ইসলামী দাওয়াত ও কর্মনীতি

চলমান পেজের সূচীপত্র




ইসলামী দাওয়াত ও কর্মনীতি

  স্ক্যান কপি ডাউনলোড

 

[পুস্তিকাটি মূলত ১৯৪৫ ইংরেজী সনের ১৯ শে এপ্রিল দারুল ইসলাম পাঠানকোটে অনুষ্ঠিত জামায়াতে ইসলামীর বার্ষিক সম্মেলনে প্রদত্ত তৎকালীন আমীরে জামায়াতে সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদীর ভাষণ]

আমাদের এই শূষ্ক, নীরস ও স্বাদহীন আন্দোলন শেষ পর্যন্ত লোকের মনে আশাতীত কৌতুহল এবং উৎসাহের সৃস্টি করিতে সমর্থ হইয়াছে দেখিয়া আমরা আল্লাহ তা’আলার লাখ লাখ শুকরিয়া আদায় করিতেছি।

বস্তুত আমরা যে দাওয়াত লইয়া উঠিয়াছি, বর্তমান দুনিয়ার আন্দোলনের বাজারে উহা অপেক্ষা অচল পণ্য বোধ হয় আর একটি ও নাই। উপরন্তু, আমরা যে কর্মনীত গ্রহণ করিয়াছি, তাহাতেও আন্দোলনকে তীব্র গতিতে সম্প্রসারিত করার এবং জনগণকে উহার দিকে আকৃষ্ট করিয়া তুলিবার জন্য বর্তমানকালে সাধারণত যে সব উপায় -উপকরণ গ্রহণ করা হয়, তাহার একটিও বর্তমান নাই। সভার পর সভা করা, মিছিল বাহির করা, রকমারি শ্লোগান দ্বারা আকাশ-বাতাস মুখরিত করা, পতাকা উত্তোলন করা, গরম গরম বক্তৃতা দান প্রভৃতি কোন একটি জিনিসও আমাদের কর্মনীতিতে স্থান পায় নাই। [ঐ সময় একদিকে কংগ্রেসের অখণ্ড ভারত আন্দোলন ও অপরদিকে মুসলিম লীগের ভারত বিভাগ করিয়া পাকিস্তান কায়েমের আন্দোলনের প্রতিযোগিতা তীব্র আকার ধারন করে। ঐ সময় রাজনৈতিক হৈ-হাঙ্গামায় জামায়াত শরীক না হইয়া নীরবে দাওয়াত ও সংগঠনে আত্মনিয়োগ করে। তাই জামায়াত তখন মিছিল ও অন্যান্য রাজনৈতিক তৎপরতা শুরু করে নাই।] কিন্তু এতদসত্ত্বেও লক্ষ্য করেতেছি এবং ইহা দেখিয়া খোদার শোকরে হৃদয় অবনত হইয়া আসে যে, ধীরে ধীরে বহু সংখ্যক লোক আমাদের এই দাওয়াতের দিকে আকৃষ্ট হইতেছে, আমাদের এই নীরস সম্মেলনসমূহের দূরবর্তী স্থান হইতে দলে দলে লোক যোগদান করিতেছে। আমাদের দৃষ্টিতে লোকদের আকর্ষণ নিশ্চিত সত্যের স্বাভাবিক আকর্ষণ ছাড়া আর কিছুই নহে। কারণ আমাদের নিকট প্রকৃত সত্য ভিন্ন লোকদের আকর্ষণ করিবার আর কোন জিনিসই নাই।

Top

সম্মেলনের উদ্দেশ্য

বস্তুত কোন প্রদর্শর্নী কিংবা আলোড়ন সৃষ্টি করিয়া লোকদেরকে নিজেদের দিকে আকৃষ্ট করা আমাদের সম্মেলনসমূহের কখনই উদ্দেশ্য নহে। এই সম্মেলনের মারফতে আমাদের সদস্যগণ পরস্পর পরিচিত ও সংঘবদ্ধ হইবে, তাহাদের মধ্যে কোনরূপ অপরিচিতির ব্যবধান থাকিবে না, পরস্পর গভীরভাবে মিলিত হইবে, পারস্পারিক পরামর্শ ও সহযোগিতার উপায় উদ্ভাবন করিবে এবং নিজেদের মূল কাজকে সম্মুখের দিকে অগ্রসর করিবার জন্য বিপদ, সমস্যা ও বাধা-বিপত্তিসমুহ দুর করিবার পন্থা নির্ধারণ করিবে- ইহাই হইতেছে সাধারণত আমাদের সম্মেলনসমুহের উদ্দেশ্য। এতদ্ব্যতীত আমাদের অতীতের কাজ যাচাই করা, দোষ-ত্রুটিসমূহ অনুধাবন করা এবং তাহা দূর করিবার জন্য চিন্তা করার অবসর লাভ করা ও আমাদের এই সম্মেলনের অন্যতম লক্ষ্য। উপরন্তু আমাদের প্রতি সহানুভূতিশীল, আমাদের আদর্শ ও চিন্তাধারার সমর্থক কিংবা আমাদের কাজ সম্পর্কে সন্দিগ্ধ লোকদেরকে প্রত্যক্ষ্যভাবে আমাদের দাওয়াত এবং কাজ বুঝিবার জন্যই এই সম্মেলনে সুযোগ করিয়া দেওয়া হয়। ফলে, আমাদের সত্যনীতি সম্পর্কে তাহাদের মন নিঃসন্দেহে সায় দিলে তাহারা আমাদের জামায়াতে যোগদান করিতে পারেন। অনেক সময় কেবল অসাক্ষাৎ ও দূরত্বের দরুনই বহু প্রকারে ভ্রান্তিবোধের সৃস্টি হয়। কাজেই তাহা দুর করিবার জন্য নৈকট্য, সাক্ষাৎ, প্রত্যক্ষ আলাপ-আলোচনা ও ব্যক্তিগত সম্পর্ক স্থাপন (personal Contact) ভিন্ন কার্যকর উপায় আর কিছুই হইতে পারে না। আতএব আমরা এইজন্য খোদার শোকর আদায় করিতেছি এবং যাহারা নিজেদের সময় ও অর্থ ব্যয় করিয়া কেবল আমাদের এই কথা শুনিবার জন্য আমাদের সম্মেলনে যোগদান করিয়াছেন, তাহাদেরও ধন্যবাদ দিতেছি। তাহাদের এই সত্যানুসন্ধিৎসাকে আমরা শ্রদ্ধা করি। কারণ যেখানে উৎসাহ সৃষ্টি করার সাধারণ ব্যবহৃত কোন উপাদানই বর্তমান নাই, তথায় তাহারা শুধু এই উদ্দেশ্যে আসিয়া থাকেন যে, খোদার মুষ্টিমেয় কয়েকজন বান্দাহ আল্লাহর নাম লইয়া যে কাজ শুরু করিয়াছেন, তাহা গভীর সূক্ষ্ণ দৃষ্টিতে যাচাই করিয়া দেখিবেন, বিচার করিবেন যে, কাজ প্রকৃতপক্ষে আল্লাহরই জন্য কি না। এই সত্যানুসন্ধিৎসা মন ও মস্তিষ্কের নির্মলতা ও পরিচ্ছন্নতার সহিত হইলে তাহাদের এই চেষ্টাকে ব্যর্থ হইতে দিবেন না। বরং তিনি তাহাদেরকে নিশ্চয়ই সত্য পথের সন্ধান বলিয়া দিবেন তাহাতে কোন সন্দেহ নাই।

এই সম্মেলনে এমন অনেক লোকই রহিয়াছেন, যাহারা আমাদের দাওয়াত, উদ্দেশ্য ও কর্মনীতি সম্পর্কে বিস্তারিত জানিতে চাহেন, এই জন্য সর্বপ্রথম আমি এই বিষয়ে আলোচনা করিতে চাই।

Top

আমাদের দাওয়াত

আমাদের দাওয়াত সম্পর্কে সাধারণত বলা হয় যে, আমরা ইসলামী রাষ্ট্র কায়েম করার দাওয়াত দিয়া থাকি। হুকুমতে ইলাহিয়া শব্দে স্বতঃই এক প্রকার ভুল ধারণর সৃষ্টি হয়- অনেকে আবার ইচ্ছা করিয়াই ইহাকে কেন্দ্র করিয়া ভুল ধারণা সৃষ্টি করিতে চেষ্টা করে। সাধারণত লোকে মনে করে, কিংবা তাহাদেরকে বুঝাতে চেষ্টা করা হয় যে, ইসলামী রাষ্ট্র বলিতে একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থা মাত্র বুঝায়। আর বলা হয় যে, বর্তমান রাষ্ট্র ব্যবস্হার পরিবর্তে সেই বিশেষ রাজনৈতিক ব্যবস্হা প্রতিষ্ঠা করাই আমাদের একমাত্র উদ্দেশ্য। তাহার পর যাহারাই এই রাষ্ট্র ব্যবস্হা প্রতিষ্ঠার জন্য চেষ্টা করিবে, যেহেতু তাহারাই উহার পরিচালনভারও লাভ করিবে, সেহেতু খুব সহেজই বুঝনো হয় যে, আমরা হুকুমত দখল করিতে চাই। অতঃপর দ্বীনদারীর ওয়ায শুরু হইয়া যায়। আমাদেরকে দুনিয়ার বা পার্থিব স্বার্থবাদী আখ্যা দেওয়া হয়। অথচ মুসলমানদের তো দ্বীন- ইসলাম এবং পরকালের জন্যই কাজ করা দরকার, দুনিয়ার জন্য নহে। দ্বিতীয়তঃ ইহাও বলা হয় যে, হুকুমত তো দাবী করার বস্তু নহে, ইহা তো ধার্মিক জীবন যাপনের ফলে খোদার তরফ হইতে উপহারস্বরূপই মানুষ লাভ করিয়া থাকে। বস্তুত আমাদের সম্পর্কে এইসব কথাবার্তা অনেক ক্ষেত্রে প্রকৃত তত্ত্ব না বুঝিয়াই বলা হয়। কোথাও বিশেষ চালাকীর সহিত ইহা প্রচার করা হয় শুধু এই উদ্দেশ্যে যে, আমাদেরকে না হইলেও খোদার অনেক বান্দাহকেই হয়তো এই উপায়ে সত্যের এই মহান আন্দোলন হইতে বিরত রাখা সম্ভব হইবে। অথচ আমাদের বই পুস্তক উদার ও মুক্ত দৃষ্টিতে পাঠ করিলে প্রত্যেকেই অতি সহজেই বুঝিতে পারেন যে, নিছক একটা রাস্ট্র-ব্যবস্হা প্রতিষ্ঠাই আমাদের উদ্দেশ্য নহে। প্রকৃতপক্ষে মানুষের সামগ্রিক জীবনে ইসলাম নির্ধারিত পরিপূর্ণ বিপ্লব সৃষ্টি করাই আমাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য। এই বিপ্লবের জন্যই আল্লাহ তাআলা নবী প্রেরণ করিয়াছেন। তাহাদের আহবান ও আন্দোলনের ফলে সব নবীরই নেতৃত্বে এক উদ্দেশ্যকে পূর্ণ করা।

আমাদের দাওয়াতকে সহজ ও সুস্পষ্ট ভাষায় পেশ করিতে হইলে ইহাকে নিম্নলিখিত তিনটি দফায় পেশ করা যায়ঃ

১. আমরা সাধারণত সকল মানুষকে এবং বিশেষভাবে মুসলমানদেরকে আল্লাহর দাসত্ব গ্রহণ করার আহবান জানাই।

২. ইসলাম গ্রহণ করার কিংবা উহাকে মানিয়া লওয়ার কথা যাহারাই দাবী অথবা প্রকাশ করেন, তাহাদের সকলের প্রতি আমাদের আহবান এই যে, আপনারা আপনাদের বাস্তব জীবন হইতে মুনাফিকী ও কর্ম-বৈষম্য দূর করুন এবং মুসলমান হওয়ার দাবী করিলে খাঁটি মুসলমান হইতে ও ইসলামের পূর্ণ আদর্শবান হইতে প্রস্তুত হউন।

৩. মানব-জীবনের যে ব্যবস্হা আজ বাতিলপন্থী ও ফাসিক কাফিরদের নেতৃত্বের আমূল পরিবর্তন করিতে হইবে এবং নেতৃত্ত্ব ও কর্তৃত্ত্ব আদর্শ ও বাস্তব উভয় ক্ষেত্রেই আল্লাহর নেক বান্দাহদের হাতে সোপর্দ করিতে হইবে। উল্লিখিত তিনটি বিষয়ই যদিও সুস্পষ্ট, তবুও দীর্ঘকাল পর্যন্ত ইহার উপর ক্রমাগত ভুল ধারণা ও অবসাদ-উপেক্ষার আবর্জনা পুঞ্জীভূত হইয়াছে বলিয়া আজ কেবল অমুসলমানই নহে- মুসলমানদের নিকটও বিস্তারিত ব্যাখ্যা করা অপরিহার্য হইয়া পড়িয়াছে।

খোদার বন্দেগীর বিভিন্ন রকম অর্থ করা হয়। কেহ মেন করে, মুখে মুখে খোদাকে ‘খোদা’ এবং নিজেকে খোদার বান্দাহ মানিয়া লওয়াই যথেষ্ট। নৈতিক, বাস্তব কর্মজীবনে এবং সমষ্টিগত ক্ষেত্রে খোদাকে না মানিলে এবং তাহার দাসত্ব স্বীকার না করিলেও কোনরূপ ক্ষতি নাই। অথবা খোদাকে অতিপ্রাকৃতিকভাবে সৃষ্টিকর্তা, রেযেকদাতা এবং মাবুদ স্বীকার করিতে হইবে এবং বাস্তব কর্মজীবনের কর্তৃত্ব ও নেতৃত্বের ক্ষেত্র হইতে খোদাকে অপসারিত ও বেদখল করা অসংগত হইবে না। খোদার বন্দেগী সম্পর্কে আর একটি ধারনা এই যে, জীবনকে ধর্মীয় ও বৈষয়িক- এই দুইভাগে বিভক্ত করা চলে এবং কেবল ধর্মীয় জীবনে আকীদা-বিশ্বাস, ইবাদত ও হালাল-হারামের কয়েকটি শর্ত পালনের ব্যাপারে খোদার বন্দেগী করিলেই চলিবে। কিন্তু বৈষয়িক ব্যাপারে তামাদ্দুন, সমাজ, রাজনীতি, অর্থনীতি, জ্ঞান-বিজ্ঞান ও শিল্প- সাহিত্যের ক্ষেত্রে মানুষ খোদার বন্দেগী হইতে সম্পূর্ণ মুক্ত থাকিবে। এই ক্ষেত্রের জন্য হয় নিজেরা কোন নীতি রচনা করিয়া লইবে, কিংবা অপর লোকদের রচিত নীতি অবলম্বন করিবে।

খোদার বন্দেগী সম্পর্কে সাধারণ প্রচলিত এই সমস্ত ধারণাকেই আমরা ভ্রান্ত মনে করি এবং ইহা নির্মূল করতে চাই। কাফিরী জীবন-ব্যবস্হার বিরুদ্ধে আমাদের লড়াই যতখানি, ততখানি কিংবা ততোধিক তীব্রতার সহিত বন্দেগীর এই ভুল ধারণাসমূহের বিরুদ্ধেও আমাদের সংগ্রাম। কারণ, উল্লিখিত ধারণসমূহে দ্বীন ইসলামের মূল ভিত্তি এবং রূপকেই সম্পূর্ণ বিকৃত করিয়া দেওয়া হইয়াছে। আমাদের মনে কুরআন মজীদ এবং উহার পূর্ববর্তী সমস্ত আসমানী গ্রন্হ, শেষ নবী এবং পৃথীবির বিভিন্ন অংশে প্রেরিত অন্য নবীগণ এক বাক্যে খোদার দাসত্ব গ্রহণ করার পর যে আহবান জানাইয়াছেন, তাহার অর্থ এই যে, মানুষ খোদাকে পূর্ণরূপে ইলাহ, রব, মাবুদ, শাসক, মালিক, মনিব, পথপ্রদর্শক, আইন রচয়িতা, হিসাব গ্রহণকারী এবং প্রতিফলদাতা মানিবে এবং নিচের সমগ্র জীবনকে ব্যক্তিগত (private), সামাজিক, নৈতিক, ধর্মীয়, তামাদ্দুনিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, বৈজ্ঞানিক ও আদর্শমূলক ব্যাপারসমূহকেও পূর্ণরূপে খোদার বন্দেগীর ভিত্তিতেই সুসম্পন্ন করিবে। কুরআন মজীদে( ) “পূর্ণরুপে ইসলামের মধ্যে দাখিল হও” বলিয়া এই কাজেরই নির্দেশ দেওয়া হইয়াছে। অর্থাৎ নিজেদের জীবনের কোন একটি দিক বা বিভাগকেই খোদার বন্দেগীর বাহিরে রাখিতে পারিবে না। পরিপূর্ণ সত্ত্বা লইয়া খোদার গোলামী ও দাসত্ব কর, জীবনের কোন একটি দিক বা কোন একটি কাজকেও তোমরা খোদার বন্দেগী হইতে মুক্ত রাখিও না, খোদার নির্দেশ ও বিধানকে পরিত্যাগ করিয়া, স্বাধীন ও স্বেচ্ছাচারী হইয়া অথবা কোন স্বাধীন স্বেচ্ছাচারী মানুষের অনুসারী ও অনুগামী হইয়া চলিও না। বস্তুত খোদার বন্দেগীর এই অর্থই আমরা প্রচার করিয়া থাকি। এইরূপ বন্দেগী কবুল করার জন্য আমরা মুসলিম সকল মানুষেকই আহবান জানাইয়া থাকি।

Top

মুনাফিকীর মূলকথা

দ্বিতীয়তঃ আমরা এই দাওয়াতও দেই যে, যাহারা ইসলামের অনুসরণ করিয়া চলার দাবী করে, কিংবা যাহারা ইসলাম গ্রহণ করিয়াছে, তাহারা যেন বাস্তব জীবনে মুনাফিকী নীতি পরিত্যাগ করে এবং নিজেদের জীবনকে যেন আভ্যন্তরীণ বৈষম্য ও কর্মীয় বৈষম্য (Inconsistencies) হইতে পবিত্র রাখে। ‘মুনাফিকী নীতি’ বলিতে বুঝায় সেই অবস্হাকে, যখন মানুষ নিজের ঈমান ও দ্বীন এর সম্পূর্ণ বিপরীত ধরনের জীবন ব্যবস্থাকে প্রতিষ্ঠিত করিতে আদৌ চেষ্টা করে না বরং সাম্প্রতিক ফাসিকী ও খোদাদ্রোহীমূলক জীবন ব্যবস্থাকে নিজের অনূকূল মনে করিয়া উহাতে নিজের মঙ্গলময় ‘ভবিষ্যত’ রচনার চিন্তায় মশগুল হয়। তাহা পরিবর্তনের চেষ্টা করিলেও তাহার উদ্দেশ্য ফাসিকী জীবন-ব্যবস্থার পরিবর্তন করিয়া দ্বীন ইসলাম প্রতিষ্ঠিত করা নহে, বরং এক ধরনের ফাসিকী রাস্ট্র-ব্যবস্থার প্রতিষ্ঠা করাই তাহার উদ্দেশ্য হইয়া থাকে। আমাদের মতে এই কর্মণীতি সম্পূর্ণ মুনাফিকী কর্মনীতি ছাড়া আর কিছুই নহে। কারণ এক প্রকার জিবন-ব্যবস্থার প্রতি ঈমান রাখা এবং কার্যত উহার বিপরীত ধরণের জীবন-ব্যবস্হার প্রতি সন্তুষ্ট থাকা সুস্পষ্টরূপে পরস্পর বিরোধি ব্যাপার। নিষ্ঠাপূর্ণ ঈমানের পরিচয় এই যে, যে জীবন ব্যবস্হার প্রতি ঈমান আনা হইবে উহাকেই বাস্তব জীবনের বিধান ও আইন হিসাবে চালু করিতে হইবে এবং এই জীবন ব্যবস্হা অনুযায়ী বাস্তব জীবন যাপনের পথে যত বাধা প্রতিবন্ধকতাই আসুক না কেন, উহার প্রত্যেকটি ক্ষেত্রেই আমাদের প্রাণ কাতর ও ব্যাকুল হইয়া উঠিবে। প্রকৃত ঈমান উহার বিকাশ পথেই এই ধরনের সামান্যতম বাধা বরদাশত করিতেও প্রস্তুত হয় না। আর সমগ্র দ্বীনকে বিপরীত ধরনের রাষ্ট্র ব্যবস্হার অধীন থাকিতে দেখার এবং তাহা সহ্য করার তো কোন প্রশ্নই উঠিতে পারে না। কারণ, এই অবস্থায় তাহার দ্বীন এর কোন অংশেরই বাস্তবায়ন সম্ভব নহে। কোন কোন দেশে বিজয়ী ও প্রতিষ্ঠিত জীবন ব্যবস্হা ইসলামের বিশেষ কয়েকটি অংশকে অক্ষতিকর মনে করিয়া অনুগ্রহ স্বরূপ চলিতে দেয় বটে, কিন্তু মানব জীবনের অন্যান্য সমগ্র ব্যাপারই দ্বীন-ইসলামের বিপরিত নিয়ম-নীতি অনুযায়ী চলিয়া থাকে। এই অবস্হায় ও সেখানে ঈমানের কোনই ক্ষতি হয় না বলিয়া যাহারা মনে করে, তাহাদের ভ্রান্তি সুস্পষ্ট। সেখানে কাফিরী ব্যবস্হাকে এক স্হায়ী নিয়তি মনে করিয়াই অন্যান্য কাজ সম্পর্কে চিন্তা করা হয়। ফিকাহ শাস্ত্রের বাহ্যিক দৃষ্টিতে এই ধরনের ঈমানের যত মূলই হোক না কেন, কিন্তু দ্বীন-ইসলামের দৃষ্টিতে প্রকৃত মুনাফিকী ও এই ধরনের ঈমানের মধ্যে কোন পাথর্ক্য নাই। কুরআনের অসংখ্য আয়াতও ইহাকে মুনাফিকী বলিয়াই অভিহিত ও প্রমাণিত করে। পূর্বোক্ত অর্থ অনুযায়ী যাহারাই খোদার বন্দেগী কবুল করার প্রতিশ্রুতি দিবে, তাহাদের সকলেরই জীবনকে এইরূপ মুনাফিকী হইতে পবিত্র করিয়া তোলাই হইল আমাদের এই প্রচেষ্টার লক্ষ্য; খোদার বন্দেগীর সঠিক ধারনা অনুযায়ী ঐকান্তিক নিষ্ঠার সহিতই অবিশ্রান্তভাবে আমাদের এই চেষ্টা চালাইয়া যাইতে হইবে। কারণ আমরা চূড়ান্তভাবে এই সিদ্ধান্ত করিয়াছি যে, আল্লাহ তা’আলা তাঁহার নবীদের মারফতে যে জীবন পদ্ধতি, আইন-কানুন এবং তামাদ্দুন, নৈতিক চরিত্র, সমাজ, রাজনীতি, অথর্নীতি এবং চিন্তা ও কর্মের যে বিধান প্রেরণ করিয়াছেন, আমরা আমাদের পরিপূর্ণ জীবনে তাহাই অনুসরণ করিয়া চলিব এবং এক মুহুর্তের জন্য জীবনের কোন একটি কাজকেও- কোন ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র ব্যপারেও- খোদার দেওয়া সত্য জীবন বিধানের পরিবর্তে অপর কোন আদর্শ ও নীতির বিন্দুমাত্র প্রভাবও স্বীকার করিব না। বাতিল জীবন ব্যবস্হার সামান্য ব্যাপারে, সেখানে উহাতে সন্তুষ্ট হওয়া, উহার প্রতিষ্টা ও স্হিতির চেষ্টায় অংশগ্রহণ করা কিংবা এক প্রকারের বাতিল ব্যবস্হার পরিবর্তে অন্য এক প্রকারের বাতিল বিধানকে প্রতিষ্ঠিত করিতে চেষ্টা করা যে প্রকৃত ঈমানের কত বিপরীত, তাহা কাহারও অজ্ঞাত থাকা উচিত নহে।

Top

কমীর্য় বৈশাদৃশ্যের তত্ত্বকথা

মুনাফিকীর পর দ্বিতীয়ত আমরা যে জিনিসকে নতুন-পুরাতন সকল মুসলমানের জীবন হইতে দুর করিতে বলি তাহা হইতেছে কর্মীয় বৈসাদৃশ্য- কথা ও কাজের অসামঞ্জস্য। মানুষ মুখে মুখে যে আদশের্র প্রতি ঈমান গ্রহণের দাবী করে, উহার বিপরীত কাজ করাকেই বলা হয় অসামঞ্জস্য। বিভিন্ন নীতি অনুসরণ করাকেও অসামঞ্জস্য বলা হয়। কাজেই কেহ যদি সমগ্র জীবনকে খোদার বন্দেগীর অনুসারী করার দাবী করে, তবে চেতনা থাকিতে জীবনে কোন একটি কাজও এই বন্দেগীর বিপরীত করা কোনক্রমেই উচিত হইতে পারে না। মানবীয় দুর্বলতার কারনে কোন ত্রুটি-বিচ্যুতি ঘটিলে সঙ্গে সঙ্গেই নিজের ত্রুটি স্বীকার করিয়া খোদার বন্দেগীর দিকে প্রত্যাবর্তন করিবে। সমগ্র জীবনকে খোদার দাসত্ব স্বীকার ভিত্তিতে পরিপূর্ণ সামঞ্জস্যের সহিত গঠন করা ঈমানের ঐকান্তিক দাবী। বহুরূপী হওয়াতো দূরের কথা, প্রকৃত ঈমান দ্বিরূপী হওয়াও বরদাশত করে না। আমরা যদি একদিকে খোদা, পরকাল, ওয়াহী, নবুয়াত এবং শরীয়তকে মানিয়া চলার দাবী করি, আর অপরদিকে বৈষয়িক স্বার্থ, সম্মান ও শ্রেষ্ঠত্ব লাভের জন্য বস্তুবাদি, খোদা ও পরকালের প্রতি অবিশ্বাস সৃষ্টিকারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহে শিক্ষালাভের জন্য যাই; এইরূপ শিক্ষাব্যবস্হা প্রতিষ্ঠার জন্য চেষ্টা করি ও অপরকেও সেই জন্য উৎসাহিত করি, তবে আমাদের দৃষ্টিতে ইহা বহুরূপী নীতি ভিন্ন আর কিছুই নহে। একদিকে খোদার শরীয়াতের প্রতি ঈমান গ্রহণের দাবী করি, আর সেই সঙ্গে খোদার দুশমনদের রচিত আইনের ভিত্তিতে স্হাপিত আদালতের জজ ও উকিল হইতে এবং সেই আদালতের বিচারকের উপর সত্য-মিথ্যা, হক, না-হক নির্ধারণে একান্তভাবে নির্ভর করি; একদিকে মসজিদে গিয়ে নামাজ পড়ি,অপরদিকে মসজিদ হইতে বাহির আসিয়াই নিজেদের জীবনে লেন-দেনের ব্যাপারে, জীবিকা নির্বাহের উপায় অবলম্বনে, বিবাহ-শাদীতে, মীরাস বণ্টনে, রাজনৈতিক আন্দোলন সমূহে এবং নিজেদের সকল প্রকার পার্থিব খোদাকে এবং খোদার শরীয়তকে ভুলিয়া গিয়া কোথাও নিজেদের নফসের দাসত্ব করি, কোথাও বংশীয়নিয়ম প্রথা, কোথাও সমাজের রীতি-নীতি এবং কোথাও খোদাদ্রোহী শাসকদের দাসত্ব করি; একদিকে আমরা খোদার নিকট এই বলিয়া বারবার প্রতিশ্রুতি দেই যে, আমরা তোমারই বান্দাহ-আমরা তোমারই ইবাদাত ও দাসত্ব করি, আর অপরদিকে আমরা এমন সকল ‘মূর্তির’ পূজা করি- যাহার সহিত আমাদের কিছু না কিছু স্বার্থ, ভালবাসা, দরদ, মনের সংস্কার, সুযোগ-সুবিধা ইত্যাদি সংশ্লিষ্ট রহিয়াছে, তবে ইহা সবই কর্মীয় বৈষম্য, অসামঞ্জস্য এবং মুনাফিকী ভিন্ন আর কিছুই নহে। বর্তমান মুসলমানদের জীবনে যে এই ধরনের অসংখ্য বৈশাদৃশ্য বর্তমান রহিয়াছে, তাহা চক্ষুষ্মান ব্যক্তিই অস্বীকার করিতে পারে ন। আমার মতে মুসলিম জাতির ইহা এক মারাত্নক রোগ, যাহা ইহার চরিত্র ও প্রকৃতি এবং দ্বীন ও ঈমানকে ভিতর হইতেই ঘূণের ন্যায় অন্তঃসারশূন্য করিয়া দিতেছে। বাস্তব জীবনের প্রতোকটি ক্ষেত্রেই আজ যে তাহাদের দূর্বলতা প্রকট হইয়া উঠিয়াছে, তাহারও মূল কারণ হইতেছে এই কর্মীয় বৈষম্য ও বৈসাদৃশ্য। দীর্ঘকাল হইতে মুসলিম জাতিকে এই বলিয়া প্রবোধ দেওয়া হইতেছে যে, মুখ দ্বারা তাওহীদ ও নবুয়াতের সাক্ষ্য দিলে এবং নামায, রোযা ইত্যাদি কয়েকটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালন করিলেই সকল কতর্ব্য আদায় হইয়া গেল, অতঃপর জীবনের অন্যান্য সকল কাজে দ্বীন বিরোধী ও ঈমান বিরোধী কর্মনীতি অবলম্বন করিলেও তোমাদের ঈমানের একবিন্দু ক্ষতি হইবে না, আর তোমাদের মুক্তিলাভের ব্যাপারেও কোন আশঙ্কা দেখা দিবে না। এই সুবিধা দানের (Allowance) সীমা ক্রমশ এতদুর সম্প্রসারিত হইয়া পড়িল যে, শেষ পর্যন্ত মুসলমান হওয়ার জন্য নামায পড়াও আর কোন অনিবার্য শর্ত রহিল না। মুসলমানদের মধ্যে এই ধারনাও বদ্ধমূল করিয়া দেওয়া হইল যে, ঈমান ও ইসলামের স্বীকারোক্তি হইলেই যথেষ্ট, কার্যত সমস্ত জীবন ইসলামের সম্পূর্ণ বিপরীত আদর্শে চলিলেও কোন ক্ষতি নাই। ইহারই ফলে আজ দেখিতেছি সকল প্রকার ফাসিকী, কাফিরী, পাপ, নাফরমানী, যুলুম ও স্পষ্ট খোদাদ্রোহিতাকে অবলীলাক্রমে ইসলামের নামে চালাইয়া দেওয়া হইতেছে। মুসলমানগণ বর্তমানে যে পথে তাহাদের সময় শ্রম, ধন-মাল, শক্তি-সামর্থ্য, যোগ্যতা, কর্মদক্ষতা এবং জীবন ও প্রাণ একান্তভাবে নিযুক্ত করিতেছে, যেসব উদ্দেশ্য ও লক্ষের পশ্চাতে ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগতভাবে চেষ্টা-সাধনা করিতেছে, তাহার অধিকাংশই যে তাহাদের ঈমানের সম্পূর্ণ বিপরীত, এইটুকু কথাও আজ মুসলমানরা অনুধাবন করিতে সমর্থ হন না। বস্তুত এই অবস্তা বর্তমান থাকিতে অমুসলিমদের ইসলাম গ্রহণেরও কোন সাথর্কতা নাই। কারণ এই লবনের খনিতে বিচ্ছিন্নভাবে যত লোকই প্রবেশ করিবে, তাহারা লবনের সহিত মিশিয়া একাকার হইয়া যাইবে। কাজেই এই সব বৈষম্য ও কর্মীয় বৈসাদৃশ্য হইতে জীবনকে পবিত্র করার জন্য মুসলমানকে আহবান জানান আমাদের মূল দাওয়াতের একটি অবিচ্ছেদ্য ও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্রত্যেক ঈমানদার ব্যক্তিকেই আমরা সম্পূর্ণ একমুখী একনীতির অনুসারী ও একই আদর্শবাদী হইতে এবং ঈমান ও ইসলামী জীবন ধারার বিপরীত সকল প্রকার কাজ-কর্মের সহিত সম্পর্ক ছিন্ন করিতে না পারিলে, তাহা করিবার জন্য অবিশ্রান্ত চেষ্টা ও সাধনা করিতে আহবান জানাই। অনুরূপভাবে আমরা ঈমানের সকল দাবীকেই গভীর ও সুস্পষ্টরূপে অনুধাবন করিতে এবং তাহা পূরণ করিতে প্রস্তুত থাকার জন্য প্রত্যেক ঈমানদার ব্যক্তিকেই বলিয়া থাকি।

Top







লেটেস্ট প্রবন্ধ