির পর বললেনঃ “যতক্ষণ যায়েদের কাছে একজন সাধারণ মুসলমান এবং ওমর সমান না হয়, ততক্ষণ যায়েদ বিচারক হতে পারে না।” [বায়হাকী, আস-সুনানুল কুবরা, ১০ খন্ড, পৃষ্ঠা- ১৩৬। দায়েরাতুল মাআরেফ, হায়দরাবাদ, ১ম সংস্করণ, ১৩৫৫ হিজরী।]

এমনি একটি ঘটনা ঘটে জনৈক খৃষ্টানের সাথে হযরত আলী (রাঃ)- এর। কুফার বাজারে হযরত আলী (রাঃ) দেখতে পেলেন, জনৈক খৃষ্টান তাঁর হারানো লৌহবর্ম বিক্রি করছে। আমীরুল মু’মিনীন হিসেবে তিনি সে ব্যক্তির নিকট থেকে বর্ম ছিনিয়ে নেননি বরং কাযীর দরবারে ফরিয়াদ করলেন। তিনি সাক্ষ্য- প্রমাণ পেশ করতে না পারায় কাযী তাঁর বিরুদ্ধে রায় দান করলেন। [বায়হাকী, আস-সুনানুল কুবরা, ১০ খন্ড, পৃষ্ঠা- ১৩৬। দায়েরাতুল মাআরেফ, হায়দরাবাদ, ১ম সংস্করণ, ১৩৫৫ হিজরী।

ঐতিহাসিক ইবনে খাল্লেকান বর্ণনা করেন যে, একবার হযরত আলী (রাঃ) এবং জনৈক যিম্মী বাদী-বিবাদী হিসেবে কাযী শোরাইহ-এর আদালতে উপস্থিত হন। কাযী দাঁড়িয়ে হযরত আলী (রাঃ)- কে অভ্যর্থনা জানান। এতে তিনি (হযরত আলী) বলেন, “এটা তোমার প্রথম বে-ইনসাফী।” [ইবনে খাল্লেকান, ওয়াফায়াতুল আইয়ান, ২য় খন্ড, পৃষ্ঠা- ১৬৮, মাকতাবাতুন নাহযাতিল মিসরিয়্যাহ, কায়রো, ১৯৪৮।]

 

ছয়ঃ বংশ-গোত্রের পক্ষপাতমুক্ত শাসন

ইসলামের প্রাথমিক যুগের আর একটি বৈশিষ্ট্য ছিল এই যে, ইসলামের নীতি এবং প্রাণশক্তি অনুযায়ী তখন বংশ-গোত্র এবং দেশের পক্ষপাতের উর্ধে উঠে সকল মানুষের সাথে সমান আচরণ করা হতো- কারো সাথে কোন রকম পক্ষপাতিত্ব করা হতো না।

আল্লার রাসূলের ওফাতের পরে আরবের গোত্রবাদ মাথাচড়া দিয়ে ওঠে ঝঞ্জার বেগে। নবুয়াতের দাবীদারদের অভ্যুদয় এবং ইসলাম ত্যাগের হিড়িকের মধ্যে এ উপাদান ছিল সবচেয়ে ক্রিয়াশীল। মোসায়লামার জনৈক ভক্তের উক্তিঃ আমি জানি, মোসায়লামা মিথ্যাবাদী। কিন্তু রাবীআর মিথ্যাবাদী মোযারের সত্যবাদীর চেয়ে উত্তম।’ [আততাবরী, ২য় খন্ড, পৃষ্ঠা- ৫০৮।] মিথ্যা নবুয়্যাতের অপর এক দাবীদার তোলাইহার সমর্থনে বনু গাতফানের জনৈক সর্দার বলেনঃ ‘খোদার কসম, কুরাইশের নবীর অনুসরণ করার চেয়ে আমাদের বন্ধুগোত্রের নবীর অনুসরণ আমার নিকট অধিক প্রিয়।” [আততাবরী, ২য় খন্ড, পৃষ্ঠা- ৪৮৭]

মদীনায় যখন হযরত আবুবকর (রাঃ)- এর হাতে বায়আত অনুষ্ঠিত হয়, তখন গোত্রবাদের ভিত্তিতে হযরত সা’দ ইবনে ওবাদা (রাঃ) তাঁর খেলাফত স্বীকার করা থেকে বিরত ছিলেন। এমনি করে গোত্রবাদের ভিত্তিতেই হযরত আবু সুফিয়ানের নিকট তাঁর খেলাফত ছিল অপসন্দনীয়। তিনি হজরত আলী (রাঃ) নিকট গিয়ে বলেছিলেনঃ “কুরাইশের সবচেয়ে ছোট গোত্রের লোক কি করে খলীফা হয়ে গেল? তুমি নিজেকে প্রতিদ্বন্ধী হিসেবে দাঁড় করাতে প্রস্তুত হলে আমি পদাতিক এবং অশ্বারোহী বাহিনী দ্বারা সমগ্র উপত্যকা ভরে ফেলবো।” কিন্তু হযরত আলী (রাঃ) এক মোক্ষম জবাব দিয়ে তাঁর মুখ বন্ধ করে দেন। তিনি বলেনঃ তোমার এ কথা ইসলাম এবং মুসলমানদের সাথে শত্রুতা প্রমাণ করে। তুমি কোন পদাতিক বা অশ্বারোহী বাহিনী আনো, আমি তা কখনো চাই না। মুসলমানরা পরস্পরের কল্যাণকামী। তারা একে অপরকে ভালবাসে। – তাদের আবাস ও দৈহিক সত্তার মধ্যে যতোই ব্যবধান থাক না কেন। অবশ্য মুনাফিক একে অন্যের সাথে সম্পর্ক ছিন্নকারী। আমরা আবুবকরকে এ পদের যোগ্য মনে করি। তিনি এ পদের যোগ্য না হলে আমরা কখনো তাঁকে এ পদে নিয়োজিত হতে দিতাম না। [কানযুল ওম্মাল, ৫ম খন্ড, হাদীস-২৩৭৪। আততাবারী, ২য় খন্ড, পৃষ্ঠা- ৪৪৯। ইবনুআব্দিল বার, আল-ইস্তিআব, ২য় খন্ড, পৃষ্ঠা- ৬৮৯।]

এ পরিবেশে হযরত আবুবকর (রাঃ) এবং তারপর হযরত ওমর (রাঃ) নিরপেক্ষ এবং পক্ষপাতমুক্ত ইনসাফপূর্ণ আচরণের মাধ্যমে কেবল আরবের বিভিন্ন গোত্রে নয়, বরং অ-আরব নওমুসলিমদের সাথেও ইনসাফপূর্ণ ব্যবহার করেন এবং আপন বংশ-গোত্রের সাথে কোন প্রকার ব্যতিক্রমধর্মী আচরণ থেকে তাঁরা সম্পূর্ণ বিরত থাকেন। এর ফলে সব রকম বংশ গোত্রবাদ বিলীন হয়ে যায়। মুসলমানদের মধ্যে ইসলামের দাবী অনুযায়ী একটি আন্তর্জাতিক প্রাণশক্তি ফুটে ওঠে। হযরত আবুবকর (রাঃ) তাঁর খেলাফতকালে আপন গোত্রের কোন লোককে কোন সরকারী পদে নিয়োগ করেননি। হযরত ওমর (রাঃ) তাঁর গোটা শাসনকালে তাঁর গোত্রের একজন মাত্র ব্যক্তিকে- যার নাম ছিল নোমান ইবনে আদী- বসরার নিকটে মায়দান নামক এক ক্ষুদ্র এলাকার তহশিলদার নিযুক্ত করেছিলেন। অল্প কিছুদিন পরই আবার এ পদ থেকে তাকে বরখাস্ত করেছিলেন। [হযরত নুমান ইবনে আদী (রাঃ) ছিলেন প্রাথমিক যুগের মুসলমানদের অন্যতম। হযরত ওমর (রাঃ)-এরও আগে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। আবিসিনিয়ায় হিজরতকালে যারা মক্কা ত্যাগ করে আবিসিনিয়া চলে যান, তাঁদের মধ্যে তিনি এবং তাঁর পিতা আদীও ছিলেন। হযরত ওমর (রাঃ) যখন তাঁকে মাইসান- এর তহসিলদার নিযুক্ত করে প্রেরণ করে প্রেরণ করেন, তখন তাঁর স্ত্রী তাঁর সঙ্গে যাননি। তিনি সেখানে স্ত্রীর বিরহে কিছু কবিতা রচনা করেন। এ সকল কবিতায় কেবল মদের বিষয় উল্লেখ ছিল। এতে হযরত ওমর (রাঃ) তাকে পদচ্যুত করেন। শুধু তাই নয়, ভবিষ্যতে তাকে কোন পদ না দেয়ারও সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন তিনি। ইবনে আব্দুল বার, আল-ইস্তীআ’ব, ১ম খন্ড, পৃষ্ঠা-২৯৬। দায়েরাতুল মাআরেফ, হায়দরাবাদ, মুজামুল বুলদান, ইয়াকুত হামাবী, ৫ম খন্ড, পৃষ্ঠা- ২৪২-২৪৩। দারে ছাদের, বৈরুত, ১৯৫৭। অপর এক ব্যক্তি, হযরত কোদামা ইবনে মাযউন- যিনি হযরত ওমর (রাঃ)- এর ভগ্নিপতি ছিলেন- তিনি তাঁকে বাহরাইন-এর শাসনকর্তা নিযুক্ত করেন। তিনি ছিলেন আবিসিনিয়ার হিজরতকারী এবং বদর যুদ্ধে অংশ গ্রহণকারীদের অন্যতম। কিন্তু তাঁর বিরুদ্ধে মদ্যপানের অভিযোগ প্রমাণিত হলে তিনি তাঁকে বরখাস্ত করে দণ্ড দান করেন। (আল- ইস্তীআব, ২য় খন্ড, পৃষ্ঠা- ৫৩৪, ইবনে হাজার, আল-ইসাবা) ৩য় খন্ড, পৃষ্ঠা- ২১৯-২২০।] এদিক থেকে এ দুজন খলীফার কর্মধারা সত্যিকার আদর্শভিত্তিক ছিল।

হযরত ওমর (রাঃ) জীবনের শেষ অধ্যায়ে আশংকাবোধ করলেন, তাঁর পরে আরবের গোত্রবাদ (ইসলামী আন্দোলনের বিরাট বিপ্লবী প্রভাবের ফলেও যা এখনও সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন হয়নি) পুনরায় যেন মাথাচা দিয়ে না ওঠে এবং তার ফলে ইসলামের মধ্যে বিপর্যয় সৃষ্টি না হয়ে যায়। একদা তাঁর সম্ভাব্য উত্তরশুরীদের সম্পর্কে আলোচনা প্রসঙ্গে হযরত আবদুল্লা ইবনে আব্বাস (রাঃ)- কে হযরত ওসমান (রাঃ)- এর ব্যাপারে বলেনঃ ‘আমি তাঁকে আমার স্থলাভিষিক্ত মনোনীত করলে তিনি বনী আবিমুয়াইত (বনী উমাইয়্যা)-কে লোকদের ঘাড়ে চাপিয়ে দেবেন। আর তারা লোকদের মধ্যে আল্লার নাফরানী করে বেড়াবে। আল্লার কসম আমি ওসমানকে স্থলাভিষিক্ত করলে সে তাই করবে। আর ওসমান তাই করলে তারা অবশ্যই পাপাচার করবে। এক্ষেত্রে জনগণ বিদ্রোহ করে তাকে হত্যা করবে। [ইবনে আব্দুল বার, আল-ইস্তীআব, ২য় খন্ড, পৃষ্ঠা- ৪৬৭। শাহ ওয়ালীউল্লাহ, ইযালাতুল খিফা, মাকসাদে আউয়াল, পৃষ্ঠা- ৩৪২,বেরিলা সংস্করণ। কেউ কেউ এখানে প্রশ্ন তোলেনঃ হযরত ওমর (রাঃ)- এর ওপর কি ইলহাম (সূক্ষ্ম ওহী) হয়েছিল, যার ভিত্তিতে তিনি হলফ করে এমন কথা বলেছিলেন, পরবর্তী পর্যায়ে যা অক্ষরে অক্ষরে ঘটে গিয়েছিল? এর জবাব এই যে, দিব্য দৃষ্টি সম্পন্ন ব্যক্তি কখনো কখনো পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে তাকে যুক্তির আলোকে পুনর্বিন্যাস করলে ভাবীকালে ঘটিতব্য বিষয় তাঁর সামনে এমনিভাবে উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে, যেমন ২ + ২ = ৪। ফলে ইলহাম ব্যতীতই তিনি দিব্য দৃষ্টি বলে সঠিক ভবিষ্যদ্বানী করতে পারেন। আরবদের মধ্যে গোত্রবাদের বীজাণু কতো গভীরে শিকড় গেড়ে বসেছে, হযরত ওমর (রাঃ) তা জানতেন। তিনি এ-ও জানতেন যে, ইসলামের ২৫-৩০ বৎসরের প্রচার এখনও সে সব বীজাণু সমুলে উৎপাটিত করতে পারেনি। এ কারণে তিনি বিশ্বাস করতেন যে, যদি তাঁর এবং হজরত আবুবকর (রাঃ)- এর নীতিতে বিন্দুমাত্র পরিবর্তন করা হয়। তাঁর উত্তরসূরীরা যদি নিজ গোত্রের লোকদেরকে বড় বড় পদ দান করা শুরু করেন, তাহলে গোত্রবাদ পুনরায় মাথা চাড়া দিয়ে ওঠবে-কেউ তাকে ঠেকাতে পারবে না। ফলে রক্তক্ষয়ী বিপ্লব অবশ্যম্ভাবী হয়ে দেখা দেবে।] ওফাতকালেও এ বিষয়টি তার স্মরণ ছিল। শেষ সময়ে তিনি হযরত আলী (রাঃ), হযরত ওসমান (রাঃ) এবং হযরত সা’দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রাঃ)- এর প্রত্যেককে ডেকে বলেনঃ ‘আমার পরে তোমরা খলীফা হলে স্ব-স্ব গোত্রের লোকদেরকে জনগণের ওপর চাপিয়ে দেবে না। [আততাবারী, ৩য় খন্ড- পৃষ্ঠা- ২৬৪। তাবাকাতে ইবনে সা’দ ৩য় খন্ড, পৃষ্ঠা- ৩৪০-৩৪৪।] পরন্তু ছয় সদস্যের নির্বাচনী শুরার জন্য তিনি যে হেদায়াত দিয়ে যান, তাতে অন্যান্য বিষয়ের সাথে নিন্মোক্ত বিষয়টিও ছিলঃ নির্বাচিত খলীফার এ কথাটি মেনে চলবেন যে, তাঁরা আপন গোত্রের সাথে কোন ব্যতিক্রমধর্মী আচরণ করবেন না। [ফতহুলবারী, ৭ম খন্ড, পৃষ্ঠা- ৪৯-৫০। মুহিবুদ্দদীন আততাবারী, আর- রিয়াযুন নাযেরা ফী মানাকিবিল আশারা, ২য় খন্ড, পৃষ্ঠা- ৭৬, হোসাইনিয়া প্রেস, মিসর, ১৩২৭ হিজরী। ইবনে খালদুন, দ্বিতীয় খন্ডের পরিশিষ্ট, পৃষ্ঠা- ১২৫, আল- মাতবাআতুল কুবরা, মিসর, ১২৮৪ হিজরী। শাহ ওয়ালিউল্লাহ (রাঃ) তাঁর ইযালাতুল খিফায় এ বর্ণনার উদ্ধৃতি দিয়েছেন। মাকসাদে আউয়াল, পৃষ্ঠা- ৩২৪ দ্রষ্টব্য।] কিন্তু দুর্ভাগ্যবশতঃ তৃতীয় খলীফা হযরত ওসমান (রাঃ) এ ক্ষেত্রে ঈপ্সিত মানদন্ড বজায় রাখতে সক্ষম হননি। তাঁর শাসনামলে বনী উমাইয়াকে ব্যাপকভাবে বিরাট বিরাট পদ পএবং বায়তুলমাল থেকে দান-দক্ষিণা দেয়া হয়। অন্যান্য গোত্র তিক্ততার সাথে তা অনুধাবন করতে থাকে। [তাবাকাতে ইবনে সা’দ, ৩য় খন্ড, পৃষ্ঠা- ৬৪, ৫ম খন্ড, পৃষ্ঠা- ৩৬।] তাঁর কাছে এটা ছিল আত্মীয়-স্বজনদের সাথে সদাচারের দাবী। তিনি বলতেনঃ ওমর (রাঃ) আল্লার জন্য তাঁর নিকটাত্মীয়দের বঞ্চিত করতেন আর আমি আল্লার জন্য আমার নিকটাত্মীয়দের দান করছি। [আততাবারী, ৩য় খন্ড, পৃষ্ঠা- ২৯১] একবার তিনি বলেনঃ ‘বায়তুলমালের ব্যাপারে আবুবকর (রাঃ) ও ওমর (রাঃ) নিজেও অসচ্ছল অবস্থায় থাকা পসন্দ করতেন এবং নিজের আত্মীয়-স্বজনকে সেভাবে রাখতে ভাল বাসতেন। কিন্তু আমি এ ব্যাপারে আত্মীয়-স্বজনদের সাথে সদাচার পসন্দ করি। [কানযুল ওম্মাল, ৫ম খন্ড, হাদীস- ২৩২৪। তাবাকাতে ইবনে সাদ, ৩য় খন্ড, পৃষ্ঠা- ৬৪] অবশেষে এর ফল তাই হয়েছে হযরত ওমর (রাঃ) যা আশংকা করতেন। তাঁর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ-বিক্ষোভ দেখা দেয়। কেবল তিনি যে শহীদ হন তাই নয়, বরং গোত্রবাদের চাপা দেয়া স্ফুলিঙ্গ পুনরায় মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে এবং অবশেষে এরি অগ্নিশিখা খেলাফতে রাশেদার ব্যবস্থাকেই জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দেয়।

 

সাতঃ গণতন্ত্রের প্রাণশক্তি

সমালোচনা ও মতামত প্রকাশের অবাধ স্বাধীনতাই ছিল এ খেলাফতের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্যরাজির অন্যতম। খলীফারা সর্বক্ষণ জনগণের নাগালের মধ্যে থাকতেন। তাঁরা নিজেরা শূরার অধিবেশনে বসতেন এবং আলোচনায় অংশগ্রহণ করতেন। তাঁদের কোন সরকারী দল ছিল না। তাঁদের বিরুদ্ধেও কোন দলের অস্তিত্ব ছিল না। মুক্ত পরিবেশে সকল সদস্য নিজ নিজ ঈমান এবঙ বিবেক অনুযায়ী মত প্রকাশ করতেন। চিন্তাশীল, উচ্চ বুদ্ধিবৃত্তি সম্পন্ন ও সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের সামনে সকল বিষয় যথাযথভাবে উপস্থাপিত করা হতো। কোন কিছুই গোপন করা হতো না । ফায়সালা হতো দলীল-প্রমাণের ভিত্তিতে, কারোর দাপট, প্রভাব-প্রতিপত্তি, স্বার্থ সংরক্ষণ বা দলাদলির ভিত্তিতে নয়। কেবল শূরার মাধ্যমেই খলীফারা জাতির সম্মুখে উপস্থিত হতেন না। বরং দৈনিক পাঁচবার সালাতের জামায়াতে, সপ্তাহে একবার জুময়ার জামায়াতে এবং বৎসরে দুবার ঈদের জামায়াতে ও হজ্জ-এর সম্মেলনে তাঁরা জাতির সামনে উপস্থিত হতেন। অন্যদিকে এ সব সময়জাতিও তাঁদের সাথে মিলিত হওয়ার সুযোগ পেতো। তাঁদের নিবাস ছিল জনগণের মধ্যেই। কোন দারোয়ান ছিল না তাঁদের গৃহে। সকল সময়ে সকলের জন্য তাঁদের দ্বার খোলা থাকত। তাঁরা হাট-বাজারে জনগণের মধ্যে চলাফেরা করতেন। তাঁদের কোন দেহরক্ষী ছিল না, ছিল না কোন রক্ষী বাহিনী। এ সব সময়ে ও সুযোগে যে কোন ব্যক্তি তাঁদেরকে প্রশ্ন করতে, সমালোচনা করতে ও তাঁদের নিকট থেকে হিসাব চাইতে পারতো। তাঁদের নিকট থেকে কৈফিয়ত তলব করার স্বাধীনতা ছিল সকলেরই। এ স্বাধীনতা ব্যবহারের তাঁরা কেবল অনুমতিই দিতেন না, বরং এ জন্য লোকদেরকে উৎসাহিতও করতেন। ইতিপূর্বে বলা হয়েছে যে, হযরত আবুবকর (রাঃ) তাঁর খেলাফতের প্রথম ভাষণেই প্রকাশ্যে বলে দিয়েছিলেন, আমি সোজা পথে চললে আমার সাহায্য করো, বাঁকা পথে চললে আমাকে সোজা করে দেবে। একদা হযরত ওমর (রাঃ) জুমআর খোতবায় মতপ্রকাশ করেন যে, কোন ব্যক্তিকে যেন বিবাহে চারশ দেরহামের বেশী মোহর ধার্যের অনুমতি না দেয়া হয়। জনৈকা মহিলা তৎক্ষণাৎ দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ করে বলেন, আপনার এমন নির্দেশ দেয়ার কোন অধিকার নেই। কুরআন স্তুপিকৃত সম্পদ (কেনতার) মোহর হিসাবে দান করার অনুমতি দিচ্ছে। আপনি কে তার সীমা নির্ধারণকারী? হযরত ওমর (রাঃ) তৎক্ষণাৎ তাঁর মত প্রত্যাহার করেন। [তাফসারী ইবনে কাসীর, আবু ইয়ালা ও ইবনুল মুনযির, এর উদ্ধৃতিতে, ১ম খন্ড, পৃষ্ঠা- ৪৬৭।] আর একবার হযরত সালমান ফারসী প্রকাশ্য মজলিসে তাঁর নিকট কৈফিয়ত তলব করেন- ‘আমাদের সকলের ভাগে একখানা চাদর পড়েছে। আপনি দু’খানা চাদর কোথায় পেলেন? হযরত ওমর (রাঃ) তৎক্ষণাৎ স্বীয় পুত্র আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রাঃ) এর সাক্ষ্য পেশ করলেন যে, দ্বিতীয় চাদরখানা তিনি পিতাকে ধার দিয়েছেন। [মুহিবুদ্দদীন আত-তাবারী আররিয়াযুন নাযেরা ফী মানাকিবিল আশারা, ২য় খন্ড, পৃষ্ঠা- ৫৬। মিসরীয় সংস্করণ। ইবনুল জাওযী, সীরাতে ওমর ইবনে খাত্তাব, পৃষ্ঠা- ১২৭।] একদা তিনি মজলিসে উপস্থিত ব্যক্তিদের জিজ্ঞেস করলেনঃ আমি যদি কোন ব্যাপারে শৈথিল্য দেখাই তাহলে তোমরা কি করবে? হযরত বিশর (রাঃ) ইবনে সাদ বললেন, এমন করলে আমরা আপনাকে তীরের মতো সোজা করে দেবো হযরত ওমর (রাঃ) বললেন, তবেই তো তোমরা কাজের মানুষ। [কানযুল ওম্মাল, ৫ম খন্ড, হাদীস- ২৪১৪।] হযরত ওসমান (রাঃ) সবচেয়ে বেশী সমালোচনার সম্মুখীন হয়েছেন। তিনি কখনো জোরপূর্বক কারো মুখ বন্ধ করার চেষ্টা করেননি। বরং সব সময় অভিযোগ এবং সমালোচনার জবাবে প্রকাশ্যে নিজের সাফাই পেশ করেছেন। হযরত আলী (রাঃ) তাঁর খেলাফত কালে খারেজীদের অত্যন্ত কটু উক্তিকেও শান্ত মনে বরদাশত করেছেন। একদা পাঁচজন খারেজীকে গ্রেফতার করে তাঁর সামনে হাযির করা হলো। এরা সকলেই প্রকাশ্যে তাঁকে গালি দিচ্ছিলো। তাদের একজন প্রকাশ্যেই বলছিল-আল্রার কসম আমি আলীকে হত্যা করবো। কিন্তু হযরত আলী (রাঃ) এদের সকলকেই ছেড়ে দেন এবং নিজের লোকদেরকে বলেন, তোমরা ইচ্ছে করলে তাদের গাল-মন্দের জবাবে গালমন্দ দিতে পারো। কিন্তু কার্যত কোন বিদ্রোহাত্মক পদক্ষেপ গ্রহণ না করা পর্যন্ত নিছক মৌখিক বিরোধিতা এমন কোন অপরাধ নয়, যার জন্য তাদেরকে শাস্তি দেয়া যেতে পারে। [সুরুখসী, আল-মাবসুত, ১০খন্ড, পৃষ্ঠা- ১২৫। সাআদাত প্রেস, মিসর, ১৩২৪ হিজরী।]

ওপরে আমরা খেলাফতে রাশেদার যে অধ্যায়ের আলোচনা করেছি, তা ছিল আলোর মীনার। পরবর্তীকালে ফোকাহা-মোহাদ্দেদসীন এবং সাধারণ দ্বীনদার মুসলমান সে আলোর মীনারের প্রতি দৃষ্টি রেখেছিলেন। ইসলামের ধর্মীয়, রাজনৈতিক, নৈতিক এবং সামাজিক ব্যবস্থার ক্ষেত্রে তাঁরা এ মীনারকেই আদর্শ মনে করে আসছেন।

Top

চতুর্থ অধ্যায়

খেলাফতে রাশেদা থেকে রাজতন্ত্র পর্যন্ত

আগের অধ্যায়ে খেলাফতে রাশেদার উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য এবং মূলনীতিগুলো আলোচনা করা হয়েছে। বস্তুত খেলাফতে রাশেদা কেবল একটা রাজনৈতিক ব্যবস্থাই ছিল না, বরং তা ছিল নবুয়াতের পূর্ণ প্রতিনিধিত্বশীল একটি ব্যবসাথা অর্থাৎ দেশের শাসন-শৃংখলা বজায় রাখা, শান্তি স্থাপন ও সীমান্ত রক্ষা করাই কেবল তার দায়িত্ব ছিল না; বরং তা মুসলমানদের সামাজিক জীবনে শিক্ষক, তত্ত্বাবধায়ক এবং পথ-প্রদর্শকের এমন সব দায়িত্ব পালন করেছে, যা নবী (সঃ) তাঁর জীবনে পালন করেছেন। দারুল ইসলাম তথা ইসলামী রাষ্ট্রে সত্য-সনাতন দ্বীনের পরিপূর্ণ ব্যবস্থাকে তার সত্যিকার আকার-আঙ্গিক এবং প্রাণ-ধারায় সঞ্জীবিত করে পরিচালনা করা এবং বিশ্বে মুসলমানদের গোটা সামাজিক শক্তিনিচয়কে আল্লার কালেমা বুলন্দ করার কাজে নিয়োজিত করাই ছিল তার দায়িত্ব। এ কারণে তাকে কেবল খেলাফতে রাশেদা না বলে বরং এ সঙ্গে খেলাফতে মুরশেদা সত্য-পথ প্রদর্শক খেলাফত-বলাই অধিক যুক্তিযুক্ত হবে। খেলাফত আলা মিনহাজিন নবুয়াত-নবুয়াতের পদাংক অনুসারী খেলফত-কথাটিতে এ উভয় বৈশিষ্ট্য ফুটে ওঠে। এ ধরনের রাষ্ট্রই ইসলামের অভিপ্রেত, নিছক রাজনৈতিক শাসন-কতৃত্ব নয়-দ্বীনের সামান্য জ্ঞানসম্পন্ন কোন ব্যক্তিই এ সম্পর্কে অনবহিত থাকতে পারে না।

যে সকল পর্যায় অতিক্রম করে শেষ পর্যন্ত এ খেলাফত রাজতন্ত্রের রূপ পরিগ্রহ করেছে, এখানে আমরা সেগুলো পর্যালোচনা করবো। এ পরিবর্তন মুসলমানদের রাষ্ট্রকে ইসলামের শাসননীতি থেকে কতটা দূরে সরিয়ে নিয়েছে, মুসলমানদের সমাজ জীবনে তার কি প্রতিক্রিয়া হয়েছে, আমরা তাও আলোচনা করবো।

 

পরিবর্তনের সূচনা

হযরত ওমর (রাঃ) যেখান থেকে এ পরিবর্তনের আশংকা করেছিলেন, ঠিক সেখান থেকেই এ পরিবর্তনের সূচনা হয়েছে। ওফাতের নিকটবর্তী কালে যে বিষয়ে তিনি সবচেয়ে বেশী অশংকা করতেন, তা ছিল এই যে, তাঁর স্থলাভিষিক্তরা যেন তাদের বংশ, গোত্র এবং নিকটাত্মীয়দের ব্যাপারে রাসুলুল্লাহর সময় থেকে তাঁর (হযরত ওমর) শাসনকাল পর্যন্ত অব্যাহত নীতির পরিবর্তন না করে। রাসুলুল্লাহ (সঃ) তাঁর গোটা শাসনামলে হযরত আলী (রাঃ) ব্যতীত বনী হাশেমের অপর কোন ব্যক্তিকে কোন পদ দান করেননি। হযরত আলী (রাঃ) তাঁর খেলাফত কালে নিজের বংশ-গোত্র থেকে কোন পদ দান করেননি। হযরত ওমর (রাঃ) তাঁর দশ বৎসরের শাসনামলে বনী আদীর কেবলমাত্র একজন লোককে একটি ক্ষুদ্র পদে নিযুক্ত করেন এবং অবিলম্বেই তাকে সে পদ থেকে বরখাস্ত করেন এ কারণে সে সময় গোত্রবাদ মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার সুযোগ পায়নি। হযরত ওমর (রাঃ)-এর আশংকা ছিল, এ নীতি পরিবর্তিত হলে তা মারাত্মক বিপর্যয়ের কারণ হবে। তাই তিনি তাঁর তিনজন সম্ভাব্য উত্তর সুরী- হযরত ওসমান, হযরত আলী এবং হযরত সা’দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রাঃ)-কে পৃথক পৃথকভাবে ডেকে ওসিয়াত করেন- আমার পরে তোমরা খলীফা হলে তোমাদের গোত্রের লোকদেরকে মুসলমানদের ঘাড়ে চাপিয়ে দেবে না। [‘তাবারী, ৩য় খন্ড, পৃষ্ঠা- ২৬৪। তাবাকাতে ইবনে সা’দ, ৩য় খন্ড, পৃষ্ঠা- ৩৪০, ৩৪১, ৩৪৩, ৩৪৪।]

কিন্তু তাঁর পরে হযরত ওসমান (রাঃ) তাঁর স্থলাভিষিক্ত হয়ে ধীরে ধীরে এ নীতি থেকে দূরে সরে যান। তিনি তাঁর আত্মীয়-স্বজনকে একের পর এক বিরাট বিরাট পদ দান করতে থাকেন। তিনি তাদেরকে এমনসব সুযোগ-সুবিধা দান করেন, যা জনগণের মধ্যে সাধারণভাবে সমালোচনার লক্ষ্য বস্তুতে পরিণত হয়। [উদাহরণ স্বরূপ, তিনি আফ্রিকার গনীমাতের মালের এক-পঞ্চমাংশের সম্পূর্ণ অংশই (৫ লক্ষ দীনার) মারওয়ানকে দান করেন। এ ঘটনা সম্পর্কে ঐতিহাসিক ইবনুল আসীর তাঁর গবেষণা বিবৃত করেছেন এ ভাবেঃ

আবদুল্লাহ ইবনে সা’দ ইবনে আবিসারাহ আফ্রিকার গনিমাতের মালের এক-পঞ্চমাংশ মদীনায় নিয়ে আসেন এবং মারওয়ান ইবনুল হাকাম ৫ লক্ষ দীনার দিয়ে তা খরদী করেন। অতঃপর হযরত ওসমান (রাঃ) তার নিকট থেকে এ মূল্য গ্রহণ করেননি। যেসব কারণে হযরত ওসমান (রাঃ)- এর সমালোচনা করা হয়, এটাও ছিল তার অন্যতম। আফ্রিকার মালে গনীমাতের এক-পঞ্চমাংশ সম্পর্কে যতো বর্ণনা পাওয়া যায় এ বর্ণনা তন্মধ্যে সবচেয়ে বিশুদ্ধ। কেউ কেউ বলেন, হযরত ওসমান (রাঃ) আফ্রিকার গনীমাতের মালের এক-পঞ্চমাংশ আবদুল্লাহ ইবনে সা’আদকে দান করেন। আবার কেউ কেউ বলেন, মারওয়ান ইবনে হাকামকে দান করেন। এ বর্ণনা থেকে এ তত্ত্ব জানা যায় যে, হযরত ওসমান (রাঃ) আফ্রিকার প্রথম যুদ্ধের গনীমাতের মালের এক-পঞ্চমাংশ আব্দুল্লাহ ইবনে সা’দকে দান করেন আর দ্বিতীয় যুদ্ধ-যাতে আফ্রিকার গোটা এলাকা বিজিত হয়- তার গনীমাতের মালের এক-পঞ্চমাংশ মারওয়ানকে দান করেন।-(আল-কামেল ফিত তারীখ, ৩য় খন্ড, পৃষ্ঠা- ৪৬, মাতবাআতুত তিবআতীল মুনীরিয়্যাহ, মিসর ১৩৪৮ হিজরী।

ইবনে সা’আদও তাবাকাত-এ ইমাম যুহরীর সনদে বর্ণনা করেনঃ ************** হযরত ওসমান (রাঃ) মিসরের গনীমাতের মালের এক-পঞ্চমাংশ মারওয়ানকে লিখে দিয়েছেন- (৩য় খন্ড, পৃষ্ঠা- ৬৪)। ইমাম যুহরীর এ বর্ণনা সম্পর্কে আপত্তি করা চলে যে, ইবনে সা’আদ এ বর্ণনাটি ওয়াকেদীর উদ্ধৃতিতে বর্ণনা করেছেন। আর ওয়াকেদী বিশ্বাসভাজন বর্ণনাকারী নয়। কিন্তু প্রথমত, সকল মুহাদ্দিদসই ইবনে সাআদকে নির্ভরযোগ্য এবং বিশ্বাসভাজন বলে স্বীকার করেন। তাঁর সম্পর্কে স্বীকার করা হয় যে, তিনি যাচাই-বাছাই করে রেওয়ায়াত গ্রহণ করতেন। এ কারণে তাঁর কিতাব তাবাকাত ইসলামের ইতিহাসের একান্ত নির্ভরযোগ্য উৎস বলে স্বীকৃত। দ্বিতীয়ত, স্বয়ং ওয়াকেদী সম্পর্কেও জ্ঞানীরা এ কথা জানেন যে আহকাম এবং সুনান সম্পর্কে তাঁর হাদীসকে রদ করা হয়েছে। বাকি থাকে ইতিহাস এবং বিশেষ করে মাগাযী এবং সিয়ার অধ্যায়। এ ব্যাপারে কে ওয়াকেদীর বর্ণনা গ্রহণ করেননি। ইতিহাসের ব্যাপারে কোন ব্যক্তি যদি বর্ণনার প্রমাণের জন্য হুবুহু এমনসব শর্ত আরোপ করে শরীয়াতের বিধানের ক্ষেত্রে মুদহাদ্দিদসগণ যা আরোপ করেছেন, তাহলে ইসলামের ইতিহাসের শতকরা ৯০ ভাগ বরং তার চেয়েও বেশী অংশকে বাদ দিতে হবে।- (এখানে উল্লেখ্য যে, ইবনে খালদুন- কেউ কেউ যাঁকে অন্যদের চেয়ে বেশী বিশ্বাসযোগ্য বলে মনে করেন- তিনি ইবনে আসীর এবং ইবনে সা’দের এ বর্ণনা সমর্থন করেছেন। দ্রষ্টব্য দ্বিতীয় খন্ডের পরিশিষ্ট পৃষ্ঠা- ১৩৯-১৪০।] তিনি হযরত সা’আদ ইবনে আবি ওয়াক্কাসকে (রাঃ) পদচ্যুত করে তাঁর বৈমাত্রেয় ভাই ওয়ালীদ ইবনে উকবা ইবনে আবী মোয়াইতকে কুফার গবর্ণর নিযুক্ত করেন। এরপরে তাঁর অপর এক বন্ধু সাঈদ ইবনে আ’সকে এ পদ দান করেন। হযরত আবু মূসা আশআরীকে (রাঃ) বসরার গবর্ণরের পদ থেকে বরখাস্ত করে তাঁর মামাত ভাই আবদুল্লাহ ইবনে আমেরকে তাঁর স্থলে নিয়োগ করেন। হযরত আমর ইবনুল আসকে মিসরের গবর্ণরী থেকে সরিয়ে নিজের দুধভাই আবদুল্লাহ ইবনে সা’আদ ইবনে আবিশারাহকে নিযুক্ত করেন। সাইয়্যেদেনা হযরত ওমর ফারুক (রাঃ)-এর যামানায় হযরত মুআবিয়া (রাঃ) কেবল সিরিয়ার শাসনকর্তা ছিলেন। [হাফেয ইবনে কাসীর বলেনঃ ******************

‘সত্য কথা এই যে, হযরত ওসমান (রাঃ) সিরিয়ার গোটা এলাকা হযরত মুয়াবিয়ার (রাঃ) গবর্ণরীতে সংযোজন করেন। হযরত ওমর (রাঃ) তাঁকে কেবল সিরিয়ার অংশবিশেষের শাসনকর্তা নিযুক্ত করেছিলেন।’- আল-বেদায়া ওয়ান নেহায়া, ৮ম খন্ড, পৃষ্ঠা- ১২৪।] হযরত ওসমান (রাঃ) দামেস্ক, হেমছ, ফিলিস্তিন, জর্দান এবং লেবাননের গোটা এলাকা তাঁর শাসনাধীন করে দেন। অতঃপর তাঁর চাচাত ভাই মারওয়ান ইবনুল হাকামকে তিনি তাঁর সেক্রেটারী নিযুক্ত করেন, যার ফলে সাম্রাজ্যের প্রত্যন্ত প্রান্তে তাঁর প্রভাব প্রতিপত্তি হয়ে পড়ে। এমনি করে একই বংশের হাতে সকল ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হয়।

কেবল সাধারণ লোকদের ওপরই নয়, বড় বড় সাহাবীদের ওপরও এসব বিষয়ের প্রতিক্রিয়া খুব একটা শুভ হয়নি। হতেও পারে না। উদাহরণস্বরুপ, ওয়ালীদ ইবনে ওকবা কুফার গবর্ণরীর পরওয়ানা নিয়ে হযরত সা’আদ ইবনে আবি ওয়াক্কাসের নিকট উপস্থিত হলে তিনি বলেনঃ ‘জানি না, আমার পরে তুমি বেশী জ্ঞানী হয়ে গেছ, না আমি বোকা হয়ে গেছি।’ তিনি জবাব দেনঃ আবু ইসহাক। ক্রুদ্ধ হয়ো না। এটাতো বাদশাহী। সকালে একজন এ নিয়ে মৌজ করে, সন্ধ্যায় আর একজন।’ হযরত সা’আদ বলেনঃ বুঝতে পেরেছি, সত্যিই তোমরা একে বাদশাহী বানিয়ে ছাড়বে।’ প্রায় এহেন মনোভাব হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদও ব্যক্ত করেন। [ইবনে আবদুল বার আল-এস্তীআব, ২য় খন্ড, পৃষ্ঠা- ৬০৪।]

এটা কেউ অস্বীকার করতে পারে না যে, সাইয়্যেদেনা হযরত (রাঃ) নিজের বংশের যেসব ব্যক্তিদেরকে এসব সরকারী পদ দান করেন, তাঁরা নিজেদের উন্নত পর্যায়ের প্রশাসনিক এবং সামরিক দক্ষতা প্রমাণ করেছেন তাঁদের হাতে বহু ভূখন্ড বিজিত হয়েছে। কিন্তু এ কথা সুস্পষ্ট যে, যোগ্যতা কেবল এদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। উৎকৃষ্ট যোগ্যতার অধিকারী আরও অনেকেই বর্তমান ছিলেন।

তাঁরা ইতিপূর্বে এদের চেয়েও উত্তম খেদমত আঞ্জাম দিয়েছিলেন। খোরাসান থেকে শুরু করে উত্তর আফ্রিকা পর্যন্ত গোটা এলাকা একই বংশের গবর্ণরদের অধীনে আনা এবঙ কেন্দ্রীয় সেক্রেটারীয়েটেও একই বংশেরই লোক নিয়োগ করার জন্য নিছক যোগ্যতাই একমাত্র ভিত্তি হতে পারে না। রাষ্ট্রপ্রধান যে বংশের হবেন, রাষ্ট্রের সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ পদে সে বংশের লোকদের নিয়োগ করা প্রথমত এমনিতেই আপত্তিকর। কিন্তু এ ছাড়াও আরো এমন কিছু কার্যকরণ ছিল, যার ফলে পরিস্থিতিতে আরও জটিলতা দেখা দেয়ঃ

প্রথমত এ খান্দানের যেসব লোক হযরত ওসমান (রাঃ) এর সময়ে অগ্রসর হয়েছেন, তাঁরা সকলেই ছিলেন তোলাকা। তোলাকা মানে হচ্ছে, মক্কার এমন এক বংশ, যারা শেষ পর্যন্ত নবী (সঃ) এবং ইসলামী দাওয়াতের বিরোধী ছিল। মক্কা বিজয়ের পর হুযুর (সঃ) তাদেরকে ক্ষমা করেন এবং তারা ইসলাম গ্রহণ করে। হযরত মুআবিয়া (রাঃ) ওয়ালীদ ইবনে ওকবা (রাঃ) এবং মারওয়ান ইবনুল হাকাম এ ক্ষমাপ্রাপ্ত বংশের লোক ছিলেন। আর আবদুল্লাহ ইবনে সাআদ ইবনে আবি সারাহ তো মুসলমান হওয়ার পরে মুর্তাদ হয়ে যান। মক্কা বিজয়ের পর যেসব ব্যক্তি সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ (সঃ) নির্দেশ দিয়েছিলেন যে, এরা খানায়ে কাবার গেলাফ জড়িয়ে ধরে থাকলেও এদেরকে হত্যা করে দাও, তিনি ছিলেন তাদের অন্যতম। হযরত ওসমান (রাঃ) তাকে নিয়ে হঠাৎ রাসুলুল্লাহ (সঃ) এর সামনে উপস্থিত হন এবঙ তিনি নিছক হযরত ওসমানের মর্যাদার খাতিরে তাকে ক্ষমা করে দেন। প্রথম যুগে ইসলাম গ্রহণকারী প্রথম সারির মুসলমানগণ, ইসলামের বিজয়ের জন্য যাঁরা নিজেদের প্রাণ বিসর্জন দিয়েছেন, যাদের ত্যাগ-কুরবানীর ফলে আল্লার দ্বীন বিজয়ী হয়েছে, তাদেরকে পেছনে সরিয়ে দিয়ে এরা উম্মাতের নেতা হবে- স্বভাবত এটা কেউ পছন্দ করতে পারেননি।

দ্বিতীয়ত, ইসলামী আন্দোলনের নেতৃত্বের জন্য এরা উপযুক্তও ছিলেন না। কারণ, তারা ঈমান অবশ্য এনেছিলেন, কিন্তু নবী করীম (সঃ) এর সান্নিধ্যে প্রশিক্ষণ দ্বারা এতটুকু উপকৃত হওয়ার তাদের সুযোগ হয়নি, যাতে তাদের মন-মানসিকতা এবং নীতি-নৈতিকতার আমুল পরিবর্তন সূচিত হতে পারে। তারা উৎকৃষ্ট ব্যবস্থাপক, প্রশাসক এবঙ বিজেতা হতে পারেন। বাস্তবে তারা তাই প্রমাণিত হয়েছেন। কিন্তু ইসলাম তো নিছক রাজ্য জয় আর দেশ শাসনের জন্যই আসেনি। ইসলাম প্রথম এবং মূলত মঙ্গল-কল্যাণের একটি ব্যাপক আহ্বান বিশেষ। এর নেতৃত্বের জন্য প্রশাসনিক এবং সামরিক যোগ্যতার চেয়ে মানসিক এবং নৈতিক প্রশিক্ষণের প্রয়োজন বেশী। আর এ বিবেচনায় এদের স্থান ছিল সাহাবা-তাবেঈনদের প্রথম সারিতে নয়, বরং পেছনের সারিতে। এ প্রসঙ্গে উদাহরণ স্বরূপ মারওয়ান ইবনে হাকামের অবস্থাটাই লক্ষণীয়। তাঁর পিতা হাকাম ইবনে আবিল আস হযরত ওসমান (রাঃ) এর চাচা ছিলেন। তিনি মক্কা বিজয়ের সময় মুসলমান হন এবং মদীনায় এসে অবস্থান করতে থাকেন। কিন্তু তাঁর কোন কোন আচরণের কারণে রাসুলুল্লাহ (সঃ) তাঁকে মদীনা থেকে বের করে দেন এবং তায়েফে বসবাসের নির্দেশ দেন। ইবনে আবদুল বার আল এস্তীআব-এ এর অন্যতম কারণ বর্ণনা করে বলেছেন, রাসুলুল্লাহ (সঃ) বড় বড় সাহাবীদের সাথে একান্তে যেসব পরামর্শ করতেন, তিনি কোন না কোন প্রকারে তা সংগ্রহ করে ফাঁস করে দিতেন। দ্বিতীয় কারণ তিনি এই বর্ণনা করেন যে, তিনি রাসুলুল্লাহ (সঃ)- এর ভান ধরতেন; এমনকি রাসুলুল্লাহ (সঃ) তাঁকে এমনটি করতে দেখে ফেলেন। [আল-এস্তীআব, ১ম খন্ড, পৃষ্ঠা- ১১৮-১১৯, ২৬৩] যাই হোক, কোন মারাত্মক অপরাধের কারণে রাসুলুল্লাহ (সঃ) তাঁকে মদীনা ত্যাগের নির্দেশ দেন। মারওয়ানের বয়স তখন ৭-৮ বছর। তিনিও পিতার সঙ্গে তায়েফে বসবাস করতে থাকেন। হযরত আবুবকর (রাঁ) খলীফা হলে তাঁর কাছে তাঁকে ফিরিয়ে আনার অনুমতি চাওয়া হলে তিনি অস্বীকার করেন। হযরত ওমর (রাঃ) এর সময়েও তাঁকে ফিরিয়ে আনার অনুমতি চাওয়া হলে তিনি অস্বীকার করেন। হযরত ওমর (রাঃ) এর সময়েও তাঁকে মদীনা আসার অনুমতি দেয়া হয়নি। হযরত ওসমান (রাঃ) তাঁর খেলাফতকালে তাঁকে ডেকে আনেন এবঙ এক বর্ণনা অনুযায়ী তিনি এর কারণ এই বর্ণনা করেন যে, আমি রাসুলুল্লাহ (সঃ) এর নিকট তার জন্য সুপারিশ করেছিলাম, তিনি আমাকে কথা দিয়েছিলেন যে, তাকে প্রত্যাবর্তনের অনুমতি দেবেন। এমনি করে পিতা-পুত্র উভয়ে তায়েফ থেকে মদীনা চলে আসেন। [ ইবনে হাজার; আল-এসাবা, ১ম খন্ড, পৃষ্ঠা- ৩৪৪, ৩৪৫; আর রিয়াযুন নায়েরাহ, ২য় খন্ড, পৃষ্ঠ- ১৪৩। ]

মারওয়ানের এ পটভূমির প্রতি লক্ষ্য করলে এ কথা ভালভাবে হৃদয়ঙ্গম করা যায় যে, তাঁর সেক্রেটারী পদে নিয়োগকে লোকেরা কিছুতেই সহ্য করতে পারেনি। হুযুর (সঃ) হযরত ওসমান (রাঃ) এর সুপারিশ গ্রহণ করে তাঁকে ফিরিয়ে আনার োয়াদা করেছিলেন- জনগণ হযরত ওসমান (রাঃ) এর কথায় আস্থা স্থাপন করে এটা মেনে নিয়েছিল। তাই তাঁকে মদীনায় ডেকে আনাকে তারা আপত্তিকর মনে করেনি। কিন্তু বড় বড় সাহাবীকে বাদ দিয়ে রাসুলুল্লাহ (সঃ) এর বিরাগভাজন ব্যক্তির পুত্রটিকেই সেক্রেটারী করার ব্যাপারটি মেনে নেয়া তাদের জন্য বড়ই কঠিন হয়ে পড়েছিল। বিশেষ করে তার বিরাগভাজন পিতা যখন জীবিত এবং পুত্রের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় কার্যে তার প্রভাব বিস্তারের সম্ভাবনাও ছিল। [ প্রকাশ থাকে যে, তিনি হযরত ওসমান (রাঃ) এর শেষ সময় পর্যন্ত জীবিত ছিলেন। হিজরী ৩২ সালে তিনি ইন্তেকাল করেন। ]

তৃতীয়ত, তাদের কারো চরিত্র এমন ছিল যে, সে সময়ের পবিত্রতর ইসলাম সমাজে তাদের মতো লোকদেরকে উচ্চপদে নিয়োগ করা কোন শুভ প্রভাব প্রতিফলিত করতে পারতো না। উদাহরণস্বরূপ ওয়ালীদ ইবনে ওকবার কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। ইনিও ছিলেন মক্কা বিজয়ের পর ইসলাম গ্রহণকারীদের অন্যতম। রাসুলুল্লাহ (সঃ) তাঁকে বনীল মুস্তালিকের সদ্কা উসুল করার জন্য প্রেরণ করেন। কিন্তু তিনি তাদের এলাকায় পৌঁছে কোন কারণে ভীত হয়ে ফিরে আসেন। তাদের সাথে সাক্ষাৎ না করেই তিনি মদীনায় ফিরে এসে উল্টো রিপোর্ট দেন যে, বনীল মুস্তালিক যাকাত দানে অস্বীকার করেছে এবং আমাকে হত্যা করতে উদ্যত হয়েছে। এতে রাসুলুল্লাহ (সঃ) ক্ষুব্ধ হন এবং তাদের বিরুদ্ধে এক সামরিক বাহিনী প্রেরণ করেন। এক বিরাট অঘটন ঘটার সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু কবীলার সর্দাররা এ সম্পর্কে যথাসময়ে অবহিত হন। তাঁরা মদীনায় হাযির হয়ে আরয করেনঃ ইনি তো আমাদের নিকটই আসেননি। আমরা প্রতীক্ষা করছিলাম, কেউ আমাদের নিকট এসে যাকাত উসুল করে নিয়ে যাবে। এ উপলক্ষে কুরআনের নিন্মোক্ত আয়াতটি নাযিল হয়ঃ

*****************

__ ঈমানদাররা! কোন ফাসেক ব্যক্তি তোমাদের কাছে এসে কোন খবর দিলে তোমরা অনুসন্ধান করো। তোমরা অজানা অবস্থায় কারো বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করবে এবং পরে নিজেদের কর্মকান্ডের জন্য অনুতাপ করবে- এমন যেন না হয়। (আল হুজুরাত-৬)। [ তাফসীরকাররা সাধারণত এ ঘটনাকেই আয়াতের শানে নুযুল হিসাবে বর্ণনা করেন। তাফসীরে ইবনে কাসীর দ্রষ্টব্য। ইবনে আবদুল বার বলেনঃ

******************

–আয়াতটি ওয়ালীদ ইবনে ওকবা প্রসঙ্গে অবতীর্ণ হয়েছে- এ ব্যাপারে জ্ঞানীদের মধ্যে কোন মতবিরোধ নেই। ইবনে তাইমিয়াও স্বীকার করেন যে, এ আয়াত ওয়ালীদ ইবনে ওকবা সম্পর্কে নাযিল হয়েছে। (মিনহাজুস সুননাতিন নববীয়্যাহ, ৩য় খন্ড, পৃষ্ঠা – ১৭৬ আমীরিয়্যা প্রেস, মিসর ১৩২২ হিজরী)। ]

এ ঘটনার কয়েক বছর পর হযরত (রাঃ) এবং ওমর (রাঃ) তাঁকে পুনরায় খেদমতের সুযোগ দান করেন। হযরত ওমর (রাঃ) এর শেষ সময়ে তাকে আল-জাসীয়ারা আরব এলাকায়- যেখনে বনী তগলব বাস করতো- আমেল (কালেক্টর) নিযুক্ত করা হয়।[ তাহযিবুত তাহযীব, ১১শ খণ্ড, পৃষ্ঠা- ১৪৪; ওমদাতুল কারী, ১৬শ খণ্ড, পৃষ্ঠ- ২০৩; ইদারাতুত তিবাআতিল মুনীরিয়্যাহ, মিসর। ]

২৫ হিজরীতে এ ক্ষুদ্র পদ থেকে তুলে নিয়ে হযরত ওসমান (রাঃ) তাকে হযরত সা’দ ইবনে আবিওক্কাসের স্থলে কুফার মতো বিরাট এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রদেশের গবর্ণর করেন। সেখানে এ রহস্য ফাঁস হয়ে যায় যে, তিনি শরাব পানে অভ্যস্ত। এমন কি একদিন তিনি ফজরের সালাতঃ রাকআত আদায় করান অতঃপর মুসুল্লীদের প্রতি লক্ষ্য করে জিজ্ঞেস করেনঃ আরো আদায় করবো? [ আল-বেদায়া ওয়ান নেহায়া, ৭ম খণ্ড, পৃষ্ঠা- ১৫৫; আল-ইস্তীআব, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা- ৬০৪; ইবনে আবদুল বার বলেন যে, নেসাগ্রস্থ অবস্থায় ওয়ালীদের সালাত আদায় করানো অতঃপর আরও আদায় করবো কি? জিজ্ঞেস করা প্রসিদ্ধ। নির্ভরযোগ্য বর্ণনাকারীরা হাদীসসবেত্তাদের উদ্ধৃতি দিয়ে এ ঘটনা বর্ণনা করেছেন। ]

এ ঘটনা সম্পর্কিত অভিযোগ মদীনায় পৌঁছে এবং জনগণের মধ্যে এর ব্যাপক চর্চা হতে থাকে। অবশেষে হযরত মেসওয়ার ইবনে মাখরামা ও আবদুর রহমান ইবনে আসওয়াদ হযরত ওসমান (রাঃ) এর ভাগ্নে ওবায়দুল্লাহ ইবনে আদী ইবনে খেয়ারকে বলেনঃ তুমি গিয়ে তোমার মামার সাথে কথা বলো, তাঁকে বলো যে, তাঁর ভাই ওয়ালীদ ইবনে ওকবার ব্যাপারে লোকেরা তাঁর কার্যকলাপ সম্পর্কে অনেক আপত্তি তুলেছে। তিনি এ ব্যাপারে দৃষ্টি আকর্ষন করে আরয করেন যে, ওয়ালীদের ওপর ‌’হুদ’ (শরীয়াতের বিধান অনুযায়ী দণ্ড দান) জারী করা আপনার জন্য জরুরী- এ আবেদন জানালে হযরত ওসমান (রাঃ) ওয়াদা করেন যে, এ ব্যাপারে আমরা হক অনুযায়ী ফায়সালা করবো, ইনশাআল্লাহ। তদনুযায়ী সাহাবায়েকেরামের প্রাকশ্য সমাবেশে ওয়ালীদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়। হযরত ওসমান (রাঃ) এর নিজের আযাদকৃত দাস হুরমান সাক্ষ্য দেয় যে, ওয়ালীদ মদ্য পান করেছিলেন। অপর এক সাক্ষী সাব ইবনে জুসামা (বা জুসমা ইবনে সাব) সাক্ষ্য দেন যে, ওয়ালীদ তাঁর সামনে মদ-বমি করেছিল। (ইবনে হাজারের বর্ণনা অনুযায়ী এ ছাড়াও আরও ৪ জন সাক্ষী-আবু যয়নাব, আবু তুআররা, জুন্দুর ইবনে যোহাইর আল-আযদী এবঙ সাদ ইবনে মালেক আল-আশআ’রীকে পেশ করা হয়। তারাও অপরাধের স্বপক্ষে সাক্ষ্য প্রদান করেন)। তখন তার ওপর ‘হদ’ জারীকরার জন্য হযরত ওসমান (রাঃ) হযরত আলী (রাঃ) কে নির্দেশ দেন। হযরত আলী (রাঃ) হযরত আবদুল্লাহ ইবনে জাফরকে একাজে নিযুক্ত করেন এবং তিনি ওয়ালীদকে ৪০টি বেত্রঘাত করেন। [ বুখারী, কিতাবুল মানাকেব, বাবো মানাকেবে ওসমান ইবনে আফফান, ও বাবো হিজরাতিল হাবশা; মুসলিম, কিতাবুল হুদুদ বাবো হাদ্দিল খামর; আবুদাউদ, কিতাবুল হুদুদ, বাবো হাদ্দিল খামর। এসব হাদীসের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে ফকীহ ও মুহাদ্দেসগণ যা কিছু লিখেছেন, তা নিম্নরুপঃ

হাফেজ ইবনে হাজার ফতহুলবারী গ্রন্থে লিখেছেনঃ লোকেরা যে কারণে ওয়ালীদের ব্যাপারে ব্যাপক আপত্তি করছিল, তা ছিল এই যে, হযরত ওসমান (রাঃ) তার ওপর ‘হদ’ কায়েম করছিলেন না। দ্বিতীয় কারণ এ ছিল যে, হযরত সাআদ ইবনে আবি ওয়াক্কাসকে পদচ্যুত করে তাঁর স্থলে ওয়ালীদকে নিয়োগ করা লোকেরা পছন্দ করতো না। কারণ, হযরত সাআদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস ছিলেন আশারা-ই-মোবাশশারা এবং শুরার অন্যতম সদস্য। জ্ঞান-মাহাত্ম, দ্বীনদারী এবং প্রথম যুগে ইসলাম গ্রহণের এমন সব গুণাবলীর সমাবেশ তাঁর মধ্যে ঘটেছিল, যার কোন একটি গুণও ওয়ালীদ ইবনে ওকবার মধ্যে ছিল না…….. হযরত ওসমান (রাঃ) ওয়ালীদকে এ জন্য কুফার শাসনকর্তা নিযুক্ত করেন যে, তাঁর নিকট তার যোগ্যতা প্রকাশ পেয়েছিল এবং তিনি আত্মীয়তার হকও আদায় করতে চেয়েছিলেন। অতঃপর তার চরিত্রের ত্রুটি তাঁর কাছে প্রকাশ পেলে তিনি তাকে পদচ্যুত করেন। তার বিরুদ্ধে যারা সাক্ষী দিচ্ছিল, তাদের অবস্থা ভালভাবে জানার জন্য তিনি তার শাস্তি বিধানে বিলম্ব করেন। অতঃপর প্রকৃত পরিস্থিতি জানার পর তিনি তার ওপর ‘হদ’ জারী করার নির্দেশ দান করেন। (ফতহুল বারী, কিতাবুল মানাকেব বাবো মানাকেবে ওসমান)।

অন্যত্র ইবনে হাজার লিখেনঃ মুসলিমের রেওয়াতের বর্ণনাকারী আবদুল্লাহ আদ-দানাজ যইফ ছিলেন- এ কারণে তাহাবী মুসলিমের বর্ণনাকে দুর্বল প্রতিপন্ন করেছেন। কিন্তু বায়হাকী তাঁর এ মতের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে লিখেন যে, হাদীসটি সহীহ-বিশুদ্ধ; মাসানীদ এবং সুনান গ্রন্থে হাদীসটি গৃহীত হয়েছে। এ বর্ণনা সম্পর্কে তিরমিযী ইমাম বুখারীকে জিজ্ঞেস করলে তিনি তাকে নির্ভরযোগ্য বলে উল্লেখ করেন। মুসলিমও তাকে সহীহ বিশুদ্ধ বলে গ্রহণ করেন। ইবনে আবদুল বার বলেন এ হাদীস এ অধ্যায়ে সবচেয়ে বেশী নির্ভরযোগ্য……. আবুযুরআ’ এবং নাসীয়ী আবদুল্লাহ আদ-দানাজকে বিশ্বস্ত-নির্ভরযোগ্য বলে উল্লেখ করেন। (ফতহুল বারী, কিতাবুল হুদুদ, বাবুয যারবি বিল জারীদ ওয়ান নেয়াল)।

ইমাম নববী লিখেনঃ মুসলিমের এ হাদীস ইমাম মালেক এবং তাঁর সমমনা ফকীহদের এ মতের প্রমাণ যে, যে ব্যক্তি মদ-বমি করে, তার ওপর মদ পানের ‘হদ’ জারী করা হবে। … এ ব্যাপারে ইমাম মালেকের দলীল অত্যন্ত শক্তিশালী। সাহাবাগণ সর্ব সম্মতিক্রমে ওয়ালীদ ইবনে ওকবাকে বেত্রাঘাতের ফায়সালা করেছিলেন। (মুসলিমের ভাষ্য, কিতাবুল হুদুদ বাবো হদ্দিল খামর)।

ইবনে কোদামা বলেনঃ মুসলিমের বর্ণনা অনুযায়ী, একজন সাক্ষী যখন এ সাক্ষ্য দেন যে, তিনি ওয়ালীদকে মদ-বমি করতে দেখেছেন, তখন হযরত ওসমান (রাঃ) বলেন, মদ পান না করে সে কি করে মদ-বমি করতে পারে। এ কারণে তিনি হযরত আলী (রাঃ)-কে তার ওপর হদ জারী করার নির্দেশ দেন। আর যেহেতু এ ফায়সালা হয়েছিল নেতৃস্থানীয়, জ্ঞানী ও আলেম সাহাবীদের উপস্থিতিতে, তাই এর ওপর ‘ইজমা’ অনুষ্ঠিত হয়েছে। (আল-মুগনী ওয়াশ শরহুল কবীর, ১০ম খণ্ড, পৃষ্ঠা- ৩৩২, মানার প্রেস, মিসর, ১৩৪৮ হিজরী)। অতঃপর কেউ যদি বলে যে, যেসব ব্যক্তি ওয়ালীদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দান করেছিলেন, তারা সকলেই ছিলেন বিশ্বাসের অযোগ্য, তাহলে সে ব্যক্তি কেবল হযরত ওসমান (রাঃ)-এর বিরুদ্ধে নয়, বরং সাহাবাদের বিরাট দলের বিরুদ্ধেই এই দেষারোপ করে যে, তাঁরা বিশ্বাসের অযোগ্য সাক্ষীদের সাক্ষ্যের ওপর ভিত্তি করে একজন মুসলমানকে শাস্তি দান করেন। জনৈক ব্যক্তি দাবী করে বসেছেন যে, হযরত হাসান (রাঃ) এ ফায়সালা সম্পর্কে নারায ছিলেন। কিন্তু ইমাম নববী মুসলিম এর ভাষ্যে এ হাদীসের যে ব্যাখ্যা করেছেন, তাতে এ মিথ্যার জারীজুরী ফাঁস হয়ে গিয়েছে। এ থেকে জানা যায় যে, হযরত হাসান (রাঃ) এর ক্রোধ ওয়ালীদের ওপর ছিল, তার বিরুদ্ধে ফায়সালাকারীদের প্রতি নয়। ]

এসব কারণে হযরত ওসমান (রাঃ) এর এ নীতি লোকদের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টিতে সক্ষম হয়। খলীফার আপন বংশের লোকদেরকে একের পর এক রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ করা এমনিতেই ছিল যথেষ্ট আপত্তিকর কারণ। এর পরও তারা যখন দেখতে পেলো যে, এদেরকেই সামনে টেনে আনা হচ্ছে, তখন তাদের অস্থিরতা-অসন্তুষ্টি আরও বেড়ে গেল। বিশেষ করে এ প্রসঙ্গে দুটি বিষয় এমন ছিল, যা সুদুরপ্রসারী এবং মারাত্মক পরিণতি ডেকে আনে।  প্রথমটি হচ্ছে, হযরত ওসমান (রাঃ), হযরত মুআবিয়া (রাঃ) কে ক্রমাগত দীর্ঘদিন ধরে একই প্রদেশের গবর্ণর পদে বহাল রাখেন। তিনি হযরত ওমর (রাঃ)- এর সময়ে ৪ বছর ধরে দামেশকের শাসনকর্তার পদে নিয়োজিত ছিলেন। হযরত ওসমান (রাঃ) আইলা থেকে রোম সীমান্ত পর্যন্ত এবং আল-জাযিরা থেকে উত্তর মহাসাগর পর্যন্ত গোটা এলাকা তার আওতাধীন করে গোটা শাসনকালে (১২ বছর) তাঁকে সে প্রদেশেই বহাল রাখেন। [ তাবাকাতে ইবনে সাআদ, ৭ম খণ্ড, পৃষ্ঠা- ৪০৬, আল-ইস্তীআব, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা- ২৫৩। বর্তমানে এ এলাকায় সিরিয়া, লেবানন, জর্দান এবং ইসরাইল ৪টি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত। এ ৪টি রাষ্ট্রের মোট আয়তন আজও প্রায় তাই, যা আমীর মুআ’বিয়ার গবর্ণর কালে ছিল। হযরত মুআ বিয়া, পৃষ্ঠা- ৩৪-৩৫ দ্রষ্টব্য)। ]

শেষ পর্যন্ত হযরত আলী (রাঃ)-কে এর পরিণতি ভোগ করতে হয়েছে। এ শাম প্রদেশটি তৎকালীন ইসলামী সাম্রাজ্যের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সামরিক এলাকা ছিল। এর এক দিকে ছিল সকল প্রাচ্য প্রদেশ, আর অপর দিকে ছিল সকল পাশ্চাত্য প্রদেশ। মধ্যখানে এ দেশটি এমনভাবে দাঁড়িয়ে ছিল যে, এর শাসনকর্তা কেন্দ্র থেকে বিমুখ হলে প্রাচ্য প্রদেশসমূহকে পাশ্চাত্য প্রদেশগুলি থেকে একেবারেই বিচ্ছিন্ন করে ফেলতে পারতেন। হযরত মুআবিয়া (রাঃ) এ প্রদেশের শাসনকার্যের দীর্ঘকাল নিয়োজিত ছিলেন। তিনি সেখানে ভালভাবে আসন গেড়ে বসেছিলেন। তিনি কেন্দ্রের আওতায় ছিলেন না, বরং কেন্দ্র ছিল তাঁর দয়া-অনুগ্রহের ওপর নির্ভরশীল।

দ্বিতীয় যে বিষয়টি এর চেয়েও মারাত্মক গোলযোগপূর্ণ প্রমাণিত হয়েছিল, তা ছিল খলিফার সেক্রেটারীর গুরুত্বপূর্ণ পদে মারওয়ান ইবনুল হাকামের নিযুক্তি্। ইনি হযরত ওসমান (রাঃ)-এর কোমল প্রকৃতি এবং আস্থার সযোগে এমন অনেক কাজ করে বসেন, যার দায়িত্ব শেষ পর্যন্ত হযরত ওসমান (রাঃ) এর ওপর বর্তায়। অথচ এ সব কাজের জন্য তাঁর অনুমতি-অবগতির কোন তোয়াক্কাই করা হতো না। উপরন্ত ইনি হযরত ওসমান (রাঃ) এবঙ বড় বড় সাহাবীদের সৌহার্দপূর্ণ সম্পর্কে ফাটল ধরাবার নিরবচ্ছিন্ন চেষ্টা চালাতে থাকেন, যাতে খলিফা তাঁর পুরাতন বন্ধুদের স্থলে তাঁকে বেশী শুভাকাংখী এবং সমর্থক জ্ঞান করেন। [ তাবাকাতে ইবনে সাআদ, ৫ম খণ্ড, ৩৬ পৃষ্ঠা; আল-বেদায়া নেহায়া, ২৫৯ পৃষ্ঠা। ] কেবল তাই নয়, তিনি একাধিকার সাহাবায়ে কেরাম (রাঃ) এর সমাবেশে এমন সব হুমকিপূর্ণ ভাষণ দান করেন, তোলাকাদের মুখ থেকে যা শুনে সহ্য করে যাওয়া প্রাথমিক যুগের মুসলমানদের পক্ষে ছিল নিতান্ত কষ্টকর। এ কারণে অন্যরা তো দুরের কথা, হযরত ওসমান (রাঃ) এর স্ত্রী হযরত নায়লাো এ মত পোষণ করতেন যে, হযরত ওসমান (রাঃ) এর জন্য সংকট সৃষ্টির বিরাট দায়িত্ব মারওয়ানের ওপর বর্তায়, এমনকি একদা তিনি স্বামীকে স্পষ্ট বলে দেন- আপনি মারওয়ানের কথা মতো চললে সে আপনাকে হত্যা করিয়ে ছাড়বে। এ ব্যক্তিটির মনে আল্লার কোন মর্যাদা নেই, নেই কোন ভয়-ভীতি ও ভালবাসা। [ তাবারী, ৩য় খণ্ড, ২৯৬-৯৭ পৃষ্ঠা, আল-বেদায়া ওয়ান নেহায়া, ৭ম খণ্ড, ১৭২-১৭৩ পৃষ্ঠা। ]

 

দ্বিতীয় পর্যায়

হযরত ওসমান (রাঃ) এর নীতির এ দিকটি নিঃসন্দেহে ভুল ছিল। আর ভুল কাজ ভুলই- তা যে কেউ করুক না কেন। ভাষার মারপ্যাচে তাকে সঠিক প্রমাণ করার চেষ্টা করা বুদ্ধিবৃত্তি ইনসাফের দাবী নয় বরং কোন সাহাবীর ভুলকে ভুল বলে স্বীকার না করা দ্বীনেরও দাবী হতে পারে না।

কিন্তু সত্য কথা এই যে, একটি দিক বাদে অন্য সব দিক থেকে তাঁর চরিত্র খলীফা হিসাবে একটা আদর্শ চরিত্র ছিল, যার বিরুদ্ধে, আপত্তি উত্থাপন করার কোন অবকাশই নেই। উপরন্ত তাঁর খেলাফত কালে সামগ্রীকভাবে সুকৃতি এত প্রবল ছিল এবং তাঁর শাসনামলে ইসলামের বিজয়ের এত বড় কাজ সম্পন্ন হচ্ছিল যে, এ বিশেষ দিকটির ব্যাপারে জনগণ আশ্বস্ত না হওয়া সত্ত্বেও গোটা সাম্রাজ্যের কোথাও সাধারণ মুসলমানরা তাঁর গবর্ণর সাঈদ ইবনুল আ’স-এর কর্মধারায় অসন্তুষ্ট হয়ে কিছু লোক বিদ্রোহ সৃষ্টির চেষ্টা করলেও জনগণ তাতে সাড়া দেয়নি। হযরত ওসমান (রাঃ) এর পক্ষ থেকে হযরত আবু মুসা আশআরী (রাঃ) জনগণকে বায়আত নবায়নের জন্য আহ্বান জানালে বিদ্রোহের পতাকাবাহীরা ছাড়া সকলেই ছুটে আসে। [ তাবাকাতে ইবনে সাআদ, ৫ম খণ্ড, পৃষ্ঠা- ৩২-৩৩, তাবারী, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা- ৩৭২। ]

এ কারণে যে ক্ষুদ্র দলটি তাঁর বিরুদ্ধে গোলযোগের জন্য এগিয়ে আসার চেষ্টা করছিল, তারা ব্যাপক বিদ্রোহের আহ্বান জানাবার পরিবর্তে ষড়যন্ত্রের পথ অবলম্বন করে।

এ আন্দোলনের পতাকাবাহীদের সম্পর্ক ছিল মিসর, কুফা এবং বসরার সাথে। তারা পারস্পরিক পত্র বিনিময় করে অকস্মাৎ মদীনা আক্রমণের জন্য গোপনে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। তারা হযরত ওসমান (রাঃ) এর বিরুদ্ধে অভিযোগের এক বিরাট ফিরিস্তি প্রণয়ন করে, যার অধিকাংশই ছিল ভিত্তিহীন বা এমন দুর্বল অভিযোগ সম্বলিত, যার যুক্তিপূর্ণ জবাব দেয়া যায় এবঙ পরেত তা দেয়াও হয়েছে। এদের সংখ্যা দু’হাজারের বেশী ছিল না। পারস্পরিক চুক্তি অনুযায়ী তারা মিসর, কুফা এবং বসরা থেকে একযোগে মদীনা পৌঁছে। তারা কোন অঞ্চলেরই প্রতিনিধি ছিল না, বরং চক্রান্ত ও ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে নিজেদের একটা দল গঠন করেছিল। মদীনার নিকটে পৌঁছে তারা হযরত আলী (রাঃ) হযরত তালহা (রাঃ) এবঙ হযরত যুবায়ের (রাঃ)-কে নিজেদের দলে ভিড়াবার চেষ্টা করে। কিন্তু বুযুর্গত্রয় তাদেরকে হাঁকিয়ে দেন। হযরত আলী (রাঃ) তাদের প্রত্যেকটি অভিযোগের জবাব দিয়ে হযরত ওসমান (রাঃ)-এর ভূমিকা সুস্পষ্ট করেন। মদীনার মোহাজের ও আনসারগণ- যারা তদানীন্তন ইসলামী রাষ্ট্র পরিচালনায় মৌল প্রাণশক্তি রূপে চিহ্নিত ছিল- তাদের সহায়ক হতে প্রস্তুত হয়নি। কিন্তু তারা নিজেদের হটকারিতায় অটল থাকে এবং অবশেষে তারা মদীনায় প্রবেশ করে হযরত ওসমান (রাঃ)- এর গৃহ অবরোধ করে। তাদের দাবী ছিল, হযরত ওসমান (রাঃ)-কে কে খেলাফত ত্যাগ করতে হবে। হযরত ওসমান (রাঃ)- এর জবাব ছিল, আমি তোমাদের যে কোন সঠিক এবং বৈধ অভিযোগ শুনতে প্রস্তুত, কিন্তু তোমাদের কথা মতো পদত্যাগের প্রস্তুত নই।[ তাবাকাতে ইবনে সা’দ, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা – ৬৬। ]

এরপর তারা ৪০ দিন ধরে গোলযোগ চালাতে থাকে। এ গোলযোগ চলাকালে তাদের দ্বারা এমনসব কাণ্ড সংঘটিত হয়েছে, যা মদীনাতুর রাসুল-এ ইতিপূর্বে আর কখনো দেখা যায়নি। এমনকি, তারা উম্মুলমু’মিনীন হযরত উম্মে হাবীবা (রাঃ)-কে অপমান করে। এ অনাচারের সয়লাব ধারায় আমিও কি নিজের ইযযাত বিকিয়ে দেবো?- এই বলে হযরত আয়েশা (রাঃ) মদীনা থেকে মক্কা চলে যান। শেষ পর্যন্ত তারা মারাত্মক হাঙ্গামা সৃষ্টি করে একান্ত নির্মমভাবে হযরত ওসমান (রাঃ)-কে শহীদ করে ফেলে। তিনদিন যাবৎ তার দেহ মোবারক দাফন থেকে বঞ্চিত থাকে। তাঁকে হত্যা করার পর যালেমরা তাঁর গৃহও লুট করে। [ বিস্তারিত বিবরণের জন্য আত-তাবারী, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা- ৩৭৬ থেকে ৪১৮ এবঙ আলা-বেদায়া ওয়ান নেহায়া, ৭ম খণ্ড, পৃষ্ঠা- ১৬৮ থেকে ১৯৭ দ্রষ্টব্য। ]

কেবল হযরত ওসমান (রাঃ)- এর ওপরই নয়, বরং স্বয়ং ইসলাম এবং খেলাফতে রাশেদার ব্যবস্থার ওপর এটা ছিল তাদের বিরাট যুলুম। তাদের অভিযোগের মধ্য থেকে যদি কোনটির একটুও গুরুত্ব থেকে থাকে তাহলে তা ছিল কেবলমাত্র একটির, যা ইতিপূর্বে আমরা উল্লেখ করেছি। সে অভিযোগ দূর করার জন্য কেবল এতটুকুই যথেষ্ট ছিল যে, তারা মদীনা শরীফের মোহাজের ও আনসার এবং বিশেষ করে বড় বড় সাহাবীদের সাথে সাক্ষাৎ করে তাদের মাধ্যমে হযরত ওসমান (রাঃ)- কে সংশোধনের জন্য উদ্বুদ্ধ করতো। এ ব্যাপারে হযরত আলী (রাঃ) চেষ্টাও শুরু করেছিলেন এবং হযরত ওসমান (রাঃ) ভুলগুলো শুধরে নেবার ওয়াদাও করেছিলেন। [ আত-তাবারী, ৩য় খণ্ড পৃষ্ঠা- ৩৭৬, ৩৭৭, ৩৮৪, ৩৮৫, আল-বাদেয়া ওয়ান নেহায়া, ৭ম খণ্ড, পৃষ্ঠা- ১৭১, ১৭২। ]

উপরন্ত এসব অভিযোগ দূর না হলেও সে জন্য খলীফার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার এবং তাঁর পদচ্যুতি দাবী করার শরীয়াত সম্মত কোন বৈধতা আদৌ ছিল না। কিন্তু তারা খলীফার পদচ্যুতির জন্য পীড়াপীড়ি করতে থাকে। অথচ বসরা, কুফা এবং মিসরের মাত্র দুই হাযার লোক- তাও তারা নিজ নিজ এলাকার প্রতিনিধিও নয়- গোটা মুসলিম জাহানের খলীফাকে পদচ্যুতি করার অথবা তাঁর পদচ্যুতি দাবী করার কোন অধিকারই পেতে পারে না। খলীফার প্রশাসনের বিরুদ্ধে কথা বলার অধিকার তাদের অবশ্যই ছিল। অধিকার ছিল তাদের অভিযোগ উত্থাপন করার। নিজেদের অভিযোগ দূর করার দাবী জানাবার অধিকারও তাদের ছিল। কিন্তু ইসলামী রাষ্ট্রের মূল শক্তি তৎকালীন ইসলামী শাসনতন্ত্র অনুযায়ী যাকে খলীফা বানিয়েছে, আর বিশ্বের সকল মুসলমান যাকে খলীফা বলে স্বীকার করে নিয়েছে, কতিপয় লোক তাঁর বিরুদ্ধে বিদ্রোহের ঝান্ডা উড়িয়ে কোন প্রতিনিধিত্বশীল মর্যাদা ছাড়াই নিছক নিজেদের অভিযোগের ভিত্তিতেই তাঁর পদচ্যুতি দাবী করবে- তাদের অভিযোগের প্রকৃতই কোন মূল্য আছে কিনা, সে প্রশ্ন দিলেও-এ অধিকার তাদের অদৌ ছিল না। [ হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রাঃ) হযরত ওসমান (রাঃ)-কে এ কথাই বলেছিলেন। ]

কিন্তু তারা এতটুকু বাড়াবাড়ি করেই ক্ষান্ত হয়নি। বরং শরীয়াতের সকল সীমা লংঘন করে খলীফাকে হত্যা করে, তাঁর বাসভবন লুট করে। হযরত ওসমান (রাঃ)-এর যে সকল কাজকে তারা অপরাধ মনে করতো, তা অপরাধ হলে শরীয়াতের দৃষ্টিতে তাকে এমন কোন অপরাধ হিসেবে প্রমাণ করা যাবে না, যে জন্য কোন মুসলমানের রক্ত হালাল হতে পারে। এ কথাই বলেছিলেন হযরত ওসমান (রাঃ) তাঁর এক ভাষণে। তিনি বলেছিলেন, শরীয়াত মতে একজন লোক তো কতিপয় নির্দিষ্ট অপরাধের কারণে হত্যার যোগ্য হয়। আমি তো সে সব অপরাধের কোনটিই করিনি। তাহলে কি কারণে তোমরা নিজেদের জন্য আমার রক্ত হালাল করছ? [ আল-বাদেয়া ওয়ান নেহায়া, ৭ম খণ্ড, পৃষ্ঠা – ১৭৯। ]

কিন্তু যারা শরীয়াতের নাম নিয়ে তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ উত্থাপন করছিল, তারা নিজেরা শরীয়াতের কোন পরওয়াই করেনি। কেবল তাঁর রক্তই নয় বরং সম্পদও নিজেদের জন্য হালাল করে নিয়েছিল তারা।

এখানে কারো মনে সন্দেহ থাকা উচিত নয় যে, মদীনাবাসীরা তাদের এ কাজে সন্তুষ্ট ছিল। আসল ঘটনা এই যে, এরা আকস্মাৎ মদীনায় প্রবেশ করে এবং গুরুত্বপূর্ণ ঘাটিগুলো অধিকার করে শহরবাসীদেরকে নিরুপায় করে দেয়। [ঐ, ৭ম খণ্ড, পৃষ্ঠা- ১৯৮। ]

উপরন্তু তারা হত্যার মতো মারাত্মক অপরাধ সত্যি সত্যিই করেই বসবে, তা কেউ কল্পনাও করতে পারেনি। মদীনাবাসীদের জন্য এটা ছিল একান্ত অপ্রত্যাসিত ঘটনা, যা আকাশ থেকে অকস্মাৎ বজ্রপাতের ন্যায় তাদের ওপর আপতিত হয়েছিল। পরে তারা প্রতিরোধ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে নিজেদের শৈথিল্যের জন্য অত্যন্ত লজ্জিত হয়েছিল। [তাবকাতে ইবনে সায়াদ, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা- ৭১। ]

সবচেয়ে বড় কথা এই যে, স্বয়ং হযরত ওসমান (রাঃ) এ পথে সবচেয়ে বড় বাধা ছিলেন। তিনি নিজের কর্তৃত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য মদীনাতুর রাসুল-এ মুসলমানদেরকে পারস্পরিক সংঘর্ষে লিপ্ত করতে চাচ্ছিলেন না। তিনি সমস্ত প্রদেশ থেকে সৈন্য বাহিনী তলব করে অবরোধ কারীদের উচিৎ শিক্ষা দিতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা থেকে বিরত থাকেন। হযরত যায়েদ ইবনে সাবেত (রাঃ) তাঁকে বলেছিলেন, আপনার সমর্থনে সকল আনসার লড়তে প্রস্তুত। কিন্তু তিনি জবাব দেন, না, যুদ্ধ করা যাবে না। তিনি হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) এবং হযরত আবদুল্লাহ ইবনে যুবায়ের (রাঃ)- কে বলেন

সন্ত্রাসবাদীদের পক্ষ থেকে পদচ্যুতির দাবী তীব্র হয়ে উঠলে হযরত ওসমান (রাঃ) হযরত আবদুল্রাহ ইবনে ওমর (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করেন- এখন আমাকে কি করতে হবে? তিনি বলেনঃ কিছু লোক তাদের আমীরের ওপর অসুন্তুষ্ট হলে তাকে পদচ্যুত করবেন- মুসলমানদের জন্য আপনি এ পথ খুলবেন না (তাবাকাতে ইবনে সা’আদ, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা- ৬৬)। আবার এ কথাই তিনি বলেছিলেন পদচ্যুতির দাবীদারের জবাবদানকালে অবরোধকারীদের উদ্দেশ্য আমি কি মুসলমানদের সাথে পরামর্শ না করেই তরবারীর জোরে রাষ্ট্রের ক্ষমতা দখল করেছি যে, তোমরা আমাকে তরবারীর জোরে পদচ্যুত করতে চাও? ঐ পৃষ্ঠ- ৬৮।

যে, আমি যুদ্ধ করতে প্রস্তুত নই। প্রাণপনে যুদ্ধ করার জন্য ৭ শত ব্যক্তি তাঁর মহলেই উপস্থিত ছিল। কিন্তু শেষ মুহুর্ত পর্যন্ত তিনি তাদেরকেও নিবৃত্ত রাখেন। [ঐ, ৭০ – ৭১ পৃষ্ঠা। ]

সত্য বলতে কি, অত্যন্ত নাযুক এবঙ পরিস্থিতিতে হযরত ওসমান (রাঃ) এমন কর্মপন্থা অবলম্বন করেছিলেন, যা একজন খলীফা এবং বাদশার পার্থক্য স্পষ্ট করে তুলে ধরেছে। তাঁর পরিবর্তে কোন বাদশাহ হলে নিজের গতি রক্ষার জন্য যে কোন পন্থা অবলম্বনেই তিনি কুণ্ঠিত হতো না। তার হাতে মদীনা শহর ধ্বংসস্তুপে পরিণতহলে, আনসার ও মোহাজেরদের পাইকারী ভাবে হত্যা করা হলে, রাসুলের পবিত্র স্ত্রীগণকে অপমান করা হলে এবঙ মসজিদে নব্বী ভেঙ্গে মাটির সাথে মিসিয়ে দেওয়া হলেও তিনি তার পরওয়া করতেন না। কিন্তু তিনি ছিলেন খলীফায়ে রাশেদ- সত্য ও ন্যায়ের পথে অভিসারী খলীফা। একজন আল্লাভীরু শাসনকর্তা- আপন গদি রক্ষার জন্য কতটুকু পাওয়া যায়, কোথায় গিয়ে তাকে থেমে যেতে হয়- একান্ত কঠিন মুহুর্তেও তিনি তৎপ্রতি লক্ষ রেখেছেন। মুসলমানের ইযযাত-আবরু বিকিয়ে দেয়ার চেয়ে নিজের প্রাণ দানকে তিনি অতি ক্ষুদ্র কাজ বিবেচনা করেছেন। কারণ, মুসলমানের ইযযাত-অবরু একজন মুসলমানের নিকট দুনিয়ার সবকিছু থেকে অধিকতর প্রিয় হওয়াই বাঞ্চনীয়।

 

তৃতীয় পর্যায়

হযরত ওসমান (রাঃ)-এর শাহদাতের পর মদীনায় নৈরাজ্য বিস্তার লাভ করে। কারণ, উম্মতের তখন কোন নেতা নেই, রাষ্ট্রের নেই কোন কর্ণধার বহিরাগত সন্ত্রাসীদের জয়ে মদীনার মোহাজের-আনসার এবং বড় বড় তাবেয়ীরা সকলেই অস্থির। রোম সীমান্ত থেকে ইয়ামান পর্যন্ত এবং আফগানিস্তান থেকে উত্তর আফ্রিকা পর্যন্ত বিস্তৃত এ উম্মাত এবং বিশাল সম্রাজ্য নেতা শূন্য অবস্থায় কয়েক দিনও কি করে চলতে পারে। যতোশীঘ্র সম্ভব একজন খলীফা নির্বাচন অপরিহার্য হয়ে পড়েছিল আর এ নির্বাচন অবশ্যই হতে হবে মদীনায়। কারণ মদীনাই হচ্ছে ইসলামের কেন্দ্র ভূমি। ইসলামের জন্য নিবেদিত প্রাণ ইসলামী ও ইসলামী ব্যবস্থার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ইসলামের মূল প্রাণশক্তি যে জনতা, যাদের বায়আতে এ যাবৎ খেলাফত সংঘটিত হয়ে আসছে, তারাও মদীনায় উপস্থিত। কাজেই এ ব্যাপারে কোন বিলম্ব করার অবকাশ ছিল না। মদীনার বাইরের দূর-দরায শহর বন্দরের দিকে দৃষ্টি দেবারও কোন প্রয়োজন ছিল না। এক মারাত্মক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল। উম্মাতকে সংগঠিত করার জন্য, রাষ্ট্রকে বিশৃংখলার হাত থেকে রক্ষা করার জন্য তৎক্ষণাৎ কোন যোগ্যতর ব্যক্তিত্বকে রাষ্ট্র প্রধান নিযুক্ত করা অপরিহার্য ছিল।

হযরত ওমর (রাঃ) তাঁর ওফাতকালে যে ছ’জন সাহাবীকে উম্মাতের সবচেয়ে অগ্রগণ্য ব্যক্তি বলে অভিহিত করে গিয়েছিলেন, তখন তাদের মধ্য থেকে ৪ জন হযরত আলী (রাঃ), হযরত তালহা (রাঃ), হযরত যোবায়ের (রাঃ), হযরত সাআদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রাঃ) জীবিত ছিলেন। এদের মধ্যে হযরত আলী (রাঃ) সকল দিক থেকে প্রথম সারিতে ছিলেন। শুরা উপলক্ষে হযরত আবদুর রহমান ইবনে আওফ (রাঃ) উম্মাতের জনমত যাচাই করে এ ফায়সালা দেন যে, হযরত ওসমান (রাঃ)-এর পরে যিনি উম্মাতের সবচেয়ে বেশী আস্থাভাজন ব্যক্তি, তিনি হচ্ছেন হযরত আলী (রাঃ)। [আল-বেদায়া ওয়ান নেহায়া, ৭ম খন্ড, পৃষ্ঠা- ১৪৬।] সুতরাং জনগণ খেলাফতের জন্য তাঁর প্রতিই দৃষ্টি নিবদ্ধ করবে, এটাই ছিল একান্ত স্বাভাবিক। কেবল মদীনায়ই নয়, বরং গোটা মুসলিম জাহানে তিনি ছাড়া আর দ্বিতীয় কোন ব্যক্তিই ছিলেন না, যিনি এ উদ্দেশ্যে মুসলমানদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারতেন। এমনকি বর্তমান কালের প্রচলিত পন্থায় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেও তিনি অবশ্যই বিপুল ভোটে জয় লাভ করতেন। [ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বাল বলেন, তখন হযরত আলী (রাঃ)-এর চেয়ে খেলাফতের যোগ্যতার অন্য কোন ব্যক্তি ছিল না- ঐ, ৮ম খন্ড, পৃষ্ঠা- ১৩০।] তাই তো সকল নির্ভরযোগ্য বর্ণনা থেকে জানা যায় যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) -এর সাহাবী এবং মদীনার অন্যান্য লোকেরা তাঁর নিকট গিয়ে বলেনঃ কোন আমীর ছাড়া এ ব্যবস্থা টিকে থাকতে পারে না। জনগণের জন্য একজন ইমাম অপরিহার্য। আজ এ পদের জন্য আপনার চেয়ে অন্য কোন যোগ্য ব্যক্তি আমরা দেখছি না। অতীতের খেদমত এবং রাসুলুল্লাহ (সঃ)-এর নৈকট্য কোন বিচারেই না। তিনি অস্বীকৃতি জানান। লোকেরা পীড়াপীড়ি করতে থাকে। অবশেষে তিনি বলেন, গৃহে বসে গোপনে আমার বায়াত হতে পারে না। সাধারণ মুসলমানের সন্তুষ্টি ব্যতিত এমনটি হওয়া সম্ভব নয়। অতঃপর মসজিদে নববীতে সাধারণ অধিবেশন বসে এবং সকল মোহাজের-আনসার তাঁর হাতে বায়াত করে। সাহাবীদের মধ্যে ১৭ জন বা ২০ জন এমনও ছিলেন, যাঁরা তাঁর হাতে বায়াত করেন নি। [ আততাবারী, ৩য় খন্ড, পৃষ্ঠা- ৪৫০, ৪৫২; আল-বেদায়া ওয়ান নেহায়া, ৭ম খন্ড, পৃষ্ঠা- ২২৫, ২২৬। ইবনে আবদুল বার-এর বর্ণনা মতে সিফফিন যুদ্ধে এমন ৮ শত সাহাবী হযরত আলীর সঙ্গে ছিলেন, যারা বায়আতুর রেযওয়ানের সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সঙ্গে ছিলেন- আল-এস্তীআব, ২য় খন্ড, পৃষ্ঠা- ৪২৩।]

যেসব নীতির ভিত্তিতে খেলাফতে রাশেদা প্রতিষ্ঠা সম্ভব- হযরত আলী (রাঃ)-এর খেলাফত নিশ্চিতরূপে সে সব মূলনীতির ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত ছিল- ওপরের বিবরণী থেকে এ কথা সন্দেহাতীতরূপে প্রমাণিত হয়। তিনি জোর করে ক্ষমতা দখল করেননি। খেলাফত লাভের জন্য তিনি সামান্যতম কোন চেষ্টা তদবীরও করেননি। জনগণ নিজেরা স্বাধীন পরামর্শক্রমে তাঁকে খলীফা নির্বাচিত করে। সাহাবীদের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ তাঁর হাতে বায়াত করেন। পরে কেবলমাত্র শাম প্রদেশ ব্যতীত গোটা মুসলিম জাহান তাঁকে খলীফা বলে স্বীকার করে। হযরত সাআদ ইবনে ওবাদার বায়াত না করায় যদি হযরত আবুবকর এবং হযরত ওমর (রাঃ)-এর খেলাফত সন্ধিগ্ধ না হয়, তাহেল ১৭ জন বা ২০ জন সাহাবীর বায়আত না করায় হযরত আলী (রাঃ)-এর খেলাফত কি করে সন্ধিগ্ধ সাব্যস্ত হতে পারে? উপরন্তু সে ক’জন সাহাবীর বায়আত না করা ছিল নিছক একটি নেতিবাচক কাজ; যার ফলে খেলাফতের আইনগত পজিসনের উপর কোন প্রভাব পড়ে না। তাঁর মুকাবিলায় কি এমন কোন খলীফা ছিল, যার হাতে তাঁরা প্রতি-বায়াত করেছিলেন? অথবা তাঁরা কি বলেছিলেন যে, এখন উম্মাত বা রাষ্ট্রের কোন খলীফার প্রয়োজন নেই? অতবা তাঁরা কি বলেছিলেন যে, কিছু সময়ের জন্য খেলাফতের পদ শূন্য থাকা উচিত? এর কোন একটিও যদি না থাকে, তাহলে তাঁদের নিছক বায়াত না করার এ অর্থ কেমন করে হতে পারে যে, সংখ্যাগরিষ্ঠ-এবং বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ যার হাতে বায়আত করেছে, মূলত তিনি বৈধ খলীফা ছিলেন না?

এভাবে হযরত ওসমান (রাঃ)-এর শাহাদাতের কালে খেলাফতে রাশেদার ব্যবস্থায় যে মারাত্মক ফাটল সৃষ্টি হয়েছিল মুসলমানরা তা পূরণ করার সুযোগ লাভ করেছিল এবং সুযোগ লাভ করেছিলেন হযরত আলী (রাঃ) তাকে পুনরায় প্রতিষ্ঠিত করায়। কিন্তু তিনটি বিষয় এমন ছিল, যা সে ফাটল পুরণের সুযোগ দেয়নি। বরং তা ফাটলকে আরও বৃদ্ধি করে উম্মাতকে মুলুকিয়্যাতের (রাজতন্ত্র) মুখে ঠেলে দেয়ার ব্যাপারে এক ধাপ অগ্রসর হয়।

একঃ হযরত ওসমান (রাঃ)-এর বিরুদ্ধে যারা সন্ত্রাস সৃষ্টি করেছিল, যারা কার্যত হত্যাকান্ডে অংশ নিয়েছিল, হত্যায় প্রেরণা যুগিয়েছিল এবং তাতে সহায়তা করেছিল, এমনি করে সামগ্রিকভাবে এ মহা বিপর্যয়ের দায়িত্ব যাদের ওপর পড়ে তারা সবাই হযরত আলী (রাঃ)- কে খলীফা করার ব্যাপারে অংশ নেয়। খেলাফত কার্যে তাদের অংশ গ্রহণ এক বিরাট বিপর্যের কারণ হয়ে পড়ে। কিন্তু মদীনার সে সময়ের পরিস্থিতি উপলব্ধি করার জন্য যে ব্যক্তিই চেষ্টা করবেন, তিনি এ কথা উপলব্ধি না করে পারবেন না যে, তখন খলীফা নির্বাচনের কাজ থেকে তাদেরকে কিছুতেই নিবৃত্ত করা যেত না। তাদের অংশ গ্রহণ সত্ত্বেও যে ফায়সালা গৃহীত হয়েছিল, তা ছিল অবশ্যি একটি সঠিক ফায়সালা। উম্মাতের সকল প্রভাবশালী ব্যক্তি ঐকমত্যের ভিত্তিতে হযরত আলী (রাঃ)-এর হস্ত সুদৃঢ় করলে হযরত ওসমান (রাঃ)-এর হত্যাকারীদেরকে নিশ্চিত দমন করা সম্ভব হত এবং দুর্ভাগ্য বশত বিপর্যয়ের যে ধারা সৃষ্টি হয়েছিল, তা সহজেই নিশ্চিহ্ন করা সম্ভব হত।

দুইঃ হযরত আলী (রাঃ)-এর বায়আত থেকে কোন কোন ব্ড় বড় সাহাবীর বিরত থাকা। কোন কোন বুযর্গ একান্ত সদুদ্দেদশ্যে ফেতনা থেকে বাঁচার জন্য এ কর্মপন্থা অবলম্বন করলেও পরবর্তী ঘটনা প্রবাহ প্রমাণ করেছে যে, যে ফেতনা থেকে তাঁরা দূরে থাকতে চেয়েছিলেন, তাদের এ কাজ তার চেয়েও বড় ফেতনার সহায়ক হয়েছে। তাঁরা ছিলেন উম্মাতের অত্যন্ত প্রভাবশালী ব্যক্তি। তাদের প্রত্যেকের উপর হাযার হাযার মুসলমানের আস্থা ছিল। তাঁদের বিরত থাকার ফলে জনমনে সন্দেহের সৃষ্টি হয়, খেলাফতে রাশেদার ব্যবস্থা নব পর্যায়ে বহাল করার জন্য যে একাগ্রতার সাথে হযরত আলী (রাঃ)-এর সহযোগিতা করা উম্মাতের উচিত ছিল- যা ছাড়া তিনি এ কাজ আঞ্জাম দিতে পারতেন না- দুর্ভাগ্যবশত তা অর্জিত হতে পারেনি।

তিনঃ হযরত ওসমান (রাঃ)-এর রক্তের দাবী। দু’পক্ষ দুটি দল এ দাবী নিয়ে এগিয়ে আসে। এক দিকে হযরত আয়েশা এবং হযরত তালহা ও যোবায়ের এবং অপর পক্ষে হযরত মুআবিয়া (রাঃ)। উভয় পক্ষের মর্যাদা এবং শ্রেষ্ঠত্বের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করেও এ কথা না বলে উপায় নেই যে, আইনের দৃষ্টিতে উভয় পক্ষের পজিশনকে কিছুতেই সঠিক বলে স্বীকার করা যায় না। বলাবাহুল্য এটা জাহেলী যুগের কোন গোত্রবাদী ব্যবস্থা ছিল না। যে কোন ব্যক্তি যেভাবে খুশী নিহত ব্যক্তির প্রতিশোধের দাবী নিয়ে দাঁড়াবে আর সে দাবী পূরণ করার জন্য ইচ্ছা মতো যে কোন কর্মপন্থা অবলম্বন করবে, এ ধরনের কোন ব্যবস্থা তখন ছিল না। সেখানে একটা বিধিবদ্ধ সরকার প্রতিষ্ঠিত ছিল। প্রতিটি দাবী উত্থাপন করার জন্য একটা নিয়ম এবং একটা বিধান বর্তমান ছিল। হ্ত্যার প্রতিশোধ দাবী করার অধিকার নিহত ব্যক্তির উত্তরাধিকারদের ছিল, তাঁরা বেঁচে ছিলেন এবং সেখানে উপস্থিতও ছিলেন। অপরাধীদের গ্রেফতার এবং তাদের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের ব্যাপারে সরকার সত্যিই জেনে শুনে শৈথিল্য প্রদর্শন করলে অন্যরা নিশ্চয়ই সরকারের নিকট ইনসাফের দাবী জানাতে পারতেন। কিন্তু সরকার কোন ব্যক্তির দাবী অনুযায়ী কর্মপন্থা গ্রহণ না করলে তিনি যে সরকারকে আদৌ কোন বৈধ সরকার বলে স্বীকারই করবেন না- কোন সরকারের কাছে ইনসাফ দাবী করার এটা কোন ধরনের পন্থা হইতে পারে? শরীয়াতের কোথাও কি এর কোন নযীর আছে? হযরত আলী (রাঃ) যদি বৈধ খলীফাই না হবেন, তবে তাঁর কাছে অপরাদীদের গ্রেফতার এবং শাস্তি বিধান দাবী করার অর্থই বা কি? তিনি কি কোন গোত্রীয় সর্দার ছিলেন যিনি আইনগত অধিকার ছাড়াই যাকে খুশী পাকড়াও করবেন এবং যাকে খুশী শাস্তি দেবেন?

এর চেয়েও বেশী বিরোধী পন্থা ছিল প্রথম পক্ষের। তারা মদীনায় গিয়ে-যেখানে খলীফা, অপরাধী এবং নিহত ব্যক্তির উত্তরাধিকারী সকলেই উপস্থিত ছিল এবং অপরাধীর বিচার ও দণ্ড বিধান সম্ভবপর ছিল- নিজেদের দাবী পেশ করার পরিবর্তে বসরার পথে গমন করেন এবং সৈন্য সমাবেশ করে হযরত ওসমান (রাঃ)- এর রক্তের প্রতিশোধ গ্রহণের চেষ্টা করেন। তাদের এ দাবীর অবশ্যম্ভাবী ফল স্বরূপ এক খুনের পরিবর্তে আরো দশ হাযার খুন হওয়া এবং রাষ্ট্রের শৃংখলা বিপন্ন হওয়াই ছিল অবধারিত। শরীয়াত তো দূরের কথা, দুনিয়ার কোন আইনের দৃষ্টিতেই এটাকে বৈধ কার্যক্রম হিসাবে স্বীকার করা চলে না।

দ্বিতীয় পক্ষ অর্থাৎ হযরত মুআবিয়া (রাঃ)-এর কর্মপন্থা ছিল এর চেয়েও কয়েকগুণ বেশী আইন বিরোধী। আবু সুফিয়ান তনয় মুআবিয়া হিসাবে নয়, বরং শাম প্রদেশের গবর্ণর হিসাবে তিনি হযরত ওসমান (রাঃ) এর খুনের প্রতিশোধ গ্রহণের দাবী উত্থাপন করেন। তিনি কেন্দ্রীয় সরকারের আনুগত্য স্বীকার করেন। নিজের উদ্দেশ্যের জন্য গবর্ণরীর ক্ষমতা প্রয়োগ করেন তিনি। হযরত আলী (রাঃ)- এর নিকট তিনি এ দাবী উত্থাপন করেননি যে, হযরত ওসমান (রাঃ)-এর হত্যাকারীদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে তাদেরকে শাস্তি দান করতে হবে। বরং তার দাবী ছিল হস্তাদেরকে তাঁর হাতে সোপর্দ করতে হবে, যাতের তিনি নিজে তাদেরকে হত্যাকরতে পারেন। [তাবারী, ৪র্থ খন্ড, পৃষ্ঠা- ৩, ৪, ইবনুল আসীর, ৩য় খন্ড, পৃষ্ঠা- ১৪৮, আল-বেদায়া, ওয়ান নেহায়া, পৃষ্ঠা- ২৫৭-২৫৮।] এসব কিছু ইসলামী যুগের সুশৃংখল সরকারের পরিবর্তে ইসলাম পূর্ব যুগের গোত্রীয় বিশৃংখলার সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ ছিল। প্রথমত হযরত ওসমান (রাঃ)-এর হত্যার প্রতিশোধ গ্রহণের দাবীর অধিকার ছিল হযরত মুআবিয়া (রাঃ)-এর পরিবর্তে হযরত ওসমান (রাঃ)-এর শরীয়াত সম্মত উত্তরাধিকারীদের। আত্মীয়তার ভিত্তিতে হযরত মুআবিয়া (রাঃ)- এর এ দাবী করার অধিকার থাকলেও তা ছিল ব্যক্তিগতভাবে, শাম-এর গবর্ণর হিসাবে নয়। হযরত ওসমান (রাঃ)- এর আত্মীয়তা ছিল আবু সুফিয়ানের পুত্র মুআবিয়ার সাথে। শাম-এর গবর্ণরী তাঁর আত্মীয়তার ভিত্তি ছিল না। ব্যক্তিগত মর্যাদায় তিনি খলীফার নিকট ফরিয়াদী হিসাবে যেতে পারতেন, দাবী করতে পারতেন অপরাধীদের গ্রেফতার করার এবং তাদের বিরুদ্ধে মামলা পরিচালনার। যে খলীফার হাতে যথারীতি আইনানুগ উপায়ে বায়াআত সম্পন্ন হয়েছে, একমাত্র তাঁর প্রশাসনাধীন প্রদেশ ছাড়া অবশিষ্ট গোটাদেশ যাঁর খেলাফত মেনে নিয়েছে, [ঐতিহাসিকভাবে একথা প্রমাণিত যে, সিপফীন যুদ্ধের পর পর্যন্ত গোটা জাযিরাতুল আরব এবং শাম-এর পূর্ব পশ্চিম উভয় দিকে ইসলামী সাম্রাজ্যের প্রতিটি প্রদেশ হযরত আলী (রাঃ)-এর বায়আতের ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। হযরত মুআবিয়ার প্রভাবাধীন হওয়ার কারণে কেবল শাম প্রদেশ তাঁর আনুগত্য বহির্ভূত ছিল। এ জন্য এ অবস্থার সত্যিকার আইনগত মর্যাদা এই ছিল না যে, মুসলিম জাহানে নৈরাজ্য বিরাজ করছিল, সেখানে কেউ কারো আনুগত্য করতে বাধ্য ছিল না। বরং সঠিক আইনগত অবস্থা এই ছিল যে, রাষ্ট্রে একটি বৈধ, আইনানুগ কেন্দ্রীয় সরকার বিদ্যমান ছিল; অন্যান্য প্রদেশসমূহ তার আনুগতৌ করছিল, কেবল একটি মাত্র প্রদেশ ছিল বিদ্রোহী- (আত-তাবারী, ৩য় খন্ড, পৃষ্ঠা- ৪৬২-৪৬৩; ইবনুল আসীর, ৩য় খন্ড, পৃষ্ঠা- ১৩৭-১৪১; আল বেদায়া ওয়ান নেহায়া, ৭ম খন্ড, পৃষ্ঠা- ২২৯, ২৫১।] তাঁর আনুগত্য অস্বীকার করার গবর্ণর হিসাবে তাঁর কোন অধিকার ছিল না। অধিকার ছিল না নিজের প্রশাসনাধীন অঞ্চলের সামরিক শক্তিকে কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে ব্যবহার করার। নিরেট প্রাচীন জাহেলিয়াতের পন্থায় এ দাবী করার অধিকারও তাঁর ছিল না যে, হত্যার অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তিদেরকে আদালতের কার্যক্রম ছাড়াই কেসাসের দাবীদারদের হাতে সোপর্দ করা হোক, যাতে তিনি নিজেই তাদের ওপর প্রতিশোধ গ্রহণ করতে পারেন।

কাযী আবুবকর আরাবী আহকামুল কুরআন-এ নিম্নোক্তভাবে এ বিষয়ের সঠিক শরীয়াত সম্মত মর্যাদা বর্ণনা করেছেন।

[হযরত ওসমান (রা)-এর শাহাদাতের পর] জনগণকে নেতাশূন্য ছেড়ে দেয়া সম্ভব ছিল না তাই হযরত ওমর (রাঃ) শূরায় যাদের কথা উল্লেখ করেছিলেন, তাঁদের সামনে ইমামাত (নেতৃত্ব) পেশ করা হয়। কিন্তু তারা তা প্রত্যাখ্যান করেন। হযরত আলী (রাঃ) যিনি এর সবচেয়ে বেশী হকদার ও যোগ্য ছিলেন তা গ্রহণ করেন, যাতে উম্মাতের রক্তপাত এবং নিজেদের মধ্যকার অনৈক্য থেকে রক্ষা করা যায়। সে রক্তপাথ এবং অনৈক্যের ফলে দ্বীন এবং মিল্লাতের অপূরণীয় ক্ষতির আশংকা ছিল। তাঁর হাতে বায়আত করার পর শাম প্রদেশের জনগণ তাঁর বায়আত কবুল করার জন্য শর্ত আরোপ করে যে, প্রথমে হযরত ওসমান (রাঃ) এর হত্যাকারীদেরকে গ্রেফতার করে তাদের নিকট থেকে কেসাস (প্রতিশোধ) গ্রহণ করা হোক। হযরত আলী (রাঃ) তাদেরকে বলেন যে, আগে বায়আতে শামিল হয়ে যাও পরে অধিকার দাবী করো, তোমরা অবশ্যি তা পাবে। কিন্তু তারা বলে, ‘আপনি বায়আতের অধিকারীই নন। কারণ আমরা হযরত ওসমান (রাঃ)- এর হত্যাকারীদেরকে সকাল-বিকাল আপনার সঙ্গে দেখছি।’ এ ব্যাপারে হযরত আলী (রাঃ)-এর মত অধিক সত্য ছিল। তাঁর উক্তি ছিল একান্ত সঠিক। কারণ তিনি তখন হযরত ওসমান (রাঃ)-এর হত্যাকারীদের নিকট থেকে প্রতিশোধ গ্রহণের চেষ্টা করলে বিভিন্ন গোত্র তাদের সহযোগিতায় এগিয়ে আসতো। ফলে যুদ্ধের একটি তৃতীয় ফ্রন্ট খুলে যেতো। তাই তিনি অপেক্ষা করছিলেন, সরকার সুদৃঢ় হোক, গোটা দেশে তাঁর বায়আত প্রতিষ্ঠিত হোক, এরপর আদালতে যথারীতি নিহত ব্যক্তির উত্তরাধিকারীদের পক্ষ থেকে দাবী উত্থাপিত হবে, সত্য ও ন্যায়ানুযায়ী ফায়সালা করা হবে। যে অবস্থায় ফেতনা মাথা চাড়া দিয়ে ওঠার এবং বিভেদ ও অনৈক্য সৃষ্টি হওয়ার আশংকা থাকে, সে অবস্থায় ইমামের জন্য কেসাসকে বিলম্বিত করা বৈধ এ ব্যাপারে ওলামায়ে উম্মাতের মধ্যে কোন মতবিরোধ নেই।’

‘হযরত তালহা ও যোবায়ের (রাঃ)- এর ব্যাপারও ছিল অনুরূপ। তাঁরা উভয়ে হযরত আলী (রাঃ)-কে খেলাফত থেকে বেদখল করেননি, তাঁরা তাঁর দ্বীনের ব্যাপারেও আপত্তি জানাননি। অবশ্য তাঁদের মত ছিল, সর্বপ্রথম হযরত ওসমান (রাঃ)-এর হত্যাকারীদেরকে দিয়েই সূচনা করা হোক। কিন্তু হযরত আলী (রাঃ) তাঁর মতে অটল ছিলেন এবং তাঁর মতই সঠিক ছিল।’

সমানে অগ্রসর হয়ে কাযী সাহেব

*****************************************

- এ আয়াতের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে লিখেছেনঃ

এ পরিস্থিতিতে হযরত আলী (রাঃ) উপরোক্ত আয়াত অনুযায়ী কাজ করেছেন। যেসব বিদ্রোহী ইমামের উপর নিজেদের মত জোরপূর্বক চাপিয়ে দিতে চেয়েছিল, তিনি তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন। এমন দাবীকরার অধিকার এ বিদ্রোহীদের ছিল না। যারা কেসাসের দাবী করছিল তাদের জন্য সঠিক পন্থা ছিল, হযরত আলী (রাঃ)- এর কথা মেনে নিয়ে কেসাসের দাবী আদালতে পেশ করে হত্যাকারীদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা। তারা এ পন্থা অবলম্বন করলে হযরত আলী (রাঃ) যদি অপরাধীদের নিকট থেকে প্রতিশোধ গ্রহণ না করতেন, তখন তাদের দ্বিধা-সংকোচেরও কোন প্রয়োজন হতো না। সাধারণ মুসলমানরা নিজেরাই হযরত আলী (রাঃ)-কে পদচ্যুত করতো। [আহকামুল কুরআন, ৪র্থ খন্ড, পৃষ্ঠা- ১৭০৬-১৭০৭, মিসরীয় সংস্করণ, ১৯৫৮।]

 

চতুর্থ পর্যায়

খেলাফতে রাশেদার মধ্যে এ তিনটি ফাটল সৃষ্টি হবার পর হযরত আল (রাঃ) এর দায়িত্বভার গ্রহণ করে কাজ শুরু করে দেন। তিনি সবেমাত্র কাজ শুরু করেছেন, দু’হাযার সন্ত্রাসবাদী তখনও মদীনায় উপস্থিত, এমন সময় হযরত তালহা (রাঃ) এবং হযরত যোবায়ের (রাঃ) অন্যান্য কয়েকজন সাহাবীকে নিয়ে তাঁর সাথে সাক্ষাত করে বলেনঃ ‘হদ’ (শরীয়াতের দন্ড বিধি) কায়েম করার শর্তে আমরা আপনার হাতে বায়আত করেছি। যারা হযরত ওসমান (রাঃ)- এর হত্যায় শরীক ছিল, এবার আপনি তাদের কাছ থেকে প্রতিশোধ গ্রহণ করুন। হযরত আলী (রাঃ) জবাবে বলেনঃ ভাইয়েরা আমার! আপনারা যতটুকু জানেন, আমিও তা অনবগত নই। কিন্তু আমি তাদেরকে কি করে পাকড়াও করবো, যারা এখন আমাদের ওপর প্রতিপত্তি বিস্তার করে আছে, যাদের ওপর এখন আমাদের কোন প্রভাব ও প্রতিপত্তি নেই। আপনারা এখন যা করতে চান, তার কি কোথাও কোন অবকাশ আছে? তাঁরা সকলেই জবাব দেয়, না। অতঃপর হযরত আলী (রাঃ) বলেনঃ আল্লার কসম। আপনারা যা চিন্তা করেন আমিও তাই চিন্তা করি। পরিস্থিতি একটু শান্ত হতে দিন, গণমনে স্বস্তি ফিরে আসুক। চিন্তার বিভ্রান্তি দূরীভূত হোক, অধিকার প্রতিষ্ঠা সম্ভব হোক। [আততাবারী, ৩য় খন্ড, পৃষ্ঠা- ৪৫৮। ইবনুল আসীর, ৩য় খন্ড, পৃষ্ঠা- ১০০। আল-বেদায়া ওয়ান নেহায়া, ৭ম খন্ড, পৃষ্ঠা- ২২৭-২২৮।]

অতঃপর এ বুযুর্গদ্বয় হযরত আলী (রাঃ)- এর অনুমতি নিয়ে মক্কা শরীফ চলে যান। সেখানে উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা (রাঃ)- এর সাথে সাক্ষাৎ করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন যে, হযরত ওসমান (রাঃ)-এর খুনের প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য কুফা ও বসরা থেকে- যেখানে হযরত তালহা ও হযরত যোবায়েরের বিপুল সংখ্যক সমর্থক ছিল- সেনাবাহিনীর সাহায্য গ্রহণ করা হবে। সুতরাং এ কাফেলা মক্কা থেকে বসরা রওয়ানা হয়ে যায়। বনী-উমাইয়ার সাঈদ ইবনুল আ’স এবং মারওয়ান ইবনুল হাকামও কাফেলার সাথে গমন করেন। মাররুয যাহরান (বর্তমান ফাতেমা উপত্যকা) পৌঁছে সাঈদ ইবনুল আ’স তাঁর দলের লোকদের বললেনঃ তোমরা যদি হযরত ওসমান (রাঃ)- এর হত্যাকারীদের প্রতিশোধ গ্রহণ করতে চাও, তাহলে এদেরকে হত্যা করো, যারা এ বাহিনীতে তোমাদের সঙ্গে রয়েছে। [হযরত তালহা (রাঃ) ও যোবায়ের (রাঃ) ইত্যাকার বুযুর্গদের প্রতি তাদের ইঙ্গিত ছিল। কারণ, বনী-উমাইয়াদের সাধারণ ধারণা ছিল এই যে, যারা হযরত ওসমান (রাঃ)-কে হত্যা করেছে, কেবল তাঁরাই তাঁর হন্তা নয়, বরং সময়ে সময়ে যারা তাঁর পলিসীর সমালোচনা করেছে, বা সন্ত্রাসকালে যারা মদীনায় উপস্থিত ছিল, কিন্তু হত্যা প্রতিরোধের জন্য লড়াই করেনি, তারাও তার হত্যাকারীদের অন্তর্ভূক্ত।] মারওয়ান বললেনঃ না, আমরা তাদেরকে [অর্থাৎ হযরত তালহা (রাঃ), হযরত যোবায়ের (রাঃ) ও হযরত আলী (রাঃ)-কে] পরস্পরের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত করাবো। এদের মধ্যে যে পরাজিত হবে, সে এমনিতেই খতম হয়ে যাবে। আর যে বিজয়ী হবে, সে এতটা দুর্বল হয়ে যাবে যে, আমরা অতি সহজে তাকে কাবু করে ফেলবো। [তাবাকাতে ইবনে সা’আদ, ৫ম খন্ড, পৃষ্ঠা- ৩৪, ৩৫। ইবনে খালদুন, দ্বিতীয় খন্ডের পরিশিষ্ট পৃষ্ঠা- ১৫৫।] এমনি করে এসব ব্যক্তিকে নিয়ে কাফেলা বসরায় পৌঁছে এবং তারা ইরাক থেকে তাদের সমর্থকদের এক বিশাল বাহিনী একত্র করে।

অপর দিকে হযরত আলী (রাঃ)- কে খেলাফতের অনুগত করার জন্য শাম যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন- বসরায় সৈন্য সমাবেশের কথা জানতে পেরে আগে এ পরিস্থিতির মুকাবিলা করতে বাধ্য হন। কিন্তু বিপুল সংখ্যক সাহাবী এবং তাঁদের প্রভাবাধিন ব্যক্তিবর্গ, যারা মুসলমানদের গৃহযুদ্ধকে স্বাভাবিকভাবেই একটা বিপর্যয় বলে মনে করতেন, এ অভিযানে তাঁর সহযোগী হতে প্রস্তুত ছিলেন না। [আল-বেদায়া, ৭ম খন্ড, পৃষ্ঠা- ২৩৩।] ফলে হত্যাকারীদের হাত থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য হযরত আলী (রাঃ) সুযোগের অপেক্ষায় ছিলেন, তারা হযরত আলী (রাঃ)-এর সংগৃহীত ক্ষুদ্র বাহিনীতে ঢুকে পড়ে। এটা তাঁর জন্য দুর্ণাম এবং বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

উম্মুল মু’মিনীন হযরত আয়েশা (রাঃ) এবং আমীরুল মু’মিনীন হযরত আলী (রাঃ)-এর সৈন্যবাহিনীর বসরার অদুরে পরস্পর মুখোমুখী হলে দ্বীনের শ্রীবৃদ্ধি ও কল্যাণকামী ব্যক্তিদের এক বিরাট গ্রুপ ঈমানদারদের দুটি দলকে সংঘর্ষ থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করেন। তাদের মধ্যে সমঝোতার কথাবর্তা প্রায় সম্পন্নই হয়ে এসেছিল। কিন্তু একদিকে হযরত আলী (ঃ)-এর সেনাবাহিনীর মধ্যে ছিল হযরত ওসমান (রাঃ)-এর হত্যাকারীরা তারা মনে করতো, এদের মধ্যে সমঝোতা হয়ে গেলে আমাদের রেহাই নেই; অপর দিকে উম্মুল মু’মিনীন-এর সেনাবাহিনীর মধ্যে এমন ব্যক্তিরাও ছিল, যারা উভয়কে সংঘর্ষে লিপ্ত করে দুর্বল করে ফেলার আকাংখা পোষণ করছিল। তাই তারা নিয়ম বহির্ভূত পদ্ধতিতে যুদ্ধ শুরু করে দেয়। অবশেষে উভয় পক্ষের কল্যাণকামীদের যুদ্ধ ঠেকাবার শত প্রচেষ্টা সত্ত্বেও জামাল যুদ্ধ সংঘটিত হয়। [আল-বেদায়া- ৭ম খন্ড, পৃষ্ঠা- ২৩৭-২৩৯।]

জামাল যুদ্ধের সূচনাকালে হযরত আলী (রাঃ), হযরত তালহা (রাঃ) ও হযরত যোবায়ের (রাঃ)-এর সাথে কথা বলার আকাংখা পোষণ করে এ মর্মে তাদের নিকট পয়গাম পাঠান তাঁরা উভযে হাযীর হলে হযরত আলী (রাঃ) তাঁদেরকে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর বাণী স্মরণ করিয়ে দিয়ে যুদ্ধ থেকে নিবৃত্ত থাকার উপদেশ দেন। ফলে হযরত যোবায়ের (রাঃ) যুদ্ধের ময়দান ত্যাগ করে চলে যান আর হযরত তালহা (রাঃ) প্রথম সারি থেকে পেছনের সারিতে সরে যান। [আততাবারী, ৩য় খন্ড, পৃষ্ঠা- ৪১৫। ইবনুল আসীর, ৩য় খন্ড, পৃষ্ঠা- ১২২-১২৩। আল-বেদায়া ওয়ান নেহায়া, ৭ম খন্ড, পৃষ্ঠা- ২৪০, ২৪১, ২৪৭। আল-ইস্তীআব, ১ম খন্ড, পৃষ্ঠা- ২০৭। ইবনে খালদুন, ২য় খন্ডের পরিশিষ্ট পৃষ্ঠা- ১৬২।] কিন্তু আমর ইবনে জারমুয নামক জনৈক যালেম হযরত যোবায়ের (রাঃ)-কে হত্যা করে এবং প্রসিদ্ধ ও একান্ত নির্ভরযোগ্য বর্ণনা মতে মারওয়ান ইবনুল হাকাম হযরত তালহা (রাঃ)-কে হত্যা করে। [তাবাকাতে ইবনে সা’আদ, ৩য় খন্ড, পৃষ্ঠা- ২২৩; ৫ম খন্ড, পৃষ্ঠা- ৩৮। ইবনে হাযার, তাহযীবুত তাহযীব, ৫ম খন্ড, পৃষ্ঠা- ২০। ইবনুল আসীর, ৩য় খন্ড, পৃষ্ঠা- ১২৪। ইবনে আবদুল বার, আল-ইস্তীআব পৃষ্ঠা- ২০৭-২০৮। ইবনে আবদুল বার বলেনঃ মারওয়ান হযরত তালহা (রাঃ)-এর সেনাবাহিনীতে শামিল ছিলেন, আর তিনিই হযরত তালহা (রাঃ)-কে হত্যা করেছেন- নির্ভরযোগ্য ব্যক্তিদের মধ্যে এ ব্যাপারে কোন দ্বিমত নেই। আল্লামা ইবনে কাসীর আল-বেদায়া এ বর্ণনাকেই প্রসিদ্ধ বর্ণনা বলে স্বীকার করেছেন- ৭ম খন্ড, পৃষ্ঠা- ২৪৭।]

যাই হোক, সিফফীন যুদ্ধ সংঘটিত হয় এবং এতে উভয় পক্ষের ১০ হাযার লোক শহীদ হয়। হযরত ওসমান (রাঃ)-এর শাহাদাতের পরে এটা ইসলামের ইতিহাসের দ্বিতীয় বৃহত্তম দুর্ঘটনা। এ ঘটনা উম্মাতকে স্বৈরাচারের দিকে আরও এক ধাপ এগিয়ে দেয়। হযরত আলী (রাঃ)-এর বিরুদ্ধে যে সেনাবাহিনী যুদ্ধ করেছিল, তার বেশীর ভাগ সংগৃহীত হয়েছিল বসরা এবং কুফা থেকেই। হযরত আল (রাঃ)-এর হাতে এ এলাকার ৫ হাযার লোক শহীদ এবং হাযার হাযার লোক আহত হওয়ার পর কি করে এ আশা করা যেতে পারে যে, শাম-এর জনগণ যে একাত্মতার সাথে হযরত মুআবিয়া (রাঃ)-এর সহযোগিতা করছিল, ঠিক একই পর্যায়ের একাত্মতার সাথে ইরাকের জনগণও হযরত আলী (রাঃ)-এর সহযোগিতা করবে? সিফফীন যুদ্ধ এবং তৎপরবর্তী পর্যায়ে হযরত তুআবিয়া (রাঃ)-এর শিবিরের ঐক্য এবং হযরত আলী (রাঃ)-এর শিবিরের অনৈক্য মৌলিকভাবে এ জামাল যুদ্ধের পরিণতি ছিল। এ যুদ্ধ সংঘটিত না হলে পরবর্তীকালের সকল বিকৃতি সত্ত্বেও স্বৈরাচারের আগমন ঠেকানো সম্পূর্ণ সম্ভব ছিল। বস্তুত এটাই ছিল হযরত আলী (রাঃ) এবং তালহা (রাঃ) ও যোবায়ের (রাঃ)-এর সংঘাতের পরিণতি। এ পরিণতির অপেক্ষায় ছিলন মারওয়ান ইবনুল হাকাম। সে জন্যেই তিনি হযরত তালহা (রাঃ) ও যোবায়ের (রাঃ)-এর সাথীহয়ে বসরায় যান। দুঃখের বিষয়, তাঁর এ অভিপ্রায় শতকরা একশ ভাগ পূর্ণ হয়।

হযরত আলী (রাঃ) এ যুদ্ধের ব্যাপারে যে কর্মপন্থা গ্রহণ করেন, তা একজন খলীফায়ে রাশেদ এবং একজন বাদশার পার্থক্য সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরে। তিনি প্রথমে আপন সেনাবাহিনীর মধ্যে ঘোষণা করেছেন, কোন পলায়নকারীর পেছনে ধাওয়া করবে না, কোন আহত ব্যক্তির ওপর আক্রমণ করবে না এবং বিজয়ী হয়ে বিরোধীদের গৃহে প্রবেশ করবে না। বিজয় শেষে তিনি উভয় পক্ষের শহীদদের জানাযার সালাত আদায় করান এবং সমান মর্যাদার সাথে তাদেরকে দাফন করান। বিরোধী বাহিনীর কাছ থেকে পাওয়া অর্থ-সম্পদকে গণীমাতের মাল সাব্যস্ত করতে সম্পূর্ণ অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করেন। বসরার জামে মসজিদে সংগৃহীত সম্পদ জড়ো করে তিনি ঘোষণা করেনঃ যে ব্যক্তি তার নিজের মাল চিনতে পারে সে যেন তা নিয়ে যায়। লোকেরা খবর রটায় আলী (রাঃ) বসরার পুরুষদের হত্যা করতেচায়, আর চায় স্ত্রীদের দাসীতে পরিণত করতে। হযরত আলী (রাঃ) তৎক্ষণাৎ এ অপপ্রচারের প্রতিবাদ করে বলেনঃ ‘আমার মতো লোক থেকে এ ধরনের আশংকা করা উচিত নয় এ আচরণ তো কাফেরদের সাথে করার মতো। মুসলমানদের সাথে এহেন আচরণ করা যায় না।’ বসরায় প্রবেশ করলে স্ত্রীরা গৃহের অভ্যন্তর থেকে গালমন্দ এবং নিন্দাবাদে জর্জরিত করে। হযরত আলী (রাঃ) তাঁর সেনাবাহিনীর মধ্যে ঘোষণা করে দেনঃ সাবধান। কারোর সম্ভ্রম নষ্ট করবে না, কারো গৃহাভ্যন্তরে প্রবেশ করবে না, কোন নারীকে উত্যক্ত করবে না, – তারা তোমাদের আমীর বেং সৎ ব্যক্তিদেরকে গালমন্দ করলেও না। এরা যখন মুশরিক ছিল, তখনও তো এদের ওপর হস্তক্ষেপ করা থেকে আমাদেরকে বারণ করা হয়েছিল। এখন তো এরা মুসলমান; তবে কি করে এখন এদের ওপর হস্তক্ষেপ করতে পারি? [আত-তাবারী, ৩য় খন্ড, পৃষ্ঠা- ৫০৬, ৫১০, ৫৪২, ৫৪৪। ইবনুল আসীর, ৩য় খন্ড, পৃষ্ঠা- ১২২, ১৩১, ১৩২। আল বেদায়া, ৭ম খন্ড, পৃষ্ঠা- ২৪৪, ২৪৫। ইবনে খালদুন, দ্বিতীয় খন্ডের পরিশিষ্টি, পৃষ্ঠা- ১৬৪, ১৬৫।] পরাজিত পক্ষের আসল পরিচালক হযরত আয়েশা (রাঃ)- এর সাথে অত্যন্ত সম্মানজনক আচরণ করেন এবং পরিপূর্ণ মর্যাদার তাঁকে মদীনা প্রেরণ করেন। [আল বেদায়া, ৭ম খন্ড, পৃষ্ঠা- ২৪৫, ২৪৬। আত-তাবারী, ৩য় খন্ড, পৃষ্ঠা- ৫৪৭।] হযরত যোবায়ের (রাঃ)-এর হন্তা এনাম লাভের আশায় উপস্থিত হলে তিনি তাকে জাহান্নামের সুসংবাদ দান করেন, তার হাতে হযরত যোবায়ের (রাঃ)-এর তরবারী দেখে বলেনঃ কতোবার এ তরবারী রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে হেফাযত করেছিল। [আল বেদায়া, ৭ম খন্ড, পৃষ্ঠা- ২৪৯। ইবনুল আসীর, ৩য় খন্ড, পৃষ্ঠা- ১২৫। ইবনে খালদুন, দ্বিতীয় খন্ডের পরিশিষ্টি, পৃষ্ঠা- ১৬২।] হযরত তালহা (রাঃ)-এর পুত্র সাক্ষাৎ করতে এলে অত্যন্ত আদরের সাথে তাকে নিকটে বসতে দেন, তাঁকে তার সম্পত্তি ফেরত দিয়ে বলেনঃ আমি আশা করি, আখেরাতে তোমার পিতা এবং আমার মধ্যে যে ঘটনা ঘটবে, তাকে আল্লাহ তায়ালা কুরআন শরীফে এভাবে বর্ণনা করেছেনঃ

*****************

-আমি তাদের অন্তরের কলুষ-কালিমা বিদূরীত করবো, আর তারা ভাইয়ের মতো একে অন্যের সম্মুখে উচ্চাসনে উপবিষ্ট হবে। [তাবাকাতে ইবনে সাআদ, পৃষ্ঠা- ২২৪, ২২৫।]

 

পঞ্চম পর্যায়

হযরত ওসমান (রাঃ)-এর শাহাদাতের (৩৫ হিজরীর ১৮ই জিলহজ্জ) পর হযরত নোমান ইবনে বশীর তাঁর রক্তমাখা জামা, তাঁর স্ত্রী হযরত নায়েলার কাটা আঙ্গুল দামেশকে হযরত মুআবিয়া (রাঃ)-এর নিকট নিয়ে যান এবং শামবাসীদের ভাবাবেগকে নাড়া দেয়ার জন্য তিনি এগুলো প্রকাশ্য রাস্তায় ঝুলিয়ে রাখেন। [ ইবনুল আসীর, ৩য় খন্ড, পৃষ্ঠা- ৯৮। আল-বেদায়া, ৭ম খন্ড, পৃষ্ঠা- ২২৭। ইবনে খালদুন, দ্বিতীয় খন্ডের পরিশিষ্ট, পৃষ্ঠা- ১৫২।] হযরত মুআবিয়া (রাঃ) ওসমান (রাঃ) হত্যার প্রতিশোধ আইনানুগ পন্থায় নয়, বরং বেআনী পন্থায় গ্রহণ করতে চান- এটা ছিল তারই প্রমাণ। অন্যথায় এটা স্পষ্ট যে, হযরত ওসমান (রাঃ)-এর শাহাদাতের খবরই মানুষের মনে ক্ষোভ ও দুঃখ সঞ্চারের জন্য যথেষ্ট ছিল, জামা এবং আঙ্গুলের প্রদর্শনী করে মানুষের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি করার কোন প্রয়োজন ছিল না।

এদিকে হযরত আলী (রাঃ) খেলাফতের দায়িত্ব গ্রহণের পর সর্বপ্রথম যে সমস্ত কাজ করেন, তার মধ্যে একটি ছিল ৩৬ হিজরীর মহররম মাসে হযরত মুআবিয়া (রাঃ)-কে শাম থেকে বরখাস্ত করে তাঁর স্থানে হযরত সাহাল ইবনে হানীফের নিযুক্তি। কিন্তু নবনিযুক্ত গবর্ণর সবেমাত্র তাবুক পৌঁছেছেন, এমন সময় শাম-এর একটি পদাতিক বাহিনী তাঁর সাথে মিলিত হয়ে বলেঃ আপনি হযরত ওসমান (রাঃ)-এর পক্ষ থেকে এসে থাকলে আপনাকে খোশআমদেদ জানাই। কিন্তু অন্য কারো পক্ষ থেকে এসে থাকলে ফেরত চলে যান। [ইবনুল আসীর, ৩য় খন্ড, পৃষ্ঠা- ১০৩। আল বেদায়া, ৭ম খন্ড, পৃষ্ঠা- ২২৮। ইবনে খালদুন, দ্বিতীয় খন্ডের পরিশিষ্ট, পৃষ্ঠা- ১৫২।] শাম প্রদেশ নতুন খলীফার আনুগত্য গ্রহণে প্রস্তত নয় এটা ছিল তারই স্পষ্ট নোটিশ। হযরত আলী (রাঃ) অপর এক ব্যক্তিকে পত্র দিয়ে হযরত মুআবিয়া (রাঃ)-এর নিকট প্রেরণ করেন। কিন্তু তিনি সে পত্রের কোন জবাবই দেননি। বরং ৩৬ হিজরীর সফর মাসে জনৈক দূতের মারফত তাঁর নিকট একখানা খাম পাঠান। হযরত আলী (রাঃ) খাম খুলে দেখেন, ভেতরে কোন চিঠি নেই। তিনি জিজ্ঞেস করেন, একি ব্যাপার? দূত জানায়, ‘ওসমান হত্যার প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য আমার পেছনে ৬০ হাযার লোক উন্মুখ হয়ে আছে।’ হযরত আলী (রাঃ) জিজ্ঞেস করেন, কার কাছ থেকে প্রতিশোধ নিতে চায়? সে জবাব দেয়, আপনার ঘাড়ের রগ থেকে। [আত-তাবারী, ৩য় খন্ড, পৃষ্ঠা- ৪৬৪। ইবনুল আসীর, ৩য় খন্ড, পৃষ্ঠা- ১০৪। আল বেদায়া, ৭ম খন্ড, পৃষ্ঠা- ২২৯। ইবনে খালদুন, দ্বিতীয় খন্ডের পরিশিষ্ট, পৃষ্ঠা- ১৫২-১৫৩।] এর স্পষ্ট অর্থ ছিল যে, শাম এর গবর্ণর কেবল আনুগত্য স্বীকার করতে চান না, তা-ই নয়, বরং আপন প্রদেশের সকল ক্ষমতা কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নিয়োজিত করতে চান, ওসমান (রাঃ)-এর হন্তাদের কাছ থেকে নয়; বরং তদানীন্তন খলীফার নিকট থেকে ওসমান হত্যার প্রতিশোধ গ্রহন করাই তার উদ্দেশ্য।

এসব কিছুই ছিল হযরত মুআবিয়া (রাঃ) একাধারে ১৬/১৭ বছর ধরে এমন একটি প্রদেশের গবর্ণরের দায়িত্বে নিয়োজিত থাকার ফল। যুদ্ধের দৃষ্টিকোণ থেকে যে প্রদেশের অবস্থান ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণে শাম ইসলামী খেলাফতের একটি প্রদেশের তুলনায় অনেকাংশে তাঁর রাজত্বে পরিণত হয়ে গিয়েছিল। ঐতিহাসিকগণ হযরত আলী (রাঃ) কর্তৃক হযরত মুআবিয়া (রাঃ)-কে পদচ্যুত করার ঘটনা অনেকটা এমনভাবে বর্ণনা করেছেন, যার ফলে পাঠক মনে করে বসে যে, হযরত আলী (রাঃ)-এর মধ্যে দূরদর্শীতা ও বিচক্ষণতার লেশমাত্রই ছিল না। মুগীরা ইবনে শোবা (রাঃ) তাঁকে বিজ্ঞতার সাথে এ কথা বুঝিয়েছিলেন যে, মুআবিয়া (রাঃ)-কে শুধু শুধু ক্ষেপিয়ে দিয়ে বিপদ ডেকে আনেন। অথচ সেসব ঐতিহাসিকদের লিখিত ইতিহাস থেকে ঘটনার যে চিত্র আমাদের সামনে ভেসে ওঠে, তা দেখে কোন রাজনৈতিক প্রজ্ঞা সম্পন্ন ব্যক্তি এ কথা অনুভব না করে পারেন না যে, হযরত আলী (রাঃ) হযরত মুআবিয়া (রাঃ)-এর পদচ্যুতির নির্দেশ দানে বিলম্ব করলে তা হতো বিরাট ভুল। তাঁর এহেন পদক্ষেপ থেকে শুরুতেই এটা স্পষ্ট হয়ে পড়ে যে, হযরত মুআবিয়া (রাঃ) কোথায় দাঁড়িয়ে তাঁর ভূমিকা প্রচ্ছন্ন থাকলে আসলে তা প্রতারণার আচ্ছাদন বৈ আর কিছুই হতো না। তা হতো আরও মারাত্মক।

হযরত আলী (রাঃ) অতঃপর শাম আক্রমণের প্রস্তুতি শুরু করেন। তখন শামকে আনুগত্যে বাধ্যকরা তাঁর জন্য তেমন কষ্টকর ছিল না। কারণ জাযিরাতুল আরব, ইরাক এবং মিসর তাঁর আদর্শানুগত। শাম প্রদেশ একা তাঁর মুকাবিলায় বেশীক্ষণ টিকতে পারতো না। উপরন্তু একটি প্রদেশের গবর্ণর খলীফার বিরুদ্ধে তরবারী উন্মুখ করে দাঁড়াবে- মুসলিম জাহানের সাধারণ জনমতও কিছুতেই তা পসন্দ করতো না। বরং এ পরিস্থিতিতে শামের জনগণের পক্ষেও এক জোট হয়ে খলীফার বিরুদ্ধে হযরত মুআবিয়া (রাঃ)-কে সাহায্য করা সম্ভব হতো না। কিন্তু একই সময়ে হযরত আয়েশা (রাঃ) হযরত তালহা (রাঃ) ও হযরত যোবায়ের (রাঃ)-এর পদক্ষেপ- যা ইতিপূর্বে আমরা উল্লেখ করেছি-পরিস্থিতির চিত্র সম্পূর্ণ পাল্টে দেয় এবং হযরত আলী (রাঃ)-কে শাম অভিমুখে অগ্রসর হওয়ার পরিবর্তে ৩৬ হিজরীর রবিউস সানী মাসে বসরা অভিমুখে রওয়ানা হতে হয়। [ইবনুল আসীর, ৩য় খন্ড, পৃষ্ঠা- ১১৩।]

হিজরী ৩৬ সালের জমাদিউস সানী মাসে জামাল যুদ্ধ শেষ করে হযরত আলী (রাঃ) পুনরায় শাম-এর দিকে মনোনিবেশ করেন এবং হযরত জারীর ইবনে আবদুল্লাহ আল-বাজালীকে একখানা পত্র দিয়ে হযরত মুআবিয়া (রাঃ)-এর নিকট পাঠান। এর মাধ্যমে তাঁকে বুঝাবার চেষ্টা করা হয় যে, উম্মাত যে খেলাফতের ব্যাপারে একমত হয়েছে, তাঁর উচিত তার আনুগত্য করা দল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে বিভেদ সৃষ্টি না করা। কিন্তু তিনি দীর্ঘ সময় হযরত জারীরকে হ্যঁ বা না, কোন উত্তরই দেননি। বরং দিচ্ছি দিচ্ছি করে সময় কাটাতে থাকেন। হযরত আমর ইবনুল আ’স-এর পরামর্শক্রমে তিনি ফায়সালা করেন যে, হযরত আলী (রাঃ)-কে হযরত ওসমান (রাঃ)-এর হত্যার জন্য দায়ী সাব্যস্ত করে তাঁর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা হবে। তাঁদের উভয়ের দৃঢ় বিশ্বাস ছিল যে, যুদ্ধের পরে হযরত আলী (রাঃ)-এর বাহিনী পুনরায় সংঘবদ্ধ হয়ে তাঁর পতাকা তলে লড়তে সক্ষম হবে না; শামবাসীদের মধ্যে হযরত মুআবিয়া (রাঃ)-এর পতাকাতলে যুদ্ধ করার জন্য যে মনোবল দেখা যায়, ইরাক সে মনোবল নিয়ে হযরত আলী( রাঃ)-এর সাহায্য করতে সক্ষম হবে না। [আত-তাবারী, ৩য় খন্ড, পৃষ্ঠা- ৫৬১। ইবনুল আসীর, ৩য় খন্ড, পৃষ্ঠা- ১৪১-১৪২। আল বেদায়া, ৭ম খন্ড, পৃষ্ঠা- ২৫৩।] হযরত মুআবিয়া (রাঃ) যখন টালবাহানা করছিলেন সে সময় হযরত জারীর ইবনে আবদুল্লাহ দামেস্কে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সাতে মিলিত হয়ে তাদেরকে এ কথা বলতে থাকেন যে, ওসমান (রাঃ) হত্যার সাথে হযরত আলী (রাঃ)-এর কোন সম্পর্ক নেই এবং এ ব্যাপারে তিনি দায়ীও নন। হযরত মুআবিয়া (রাঃ) এতে শংকিত হন, হযরত আলী (রাঃ)-ই হযরত ওসমান (রাঃ)-এর হত্যার জন্য দায়ী-এ মর্মে শামবাসীদের সামনে সাক্ষ্য দেয়ার নিমিত্ত কতিপয় সাক্ষী তৈরী করার জন্য তিনি এক ব্যক্তিকে নিয়োজিত করেন। কাজেই ঐ ব্যক্তি পাঁচ জন সাক্ষী সংগ্রহ করে আনে। তারা জনগণের সামনে সাক্ষ্য দেয় যে, হযরত আলী (রাঃ)-ই ওসমান (রাঃ)-কে হত্যা করেছেন। [আল-ইস্তীয়াব, ২য় খন্ড, পৃষ্ঠা- ৫৮৯।]

এরপর হযরত আলী (রাঃ) ইরাক থেকে এবং হযরত মুআবিয়া (রাঃ) শাম থেকে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করে পরস্পরের দিকে অগ্রসর হন এবং ফোরাতের পশ্চিম প্রান্তে ‘আর-রাক্কার নিকটে অবস্থিত ‘সিফফীন’ নামক স্থানে উভয়পক্ষ মুখোমুখী হয়। হযরত মুআবিয়া (রাঃ)-এর বাহিনী পূর্বেই ফোরাতের পানীর ওপর অধিকার প্রতিষ্ঠা করে বসে। তিনি প্রতিপক্ষ বাহিনীকে পানি ব্যবহারের অনুমতি দেননি। হযরত আলী (রাঃ)-এর সৈন্যরা যুদ্ধ করে তাদেরকে সেখান থেকে বেদখল করে। হযরত আলী (রাঃ) নিজের লোকদেরকে নির্দেশ দেন নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী পানি নিতে থাকো এবং অবশিষ্ট পানি থেকে প্রতিপক্ষ সৈন্যদলকে উপকৃত হতে দাও। [আত-তাবারী, ৩য় খন্ড, পৃষ্ঠা- ৫৬৮, ৫৬৯। ইবনুল আসীর, ৩য় খন্ড, পৃষ্ঠা- ১৪৫, ১৪৬। ইবনে খালদুন, দ্বিতীয় খন্ডের পরিশিষ্ট, পৃষ্ঠা- ১৭০।]

জিলহজ্জ মাসের প্রথম দিকে যথারীতি যুদ্ধ শুরু করার আগে হযরত আলী (রাঃ) হযরত মুআবিয়া (রাঃ)-এর নিকট প্রতিনিধি দল প্রেরণ করেন। কিন্তু তিনি জবাব দেনঃ আমার নিকট থেকে চলে যাও, আমার এবং তোমাদের মধ্যে তরবারী ব্যতীত কিছুই নেই। [ ইবনুল আসীর, ৩য় খন্ড, পৃষ্ঠা- ৪৬। ইবনে খালদুন, দ্বিতীয় খন্ডের পরিশিষ্ট, পৃষ্ঠা- ১৭০।]

কিছুকাল যুদ্ধ অব্যাহত রাখার পর হিজরী ৩৭ সালের মহররম মাসের শেষ পর্যন্ত তা মুলতবী রাখার চুক্তি সম্পাদিত হলে হযরত আলী (রঃ) হযরত আদী ইবনে হাতেম (রাঃ)-এর নেতৃত্বে পুনরায় একটি প্রতিনিধিদল প্রেরণ করেন। প্রতিনিধি দলটি হযরত মুআবিয়া (রাঃ)-কে বলেন যে, সকলেই হযরত আলী (রাঃ)-এর ব্যাপারে একমত; কেবল আপনি এবং আপনার সঙ্গীরাই তাঁর থেকে বিচ্ছিন্ন রয়েছেন। হযরত মুআবিয়া (রাঃ) জবাব দেনঃ হযরত ওসমান (রাঃ)-এর হত্যাকারীদেরকে যদি তিনি আমাদের হাতে সোপর্দ করেন, যাতে আমরা তাদেরকে হত্যা করতে পারি, তাহলে এর পরই আমরা তোমাদের কথা শুনবো এবং আনুগতৌ গ্রহন করে জামায়াতের অন্তর্ভূক্ত হবো। অতঃপর তিনি হযরত আলী (রাঃ)-এর নিকট একটি প্রতিনিধি দল পাঠান। এ দলের নেতা ছিলেন হাবীব ইবনে মাসলামা আল-ফিহরী। তিনি হযরত আলী (রাঃ)-কে বলেনঃ আপনি হযরত ওসমান (রাঃ)-কে হত্যা করেননি-এ যদি আপনার দাবী হয়ে থাকে, তবে যারা হত্যা করেছে তাদেরকে আমাদের হাতে সোপর্দ করুন। আমরা হযরত ওসমান (রাঃ)-এর রক্তের বদলে তাদেরকে হত্যা করবো। অতঃপর আপনি খেলাফতের পদে ইস্তফা দিন, যাতের মুসলমানরা পারস্পরিক পরামর্শক্রমে যার ব্যাপারে একমত হয়, তাকে খলীফা বানাতে পারে। [তাবারী, ৪র্থ খন্ড, পৃষ্ঠা- ৩, ৪। ইবনুল আসীর, ৩য় খন্ড, পৃষ্ঠা- ১৪৭, ১৪৮। আল বেদায়া, ৭ম খন্ড, পৃষ্ঠা- ২৫৭, ২৫৮। ইবনে খালদুন, দ্বিতীয় খন্ডের পরিশিষ্ট, পৃষ্ঠা- ১৭১।]

মহররম মাস শেষ হওয়ার পর হিজরী ৩৭ সালের সফর মাস থেকে চূড়ান্ত যুদ্ধ শুরু হয়। যুদ্ধের সূচনাতেই হযরত আলী (রাঃ) নিজের বাহিনীর মধ্যে ঘোষণা করেনঃ সাবধান। তারা আক্রমণ চালাবার আগে নিজেদের পক্ষ থেকে যুদ্ধের সূচনা করবে না। অতঃপর তোমরা তাদেরকে পরাজিত করলে কোন পলায়নকারীকে হত্যা করবে না, কোন আহত ব্যক্তির ওপর হাত তুলবে না, কাউকে নগ্ন করবে না, কোন নিহিত ব্যক্তির লাশ বিকৃত করবে না, কারো গৃহে প্রবেশ করবে না, তাদের অর্থ সম্পদ লুণ্ঠন করবে না, নারীরা তোমাদেরকে গালি দিলেও তাদের গায়ে হাত লাগাবে না। [তাবারী, ৪র্থ খন্ড, পৃষ্ঠা- ৬। ইবনুল আসীর, ৩য় খন্ড, পৃষ্ঠা- ১৪৯।]

এ যুদ্ধের সয় এমন একটি ঘটনা সংঘটিত হয়, যা স্পষ্টত প্রমাণ করে দেয় যে, পক্ষদ্বয়ের মধ্যে কে সত্যের ওপর আছে, আর কে মিথ্যার ওপর। ঘটনাটি ছিল এই যে, হযরত আম্মার ইবনে ইয়াসের-যিনি হযরত আলী (রাঃ)-এর সেনাবাহিনীতে ছিলেন-হযরত মুআবিয়া (রাঃ)-এর বাহিনীর সাথে যুদ্ধে শহীদ হন। ***************** একটি বিদ্রেহী দল তোমাকে হত্যা করবে- হযরত আম্মার সম্পর্কে নবী করীম (সঃ)-এর এ উক্তি সাহাবীদের মধ্যে বহুল পরিচিত এবং প্রসিদ্ধ ছিল। মুসনাদে আহমাদ, বুখারী, মুসলিম, তিরমিযী, নাসায়ী, তাবারানী, বায়হাকী, মুসনাদে আবুদাউদ তায়ালেসী ইত্যাকার হাদীসগ্রন্থে হযরত আবুসাঈদ খুদরী, আবুকাতাদা আনসারী, উম্মে সালমা, আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ, আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আ’স, আবু হুরায়রা ওসমান ইবনে আফফান, হুযায়ফা, আবু আইয়ুব আনসারী, আবুরাফে, খোযায়মা ইবনে সাবেত, আমর ইবনুল আ’স, আবুল ইউসর, আম্মার ইবনে ইয়াসের রাযিয়াল্লাহু আনহুম এবং আরও অনেক সাহাবী থেকে এ ধরনের রেওয়ায়াত বর্ণীত হয়েছে। ইবনে সাআদতাঁর তাবাকাত-এর কয়েক সনদে এ হাদীস উদ্ধৃত করেছেন। [ ইবনে সা’আদ, ৩য় খন্ড, পৃষ্ঠা- ২৫১, ২৫৩, ২৫৯।]

বিভিন্ন সাহাবা এবং তাবেয়ী-হযরত আলী (রাঃ) এবং মুআবিয়া (রাঃ)-এর যুদ্ধে যারা সন্ধিহান ছিলেন- এ যুদ্ধে হক-এর ওপর রয়েছেন আর কে বাতিল-এর ওপর এ কথা জানার জন্য তাঁরা হযরত আম্মর (রাঃ)-এর শাহাদাতকে প্রতীক হিসেবে গ্রহণ করেছেন। [ইবনে সাআদ, ৩য় খন্ড, পৃষ্ঠা- ২৫৩, ২৫৯, ২৬১। আত-তাবারী, ৪র্থ খন্ড, পৃষ্ঠা- ২৭। ইবনুল আসীর, ৩য় খন্ড, পৃষ্ঠা- ১৫৭, ১৬৫।]

আবুবকর আল-জাসসাস তার আহকামুল কুরআন গ্রন্থে লিখেছেনঃ

‘আলী ইবনে আবুতালেব (রাঃ) বিদ্রোহী দলের বিরুদ্ধে অস্ত্রের সাহায্যে যুদ্ধ করেন। তাঁর সাথে ছিলেন এমন সব বড় বড় সাহাবী এবং বদর যুদ্ধে অংশ গ্রহণকারীগণ যাঁদের মর্যাদা সবার জানা আছে। এ যুদ্ধে তিনি ‘হক’-এর ওপর ছিলেন। যে বিদ্রোহী দল তাঁর সাথে যুদ্ধ করেছে তারা ব্যতীত এ ব্যাপারে আর কেউ দ্বিমত পোষণ করে না। উপরন্ত নবী (সঃ) নিজে হযরত আম্মার (রাঃ)-কে বলে ছিলেন যে, একটি বিদ্রোহী দল তোমাকে হত্যা করবে। এটা এমন এক হাদীস, যা বিভিন্ন সূত্রের বর্ণিত হয়েছে এবং সাধারণ্যে সর্বসম্মতভাবে বিশুদ্ধ বলে গৃহীত হয়েছে। এমনকি, আবদুল্লা ইবনে আমর ইবনুল আ’স হযরত মুআবিয়া (রাঃ)-এর নিকট এ হাদীস বর্ণনা করলে তিনিও অস্বীকার করতে পরেননি। অবশ্য তিনি ব্যাখ্যা করে বলেছেন যে, আম্মারকে তারা হত্যা করেছে, যারা তাকে আমাদের বর্শার সামনে ঠেলে দিয়েছে। কুফা, বসরা, হেজায এবং শাম-এর বাসিন্দাগণ সবাই এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। [ আহকামুল ‘কুরআন, ৩য় খন্ড, পৃষ্ঠা- ৮৯২।]

ইবনে আবদুল বার আল-ইস্তীআব এ লিখেনঃ ‘বিদ্রোহী দল আম্মার ইবনে ইয়াসেরকে হত্যা করবে- নবী (সঃ) থেকে অসংখ্য হাদীসের মাধ্যমে এ কথা বর্ণিত হয়েছে। আর এ বর্ণনাটি বিশুদ্ধ হাদীসমূহের অন্যতম। [ আল-ইস্তীআব, ২য় খন্ড, পৃষ্ঠা- ৪২৪।]

হাফেজ ইবনে হাজার ‘আল-এসাবায়’ এ কথাই লিখেছেন। [ আল-এসাবা, ২য় খন্ড, পৃষ্ঠা- ৫০৬।] অন্যত্র তিনি লিখেছেনঃ ‘আম্মার হত্যার পর এ কথা স্পষ্ট হয়ে যায় যে, ‘হক’ হযরত আলী (রাঃ)-এর পক্ষে। আহলে সুন্নাত এ ব্যাপারে একমত। অথচ ইতিপূর্বে এ ব্যাপারে মতবিরোধ ছিল। [ আল-এসাবা, ২য় খন্ড, পৃষ্ঠা- ৫০২। তাহাযীবুত তাহযীব-এ ইবনে হাজার লিখেনঃ ****************** নবী (সঃ) হযরত আম্মারকে বলেছিলেন, বিদ্রোহী দল তোমাকে হত্যা করবে-এ হাদীস উপর্যুপুরী বর্ণনায় তাঁর থেকে বর্ণিত হয়েছে।]

হাফেয ইবনে কাসীর আল-বেদায়া ওয়ান নেহায়ায় হযরত আম্মার ইবনে ইয়াসের হত্যার ঘটনা উল্লেখ করে লিখেনঃ এ থেকে বিদ্রোহী দল কর্তৃক হযরত আম্মারের নিহত হবার যে খবর রাসূলুল্লাহ (সঃ) দিয়েছিলেন তার রহস্য উন্মেচিত হয়েছে, এ থকে এ কথাও স্পষ্ট হয়েছে যে, হযরত আলী (রাঃ) ‘হক’-এর ওপর আছেন আর হযরত মুআবিয়া (রাঃ) বিদ্রোহী। [আল-বেদায়া, ৭ম খন্ড, পৃষ্ঠা- ২৭০।]

জামাল যুদ্ধ থেকে হযরত যোবায়ের (রাঃ)- এর সরে দাঁড়াবার অন্যতম কারণ এও ছিল যে, নবী করীম (সঃ)-এর এ উক্তি তাঁর স্মরণ ছিল। তিনি দেখতে পান যে, হযরত আলী (রাঃ)-এর সেনাবাহিনীতে হযরত আম্মার ইবনে ইয়াসেরও রয়েছেন। [আল-বেদায়া, ৭ম খন্ড, পৃষ্ঠা- ২৪১। ইবনে খালদুন, ২য় খন্ডের পরিশিষ্ট, পৃষ্ঠা- ১৬২।]

কিন্তু হযরত আম্মারের শাহাদাতের খবর হযরত মুআবিয়া (রাঃ)-এর সেনাবাহিনীতে পৌঁছিলে এবং হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আ’স (রাঃ) তাঁর পিতা এবং হযরত মুআবিয়া (রাঃ) উভয়কে রাসূলুল্লাহ (সঃ)- এর বাণী স্মরণ করিয়ে দিলে হযরত মুআবিয়া (রাঃ) তৎক্ষণাৎ এর ব্যাখ্যা করে বলেনঃ ‘আমরা কি আম্মারকে হত্যা করেছি? তাঁকে তো সে-ই হত্যা করেছে, যে তাঁকে যুদ্ধ ক্ষেত্রে নিয়ে এসেছে। [আত-তাবারী, ৪র্থ খন্ড, পৃষ্ঠা- ২৯। ইবনুল আসীর, ৩য় খন্ড, পৃষ্ঠা- ১৫৮। আল-বেদায়া ওয়ান নেহায়া, ৭ম খন্ড, পৃষ্ঠা- ২৬৮, ২৬৯। হযরত মুআবিয়া (রাঃ)-এর এ ব্যাখ্যা এ ব্যাখ্যা সম্পর্কে আল্লামা ইবনে কাসীর বলেনঃ তিনি যে ব্যাখ্যা পেশ করেছেন, তা গ্রহণযোগ্য নয়। মোল্লা আলী কারী ফিকহে আকবর-এর ভাষ্যে এ বর্ণনা উল্লেখ করেন যে, তাঁর এ ব্যাখ্যা সম্পর্কে হযরত আলী জানতে পেরে বলেনঃ এ ধরনের ব্যাখ্যা থেকে এ কথাও তো বলা চলে যে, নবী (সঃ) নিজেই হযরত হামযা (রাঃ)-এর হত্যাকারী ছিলেন। – ফিকহে আকবর-এর ভাষ্য, পৃষ্ঠা-৭৯। দিল্লীর মুজতাবায়ী প্রেস সংস্করণ দ্রষ্টব্য।] অথচ নবী (সঃ) এ কথা বলেননি যে, বিদ্রোহী দল হযরত আম্মারকে যুদ্ধ ক্ষেত্রে নিয়ে আসবে; বরং তিনি বলেছিলেন যে, বিদ্রোহী দল তাঁকে হত্যা করবে এ কথা সুস্পষ্ট যে, তাঁকে হযরত মুআবিয়া (রাঃ)- এর দল হত্যা করেছে, হযরত আলী (রাঃ)- এর দল নয়।

হযরত আম্মার (রাঃ)- এর শাহাদাতের দ্বিতীয় দিন, ১০ই সফর তুমুল যুদ্ধ হয় হযরত মুআবিয়া (রাঃ)- এর সেনাবাহিনী পরাজয়ের দ্বারপ্রান্তে উপনীত হয়। এ সময় হযরত আমর ইবনুল আ’স (রাঃ) হযরত মুআবিয়া (রাঃ)-কে পরামর্শ দেনঃ এখন আমাদের সেনাবাহিনীর বর্শার অগ্রভাগে কুআন বেঁধে ঘোষণা করা উচিত ********************* আল-কুরআনই তোমাদের এবং আমাদের মধ্যে ফায়সালা করবে। হযরত আমর ইবনুল আ’স (রাঃ) নিজে এর স্বপক্ষে যুক্তি দেখান যে, এতে হযরত আলী (রাঃ)-এর বাহিনীর মধ্যে ফাটল সৃষ্টি হবে। এক দল বলবে, তা মেনে নেয়া হোক, আর এক দল বলবে, না, তা মানা যায় না। আমরা ঐক্যবদ্ধ থাকবো, আর তাদের মধ্যে অনৈক্য সৃষ্টি হবে। তারা মেনে নিলে আমরা হাতে সময় পেয়ে যাবো। [তাবারী, ৪র্থ খন্ড, পৃষ্ঠা- ৩৪। ইবনে সাআদ, ৪র্থ খন্ড, ২৫৫ পৃষ্ঠা। ইবনুল আসীর, ৩য় খন্ড, ১৬০ পৃষ্ঠা। আল-বেদায়া, ৭ম খন্ড, ২৭২ পৃষ্ঠা। ইবনে খালদুন, দ্বিতীয় খন্ডের পরিশিষ্ট, পৃষ্ঠা- ১৭৪।] এর স্পষ্ট অর্থ এই ছিল যে, এটা ছিল নিছক একটি সামরিক কৌশল। কুরআনকে ফায়সালাকারী হিসেবে গ্রহণ করা আদৌ এর লক্ষ্য ছিল না।

এ পরামর্শ অনুযায়ী মুআবিয়া (রাঃ)-এর সৈন্যবাহিনী কুরআনকে বর্শার অগ্রভাগে তুলে ধরে। এর ফলে হযরত ইবনুল আ’স (রাঃ) যা আশা করেছিলেন তাই হয়। হযরত আলী (রাঃ) ইরাকের লোকদেরকে হাযারো বুঝাতে চেষ্টা করেন যে, তোমরা এ চক্রান্তে পড়ো না, যুদ্ধকে চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছিলে দাও। কিন্তু তাদের মধ্যে অনৈক্য সৃষ্টি হয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত যুদ্ধ বন্ধ করে হযরত মুআবিয়া (রাঃ)-এর সাথে তাহকীম-এর চুক্তি করতে হযরত আলী (রাঃ) বাধ্য হন। হাকাম বা সালিস নিযুক্ত করার সময়ও এ অনৈক্য দেখা দেয়। হযরত মুআবিয়া (রাঃ) তাঁর পক্ষ থেকে হযরত আমর ইবনুল আ’স (রাঃ)-কে হাকাম নিযুক্ত করেন। হযরত আলী (রাঃ)-এর ইচ্ছা ছিল, তাঁর পক্ষ থেকে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ)-কে হাকাম নিযুক্ত করার। কিন্তু ইরাকের লোকেরা বলে উঠলো যে, তিনি তো আপনার চাচাত ভাই। আমরা নিরপেক্ষ লোক চাই। শেষ পর্যন্ত তাদের পীড়াপীড়িতে পড়ে হযরত আবু মূসা আশআরী (রাঃ)-কে হাকাম নিযুক্ত করতে বাধ্য হন। অথচ তাঁর ব্যাপারে তিনি নিজে নিশ্চিন্ত ছিলেন না। [তাবারী, ৪র্থ খন্ড, পৃষ্ঠা- ৩৪, ৩৫, ৩৬। ইবনুল আসীর, ৩য় খন্ড, পৃষ্ঠা- ১৬১, ১৬২। আল-বেদায়া, ৭ম খন্ড, পৃষ্ঠা- ২৭৫, ২৭৬। ইবনে খালদুন, দ্বিতীয় খন্ডের পরিশিষ্ট, পৃষ্ঠা- ১৭৫।]

 

ষষ্ঠ পর্যায়

এখন খেলাফতকে রাজতন্ত্রের দিকে অগ্রসর হওয়া থেকে বিরত রাখার সর্বশেষ সুযোগটি মাত্র অবশিষ্ট ছিল। তা ছিল-এই যে, যে চুক্তি অনুযায়ী সালিসদ্বয়কে ফায়সালা করার ইখতিয়ার দেয়া হয়েছিল তারা যথাযথ ফায়সালা করবেন। চুক্তির যে, বিবরণী ঐতিহাসিকরা উদ্ধৃত করেছেন, তাতে ফায়সালার ভিত্তি ছিল এইঃ

‘উভয় সালিস আল্লার কিতাব অনুসারে কাজ করবেন আর আল্লার কিতাবে যে ব্যাপারে সিদ্ধান্ত পাওয়া যাবে না সে ব্যাপারে সত্যাশ্রয়ী এবং ঐক্য সংহতকারী সুন্নাহ অনুযায়ী কাজ করবো। [তাবারী, ৪র্থ খন্ড, পৃষ্ঠা- ৩৮। আল-বেদায়া, ৭ম খন্ড, পৃষ্ঠা- ২৭৬। ইবনে খালদুন, দ্বিতীয় খন্ডের পরিশিষ্ট, পৃষ্ঠা- ১৭৫।]

কিন্তু ‘দুমাতুল জান্দাল’-এ উভয় সালিস যখন বসেন, তখন কুরআন ও সুন্নাহর দৃষ্টিতে এ বিরোধের মীমাংসা হতে পারে এ বিষয়টি আদতে আলোচনার অন্তর্ভূক্ত হয়নি। কুরআনে সুষ্ঠু নির্দেশ রয়েছে যে, মুসলমানদের দুটি দল পরস্পর সংঘর্ষে লিপ্ত হয়ে পড়লে বিরোধ মীমাংসার সঠিক উপায় হচ্ছে বিদ্রোহী দলকে সত্যপথে আসতে বাধ্য করা। [আল-হুজুরাতে ৯ আয়াত। আয়াতের শব্দুগলো এইঃ  **************** “মুমিনদের দুটি দল যদি পরস্পর সংঘর্ষে লিপ্ত হয়, তবে তাদের মধ্যে সন্ধি স্থাপন করো। একদল যদি অপর দলের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে, তাহলে বিদ্রোহী দল আল্লার নির্দেশের দিকে ফিরে না আসা পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করো।”] হযরত আম্মার-এর শাহাদাতের পর নবী (সঃ)-এর সুস্পষ্ট হাদীস দ্ব্যর্থহীনভাবে চিহ্নিত করে দিয়েছিল যে, এ বিরোধে বিদ্রোহী দল কোনটি। একজন আমীরের নেতৃত্ব ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর তাঁর আনুগত্য অস্বীকারকারীর বিরুদ্ধেও স্পষ্ট হাদীস বর্তমান ছিল। রক্তের প্রতিশোধ দাবী করারও স্পষ্ট বিধান বর্তমান ছিল শরীয়াতে। এ বিধানের আলোকে বিচার করা যেতো যে, হযরত মুআবিয়া (রাঃ) হযরত ওসমান (রাঃ)-এর খুন সম্পর্কে তাঁর দাবী সঠিক পন্থায় উত্থাপন করেছেন, না অন্যায় পন্থায়। সালিস চুক্তিতে উভয় সালিসের উপরে আসলে এ দায়িত্ব অর্পণই করা হয়নি যে, তাঁরা নিজেদের ইচ্ছা মতো খেলাফত সম্পর্কে একটি ফায়সালা করে দেবেন। বরং তাদের সামনে উভয় পক্ষের বিরোধ দ্ব্যর্থহীনভাবে তুলে ধরা হয় এবং প্রথমে আল্লার কিতাব অতঃপর রাসূলের ন্যায়ানুগ সুন্নাতের ভিত্তিতে এর মীমাংসা করার দায়িত্ব তাদের ওপর অর্পিত হয়। কিন্তু উভয় বুযুর্গ যখন আলোচনা শুরু করেন তখন এ সমস্ত বিষয় বেমালুম ভুলে গিয়ে খেলাফতের ব্যাপারে কিভাবে একটা সমাধানে পৌঁছানো যায় এ নিয়ে তারা মাথা ঘামাতে থাকেন।

হযরত আমর ইবনুল আ’স (রাঃ) হযরত আবু মূসা আশআরী (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করেন, আপনার মতে এ ব্যাপারে কোন পন্থা সমীচীন? জবাবে তিনি বলেনঃ ‘আমার মত এই যে, আমরা এ ব্যক্তিদ্বয়কে (আলী ো মুআবিয়া) বাদ দিয়ে খেলাফতের ব্যাপারটি মুসলমানদের পারস্পরিক পরামর্শের ওপর ছেড়ে দেই, যাতে তারা যাকে খুশী নির্বাচিত করতে পারে।’ হযরত আমর (রাঃ) বললেনঃ আপনি যথার্থ চিন্তা করেছেন। অতপর উভয়ে এক গণসমাবেশে উপস্থিত হন। এ গণসমাবেশে উভয় পক্ষ থেকে ৪শত করে সমর্থক এবং কয়েকজন নিরপেক্ষ বুযুর্গও উপস্থিত ছিলেন। হযরত আমর (রাঃ) হযরত আবু মূসা (রাঃ)-কে বলেনঃ ‘আমাদের উভয়ের ঐক্যমতে পৌছার কথাটা আপনি এদেরকে বলে দিন।’ হযরত আবদুল্রাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) হযরত আবু মূসা (রাঃ)-কে বলেনঃ ‘আপনারা উভয়ে ঐক্যমতে উপনীত হয়ে থাকলে হযরত আমর ইবনুল আ’স (রাঃ)-কে তা ঘোষণা করতে দিন। কারণ আমার আশংকা হচ্ছে, আপনি প্রতারিত হয়েছেন। হযরত আবু মূসা (রাঃ) বলেনঃ ‘আমি এ রকম কোন আশংকা করছি না। আমরা একমত হয়ে একটি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করছি।’ অতঃপর তিনি ভাষণ দিতে দাঁড়িয়ে ঘোষণা করেনঃ ‘আমি এবং আমার এ বন্ধু (অর্থাৎ আমর ইবনুল আ’স) একটি বিষয়ে একমত হয়েছি। তা এই যে, আমরা আলী (রাঃ) এবং মুআবিয়া (রাঃ)-কে বাদ দেবো- অতঃপর জনগণ পরামর্শক্রমে যাকে খুশী আমীর নিযুক্ত করবে। সুতরাং আমি আলী (রাঃ)- এবং মুআবিয়া (রাঃ)-কে বরখাস্ত করছি। এখন নিজেদের ব্যাপার আপনারা নিজেদের হাতে নিয়ে নিন এবং যাকে যোগ্য মনে করেন, আমীর নিযুক্ত করুন।’ অতঃপর হযরত আমর ইবনুল আ’স (রাঃ) দাঁড়িয়ে বললেনঃ ‘ইনি যা বলেছেন, আপনারা শুনলেন। তিনি নিজের লোক (হযরত আলী)-কে বরখাস্ত করেছেন। তাঁর মতে আমিও তাঁকে বরখাস্ত করছি এবং আমার নিজের লোক (হযরত মুআবিয়াকে) বহাল রাখছি। কারণ তিনি ওসমান ইবনে আফফান (রাঃ)-এর বন্ধু এবং তাঁর রক্তের দাবীদার। উপরন্তু তাঁর স্থলাভিষিক্ত হওয়ার জন্য সবচেয়ে যোগ্য ব্যক্তি।’ হযরত আবু মূসা (রাঃ) এ কথা শুনেই বলে ওঠেনঃ

********************

“তুমি এ কি করলে? আল্লাহ তোমাকে সুযোগ দেবেন না। তুমি প্রতারণা করেছো এবং চুক্তির বিরোধিতা করেছো।” হযরত সাআদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রাঃ) বলেনঃ আবু মূসা! তোমার জন্য আফসোস হয়। আমরের চক্রান্তের মুকাবিলায় তুমি অনেক দুর্বল প্রতিপন্ন হলে।’ হযরত আবু মূসা (রাঃ) জবাবে বলেনঃ এখন আমি কি করবো? তিনি আমার সাথে একটি বিষয় একমত হয়েছিলেন পরে তা থেকে মুক্ত করে নিলেন নিজেকে।’ হযরত আবদুর রহমান ইবনে আবুবকর (রাঃ) বলেনঃ “এর পূর্বে আবু মূসা মারা গেলে তা তার জন্য আতি উত্তম হতো।”

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রাঃ) বলেনঃ ‘দেখো, এ উম্মতের অবস্থা কোথায় গিয়ে পৌঁছেছে। এমন দু ব্যক্তির ওপর উম্মতের ভবিষ্যত ন্যস্ত করা হয়েছে, যাদের মধ্যে একজন কি করেছেন তার কোন পরওয়া করেন না, আর অন্যজন দুর্বল। [তাবারী, ৪র্থ খন্ড, পৃষ্ঠা- ৫১। ইবনে সাআদ, ৪র্থ খন্ড, পৃষ্ঠা-২৫৬, ২৫৭। ইবনুল আসীর, ৩য় খন্ড, পৃষ্ঠা- ১৬৮। আল বেদায়া, ৭ম খন্ড, পৃষ্ঠা- ২৮২, ২৮৩। ইবনে খালদুন, ২য় খন্ডের পরিশিষ্ট, পৃষ্ঠা- ১৭৮।]

হযরত আবু মূসা (রাঃ) তাঁর ভাষণে যা বলেছিলেন, সে সম্পর্কে যে উভয়ের মধ্যে ঐক্যমত হয়েছিল-এ বিষয়ে সেখানে উপস্থিত কোন ব্যক্তির সন্দেহ ছিল না। হযরত আমর ইবনুল আ’স (রাঃ) যা কিছু করেন, তা ছিল স্থিরকৃত সিদ্ধান্তের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। অতঃপর হযরত আমর ইবনুল আ’স (রাঃ) হযরত মুআবিয়া (রাঃ)-এর নিকট গিয়ে তাঁকে খেলাফতের সুসংবাদ দেন। হযরত আবু মূসা (রাঃ) লজ্জায় হযরত আলী (রাঃ)-কে মুখ দেখাতে না পেরে সরাসরী মক্কা চলে যান। [আল-বেদায়া, ৭ম খন্ড, পৃষ্ঠা- ২৮৩। ইবনে খালদুন, দ্বিতীয় খন্ডের পরিশিষ্ট, পৃষ্ঠা- ১৭৮।]

হাফেয ইবনে কাসীর হযরত আমর ইবনুল আ’স (রাঃ)-এর এ কার্যের ব্যাখ্যা দিয়ে লিখেছেনঃ তিনি জনগণকে সে মুহুর্তে নেতা বিহীন অবস্থায় ছেড়ে দেয়া সমীচীন মনে করেননি। কারণ তখন জনগণের মধ্যে যে মতানৈক্য বিরাজ করছিল, তা দেখে তাঁর আশংকা হয় যে, এর ফলে দীর্ঘস্থায়ী বিপর্যয় দেখা দেবে। তাই, তিনি প্রয়োজনের তাকীদে হযরত মুআবিয়া (রাঃ)-কে বহাল রাখেন। ইজতিহাদ নির্ভুলও হয়, ভুলও হয়। [আল-বেদায়া, ৭ম খন্ড, পৃষ্ঠা- ২৮৩।]

কিন্তু যে কোন ইনসাফপ্রিয় ব্যক্তি বর্শার মাথায় কুরআন বাঁধার প্রস্তাব থেকে শুরু করে এ পর্যন্তকার সমস্ত বিবরণী পাঠ করবেন, এসব কিছুকে ‘ইজতিহাদ’ বলে মেনে নেয়া তার পক্ষে বড়ই কঠিন হয়ে পড়বে। সন্দেহ নেই, আমাদের জন্য রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সকল সাহাবীই সম্মানার্হ। যে ব্যক্তি তাঁদের কোন ভুলের কারণে তাঁদের সকল খেদমত অস্বীকার করে বসে এবং তাঁদের উচ্চতর মর্যাদা বিস্মৃত হয়ে গালি দেয়ার পর্যায়ে নেমে আসে, সে সত্যিই শত-সহস্র বার যুলুম করে। কিন্তু তাঁদের কেউ কোন ভুল করলে নিছক সাহাবীদের মর্যাদার কারণে তাকে ‘ইজতিহাদ’ বলে আখ্যায়িত করার চেষ্টা করাটাও কম যুলুম ও অন্যায় নয়। বড় লোকদের ভুল যদি তাদের মহত্বের ফলে ইজতিহাদ হয়ে যায়, তবে পরবর্তীকালের লোকদেরকে কি বলে এমন সব ইজতিহাদ থেকে আমরা নিবৃত্ত করবো? ইজতিহাদের অর্থই তো হচ্ছে সত্য বিষয় অবগত হওয়ার জন্য সাধ্যানুযায়ী চেষ্টা করা। এ চেষ্টা অনিচ্ছাকৃতভাবে কোন ভুল হয়ে গেলেও সত্য জানার চেষ্টা অবশ্যি প্রতিদান লাভের অধিকারী হবে। কিন্তু জেনে শুনে সুপরিকল্পিত উপায়ে কোন ভুল করার নাম কিছুতেই ইজতিহাদ হতে পারে না। বস্তুত এ সকল ব্যাপারে বাড়াবাড়ি একান্তই বর্জনীয়। কোন ভুল কাজ নিছক সাহাবী হওয়ার ফলে মর্যাদাপূর্ণ হতে পারে না; বরং সাহাবীর মহান মর্যাদার ফলে সে ভুল আরও উৎকট হয়ে ওঠে। তবে সে ব্যাপারে মন্তব্যকারীকে অবশ্যই সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। ভুলকে ভুল মনে করা এবং ভুল বলা পর্যন্তই মন্তব্য সীমাবদ্ধ রাখতেহবে। আরও অগ্রসর হয়ে সাহাবীদের ব্যস্তিসত্তাকে সামগ্রিকভাবে অভিযুক্ত ও দোষারোপ করা যাবে না। নিঃসন্দেহে হযরত আমর ইবনুল আ’স (রাঃ) বিরাট মর্যাদা সম্পন্ন বুযুর্গ। তিনি ইসলামের বহু মূল্যবান খেদমত আঞ্জাম দিয়েছেন। কিন্তু তিনি এ দুটি ভুল কাজ করেছেন, যাকে ভুল না বলে গত্যন্তর নেই।

উভয় সালিসের মধ্যে কে কি করেছেন, সে আলোচনার প্রবৃত্ত না হয়েও এ কথা বলা চলে যে, দুমাতুল জানদালে যা কিছু ঘটেছে, তার সবটুকুই ছিল সালিসী চুক্তির সম্পূর্ণ পরিপন্থী। এভাবে নিঃসন্দেহে চুক্তির সীমালংঘন করা হয়েছিল। তাঁরা অন্যায়ভাবে এ কথা ধরে নিয়েছিলেন যে, হযরত আলী (রাঃ)-কে বরখাস্ত করার ইখতিয়ার তাঁদের রয়েছে। অথচ হযরত ওসমান (রাঃ)-এর শাহাদাতের পর তিনি যথারীতি আইনানুগ পন্থায় খলীফা নির্বাচিত হয়েছিলেন। সালিসী চুক্তির কোন শব্দের এমন অর্থ করা যায় না, যা থেকে বুঝা যায় যে, তাঁকে বরখাস্ত করার ইখতিয়ার তাদেরকে দেয়া হয়েছে। উপরন্তু তাঁরা এ কথাও অন্যায়ভাবে ধরে নিয়েছেন যে, হযরত মুআবিয়া (রাঃ) হযরত আলী (রাঃ)-এর বিরুদ্ধে খেলাফতের দাবী নিয়ে এগিয়ে এসেছেন। অথচ এ পর্যন্ত তিনি কেবল মাত্র হযরত ওসমান (রাঃ)- এর রক্তের দাবীদার ছিলেন, খেলাফতের দাবীদার ছিলেন না। সর্বোপরি তাদের এ ধারণাও ভুল ছিল যে, তাদেরকে খেলাফত সমস্যার সমাধানের জন্য নিযুক্ত করা হয়েছে। সালিসী চুক্তিতে এহেন ভ্রান্ত ধারণার কোন ভিত্তি ছিল না। এ কারণে হযরত আলী (রাঃ) তাঁদের ফায়সালা প্রত্যাখ্যান করেন এবং এক সমাবেশে বক্তৃতা প্রসঙ্গে বলেনঃ

‘শোন! তোমরা যে দুজনকে সালিস নিযুক্ত করেছিলে, তারা কুরআনের নির্দেশ প্রত্যাখ্যান করেছে। আল্লার নির্দেশ ব্যতিরেকেই তাদের সকলেই স্ব স্ব ধারণার অনুসরণ করেছে। তারা এমন ফায়সালা দিয়েছে, যা সুস্পষ্ট দলীল-প্রমাণ এবং অতীত রীতির ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত নয়। এ ফায়সালায় তাদের কেউই একমত হতে পারেনি। কেউই পারেনি কোন সিদ্ধান্তে উপনীত হতে। [তাবারী, ৪র্থ খন্ড, পৃষ্ঠা- ৫৭।]

অতঃপর হযরত আলী (রাঃ) কুফায় পৌঁছে পুনরায় শাম আক্রমণের প্রস্তুতি শুরু করেন। এ সময় তিনি যেসব ভাষণ দেন, তা থেকে স্পষ্ট জানা যায়, তিনি মিল্লাতের ওপর স্বৈরতন্ত্র আরোপিতা হওয়ার আশংকা কতো তীব্রভাবে অনুভব করেছিলেন এবং খেলাফতে রাশেদার ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখার জন্য কিভাবে আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছিলেন। এক ভাষণে তিনি বলেনঃ

‘আল্লার শপথ, এরা যদি তোমাদের শাসক হয়ে বসে, তাহলে তোমাদেরকে কাইজার এবং হেরাক্লিয়াসের ন্যায় শাসন করতে থাকবে। [ তাবারী, ৪র্থ খন্ড, পৃষ্ঠা- ৫৮। ইবনুল আসীর, ৩য় খন্ড, পৃষ্ঠা- ১৭১।]

অপর এক ভাষণে তিনি বলেনঃ যারা আল্লার বান্দাদেরকে নিজেদের গোলাপে পরিণত করার জন্য এবং স্বৈরাচারী শাসক হবার জন্য তোমাদের সাথে লড়ছে, তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য তোমরা প্রস্তুত হও। [তাবারী, ৪র্থ খন্ড, পৃষ্ঠা- ৫৯। ইবনুল আসীর, ৩য় খন্ড, পৃষ্ঠা- ১৭২।]

কিন্তু ইরাকের লোকেরা মনোবল হারিয়ে ফেলেছিল এবং অন্যদিকে খারেজিদের বিপর্যয় হযরত আলী (রাঃ)-এর জন্য এক নতুন মাথা ব্যাথার সৃষ্টি করে। এ ছাড়া হযরত মুআবিয়া (রাঃ) এবঙ হযরত আমর ইবনুল আ’স (রাঃ) এমন কৌশল অবলম্বন করেন, যার ফলে মিসর এবং উত্তর আফ্রিকার অধিকাংশ অঞ্চলও তাঁর হাতছাড়া হয়ে যায় এবং মুসলিম জাহান কার্যত দুটি সংঘর্ষশীল সরকারে বিভক্ত হয়ে পড়ে। অবশেষে হযরত আলী (রাঃ)-এর শাহাদাত (৪০ হিজরী) রমযান মাসের এবং হযরত হাসান (রাঃ)-এর সমঝোতা (৪১ হিজরী) ময়দানকে হযরত মুআবিয়া (রাঃ)-এর জন্য সম্পূর্ণ উন্মুক্ত করে দেয়। এরপর যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, তা দেখে যেসব লোক ইতিপূর্বে হযরত আলী (রাঃ) এবং তাঁর বিরোধীদের মধ্যেকার যুদ্ধকে নিছক ফেতনা বলে উল্লেখ করে নির্লিপ্ত ছিলেন, তাঁরাও ভালভাবে বুঝতে সক্ষম হন যে, হযরত আলী (রাঃ) কোন বিষয়টি প্রতিষ্ঠিত রাখার এবং উম্মতকে কোন পরিণতি থেকে বাঁচাবার জন্য প্রাণপাত করে আসছিলেন। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রাঃ) তাঁর জীবনের শেষ সময়ে বলেছিলেনঃ ‘আমি আলী (রাঃ)-এর সঙ্গে কেন যোগ দেইনি, এ জন্য যত অনুতাপ হয়েছে, তা আর কিছুর জন্য হয়নি।’ [ ইবনে সাআদ, ৪র্থ খন্ড, পৃষ্ঠা- ১৮৭। ইবনে আবদুল বার, আল-ইস্তীআব, ১ম খন্ড, পৃষ্ঠা- ৩০-৩৭।] ইবরাহীম নাখঈর বর্ণনায়ঃ ‘মাসরুক ইবনে আজদা’ হযরত আলী (রাঃ)-এর সাথে যোগ না দেয়ার জন্য তাওবা ও এস্তেগফার করেন। [আল-ইস্তীআব, ১ম খন্ড, পৃষ্ঠা- ৩০।] হযরত আলী (রাঃ)-এর বিরুদ্ধে যুদ্ধে হযরত মুআবিয়া (রাঃ)-এর পক্ষ অবলম্বন করার জন্য হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আ’স (রাঃ) সারা জীবন ভীষণ লজ্জিত ও অনুতপ্ত ছিলেন। [আল-ইস্তীআব, ১ম খন্ড, পৃষ্ঠা- ৩৭১।]

হযরত আলী (রাঃ) এ বিপর্যয় কালে যেভাবে কাজ করেছেন, তা একজন খলীফায়ে রাশেদের সম্পূর্ণ উপযোগী ছিল। কেবল একটি বিষয়ে এমন দেখা যায়, যার সমর্থন করা অত্যন্ত কঠিন মনে হয়। তা হচ্ছে, যুদ্ধের পর হযরত ওসমান (রাঃ)-এর হত্যাকারীদের ব্যাপারে তিনি নিজের দৃষ্টিভঙ্গী পরিবর্তন করেন। জামাল যুদ্ধের পূর্বপর্যন্ত তিনি তাদের প্রতি অসন্তুষ্ট ছিলেন। অনিচ্ছা সত্ত্বেও তাদেরকে সহ্য করতেন, তাদেরকে কাবু করার জন্য সুযোগের অপেক্ষায় ছিলেন। হযরত আয়েশা (রাঃ) এবং হযরত তালহা (রাঃ) ও যুবায়ের (রাঃ)- এর সাথে আলাপ আলোচনার জন্য তিনি যখন হযরত কা’কা’ ইবনে আমরকে প্রেরণ করেন, তখন তাঁর প্রতিনিধিত্ব করে কা’কা’ বলেছিলেনঃ ‘হযরত ওসমান (রাঃ)-এর হন্তাদের পাকড়াও করার ক্ষমতালাভের পূর্ব পর্যন্ত হযরত আলী (রাঃ) তাদের বিরুদ্ধে হস্ত উত্তোলন থেকে বিরত রয়েছেন। আপনারা বায়াত গ্রহণ করলে হযরত ওসমান (রাঃ)-এর খুনের প্রতিশোধ গ্রহণ সহজ হয়ে যাবে। [আল-বেদায়া, ৭ম খন্ড, পৃষ্ঠা- ২৩৭।] অতঃপর যুদ্ধের অব্যবহিত পূর্বে হযরত তালহা (রাঃ) এবং যুবায়ের (রাঃ)-এর সাথে তাঁর কথাবার্তা হয়েছে। তাতে হযরত তালহা (রাঃ) তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন যে, আপনি ওসমান (রাঃ)-এর হত্যার জন্য দায়ী। জবাবে তিনি বলেনঃ ****************** ওসমান হন্তাদের ওপর আল্লার অভিসম্পাত। [আল-বেদায়া, ৭ম খন্ড, পৃষ্ঠা- ২৪০।] কিন্তু হযরত ওসমান (রাঃ)-এর বিরুদ্ধে সন্ত্রাস সৃষ্টি করে অবশেষে তাঁকে হত্যার জন্য যারা দায়ী, অতঃপর এবং মুহাম্মদ ইবনে আবুবকর (রাঃ)-কে গবর্ণর পদে নিয়োগ করেন। অথচ ওসমান (রাঃ)-এর হত্যায় এদের যে ভূমিকা ছিল, তা সকলেরই জানা। হযরত আলী (রাঃ)-এর সমগ্র খেলাফত আমলে এ একটি কাজই আমরা এমন দেখতে পাই, যাকে ভুল না বলে উপায় নেই।

কেউ কেউ বলে থাকেন যে, হযরত ওসমান (রাঃ)-এর মতো হযরত আলী (রাঃ)-ও তাঁর অনেক আত্মীয়-স্বজনকে বড় বড় পদে নিয়োগ করেছেন। যেমন, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ), হযরত ওবায়দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ), হযরত কোসাম ইবনে আব্বাস (রাঃ) ইত্যাদি। কিন্তু এ যক্তি পেশ করার সময়তারা ভুলে যান যে, হযরত আলী (রাঃ) এমন এক পরিস্থিতিতে এ কাজ করেছিলেন, যখন উন্নতমানের যোগ্যতা সম্পন্ন ব্যক্তিদের একটি অংশ তাঁর সাথে সহযোগিতা করছিল না, অন্যদিকে অপর একটি অংশ বিরোধী শিবিরে যোগ দিয়েছিল এবং তৃতীয় অংশটি থেকেও প্রতিদিন লোকেরা বের হয়ে ভিন্ন দিকে চলে যাচ্ছিল। এ পরিস্থিতিতে তিনি এমন সব লোককে কাজে লাগাতে বাধ্য হন, যাদের ওপর তাঁর পূর্ণ আস্থা ছিল। হযরত ওসমান (রাঃ)-এর আমলের পরিস্থিতির সাথে এ পরিস্থিতির কোন মিল নেই। কারণ তিনি এমন এক সময় এ কাজ করেন, যখন উম্মাতের সমস্ত যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তির সম্পূর্ণ সহযোগিতা তিনি লাভ করেন। আত্মীয়-স্বজনের সাহায্য-সহযোগিতা গ্রহণে তিনি বাধ্য ছিলেন না।

 

শেষ পর্যায়

ক্ষমতার চাবিকাটি মুআবিয়া (রাঃ)-এর হস্তগত হওয়াই ছিল ইসলামী রাষ্ট্রের খেলাফত থেকে স্বৈরতান্ত্রিক রাজতন্ত্রের দিকে প্রত্যাবর্তনের অন্তবর্তীকালীন পর্যায়। দুরদৃষ্টি সম্পন্ন ব্যক্তিরা এ পর্যায়েই অনুধাবন করতে পেরেছিলেন যে, এখন তারা রাজতন্ত্রের স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থার সম্মুখীন। তাই দেখি, হযরত মুআবিয়া (রাঃ)-এর বায়আতের পর হযরত সাআদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রাঃ) তাঁর সঙ্গে মিলিত হয়ে ***************** রাজা। আপনার প্রতি সালাম বলে সম্বোধন করেন। হযরত মুআবিয়া (রাঃ) বলেনঃ আপনি আমীরুল মুমিনীন বললে কি অসুবিধা ছিল? জবাবে তিনি বলেনঃ আল্লার কসম, যে পন্থায় আপনি ক্ষমতা লাভ করেছেন, আমি সে পন্থায় কিছুতেই তা গ্রহণ করতাম না। [ইবনুল আসীর, ৩য় খন্ড, পৃষ্ঠা- ৪০৫। এ ব্যাপারে হযরত সাআদ (রাঃ) এর দৃষ্টিভঙ্গী কি ছিল, একটি ঘটনা থেকে তার ওপর আলোকপাত হয়। বিপর্যয় কালে একদা তাঁর ভ্রাতুষপুত্র হাশেম ইবনে ওতবা ইবনে আবি ওয়াক্কাস তাঁকে বলেনঃ আপনি খেলাফতের জন্য দাঁড়ালে অসংখ্য তরবারী আপনার সমর্থনের জন্য প্রস্তুত। জবাবে তিনি বলেনঃ এসব লক্ষ তরবারীর মধ্যে আমি কেবল একখানা তরবারী চাই, যা কাফেরের ওপর চলবে, চলবে না কোন মুসলমানের বিরুদ্ধে (আল-বেদায়া, ৮ম খন্ড, পৃষ্ঠা- ৭২।] হযরত মুআবিয়া (রাঃ) নিজেও একথা জানতেন। একবার তিনি নিজেই বলেছিলেনঃ **************** আমি মুসলমানদের মধ্যে প্রথম রাজা। [আল-ইস্তীআব, ১ম খন্ড, পৃষ্ঠা- ২৪৫। আল-বেদায়া ওয়ান নেহায়া, ৮ম খন্ড, পৃষ্ঠা- ১৩৫।] বরং হাফেজ ইবনে কাসীর-এর উক্তি অনুযায়ী তাঁকে খলীফা না বলে বাদশাহ বলাই সুন্নত। কারণ, মহানবী (সঃ) ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেনঃ ‘আমার পর খেলাফত ৩০ বৎসর থাকবে, অতঃপর বাদশাহীর আগমন হবে।’ হিজরী ৪১ সালের রবিউল আউয়াল মাসে হযরত মুআবিয়া (রাঃ)-এর পক্ষে হযরত হাসান (রাঃ)-এর খেলাফত ত্যাগের মাধ্যমে এ মেয়াদ সমাপ্ত হয়েছে। [আল-বেদায়া, ৮ম খন্ড, পৃষ্ঠা- ১৬।]

এখন খেলাফত আলঅ মিনহাজিন নবুয়াত (মহানবী প্রদর্শিত পথে খেলাফত) বহাল করার একটি মাত্র উপায়ই অবশিষ্ট ছিল। তা ছিল হযরত মুআবিয়া (রাঃ) তাঁর অবর্তমানে কাউকে এ পদে নিয়োগ করার ভার মুসলমানদের পারস্পরিক পরামর্শের ওপর ছেড়ে দিতেন; অথবা বিরোধ নিরসনের উদ্দেশ্যে তাঁর জীবদ্দশায়ই স্থলাভিষিক্তের ব্যাপারটি চূড়ান্ত করা প্রয়োজনীয় মনে করলে মুসলমানদের সৎ ও ইসলামী জ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তিদের সমবেত করে উম্মতের মধ্য থেকে যোগ্যতম ব্যক্তিকে বাছাই করার স্বাধীনতা ক্ষমতা দান করতেন। কিন্তু স্বীয় পুত্র ইয়াজীদের স্বপক্ষে ভয়-ভীতি ও লোভ-লালসা দেখিয়ে বায়আত গ্রহণ করে তিনি এ সম্ভাবনারও সমাপ্তি ঘটালেন।

হযরত মুগীরা ইবনে শো’বা (রাঃ) এ প্রস্তাবের উদ্ভাবক। হযরত মুআবিয়া (রাঃ) তাঁকে কুফার গবর্ণরে পদ থেকে বরখাস্ত করার কথা চিন্তা করছিলেন। তিনি এ বিষয়ে অবহিত হলেন। তৎক্ষণাৎ কুফা থেকে দামেশকে পৌছে ইয়াজিদের সাথে সাক্ষাৎ করে বলেনঃ ‘শীর্ষ স্থানীয় সাহাবী এবং কুরাইশের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছেন। আমি বুঝতে পারছি না আমীরুল মুমিনীন তোমার পক্ষে বায়আত গ্রহণের কেন বিলম্ব করছেন।’ ইয়াজীদ তাঁর পিতার সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা করেন। তিনি হযরত মুগীরা (রাঃ)-কে ডেকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি ইয়াজিদকে কি বলেছো? হযরত মুগীরা (রাঃ) জবাব দেনঃ ‘আমিরুল মুমিনীন। হযরত ওসমান (রাঃ)-এর হত্যার পর যতো মতবিরোধ এবং খুন-খারাবী হয়েছে, তা আপনি নিজে প্রত্যক্ষ করেছেন। কাজেই এখন আপনার জীবদ্দশায়ই ইয়াজীদকে স্থলাভিষিক্ত করে বায়আত গ্রহণ করাই আপনার জন্য উত্তম। ফলে আল্লাহ না করুন যদি আপনার কখনো কিছু হয়ে যায়, তাহলে অন্তত মতবিরোধ দেখা দেবে না।’ হযরত মুআবিয়া (রাঃ) জিজ্ঞেস করলেনঃ ‘এ কাজ সমাপ্ত করার দায়িত্ব কে নেবে? জবাবে তিনি বললেনঃ আমি কুফারবাসীদের সামলাবো; আর যিয়াদ বসরাবাসীদেরকে। এরপর বিরোধিতা করার আর কেউ থাকবে না।’ এ কথা বলে হযরত মুগীরা (রাঃ) কুফা গমন করেন এবং দশজন লোককে ৩০ হাযার দেরহাম দিয়ে একটি প্রতিনিধি দলের আকারে হযরত মুআবিয়ার নিকট গমন করে ইয়াজীদের স্থলাভিষিক্তের জন্য তাঁকে বলতে সম্মত করেন। হযরত মুগীরা (রাঃ)-এর পুত্র মুসা ইবনে মুগীরার নেতৃত্বে এ প্রতিনিধি দল দামেস্কে গমন করে তাদের দায়িত্ব সম্পন্ন করে। পরে হযরত মুআবিয়া (রাঃ) মুসাকে একান্তে ডেকে জিজ্ঞেস করেনঃ ‘তোমার পিতা এদের নিকট থেকে কত মূল্যে এদের ধর্ম ক্রয় করেছেন? তিনি বললেন ৩০ হাযার দিরহামের বিনিময়ে।হযরত মুআবিয়া (রাঃ) বলেনঃ তাহলে তো এদের ধর্ম এদের দৃষ্টিতে নিতান্ত নগন্য। [ইবনুল আসীর, ৩য় খন্ড, পৃষ্ঠা- ২৪৯। আল-বেদায়া, ৮ম খন্ড, পৃষ্ঠা- ৭৯ এবং ইবনে খালদুন, ৩য় খন্ড, পৃষ্ঠা- ১৫-১৬ তে এঘটনার অংশ বিশেষের উল্লেখ আছে।]

অতঃপর হযরত মুআবিয়া (রাঃ) বসরার গবর্ণর যিয়াদকে লিখেন, এ ব্যাপারে তোমার মত কি? তিনি ওবায়েদ ইবনে কাআব আন নুমাইরকে ডেকে বলেন, আমিরুল মুমিনীন এ ব্যাপারে আমাকে লিখেছেন। আমার মতে ইয়াজীদের মধ্যে অনেকগুলো দুর্বলতা রয়েছে। তিনি দুর্বলতাগুলো উল্লেখ করেন। অতঃপর বলেন, তুমি আমীরুল মুমিনীনের কাছে গিয়ে বলো যে, এ ব্যাপারে যেন তাড়াহুড়ো না করা হয়। ওবায়েদ বলেন, আপনি হযরত মুআবিয়া (রাঃ)-এর মতামত নষ্ট করার চেষ্টা করবেন না। আমি গিয়ে ইয়াজীদকে বলবো যে, আমীরুল মুমিনীন এ ব্যাপারে আমীর যিয়াদের পরামর্শ চেয়েছেন। তিনি মনে করেন, জনগণ এ প্রস্তাবের বিরোধিতা করবে। কারণ, তোমার কোন কোন আচার-আচরণ জনগণ পসন্দ করে না। তাই আমীর যিয়াদের পরামর্শ এই যে, তমি এ সব বিষয় সংশোধন করে নাও, যাতে কাজটি ঠিকভাবে সম্পন্ন হতে পারে। যিয়াদ এ মত পসন্দ করেন। ওবায়েদ দামেস্ক গমন করে এক দিকে ইয়াজীদকে তাঁর ব্যক্তিগত আচার-আচরণ সংশোধনের পরামর্শ দেন আর অপর দিকে হযরত মুআবিয়া (রাঃ)-কে বলেন, আপনি এ ব্যাপারে তাড়াহুড়ো করবেন না। [আত-তাবারী, ৪র্থ খন্ড, পৃষ্ঠা- ২২৪, ২২৫। ইবনুল আসীর, ৩য় খন্ড, পৃষ্ঠা- ২৪৯-২৫০। আল-বেদায়া, ৮ম খন্ড, পৃষ্ঠা- ৭৯।] ঐতিহাসিকরা বলেন, এরপর ইয়াজীদ তাঁর বহু আচরণ সংশোধন করে নেন, যা লোকেরা আপত্তিকর মনে করতো। কিন্তু এ বিবরণ থেকে দুটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে যায়। একঃ ইয়াজীদের স্থলাভিষিক্তের প্রাথমিক আন্দোলন কোন সুষ্ঠু ভাবধারার ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল না। বরং একজন বুযুর্গব্যক্তি তাঁর ব্যক্তিগত স্বার্থে অপর বুযুর্গের স্বার্থকে চাঙ্গা করে এ প্রস্তাবের জন্ম দিয়েছিলেন। এভাবে তাঁরা উম্মাতে মুহাম্মদীকে কোন পথে ঠেলে দিচ্ছেন, তা কোন বুযুর্গই চিন্তা করেননি। দুইঃ ইয়াজীদ নিজে এমন মর্যাদা সম্পন্ন ব্যক্তি ছিলেন না যে মুআবিয়া (রাঃ)-এর পুত্র হবার বিষয়টি বাদ দিলে কেউ এ কথা বলতে পারেন যে, হযরত মুআবিয়া (রাঃ) এর পরে উম্মতের নেতৃত্বের জন্য তিনি যোগ্যতম ব্যক্তি ছিলেন।

যিয়াদের মৃত্যুর (৫০ হিজরী) পর হযরত মুআবিয়া (রাঃ) ইয়াজীদকে উত্তরাধিকারী মনোনীত করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে প্রভাবশালী লোকদের সমর্থন লাভের চেষ্টা শুরু করেন। এ প্রসঙ্গে তিনি হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রাঃ)-এর নিকট এক লক্ষ দেরহাম পাঠিয়ে ইয়াজীদের বায়আতের জন্য তাঁকে সম্মত করাবার চেষ্টা করেন। তিনি বলেনঃ ‘ওহো, এ উদ্দেশ্যে আমার জন্য এ টাকা পাঠান হয়েছে। তা হলে তো আমার দ্বীন আমার জন্য খুবই সস্তা।’ এ বলে তিনি টাকা গ্রহণ করতে অস্বীকার করেন। [ইবনুল আসীর, ৩য় খন্ড, পৃষ্ঠা- ২৫০। আল-বেদায়া, ৮ম খন্ড, পৃষ্ঠা- ৮৯।]

এরপর হযরত মুআবিয়া (রাঃ) মদীনার গবর্ণর মারওয়ান ইবনুল হাকামকে লিখেনঃ ‘আমি বৃদ্ধ হয়ে পড়িছি। আমার জীবদ্দশায়ই কাউকে স্থলাভিষিক্ত করে যেতে চাই। ………….স্থলাভিষিক্ত মনোনয়নের ব্যাপারে জনগণের মতামত জিজ্ঞেস করো।’ মারওয়ান বিষয়টি মদীনাবাসীদের সামনে উত্থাপন করেন। সকলেই বলেন, এটা একান্ত সমীচীন। এরপর হযরত মুআবিয়া (রাঃ) আবার মারওয়ানকে লিখেন, ‘আমি স্থলাভিষিক্তির জন্য ইয়াজীদকে মনোনীত করেছি।’ মারওয়ান পুনরায় বিষয়টি মদীনাবাসীদের সামনে উত্থাপন করে মসজিদে নববীতে ভাষণ দান করেন। তিনি বলেনঃ ‘আমীরুল মুমিনীন তোমাদের জন্য যোগ্য ব্যক্তি সন্ধান করার ব্যাপারে কোন ত্রুটি করেননি। তিনি নিজে পুত্র ইয়াজীদকে তার স্থলাভিষিক্ত করেছেন। এটা একটা চমৎকার সিদ্ধান্ত। আল্লাহজ তাআলা তাঁকে এ সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা দিয়েছেন। তিনি নিজ পুত্রকে স্থলাভিষিক্ত করেছেন, এটা কোন নতুন কথা নয়। আবুবকর (রাঃ) এবং ওমর (রাঃ)-ও স্থলাভিষিক্ত মনোনীত করেছিলেন।’ এতে হযরত আবদুর রহমান ইবনে আবুবকর উঠে দাঁড়িয়ে বলেনঃ ‘মারওয়ান! তুমি মিথ্যা বলেছো। আর মিথ্যা বলেছে মুআবিয়াও। তোমরা কখনো উম্মাতে মুহাম্মদীয়ার কল্যাণের কথা চিন্তা করোনি। তোমরা একে ‘কায়সারতন্ত্রে’ রূপান্তিরত করতে চাও। একজন কায়সর মারা গেলে তার পুত্র তার স্থান দখল করে। এটা আবুবকর ও ওমরের নীতি নয়। তাঁরা আপন সন্তানকে স্থলাভিষিক্ত করেননি।’ মারওয়ান বলেনঃ ‘ধরো একে’। এ ব্যক্তি সম্পর্কেই তো কুরআনে বলা হয়েছেঃ

****************

(যে ব্যক্তি তার মাতা-পিতাকে বলেছেঃ দুঃখ তোমাদের জন্য।) হযরত আবুদর রহমান (রাঃ) পলায়ন করে হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর হুজরায় আশ্রয় গ্রহণ করেন। হযরত আয়েশা (রাঃ) চীৎকার করে বলেনঃ ‘মিথ্যা বলেছে মারওয়ান। আমাদের খান্দানের কারো প্রসঙ্গে এ আয়াত অবতীর্ণ হয়নি। বরং যার প্রসঙ্গে এ আয়াত অবতীর্ণ হয়েছে, আমি ইচ্ছা করলে তার নাম বলতে পারি। অবশ্য মারওয়ান যখন পিতার ঔরসে, তখন রাসুলুল্লাহ (সঃ) তাঁর পিতার ওপর লানৎ বর্ষণ করেন।’ মজলিসে উপস্থিত ব্যক্তিদের মধ্যে হযরত আবদুর রহমান ইবনে আবুবকর (রাঃ)-এর মতো হযরত হুসাইন ইবনে আলী (রাঃ), হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রাঃ) এবং হযরত আবদুল্লাহ ইবনে যুবায়ের (রাঃ)-ও ইয়াজীদের স্থলাভিষিক্ততা মেনে নিতে অস্বীকার করেন। [বুখারী শরীফে সুরায়ে আহকাফের তাফসীরে এ ঘটনার সংক্ষিপ্ত আলোচনা করা হয়েছে। হাফেয ইবনে হাজার ফতহুল বারীতে নাসায়ী, ইসমাঈলী, ইবনুল মুনযের, আবু ইয়া’লা এবং ইবনে আবী হাতেম হতে এ ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছেন। হাফেয ইবনে কাসীরও তাঁর তাফসীরে ইবনে আবী হাতেম এবং নাসায়ীর উদ্ধৃতি দিয়ে এর আনুসাঙ্গিক বিবরণ উল্লেখ করেছেন। আরও বিস্তারিত বিবরণের জন্য আল-ইস্তীআব, ২য় খন্ড, পৃষ্ঠা- ৩৯৩। আল-বেদায়া, ৮ম খন্ড, পৃষ্ঠা- ৮৯ এবং ইবনুল আসীর, ৩য় খন্ড, পৃষ্ঠা- ২৫০। দেখুন। ইবনুল আসীর লিখেছেনঃ কোন কোন বর্ণনা মতে হিজরী ৫৩ সালে হযরত আবদুর রহমান ইবনে আবুবকর ইন্তেকাল করেন। এটা সত্য হলে তখন তিনি উপস্থিত ছিলেন না।’ কিন্তু নির্ভরযোগ্য হাদীসের বর্ণনা এর বিপক্ষে। হাফেয ইবনে কাসীর আল-বেদায়ায় লিখেছেন, হিজরী ৫৮ সালে তার ইন্তেকাল হয়েছৈ।]

এ সময়ে হযরত মুআবিয়া (রাঃ) বিভিন্ন অঞ্চলের প্রতিনিধিদের তলব করে বিষয়টি তাদের সামনে উত্থাপন করেন। জবাবে সকলেই তোষামোদমূলক বক্তব্য পেশ করে। কিন্তু হযরত আহনাফ ইবনে কায়েস নীরব থাকেন। হযরত মুআবিয়া (রাঃ) জিজ্ঞেস করেনঃ ‘হে আবু, বাহর, তোমার কি মত?’ তিনি বলেনঃ ‘সত্য বললে আপনার ভয়, আর মিথ্যা বললে আল্লার ভয়। আমীরুল মুমিনীন, আপনি ইয়াজীদের দিন-রাত্রির চলাফেরা ওঠা-বসা, তার ভিতর-বাহির সবকিছু সম্পর্কে ভালভাবেই জানেন। আল্লাহ এবং এ উম্মতের জন্য সত্যিই তাকে পসন্দ করে থাকলে এ ব্যাপারে আর কারো পরামর্শ নেবেন না। আর যদি তাকে এর বিপরীত মনে করে থাকেন, তাহলে আখেরাতের পথে পাড়ি দেবার আগে দুনিয়া তার হাতে দিয়ে যাবেন না। আর বাকী রইলো আমাদের ব্যাপার; যা কিছু নির্দেশ দেয়অহয়, তা শোনা এবং মেনে নেয়াইতো আমাদের কাজ।’ [ইবনুল আসীর, ৩য় খন্ড, পৃষ্ঠা- ২৫০-২৫১। আল-বেদায়া, ৮ম খন্ড, পৃষ্ঠা- ৮০।]

ইরাক, শাম এবং অন্যান্য এলাকা থেকে বায়আত গ্রহণ করে হযরত মুআবিয়া (রাঃ) হেজায গমনকরেন। কারণ, হেজাযের ব্যাপারটি ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। মুসলিম জাহানের যে সকল প্রভাবশালী ব্যক্তির পক্ষ থেকে বিরোধিতার আশংকা ছিল, তাঁরা সকলেই ছিলেন সেখানে। মদীনার বাইরে থেকেহযরত হুসাইন (রাঃ, হযরত ইবনে যুবায়ের (রাঃ), হযরত ওমর (রাঃ) এবং হযরত আবদুর রহমান ইবনে আবুবকর (রাঃ) তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করেন। হযরত মুআবিয়া (রাঃ) তাদের সাথে এমন কঠোর আচরণ করেন যে, তাঁরা শহর ত্যাগ করে মক্কা চলে যান। এভাবে মদীনার ব্যাপারটি সহজ হয়ে যায়। এরপর তিনি মক্কা গমন করে ব্যক্তি চতুষ্টয়কে শহরের বাইরে ডেকে এনে তাঁদের সঙ্গে মিলিত হন। মদীনার অদুরে তাঁদের সাথে যে আচরণ করেছিলেন এবারের আচরণ ছিল তা থেকে ভিন্ন। তাদের প্রতি বিরাট অনুগ্রহ করেন, তাঁদেরকে সাথে করে শহরে প্রবেশ করেন। অতঃপর তাঁদেরকে একান্তে ডেকে ইয়াজীদের বায়আতে তাদেরকে রাযী করাবার চেষ্টা করেন। হযরত আবুদল্লাহ ইবনে যুবায়ের (রাঃ) জবাবে বলেনঃ ‘আপনি তিনটি কাজের যে কোন একটি করুন। হয় নবী করীম (সঃ)-এর মতো কাউকে স্থলাভিষিক্ত-ই করবেন না জনগণ নিজেরাই কাউকে খলীফা বানাবে, যেমন বানিয়েছিল হযরত আবুবকর (রাঃ)-কে। অথবা আবুবকর (রাঃ) যে পন্থা অবলম্বন করেছিলেন সে পন্থা অবলম্বন করুন। তিনি স্থলাভিষিক্তের জন্য হযরত ওমর (রাঃ)-এর মতো ব্যক্তিকে মনোনীত করেছিলেন, যাঁর সাথে তাঁর দুরতম কোন আত্মীয়তার সম্পর্কও ছিল না। অথবা হযরত ওমর (রাঃ)-এর পন্থা অবলম্বন করুন। তিনি ৬ ব্যক্তির পরামর্শ সভার প্রস্তাব দেন। এ পরামর্শ সভায় তাঁর সন্তানদের কেউ ছিলেন না।’ হযরত মুআবিয়া (রাঃ) অবশিষ্ট ব্যক্তিদেরকে জিজ্ঞেস করেনঃ ‘আপনারা কি বলেন?’ তাঁরা বলেনঃ ‘ইবনে যুবায়ের (রাঃ) যা বলেছেন, আমাদের বক্তব্যও তাই।’ এরপর হযরত মুআবিয়া (রাঃ) বলেনঃ এতক্ষণ পর্যন্ত আমি তোমাদেরকে ক্ষমা করে এসেছি। এবার আমি আল্লার কসম করে চিলীছ, ‘আমার কথার জবাবে তোমাদের কেউ যদি একটি কথাও বলে, তাবে তার মুখ থেকে পরবর্তী শব্দটি প্রকাশ করার অবকাশ দেয়া হবে না। সবার আগে তার মাথায় তরবারী পড়বে।’ অতঃপর তাঁর দেহরক্ষী বাহিনীর প্রধান কর্মকর্তাকে ডেকে নির্দেশ দেনঃ ‘এদের প্রত্যেকের জন্য একজন লোক নিয়োগ করে তাকে বলে দাও যে, এদের কেউ আমার মতের পক্ষে বা বিপক্ষে মুখ খুললে তার মস্তক যেন উড়িয়ে দেয়া হয়।’ তারপ তিনি তাঁদেরকে নিয়ে মসজিদে গমন করে ঘোষণা করেনঃ ‘ এরা মুসলমানদের স্থলাভিষিক্তে সন্তুষ্ট এবং এঁরা বায়আত (আনুগত্যের শপথ) করেছেন। সুতরাং তোমরাও বায়আত করো।’ এক্ষেত্রে লোকদের পক্ষে অস্বীকার করার কোন প্রশ্নই ছিল না। কাজেই মক্কাবাসীরও সবাই বায়আত করে। [ইবনুল আসীর, ৩য় খন্ড, পৃষ্ঠা- ২৫২।]

এমনি করে খেলাফতে রাশেদার চূড়ান্ত পরিসমাপ্তি ঘটে। খেলাফতের স্থান দখল করে রাজকীয় বংশধারা (,,,,,,,,)। তারপর থেকে আজ পর্যন্ত মুসলিম জনতার ভাগ্যে তাদের ইপ্সিত খেলাফত আর কোন দিন জোটেনি। হযরত মুআবিয়া (রাঃ) যথার্থই বিপুল গুণের অধিকারী ছিলেন। তাঁর সাহাবী হওয়ার মর্যাদাও অতীব সম্মানার্হ তিনি মুসিলিম জাহানকে পুনরায় এক পতাকাতলে সমবেত করেন এবং বিশ্বে ইসলামের বিজয়ের গতি পূর্বের চাইতেও দ্রুত করেন। তাঁর এসব খেদমতও অনস্বীকার্য। যে ব্যক্তি তাঁকে গালাগালি করে, সে নিঃসন্দেহে বাড়াবাড়ি। করে। কিন্তু তাঁর অন্যায় কাজকে অন্যায়ই বলতে হবে। তাঁর অন্যায় কাজকে ন্যায় বলার অর্থ হবে, আমরা আমাদের ন্যায়-অন্যায়ের মানদণ্ডকেই আশংকার মুখে ঠেলে দিচ্ছি।

Top







লেটেস্ট প্রবন্ধ