হেদায়াত

চলমান পেজের সূচীপত্র




ভূমিকা

  স্ক্যান কপি ডাউনলোড

 

  ১৯৫১ সালের ১৩ই নভেম্বর করাচিতে অনুষ্ঠিত জামায়াত ইসলামীর বার্ষিক সম্মেলনের শেষ অধিবেশনে কর্মীদের উদ্দেশ্যে প্রদত্ত বক্তৃতা।

সহকর্মী বন্ধুগণ!

চারদিন ব্যাপী সম্মেলনের পর এখন সকলেই এখান থেকে বিদায় নিচ্ছে। এ সম্মেলন উপলক্ষে নির্ধারিত কার্যসূচী আল্লাহর ফযলে সম্পন্ন হয়েছে এবং সেই সম্পর্কে আমরা বিশেষ অধিবেশনে মোটামুটি ভাবে পর্যলোচনাও করেছি। এখান থেকে বিদায় গ্রহণের পূর্বে আমি আমার সহকর্মী রুকন এবং মুত্তাকীগণকে (বর্তমানে সহযোগী সদস্য) আমাদের কর্মপন্থা সম্পর্কে কয়েকটি জরুরী কথা বলতে চাই; যেন তারা ভবিষ্যতে নিজেদের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করতে পারেন।

Top

আল্লাহ তাআলার সাথে সম্পর্ক

আম্বিয়ামে কিরাম, খোলাফায়ে রাশেদীন এবং জাতির আদর্শ ও সৎ ব্যক্তিগণ প্রত্যেকটি কাজ উপলক্ষে তাদের সহকর্মীগণকে যে বিষয়ে উপদেশ দিয়েছেন, সর্বপ্রথম আমি তার উল্লেখ করতে চাই। তাঁরা আল্লাহ তাআলাকে ভয় করতে,, মনে-প্রাণে তাঁর প্রতি ভক্তিভাব পোষণ করতে এবং তাঁর সাথে সম্পর্ক ঘন্ঠিষ্ঠতর করতে তাকীদ করেছেন। তাঁদের অনুকরণ ও অনুসরণ করে আমিও আপনাদের কে আজ এ উপদেশই দিচ্ছি। আর ভবিষ্যতেও আমি যখন সুযোগ পাবো, ইনশাআল্লাহ একথাই আপনাদেরকে স্মরণ করিয়ে দিতে থাকবো। কারণ এ বিষয়টি এতোই গুরুত্বপূর্ণ যে, অন্যান্য সকল বিষয়ের তুলনায় এটাকে প্রাধান্য দেয়া উচিত। আকীদা-বিশ্বাসের ব্যাপারে আল্লাহর প্রতি ঈমান, ইবাদতের বেলায় আল্লাহর সাথে নিবিড়তর সম্পর্ক স্থাপন, নৈতিক চরিত্রে আল্লাহর প্রতি ভয় পোষণ এবং আচার-ব্যবহার ও লেন-দেনের বেলায় আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টিলাভ করাকেই প্রাধান্য লাভ করা বাঞ্চনীয়। বিশেষত আমরা যে কাজের জন্য সংঘবদ্ধ হয়েছি, এটা শুধু আল্লাহ তাআলার সাথে সম্পর্ক স্থাপনের ভিত্তিতে সম্পন্ন হতে পারে। আমরা আল্লাহ্ তাআলার সাথে যতখানি গভীর ও দৃঢ় সম্পর্ক করবো আমাদের আন্দোলন তাতোই মযবুত হবে। পক্ষান্তরে আল্লাহ তাআলার সাথে আমাদের সম্পর্ক দুর্বল হলে এ আন্দোলও দুর্বল হয়ে পড়বে। আল্লাহ যেন এটা থেকে আমাদেরকে রক্ষা করেন।

বলা বাহুল্য মানুষ যে কাজেই অংশগ্রহণ করুক না কেন-সেই কাজ দুনিয়ার হোক কি আখেরাতের তার প্রেরণা সেই কাজের মূল উদ্দেশ্য হতেই লাভ করে। যে কাজের জন্য সে উদ্যোগ-আয়োজন করেছে, সে কাজে তার চেষ্টা-তৎপরতা তখনই পরিলক্ষিত হবে যখন মূল উদ্দেশ্যে সাথে তার মনে প্রবল আগ্রহ ও উৎসাহ দেখা যাবে। আত্মকেন্দ্রিক স্বর্থপর ব্যক্তি ছাড়া কেউ প্রবৃত্তির পূজা করতে পারে না। সুতরাং যে ব্যক্তি যতবেশী স্বার্থপর হবে, ততোই সে আপন প্রবত্তির জন্য কাজ করতে থাকবে। সন্তান-সন্তির মঙ্গলের জন্য নিজের পার্থিব জীবনেই নয় নিজের আখেরাতকেও বরবাদ করতে ইতস্তত করে না। কারণ তার সন্তান-সন্ততি অধিকতর সুখ-শান্তি লাভ করুক এটাই হচ্ছে তার একমাত্র কামনা।

অনুরূপভাবে দেশ ও জাতির খেদমতে আত্মনিয়োগকারী ব্যক্তি মূলত দেশ ও জাতির প্রেমে আবদ্ধ হয়। এর ফলেই সেই ব্যক্তি দেশ ও জাতির আযাদী, নিরাপত্তা ও উন্নতির জন্য আর্থিক ক্ষতি স্বীকার করে, কয়েদখানার দুর্বিসহ যাতনা অনায়াসে বরণ করে এবং এজন্য দিন-রাত পরিশ্রম করে। এমনকি একাজে সে নিজের প্রাণ বিসর্জন দিতেও আদৌ কুন্ঠিত হয় না। সুতরাং আমরা যদি এ কাজ আপন প্রবৃত্তির জন্য, আত্নীয়-স্বজনের জন্য, দেশ ও জাতির বিশেষ কোনো স্বার্থের জন্য না-ই করি বরং একমাত্র আল্লাহ তাআলার সাথে আমাদের সম্পর্ক গভীল এবং মজবুত না হলে যে আমদের এ কাজ কখনো অগ্রসর হতে পারে না, একথা আপনারা সহজেই উপলবদ্ধি করতে পারেন। আর এ কাজের জন্য আমাদের চেষ্টা-তাৎপরতা শুধু তখনই শুরু হতে পারে যখন ও প্রতিষ্ঠার জন্যই কেন্দ্রীভূত হবে। এ কাজে অংশগ্রহণকারীদের জন্য আল্লাহ তাআলার সাথে শুধু সম্পর্ক স্থাপন করাই যথেষ্ট নয় বরং তাদের যাবতীয় আশা-ভরসা একমাত্র আল্লাহ তাআলার সাথেই সম্পর্কিত হওয়া আব্শ্যক। এটা একাধিক সম্পর্কের এতটি অন্যতম সম্পর্ক হলে চলবে না, বরং এটাকেই একমাত্র মৌলিক ও বাস্তব যোগসূত্রে পরিণত হতে হবে। পরন্তু আল্লাহ তাআলার সাথে এ সংযোগ-সম্পর্ক হ্রাস না পেয়ে বরং যাতে ক্রমশ বৃদ্ধি পায় সেই চিন্তাই যেন তাদের মনে প্রতিটি মুহূর্তে জাগরুক থাকে। বস্তুত আল্লাহ তাআলার সাথে সম্পর্ক স্থাপন করাই যে আমাদের এ কাজের মূল প্রাণ স্বরূপ : এ বিষয়ে আমাদের মধ্যে কোনো প্রকার দ্বিতম নেই। আল্লাহর ফযলে আমাদের কোনো সহকর্মীই এর গুরুত্ব সম্পর্কে অসতর্ক নয়। তবে এ ব্যাপারে কতকগুলো প্রশ্ন অনেক সময় লোকদেরকে বিব্রত করে তোলে, তাই এই যে, আল্লাহ তাআলার সাথে সম্পর্ক স্থাপনের সঠিক তাৎপর্য কি, এটা কিরূপে স্থাপিত এবং বর্ধিত হয়। আর আল্লাহ তাআলার সাথে আমাদের কোনো সম্পর্ক আছে কিনা, থাকলেই বা কতখানি এবং এসব কথা জানাবার সঠিক উপায় কি হতে পারে?

এ সকল প্রশ্নের কোনো স্পষ্ট উত্তর জানা না থাকার কারণে আমি অনেক সময় অনুভব করেছি যে, অনেকেই এ ব্যাপারে নিজেদেরকে সীমাহীন মরুভূমির ম্যধে পতিত ও সম্পূর্ণ অসহায় অবস্থায় দেখতে পায়। সেখানে বসে তারা আপন লক্ষ্য পথের সন্ধান করতে পারে না। এমনকি কতখানি পথ অতিক্রম করেছে, কোনখানে এসে পৌঁছেছে এবং কতখানি পথ বাকি আছে, তাও সঠিকরূপে অনুমান করতে পারে না। ফলে অনেক সময় আমাদের কোনো সহকর্মী হয়তো অস্পষ্ট ধারণার বশবর্তী হয়ে পড়েন। কেউ বা এমন পথে অগ্রসর কারো পক্ষে লক্ষ্যস্থলের দূরে কিংবা নিকটবর্তী বস্তুত মধ্যে পার্থক্য সৃষ্টি করা দু:সাধ্য হয়ে পড়েছে। কেউ বা সম্পূর্ণ অনিশ্চিত অবস্থার সম্মুখীন হয়েছে। এ কারণেই আমি আপনাদেরকে শুধু আল্লাহ তাআলার সাথে সংযোগ স্থাপন সম্পর্কে উপদেশ দিয়েই ক্ষান্ত হবো না, বরং উল্লেখিত প্রশ্নাবলীর একটা সুষ্ঠু জবাব দেয়ার জন্য সাধ্যনুযায়ী চেষ্টা করবো।

Top

আল্লাহ তাআলার সাথে সম্পর্ক স্থাপনের অর্থ

আল্লাহ তাআলার সাথে সম্পর্ক স্থাপনের তাৎপর্য সম্পর্কে কুরআন মজীদে বলা হয়েছে : মানুষের জীবন-মরণ, ইবাদাত-বন্দেগী, কুরবানী ইত্যাদি সবকিছু একমাত্র আল্লাহ তাআলার জন্যই নির্ধারিত হবে। এজন্যই নির্দিষ্ট করে তাঁর ইবাদাত করবে :

নিশ্চয়ই আমার সালাত, আমার কুরবানী, আমার জীবন, আমার মৃত্যু একমাত্র রাব্বুল আলামীন আল্লাহর জন্যই উৎসর্গীকৃত। সূরা আল আনআম : ১৬২

সে পূর্ণ একাগ্রতার সাথে দীনকে একমাত্র আল্লাহ তাআলার সম্বন্ধে এমন বিস্তারিত ব্যাখ্যা করেছেন যে, এর অর্থ ও তাৎপর্যের ভিতর কোনোটাই অস্পষ্টতা নেই।

তাঁর বাণী সমূহ পর্যালোচনা করলে দেখা যায় আল্লাহ তাআলার সাথে সম্পর্ক স্থাপনের অর্থ হচ্ছে :

গোপনে এবং প্রকাশ্যে সকল কাজেই আল্লাহ তাআলাকে ভয় করো।

নিজের উপায়-উপাদানের তুলনায় আল্লাহ তাআলার মহান শক্তির উপরেই অধিক ভরসা করা এবং আল্লাহ তাআলাকে সন্তুষ্ট করার জন্য লোকের বিরাগভাজন হওয়া। এর সম্পূর্ণ বিপরীত অবস্থা হচ্ছে লোকের সন্তুষ্টিলাভের জন্য আল্লাহ তাআলার অসন্তোষ অর্জন করা অতপর এ সংযোগ-সম্পর্ক যখন বৃদ্ধি পেয়ে এমন অবস্থায় উপনীত হবে যে, লোকের সাথে বন্ধুত্ব, শত্রুতা এবং লেন-দেন ইত্যাদি সবকিছুই একমাত্র আল্লাহ তাআলার উদ্দেশ্যেই সম্পন্ন হবে, নিজের ইচ্ছা প্রবৃত্তি বা আগ্রহ ঘৃণার বিন্দুমাত্র প্রভাবও সেখানে থাকবে না, তখনই বুঝতে হবে যে, আল্লাহ তায়ালার সাথে তার সম্পর্ক পরিপূর্ণ হয়েছে।

এছাড়া প্রত্যেক রাতে আপনার দোয়ায়ে কুনুতে যা পাঠ করেন, তার প্রতিটি শব্দই আল্লাহ তাআলার সাথে আপনার এ সম্পর্কের পরিচয় দিচ্ছে। আপনারা আল্লাহ তাআলার সাথে কোন ধরনের যোগ-সম্পর্ক স্থাপনের স্বীকৃতি দিচ্ছেন, তা এ দোয়ার শব্দাবলীর প্রতি লক্ষ্য করলেই সুন্দরূপে বুঝতে পারেন।

হে আল্লাহ! আমরা তোমার কাছে সাহায্য চাচ্ছি, তোমারই কাছে সরল-সত্য পথের নির্দেশ চাচ্ছি, তোমারই কাছে ক্ষমা ভিক্ষা করছি, তোমারই উপরে আস্থা স্থাপন করছি, তোমারই উপর ভরসা করছি এবং তোমার যাবতীয় উত্তম প্রশংসা তোমার জন্য নির্দিষ্ট করছি। আমরা তোমারই কৃতজ্ঞতা পাশে আবদ্ধ, তোমার অকৃতজ্ঞ দলে শামিল নই। তোমার অবাধ্য ব্যক্তিকে আমার বর্জন করে চলি। হে আল্লাহ! আমরা একমাত্র তোমারই ইবাদাত করি, তোমারই জন্য সালাত আদায় করি, সেজদা করি এবং তোমার জন্যই আমাদের যাবতীয় চেষ্ট-তৎপরতা নিবদ্ধ। আমরা তোমার অনুগ্রহ প্রার্থী এবং তোমার শাস্তি সম্পর্কে ভীত-সন্ত্রস্ত। নিশ্চয়ই তোমার যাবতীয় আযাব কাফেরদের জন্য নির্দিষ্ট।

হযরত রাসূলে করীম (স) তাহাজ্জুদের জন্য উঠার সময় যে দোয়া পাঠ করতেন তাতেও আল্লাহ তাআলার সাথে এ সম্পর্কের একটি চিত্র পাওয়া যায়। তিনি আল্লাহ তাআলাকে উদ্দেশ্য করে বলতেন:

হে আল্লাহ! আমি তোমারই অনুগত হলাম, তোমার প্রতি ঈমান আনলাম, তোমার উপর ভরসা করলাম, তোমার দিকে আমি নির্বিষ্ট হলাম, তোমার জন্যই আমি লড়াই করছি এবং তোমার দরবারেই আমি ফরিয়াদ জানাচ্ছি।

Top

আল্লাহর সাথে সম্পর্ক বৃদ্ধির উপায়

আল্লাহ তাআলার সাথে একজন মুমিনের যে সম্পর্ক থাকা উচিত, উপরে তার সঠিক বর্ণনা দেয়া হলো। এখন এ সম্পর্ক এবং তা বৃদ্ধি করা যায় কিভাবে তা-ই আমাদের চিন্তা করে দেখতে হবে।

এ সম্পর্ক স্থাপনের একটি মাত্র উপায় রয়েছে, তা এই যে, মানুষকে সর্বান্তকরণে এক ও লা-শরীক আল্লাহ তাআলাকে নিজের এবং সমগ্র জগতের একমাত্র মালিক, উপাস্য এবং শাসকরূপে স্বীকার করতে হবে। প্রভূত্বের যাবতীয় গুনাবলী, অধিকার ও ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহ তাআলার জন্যই নির্দিষ্ট বলে গ্রহণ করতে হবে। নিজের মন-মস্তিষ্ককে নির্মল ও পবিত্র রাখতে হবে। এ কাজটি সম্পাদনের পরই আল্লাহ তাআলার সাথে সম্পর্ক স্থাপিত হয়। এসম্পর্ক দুটি উপায়ে বৃদ্ধি করা যেতে পারে। প্রথমটি হলো চিন্তা ও গবেষণার পন্থা আর দ্বিতীয়টি হলো বাস্তব কাজের পন্থা।

চিন্তা ও গবেষণার মাধ্যমে আল্লাহ তাআলার সাথে সম্পর্ক বৃদ্ধির উপায় হলো পবিত্র কুরআন ও সহীহ হাদীসসমূহের সাহায্য এ ধরনের সংযোগ সম্পর্কে বিস্তারিত জ্ঞান লাভ করা।এভাবে আল্লাহ তাআলার সাথে আপনার যে স্বাভাবিক সম্পর্ক রয়েছে কার্যত যে রূপ সম্পর্ক থাকা উচিত সেই বিষয়ে আপনাকে সুস্পষ্ট ধারণা লাভ করতে হবে। এ ধরনের যোগসূত্র সম্পর্ক স্পষ্ট ধারণা লাভ করতে হবে। এধরনের যোগসূত্র সম্পর্ক স্পষ্ট ধারণা ও অনুভূতি লাভ এবং এটাকে সর্বদা স্মরণ রাখতে হবে, পবিত্র কুরআন-হাদীস বুঝে পাঠ করতে হবে এবং বারবার অধ্যয়ন করতে হবে। পবিত্র কুরআন-হাদীসের আলোকে যে সকল বিষয়ে আল্লাহ তাআলার সাথে আপনার যোগ সম্পর্ক আপনাকে বিচার-বিশ্লেষণ করতে হবে। আল্লাহ তাআলার সাথে আপনি কোন কোন বিষয়ে কতখানি দাবী আপনি পূরণ করেছেন, কোন বিষয়ে কতখানি ত্রুটি অনুভব করেছেন, আপনাকে তা যাচাই করে দেখতে হবে। এ অনুভূতি সমীক্ষা যতখানি বৃদ্ধি পাবে, ইনশাআল্লাহ আপনার সাথে আল্লাহ তাআলার যোগ সম্পর্কও ততই বাড়তে থাকবে।

উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়, আল্লাহ তাআলার সাথে আপনার একটি সম্পর্ক এই যে, তিনি আপনাদের মাবুদ এবং আপনারা তাঁর গোলাম। দ্বিতীয় সম্পর্ক হলো, পৃথিবীর বুকে আপনার তাঁর প্রতিনিধি। আর তিনি অসংখ্য জিনিস আপনাদের কাছে আমানত রেখেছেন। তৃতীয় সম্পর্ক এই যে, আপনারা তাঁর প্রতি ঈমান এনে একটি বিনিময় চুক্তি সম্পাদন করেছেন। সেই অনুসারে আপনাদের জান ও মাল বিনিময়ে চুক্তি সম্পাদন করেছেন। সেই অনুসারে আপনাদের জান ও মাল তাঁকে প্রদান করেছেন। এবং তিনি জান্নাতের বিনিময়ে তা খরিদ করে দিয়েছেন। চতুর্থ সম্পর্ক এই যে, আপনাকে তাঁর নিকট জবাবাদিহি করতে হবে এবং তিনি শুধু আপনার প্রকাশ্য বিষয়সমূহের প্রতি লক্ষ্য রেখেই হিসেবে গ্রহণ করবেন না। বরং আপনার প্রত্যেকটি কাজ, আপনার অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য ইত্যাদি সম্পর্কে তাঁর নিকট সুস্পষ্ট দলীল-প্রমাণ রয়েছে: তার দৃষ্টিতে তিনি আপনার পুংখানুপুংখ হিসেবে গ্রহণ করবেন। মোটকথা, এরূপ অনেক বিষয়ে আল্লাহ তাআলার সাথে আপনার সম্পর্ক রয়েছে। এই সকল সংযোগ-সম্পর্ক স্পষ্ট ধারণা লাভ করা, তাংপর্য উপলব্ধি করা ও এর সদাসর্বদা স্মরণ রাখা এবং এর দাবীগুলো পূরণ করার উপরই আল্লাহ তাআলার সাথে আপনাদের সম্পর্ক-সংযোগ গভীর ও ঘনিষ্ঠতর হওয়া নির্ভর করেছে। পক্ষান্তরে এ ব্যাপারে আপনারা যতখানি সর্তক ও মনোযোগী হবেন, ততই আল্লাহ তাআলার সাথে আপনাদের সম্পর্ক গভীর ও মযবুত হবেন, ততই আল্লাহ তাআলার সাথে আপনাদের সম্পর্ক গভীর ও মযবুত হবেন, ততই আল্লাহ তাআলার সাথে আপনাদের সম্পর্ক গভীর ও মযবুত নিয়ে বেশীদুর অগ্রসর হওয়াই সম্ভব নয়। বাস্তব কাজ বলতে বুঝায় নিষ্ঠার সাথে আল্লাহ তাআলার যাবতীয় নির্দেশিত কাজ সম্পন্ন করা।

এ সমস্ত কাজে কোনো পার্থিব স্বার্থ নয় বরং আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টিলাভ করাকেই একমাত্র উদ্দেশ্য হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। আল্লাহ তাআলা যে সমস্ত কাজ নিষিদ্ধ করেছেন, গোপনে ও প্রকাশ্যে যে কোনো অবস্থায় তা আন্তরিক ঘৃণার সাথে বর্জন করতে হবে। এবং এর মূলেও কোনো প্রকার পার্থিব ক্ষতি বা বিপদের আশাংকা নয়, বরং আল্লাহ তাআলার গযব বা শাস্তির ভয়কেই বিশেষভাবে সক্রিয় রাখতে হবে। এভাবে আপনার যাবতীয় কার্যকলাপ তাকওয়ার পর্যায়ে উপনীত হবে এবং এর পরবর্তী কর্মপন্থা আপনাকে ইহসানের স্তরে উন্নীত করবে। অর্থ্যাৎ আল্লাহ তাআলার পছন্দ অনুসরে প্রত্যেকটি ন্যায় ও সৎকাজের প্রচার ও প্রতিষ্ঠায় আপনি আগ্রহের সাথে আত্মনিয়েগের করবেন এবং তার অপছন্দীয় প্রত্যেকটি অন্যায় ও অসৎকাজের প্রতিরোধ চেষ্টায় ব্রত হবেন। এ পথে আপনি নিজের জান-মাল, শ্রম এবং মন-মগযের শক্তি সামর্থ কুরবানী করার ব্যাপারে কোনো প্রকার কার্পণ্য করবেন না। শুধু তাই নয়, এপথে আপনি যা কিছু কুরবানী করবেন সেই জন্য আপনার মনে বিন্দুমাত্র গর্ব অনুভূত হওয়া উচিত নয়। আপনি কারো প্রতি কিছুমাত্র অনুগ্রহ করেছেন এরূপ ধারণাও কখনো পোষণ করবেন না। বরং বৃহত্তর কুরবানীর পরও যেন আপনার মনে একথাই জাগ্রত থাকে যে, সৃষ্টিকর্তার প্রতি আপনার যে দায়িত্ব রয়েছে, এতসব করার পরও তা পালন করা সম্ভব হয়নি।

Top

আল্লাহর সাথে সম্পর্কের বিকাশ সাধনের উপকরণ

প্রকৃতপক্ষে এ ধরনের কর্মপন্থা অনুসরণ করা মোটেই সহজসাধ্য নয়। এটা অত্যন্ত দুর্গম লক্ষ্যস্থল। এ পর্যন্ত পৌছুতে হলে বিশেষ শক্তি সামর্থের প্রয়োজন। নিম্নলিখিত উপায়ে এ শক্তি অর্জন করা সম্ভব।

এক . সালাত : শুধু ফরজ ও সুন্নত ই নয় , বরং সাধ্যানুযায়ী নফল সালাতও আদায় করা দরকার। কিন্ত নফল সালাত অত্যন্ত গোপনে আদায় করতে হবে, এবং আপনার মধ্যে নিষ্ঠার ভাব জাগ্রত হয়। নফল পড় বিশেষত তাহাজ্জুদ পড়ার কথা বাহির করতে থাকলে মানুষের মধ্যে এক প্রকার মারাত্মক। অন্যান্য নফল সাদকা এবং যিকর-আযকারের প্রচারের মধ্যেও অনুরূপ ক্ষতির আশাংকা রয়েছে।

দুইঃ আল্লাহর যিকর- জীবনের সকল অবস্থাতেই আল্লাহ তাআলার যিকর করা উচিত। কিন্তু বিভিন্ন সুফী সম্প্রদায় এজন্য যে সমস্ত প্রক্রিয়া আবিষ্কার করেছেন কিংবা অপরের নিকট হতে গ্রহণ করেছেন,তা মোটেই ঠিক নয়। বরং এ সম্পর্কে রাসূলে করীম (স) যে পন্থা অনুসরণ করেছেন এবং সাহাবায়ে কেরামকে শিক্ষা দিয়েছেন তাই হচ্ছে উত্তম ও সঠিক প্রক্রিয়া। হুজুরে আকরাম (স) এর অনুসৃত দোয়া, যিকর ইত্যাদির মধ্যে যতখানি সম্ভব আপনারা মুখস্ত করে নিবেন এবং শব্দ এ তার অর্থ উত্তমরূপে বুঝে নিবেন; অর্থের প্রতি লক্ষ্য রেখে তা মাঝে মাঝে পড়তে থাকবেন। বস্তুত আল্লাহ তাআলার কথা স্মরণ রাখা তা মাঝে মাঝে পড়তহে থাকবেন। বস্তুত আল্লাহ তাআলার কথা স্মরণ রাখা এবং তাঁর প্রতি মনকে নিবিষ্ট রাখার জন্য এটা একটি বিশেষ কার্যকরী পন্থা।

তিনঃ সওম : শুধু পরয নয় ; বরং নফল সওমও প্রয়োজন। প্রত্যেক মাসে নিয়মিত তিনটি সওম রাখাই উত্তম। নফল সম্পর্ক এটাই বিশেষ উপযোগী ব্যবস্থা। এ সময়ে সওমের মূল উদ্দেশ্য অর্থাৎ কুরআন শরীফে বর্ণিত তাকওয়া অর্জনের জন্য বিশেষভাবে চেষ্টা করা উচিত।

চারঃ আল্লাহর পথে অর্থ খরচ করা :

এ ব্যাপারে শুধু ফরযই নয়; সাধ্যানুসারে নফলও আদায় করতে হবে। এ সম্পর্কে একটি কথা উত্তমরূপে বুঝে নেয়া দরকার যে, আপনি আল্লাহ তাআলার পথে কি পরিমাণ অর্থ-সম্পদ ব্যায় করেছেন,মূলত তার কোনো গুরুত্ব নেই; বরং আপনি আল্লাহর জন্য কতখানি কুরবানী করলেন তা-ই হচ্চে প্রকৃত আপনি আল্লাহর জন্য কতখানি কুরবানী করলেন তা-ই হচ্ছে প্রকৃত বিচার্য। একজন গরীব যদি অভূক্ত থেকে আল্লাহর রাস্তায় একটি পয়সাও ব্যয় করে তবে তার সেই পয়সাটি ধনী ব্যক্তির এক হাজার টাকা হতে উত্তম। ধনী ব্যক্তির এক হাজার টাকা হয়তো তার ভোগ সামগ্রীর দশমাংশ কিংবা বিশ ভাগের এক ভাগ মাত্র। এ প্রসংগে আরও একটি কথা স্মরণ রাখা দরকার, আত্মার বিশুদ্ধিকরণের (তাযকিয়ায়ে নাফস) জন্য আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল (স) যে সব পন্থা নির্দেশ করেছেন তার মধ্যে সাদকা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। এর কার্যকরী ক্ষমতা সম্পর্কে আপনি অনুশীলন করে দেখতে পারেন কোনো ব্যাপারে আপনার একমাত্র ত্রুটি-বিচ্যুতি হলে আপনি অনুতপ্ত হৃদয়ে শুধু তাওবা করেই ক্ষান্ত হবেন। ঘটনাক্রমে পুনরায় যদি ত্রুটি-বিচ্যুতি ঘটে তখন আপনি তাওবা করার সাথে সাথে সাদকা করলে আত্মা অধিকতর বিশুদ্ধ হয়ে থাকে এবং অসৎ চিন্তার মুকাবিলায় আপনি অধিক সাফল্যের সাথে অগ্রসর হতে পারবেন।

পবিত্র কুরআন ও সুন্নাহ আমাদেরকে এ সহজ-সরল পন্থা অনুসরণেরই নির্দেশ দান করেছে। নিষ্ঠার সাথে এর অনুশীলন করলে কঠোর সাধনা, তপস্যা কিংবা মোরাকাবা ছাড়াই আপনি নিজ গৃহে স্ত্রী-পুত্রাদির সাথে অবস্থান করে এবং সমস্ত সাংসারিক দায়িত্ব পালন করেই আল্লাহ তাআলার সাথে সংযোগ সম্পর্ক বৃদ্ধি করতে সক্ষম হবেন।

Top







লেটেস্ট প্রবন্ধ